এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  স্মৃতিচারণ   স্মৃতিকথা

  • এল ডোরাডো

    যোষিতা লেখকের গ্রাহক হোন
    স্মৃতিচারণ | স্মৃতিকথা | ৩০ নভেম্বর ২০২৩ | ১১৫৮৮ বার পঠিত | রেটিং ৪.৩ (৭ জন)
  • এখানে লিখব সোনার দেশ সুইটজারল্যান্ডের নানান অভিজ্ঞতা ও মানুষের কথা।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পড়ছি  | 173.62.***.*** | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:৪৬742296
  • পড়ছি  কিন্তু 
  • যোষিতা | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৫:০২742308
  • আজ সকাল থেকেই সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাড়িটা দিয়ে দিলাম। বড়ো যত্নের, বড়ো কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে কেনা ঐ বাড়ি। আমার বাগান, গন্ধরাজ গাছ, জারুল গাছ, সারি সারি হাসনুহানা, সব ফেলে দিয়ে এলাম। এখন থেকে ফ্রেশ আনকোরা নতুন জীবন শুরু হবে। এমন সুযোগ কজন পায় গোটা জীবনে? আমি পজিটিব থিংকিং করছি।
    ফ্লাইট লেট হলো, ট্যাক্সি স্ট্রাইক, তবু আমার মন বলছে আজকের দিনটা হেলায় ফেলায় নষ্ট করা ঠিক হবে না। 
    কিন্তু ডবল ঝামেলা অটো নিয়ে। প্রথমত নাইন ইলেভেন হবার পর থেকে অ্যামেরিকান এমব্যাসীর ঐ গোটা এলাকায় সর্বক্ষণের জন্য ব্যারিকেড, গাড়ি ঢুকতে দেয় না। সুইস এমব্যাসী ঐখানেই আগেই বলেছি। দ্বিতীয়ত তবু যদিবা ট্যাক্সি থাকলে ঐ ব্লকের ভেতরে কিছুদূর অবধি যাওয়া যেত, অটোরিক্সাকে একেবারেই ঢুকতে দেবে না। প্রায় দুশো আড়াইশো মিটার দূরে মেইন রোডের ওপর অটো আমাদের ঐ কথাই জানালো। 
    জিনিসপত্র টেনে টেনে অতটা পথ হাঁটা যায় না। বাবু দাঁড়িয়ে রইল চওড়া ফুটপাথের ওপর দুটো সুটকেস, হ্যান্ড ব্যাগেজ ট্যাগেজ নিয়ে। আমরা মা মেয়ে কাগজপতর্ নিয়ে জোর পায়ে হাঁটছি সুইস এমব্যাসীর দিকে।
    এমব্যাসীর সামনে দাঁড়িয়ে হাত থেকে কাগজ বের করব, একটা নোটিস টাঙানো, মেয়েই সেটা প্রথম দেখে পড়ে নিল।
    — মা! এমব্যাসী বন্ধ হয়ে গেছে। জানুয়ারীর ছ তারিখে খুলবে!
    মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা। ঘড়িতে বারোটা দশ। বারোটায় দরজা বন্ধ। দারোয়ান ঐ ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে।
    — ভাইসাব! 
    — ম্যাডাম, অফিস বন্ধ হো গিয়া।
    আমার মাথায় হিন্দি আসছে না।
    — প্লিজ প্লিজ প্লিজ ভাই একটু যেতে দিন। নইলে কী অবস্থা হবে আমাদের বলুন দিকি! এ দেখুন টিকিট কাটা রয়েছে,.... আমার চোখে জল আসছে না, কিন্তু ভয়ে গলা শুকেচ্ছে।
    দারোয়ান দরজা খুলে দিলেন।
    ভ্তরের ঘরে অনেক লোক। প্রায় ছ সাতজন ভিসাপ্রার্থী। চেয়ার বিশেষ খালি নেই। কিন্তু প্রত্যেকের হাতে সিরিয়াল নম্বরের টিকিট। আমরা দেরি করে ঢুকেছি টিকিট পাই নি।
    এদিকে পারিজাত  ঝুঁকে পড়ে মেঝেয় কীসব করছে।
    — উঠে বোসো। চেয়ারে বোসো।
    আমি রেগে গেলে ওকে তুমি তুমি করে বলি।
    পারিজাত মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিয়েছে কার যেন ফেলে দেওয়া একটা টিকিট, তাতে কিছু একটা সিরিয়াল নম্বর দেওয়া। ক্রমশঃ ঘর খালি হতে থাকে। আমরা কাউন্টারে যাই। কাগজপত্র, পারিজাতের পাসপোর্ট জমা দিই। খুব সম্ভবত ভিসা ফি লাগে না। কাল ছুটি। তবুও পাসপোর্ট মালীর কাছ থ্কে নেওয়া যাবে।
    আমরা নাচতে নাচতে ফের মেন রাস্তায়। বাবু দাঁড়িয়ে রয়েছে সুটকেস আগলে। 
    একজন অটোচালক জানতে চাচ্ছে আমরা কোথায় যাব।
    আমি তাকে বলে দিই কনট প্লেস, অপোজিট টু সুপার বাজার।
    আমার মেয়েটা এত বোকা, ও বলে, ও ফ্লাইট থেকে নেমে ভেবেছিল এটাই সুইটজারল্যান্ড কিনা।
    দিল্লি ওর খুব ভালো লেগেছে। কী সুন্দর শহর, কী পরিষ্কার।
    কনট প্লেস আমার যেন নিজের জায়গা। ওখানে দুটো হোটেল আমি বেশ চিনি। বহু বছর আসি নি, তবে এটুকু জানি যে বুকিং ছাড়াই আমাদের থাকার ব্যবস্থা তারা করে দেবে।
    হয়েও গেল। ঐ বিশাল যে গোল সাদা বাড়িটা, ওরই মধযে আমার চেনা হোটেল, সস্তার হোটেল। এমনকি ম্যানেজার এখনও সেই শর্মাজী।
    একটা ডবল রুম পেয়ে গেলাম। তারপর খেতে যাব গোল মার্কেটের বসু বোর্ডিং হাউসে। হেঁটেও যাওয়া যায়, কিন্তু এখন ওসব না। প্লাজা সিনেমার মোড়টায় গিজগিজ করছে অটো।
  • যোষিতা | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৫:০৭742368
  • তেইশে ডিসেম্বর ২০০২ এর সেই অদ্ভূত রাত। ব্রাইট হোটেল। রাতের খাবার খেয়েছিলাম নিরুলাস এর নিরিমিষ একটা রেস্টুরেন্টে।
    হোটেলে যে ঘরটা পেয়েছিলাম অ্যাটাচড বাথরুম সহ, সেখানে দুটো সিঙ্গল বেড। একটায় বাবু শুয়েছে, অন্যটায় মেয়েকে নিয়ে আমি। কনকনে ঠান্ডা, কম্বলে শীত মানছে না। মাথার মধ্যে অসংখ্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। হোটেলটা বড্ড নোংরা লাগছে, হয়ত দেড় বছর সুইটজারল্যান্ডে থাকার কারনেই।
    আমার ঘুম আসছে না। ফিরবার টিকিট ডিসেম্বরের ঊনত্রিশে। কিন্তু এতগুলো দিন কীভাবে কাটাবো এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে?
    ভোর হতেই আমরা হুড়মুড়িয়ে চলে যাই সুইস এমব্যাসী। মালীর কাছ থেকে নিয়ে নিই মেয়ের পাসপোর্ট, তাতে ভিসার স্ট্যাম্প লেগে গেছে, আনলিমিটেড ভিসা।
    রাস্তার ধারে তোলা উনুনের ওপর কেটলি চারিয়ে চাওয়ালা চা বেচছে, সঙ্গে পাঁউরুটি, বিস্কুট। রাস্তাতেই ব্রেকফাস্ট হলো। দিল্লি তখনও কুয়াশায় ভরা। 
    ঐ সময়েই ঠিক করে ফেললাম, টিকিটের তারিখ বদলাতে হবে। সম্ভব হলে আজ রাতের ফ্লাইটেই যদি জায়গা পাই আমরা আজই রওনা দেবো।
    সঙ্গে সঙ্গে ট্যাক্সি ধরে সোজা কনট প্লেস, জনপথে পৌঁছে দেখি তখনও দশটা বাজে নি। অতয়েব যন্তরমন্তরে ঢুকে অবজারভেটরি দেখলাম মন দিয়ে। এই আমার তৃতীয়বার এই অবজারভেটরি দর্শন। প্রথমে পাঁচ ছ বছর বয়সে, আবছা স্মৃতি আছে তার কিছুটা, দ্বিতীয়বার ১৯৮৫তে যখন প্রথমবার দেশের বাইরে গেছলাম, সেবারেও দিল্লি থেকে, তখন কনট প্লেসেই থেকেছি ওয়াইএসসিএ র হেটেলে, সম্ভবত মানসিং রোডে। সেবার মনের মধ্যে কত আনন্দ। সারা বিকেল কত ঘুরতাম। এবারে আমার মনের মধ্যে যে আনন্দটা রয়েছে, সেটাকে অনুভব করতে পারছি না। সারাটা ক্ষণ এত উদ্বেগ, এত নিখুঁত করে প্ল্যানিং, এত ভয়, এত দুশ্চিন্তা মনটাকে ভরে রেখেছে, যে ঘুরছি বেড়াচ্ছি খাচ্ছি দাচ্ছি সব যন্ত্রের মত।
    ভাগ্যক্রমে এয়ারইন্ডিয়া অফিসে যেতেই সেরাতের জন্য জায়গা পাওয়া গেল ফ্লাইটে। তবে পাশাপাশি তিনটে সীট হচ্ছে না। আলাদা আলাদা জায়গায় বসতে হবে।
    ওসব ছুটকো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।
    আজ চব্বিশে ডিসেম্বর, গত বছর ঠিক এই দিনে বাবুর সঙ্গে প্রথম আলাপ, প্রথম দেখা সাক্ষাৎ। সেদিন আমরা রাইন নদীর প্রপাত দেখতে গেছলাম। স্দিন কি ঘুণাক্ষরেও আমরা ভেবেছিলাম যে পরের বছর ঐ একই দিনে আমার বাচ্চাটাকে উদ্ধার করে আনতে হবে এত ঝামেলা ঝক্কি পুইয়ে?
    এবার এয়ারপোর্টে চেক ইনে ঝামেলা হয় না। গেট নাম্বার থ্রি। বাকি সব গেটের থেকে আলাদা, একেবারে অন্যদিকে। এই এয়ারপোর্ট আমার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চেনা, এতবার যাতায়াত করেছি।
    কিন্তু ঝামেলা হবে না, সে কি হতে পারে?
    ইমিগ্রেশনের কাউন্টারে আমার মেয়েকে আটকে দিলো।
    বাবুর ইমিগ্রেশন হয়ে গেছে, সে ওপারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। আমি মেয়েকে নিয়ে দুটো পাসপোর্ট এবং বোর্ডিং পাস রাখলাম কাউন্টারে। ইমিগ্রেশন অফিসার আমাদের পাসপোর্ট ও বোর্ডিং পাস দেখে আমাকে প্রশ্ন করল, ও আপনার কে হয়?
    — আমার মেয়ে।
    লোকটার বিশ্বাস হলো না। সে মাথা নেড়ে বলল, উঁহু, বাচ্চা যেতে পারবে না।
    আমি অবাক। কেন? যেতে পারবে না কেন?
    — ম্যাডাম আপনি সাইডে আসুন। আপনার পেছনে যারা লাইনে আছে তাদের আসতে দিন।
  • সমরেশ মুখার্জী | ০২ মার্চ ২০২৪ ২১:৪১742433
  • অমিতাভ‌বাবুর সাথে একমত
    ১৪/২ চলো অটো চাণক‍্যপুরী ..... ২১/২ প্লাজা সিনেমার মোড়ে গিজগিজ করছে অটোর ভীড় .... ২৮/২ ম‍্যাডাম সাইডে আসুন, পেছনের জনকে আসতে দিন ..... এসবের মাঝে আমি‌ও মাঝেমধ্যে এসে দেখে গেছি জল কোথায় কতদূর গড়াচ্ছে .... ম‍্যাডাম এখন সন্দেশখালি নিয়ে বেশ বিচলিত মনে হয় .... তাই এদিকে জল ধীরে বগড়াচ্ছে  laugh
  • যোষিতা | ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৫:২১742440
  • আর একটু পরেই মধ্যরাত হবে। গত বছরটা বাদ দিলে তার আগের কয়েক বছরের মধ্যরাত আমার কেটেছে এন্টালির গির্জাঘরে মিডনাইট মাসের উৎসবে। 
    ক্রিসমাস যে শুরু হতে চলেছে সেটা হঠাৎই এই মুহূর্তে অনুভব করলাম। কারণ অনেকক্ষণ থেকেই এই এয়ারপোর্টে বেজে চলেছে কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, মানে যেগুলো নিয়ম করে ক্রিসমাসে গাওয়া হয়ে থাকে। মূল গান জারমানে, তবে ইংরিজি অনুবাদটাই বাজছে — সায়লেন্ট নাইট, হোলি নাইট।
    সেটা শেষ হলেই — "উই উইশ ইউ আ মেরি ক্রিসমাস" গানটা চলছে, লুপে চলছে দুটো কি তিনটে গান।
    সাইড হয়ে দাঁড়ানোর পরে আর বাকি সব শব্দ ছাপিয়ে কেন জানি না "সায়লেন্ট নাইট" টা বেশ জোরে জোরে কানে এসে লাগল। দুজন অফিসার আমাদের পাসপোর্ট বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন থেকে একটু দূরে নিয়ে গেল, আমার মেয়েকেও হাত ধরে নিয়ে গেল।
    এবার জিজ্ঞাসাবাদ হবে। আমার মনে একটা ক্ষীণ আশঙ্কা ক্ষনিকের জন্য উঁকি মেরেছিল, তবে কি আমার স্বামীর ষড়যন্ত্র? সে তো বারবার আমার মেয়েকে ভয় দেখাতো যে আমাকে সুইটজারল্যান্ড থেকে ডিপোর্ট করাবে বলে। সে ই কি কলকাঠি নেড়ে আমাদের যাওয়া টা রুখে দিচ্ছে?
    নাহ। ওর হাত অত লম্বা বলে মনে হয় না।
    আমার মেয়েকে যখন টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, সে ভয়ে ভয়ে পেছন ফিরে আমায় দেখছিল। আমি তো সঙ্গে সঙ্গেই ছুটছিলাম পেছন পেছন।
    — আপনার কে হয়?
    — আমার মেয়ে।
    — একে আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
    — জুরিখে, আমার কাছে।
    অফিসার দুজন পরষ্পরের দিকে তাকালো। চোখে চোখে কথা হলো তাদের।
    আমার মেয়েকে জিজ্ঞাসা করল একজন আমাকে দেখিয়ে — এ তোমার কে হয়?
    — আমার মা।
    মেয়ে প্রায় কেঁদে ফেলেছে।
    চোখের ইশারায় ইমিগ্রেশনের অফিসারকে দূর থেকে গ্রীন সিগনাল দিলো একজন অফিসার, আমার হাতে পাসপোর্ট বোর্ডিং পাস ফিরিয়ে দিয়ে বলল — ওকে ইউ ক্যান গো।
    আমরা ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে যাবার সময় আমার রানে ভেসে এল একজন অফিসারের কথা, নিজ্দের মধ্যেই বলছে, "এত সিম্পল জামাকাপড়...."।
    ইমিগ্রেশনে তারপর দাম দাম করে স্ট্যাম্পিং, আমরা বাবুর কাছে দিয়ে দাঁড়ালাম।
    এই হ্যারাসমেন্টের অর্থ কিছুটা হলেও বুঝেছি।  ওরা আমাকে শিশুপাচারকারী ভেবে বসেছিল। সেই যে আমার পুরোন অফিসের কোলিগ একবার বলেছিল — তোমার মেয়ের পোশাক আশাক এত সিম্পল কেন?
    এই অফিসাররাও নিজেদের মধ্যে একই কথা বলেছে।
    সাধারণ জামাকাপড় পরা মানুষদের ন্যূনতম সম্মানটুকুও প্রাপ্য হয় না। গর্ভধারিণী মা কে শিশুপাচারকারি মনে করে হয়। তার ওপর সুইসভিসা থাকলে নির্ঘাৎ শিশুকে ব্র্যান্ডেড কাপড়জামা পরিয়ে এয়ারপোর্টে আনা নিয়ম।
    লুপে বেজে চলেছে গান। মাথা ধরে যাচ্ছে।
    সেই সময়েই আমার মেয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে সে আর কোনওদিন ভারতে যাবে না। 
    এই দেশ নিজের নাগরিকদের সম্মান করে না। পদে পদে অসম্মান করে। মানুষের অধিকার এ দেশে নেই।
    এ দেশ যে তার জন্মভূমি নয়, সে জন্যও সে খুশি।
    কথাগুলো শুনতে কঠিন, কিন্তু জীবনের কোন পরিস্থিতে মানুষ এমন কথা বলতে পারে সেটা চিন্তা করবার বিষয়।
    সাজিয়ে গুছিয়ে ছদ্ম ভদ্রতার মোড়ক মেরে মিথ্যে কথা বলতে তাকে আমি শেখাই নি। সে সত্য কথা অকপটে বলেছে।
  • kk | 172.58.***.*** | ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৫:৩৬742442
  • যেকোনো ছুতোনাতায় মানুষের জাজ করার প্রবণতা দেখতে দেখতে ক্লান্ত লাগে!
  • যোষিতা | ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৬:১৭742444
  • ভোররাতে বাড়ি পৌঁছেছিলাম আমরা। সেদিন পঁচিশে ডিসেম্বর। ঘুম ভেঙেছিল একটু বেলা করেই। সকালবেলা তিনজনে মিলে চললাম জুরিখের মধ্যিখানে বুয়ের্কলিপ্লাৎসে জুরিখ লেকের ধারে। মনে হচ্ছে এ কদিনে বেশি তুষারপাত হয় নি, তবে তাপাঙ্ক শূন্যের নীচেই।
    আমরা তিনজনে মনের আনন্দে, একেবারে সত্যিকারের প্রাণভরা আনন্দে সেদিন ঘুরেছি শহরে, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি, কথায় কথায় হেসেছি, কত কত নতুন নতুন জায়গা দেখিয়েছি মেয়েকে।
    মেয়েও মহাখুশি।
    দুদিন পরে তার জন্য নতুন জ্যাকেট জুতো জামা দস্তানা যা যা প্রয়োজন সমস্ত কেনা হলো। ইস্কুলে ভর্তির দন্য স্থানীয় অফিসে খবর দেওয়া হলো যে মেয়ে এসে গেছে, তার নতুন রেসিডেন্স পার্মিট হবে। পরের দিন বাড়িতে চিঠিও চলে এল। সম্ভবত ছ তারিখ ছিল সোমবার। সে দিনই নতুন বছরে প্রথম ইস্কুল খোলার দিন।
    আমি তখনও অফিসের ছুটিতেই ছিলাম।
    মেয়েকে নিয়ে পাড়ার প্রাইমারি ইস্কুলে গেছি আমরা। ইস্কুলের টিচার্স ইনচার্জ এম্মা হাইডেলবের্গ আমাদের নিয়ে চললেন মেয়ের  ক্লাসে। ক্লাসটিচার ডিনার এর হাতে সঁপে দিয়ে তিনি চলে গেলেন। এখন মেয়ে ভর্তি হবে।
    ফরম্যালিটি কিচ্ছু নেই। মেয়ের পাসপোর্ট আছে কি নেই, সেটাও দরকারি না। একটা জিনিসই চাই। জন্ম নিবন্ধ পুস্তিকা। সেটি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের। সবুজ রঙের একটা ছোট্ট বই। কোনও ফর্ম ফিলাপ নেই, বাবা মায়ের নাম ধাম ইন্টারভিউ, কিচ্চু নেই।
    তবু বাবু কিছু কথা বলল শিক্ষিকাকে।
    — দেখুন, এই মেয়ের মা আমার বান্ধবী।
    — তাহলে আপনিই ওর বাবার মতো।
    — তা ধরে নিতে পারেন।
    এই ইস্কুলের একটা বিশেষ ক্লাসে আমার মেয়ে ভর্তি হলো। এই ক্লাসে নানান দেশের নানান বয়সের ছেলে মেয়ে রয়েছে। সবাই জার্মান শিখবে এখন, কেউ আফ্রিকার কোনও দেশ থেকে এসেছে, তো কেউ এসেছে ইয়োরোপ কি উত্তর বা দক্ষিণ অ্যামেরিকার কোনও দেশ থেকে। মে কিংবা জুন মাসে ঠিক করা হবে এরা পরে সাধারণ ইস্কুলে কোন ক্লাসে যাবে। কে কোন বিষয় নিয়ে পড়বে।
    আমার মেয়ে যেহেতু বেশ দেরি করে এসেছে, ও যদি ভাষা শেখাটা তাড়াতাড়ি পারে, ও ও অগস্ট সেপ্টেম্বরে নতুন ইস্কুলে চলে যাবে। যেহেতু বারো বছর বয়স, তার মানে এখন ও ক্লাস সিক্স। 
    কোনও পরীক্ষা নয়, একটা অকিরিক্ত কথা নয়, নতুন বই খাতা কিছুই কেনা নয়, ইউনিফর্মেরও বালাই নেই। সেই অতি সাধারণ পোশাক আশাকেই ওকে সাদরে ভর্তি করে নিলেন ফ্রাউ ডিনার।
    মিস্টার বোসের মেয়ে আমাকে আগে সতর্ক করে দিয়েছল যে বাচ্চা মানুষ করা বড্ড শক্ত কাজ এ দেশে। ফুল টাইম চাকরি করা মায়েদের জন্য বড্ড কঠিন কাজ।
    আমার কিন্তু মোটেই কঠিন লাগছে না এ দেশে। বিশেষ করে ভর্তি তো করে ফেলেছি কোনও সমস্যা ছাড়াই। সব ইস্কুল অবৈতনিক। প্রাইভেট ইস্কুল আছে বলে শুনেছি, তবে অধিকাংশ বাচ্চাই সরকারী ইস্কুলে পড়ে। এ ইস্কুল বাড়ি থেকে হেঁটে পাঁচ ছ মিনিট।
  • যোষিতা | ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৬:৩৭742445
  • জারমান শেখা নিয়ে বাবু জিজ্ঞাসা করেছিল ফ্রাউ ডিনারকে — আমরা কি বাড়িতে ওর সঙ্গে জারমানে কথা বলব, যাতে ও তাড়াতাড়ি ভাষাটা শিখে নিতে পারে?
    — না না! সেকী? একদম ওরকম করবেন না। ওর সঙ্গে বাড়িতে মাতৃভাষাতেই কথা বলবেন।
    আমি একথা শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। নিজের মেয়ের সঙ্গে যদি মাতৃভাষায় কথা বলতে না পারি, তবে আমার বেঁচে থাকাই দায় হয়ে যাবে।
    এ দেশে মাতৃভাষায় কথা বলবার কজন মানুষই বা রয়েছে।
    শিক্ষিকাও বলে দিয়েছেন — বাচ্চা নিজের ভাষায় নিজের ঘরে কথা বলতে না পারলে তার দম আটকে যাবে যে।
    জারমান ভাষা শেখা তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, ওরও তো মানিয়ে নেবার জন্য একটু নিজস্ব জায়গা চাই। তাই না?
    আমি বুঝতে পেরেছি। মাতৃভাষাটাই ওর নিজস্ব জায়গার একটা বড়ো অংশ। যে ভাষায় ও চিন্তা করে, স্বপ্ন দেখে, সেই ভাষাতেই ও ওর মনের ভাব সবচেয়ে প্রাঞ্জল করে বোঝাতে পারে। সেখানে চাপ দিলে ও নিজেকেই প্রকাশ ররতে পারবে না। ওর পড়াশুনো শিক্ষা সব যাবে।
    আমি নিজেও জীবনে দুবার এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি। একবার সোভিয়েত দেশে, দ্বিতীয়বার এদেশে। 
    মাতৃভাষা এমন জিনিস, যা পাল্টানো ইহজীবনে সম্ভব না।
  • ভালো জায়গায় থামা | 173.62.***.*** | ০৩ মার্চ ২০২৪ ২৩:৪৪742454
  • অন্যগুলো ক্লিফহ্যাঙ্গার - রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ। মন্দ হবে কেন। smiley
  • aranya | 2601:84:4600:5410:f54b:7c7a:b17c:***:*** | ০৪ মার্চ ২০২৪ ০৪:৫৯742460
  • পড়ছি। ভাল লাগছে। আপনার লেখার হাত দারুণ 
  • . | ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ ০৪:০৪744396
  • এর আগে যা ছিলো, ট্রেলার। এখন আসবে কৃষ্ণবর্ণ মেয়েছেলের কথা। তার পাশে কেও থাকে না। দুনিয়াতে সবচেয়ে নীচু স্তরে তার অবস্থান। সমস্ত সমাজেই।
    যাদের পছন্দ হবে না এই লেখা, দয়া করে ঢুঁ মারবেন না এখানে।
  • . | ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ ০৮:৩২744397
  • শুরু করেছিলাম গোল্ডিজির আখ‍্যান দিয়ে। বেঁটে মতো, কালো চামড়ার, অথেনটিক হিসেবে মোটামুটি কুৎসিত মুখাবয়বের এক অশিক্ষিত মধ‍্যবয়সী ভদ্রলোক যিনি। অবশ‍্য ভারতে ইনি কোনও দিনই ভদ্রলোক গোত্রের ছিলেন না, অ‍্যাটলিস্ট এই ইয়েরোপে আসার আগে তো একেবারেই না। ইয়োরোপে আসার পরে টাকা কড়ি রোজগার করে ইনি ভারতে টাকা পয়সা পাঠিয়ে দিয়েছেন দেদার। জমি বাড়ি কেনা হয়েছে সেসব টাকা দিয়ে। তখন ভারতে ফিরলে উনি ভদ্রলোকের স্টেটাস পেয়েছেন। 
    এল ডোরাডোয় অবশ্য নিয়ম কানুন অন‍্যরকমের।
    এখানে এক সময় গোল্ডিজির নাগরিকত্ব নেবার সময় ঘনিয়ে এলো। না নিলেও সমস্যা হয় না থাকতে আজীবন, তবে নিলে টুকটাক কিছু সুবিধা, যেমন ভোটাধিকার এবং দুনিয়ার প্রায় একশো চল্লিশ পঁয়তাল্লিশটা দেশে অবাধে বেড়াতে যাওয়ার জন‍্য ভিসার ঝামেলা পোয়াতে হয় না। 
    কেউ জিজ্ঞাসা করবে না, তুমি কবে ফিরবে তার প্রমাণ দাও, সঙ্গে কত টাকা আছে বলো, ভিসার অ‍্যাপ্লিকেশনের জন‍্য গাদা গাদা টাকা খরচ হবে না, রিজেক্ট হবে না, কোথাও কোথাও যদিও ভিসা অন অ‍্যারাইভালে কিছু খরচ আছে, তবে ঐ লাল টুকটুকে পাসপোর্ট দেখলেই আসুন আসুন করে আহ্লাদ করে স্ট‍্যাম্প মারে নানান দেশের ইমিগ্রেশন অফিসারেরা। 
    এর আগে নীল ভারতীয় পাসপোর্টে ইউএস ভিসার স্ট‍্যাপ পড়ে নি, রিজেক্টেড হয়েছিল, অথচ গোল্ডিজির কত শখ ছিলো সেবারে অ‍্যামেরিকা ফেরৎ ট‍্যাগ লাগিয়ে অন‍্য সব রাঁধুনিদের মধ‍্যে রেলা নেবার, বৎসরান্তে দেশে গিয়েও সমাজে একটা আলাদা রেসপেক্ট আদায় করা যেত। কিন্তু বিধি বাম। ভিসা রিজেক্টেড হলো, কোনও কারণ দেখায় নি যদিও। দেশের লোকজন বিলেত অ‍্যামেরিকাটা ভালো বোঝে, মিডল ইস্ট ও বোঝে, ইয়োরোপটা তাদের কাছে ঝাপসা ব‍্যাপার, সেইজন্যই অ‍্যামেরিকা ফেরৎ হবার একটা বাসনা ছিল গোল্ডিজির মনে। এখন সুইস পাসপোর্ট পেয়ে গেলে তো ভিসার বালাই থাকবে না, মামুলি একটা ইলেকট্রনিক ফর্ম অনলাইনে জমা করে সামান্য একটু ফি দিলেই টানা দুবছরের জন‍্য যতবার খুশি যাওয়া যাবে। 
    গোল্ডিজি কর্পোরেশনের অফিস থেকে নাগরিকত্ব নেবার ফর্ম  তুলে নিয়ে এলেন। মোট গোটা আষ্টেক পাতার ফর্ম । বিনামূল্যেই দেয়। অধিকাংশ পৃষ্ঠাতেই ভর্তি করবার কিছু নেই। কয়েকটা জায়গায় দাগ দেওয়া আছে, সেগুলো ভরে ফেলতে ঘন্টাখানেকও লাগার কথা নয়। সঙ্গে কিছু নথি লাগে, সেগুলো জোগাড় করতে যেটুকু সময় লাগবার, ততটুকুই জমা দেবার অপেক্ষা। গোল্ডিজিকে ফর্ম ভরতে সাহায্য করলাম। মাসখানেকেরও কম সময়ের মধ্যে উনি কাগজপত্র জমা দিয়ে এলেন। কয়েক মাস পরে কর্পোরেশন অফিস থেকে ডাক পড়ল। রুটিন ডাক, সকলকেই ডাকে। সেখানে দুচারটে কথা জিজ্ঞাসা করে, তারপরে সরকারি কেরানী নিজেই বেশি কথা বলেন গড়গড়িয়ে মুখস্থ কিছু বাক‍্য। এর পরে বছর খানেক কি দেড়েকের মধ‍্যে বাড়িকে চিঠি আসে, তোমার জেলায় তুমি নাগরিক হয়ে গেছো, একশ দেড়শো মতো টাকা নেয়, ফের মাসখানেকের মধ্যে দেশের নাগরিকত্বের চিঠি আসে, তখন সাকুল‍্যে আবার দেড়শো টাকা নেয়, ফোটো তোলে পাসপোর্ট অফিস, দিন দুয়েকের মধ্যেই রেজিস্ট্রি করা পোস্টে পাসপোর্ট এবং আইডি কার্ড চলে আসে। পাসপোর্ট না নিলে খরচ কম। শুধু আইডি কার্ডই অনেক। তা দিয়েই গোটা ইয়োরোপের সবখানে অবাধে যাতায়াত করা যায়, রাশিয়াটা বাদ, ব্রেক্সিটের পরে ব্রিটেন ও বাদ। তবে এটা তার অনেক আগের কথা।
    নাগরিকত্ব পেয়ে গোল্ডিজি হেভি খুশি। মদ ফদ খেয়ে কদিন ফুর্তি করেছেন বোঝা গেল। ভারতীয় নাগরিকত্বের তথা পাসপোর্টটির বোঝা নামানোও বিশাল খরচের, সঙ্গে ওসিআই কার্ড বানানোর কম্বো অপশনও শুরু হয়েছে তখন সবে। সব কিছু চুকে যেতে গোল্ডিজি অনুভব করলেন যে তিনি এতজন সুইস হলেও আদতে কালা আদমি।  এই অনুভূতি অবশ্যই এক দিনে হলো না, ধীরে ধীরে ঘোর কাটল বলা চলে।
    সুইস হবার টাইমেই কর্মক্ষেত্রে ঝামেলা শুরু হয়ে গেছল। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের ইন্ডিয়ান মালিক গোল্ডিজির সুইস হবার প্রোসেস শুরু হয়েছে জেনেই, রেগে কাঁই। তোমার এত বড়ো আস্পর্দা? মানে সরাসরি এই বাক‍্যটাই নয়, তবে ঠেশ দিয়ে দিয়ে বাঁকা কথা শোনানোর সঙ্গে বেশি বেশি করে কাজের বোঝা চাপিয়ে দিতে লাগল মালিক - প‍্যাটেল।
    কথায় কথায় ধমক মুখঝামটা — তুমি কো সাহেব বনে যাচ্ছ, তোমাকে আর চেনাই যাবে না!
    গোল্ডিজি এসব কথা গায়ে মাখেন না। আশেপাশে আরও কত এরকম শ্রমিক রয়েছে, বাংলাদেশ কি পাকিস্তান কি ভারত থেকে আগত। সকলেরই নানান পাসপোর্ট নিয়ে ঘুরছে ফিরছে কাজ করছে, কারও পোর্তুগীজ, কারো ইতালির তো কারো স্প‍্যানিশ কি ব্রিটিশ পাসপোর্ট। কাগজের বিয়ে করে নিয়ে তারা সব সিটিজেন বনে গেছে। কিন্তু গোল্ডিজির কেস আলাদা। বিয়ে করে সহজ উপায়ে সিটিজেন হওয়া নয়, উনি নাগরিকত্ব পেয়েছেন নিজের যোগ্যতায়। সেইজন্যই প‍্যাটেলের এত রাগ।
  • | ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ ২৩:২৬744400
  • বাহ এটা আবার শুরু হয়েছে। চলুক চলুক।
  • . | ১৭ জানুয়ারি ২০২৫ ০২:২৯744401
  • প‍্যাটেলের রাগের পেছনে আরেকটা বেদনাদায়ক বাস্তব আছে। সে এদেশে এসেছিল প্রায় চল্লিশ বছর আগে, যুবক বয়সে। অবশ‍্যই লিগ্যাল ইমিগ্রেশন ভিসা নিয়ে নয়। কাগজের বিয়ে সে ও করেছিল। তবে কেস কেঁচে যায়। সেকালে ইয়োরেপিয়ান ইউনিয়ন বহরে এত বাড়ে নি, কারেন্সীও সব দেশের আলাদা আলাদা। শেংগেন তো দূরের কথা। ফলে কাগুজে বিয়ে করলে সুইস মেয়েদেরই করতে হবে। সেসবে খরচা অনেক, তবু যাদের তাড়া থাকে, তারা করত খরচ। মুশকিল তৈরি হয় বিযের পরে, নতুন বৌ নিয়মিত ডিভোর্সের ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়, ব্ল‍্যাকমেলিং যাকে বলে। পাঁচ বছর হলে তখন ডিভোর্স করলে সমস‍্যা নেই। নাগরিকত্বের জন‍্য অপেক্ষা না করলেও চলে, তবে অনেকেই রিস্ক নিতে ভয় পেত, যদি তীরে এসে তরী ডোবে, এইসব আর কি। প‍্যাটেল সুইস হবার অপেক্ষা করে টরে নি, পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট হবার আগেই সে ব‍্যবসা ফেঁদে ফেলে। দুটো ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট তার তখন। মহারাজা এবং মহারাণী। প্রথমটা শহরের মধ‍্যিখানে ঘোর য়িহুদিপাড়ায়। সেখানে অর্থোডক্স সমাজ, ছোট ছোট বাচ্চা মেয়েরাও সে পাড়ায় হাঁটুর নীচের ঝুলওয়ালা ফ্রক ছাড়া অন‍্য পোশাক পরবার অনুমতি পায় না, বড়ো হয়ে গেলে ফুলহাতা লম্বাঝুলের জামা। মেয়েরা প‍্যান্ট পরে না। পুরুষদের মাথায় উঁচু টুপি কানের দুপাশে সরু বিনুনি ঝোলে। ছোটো ছোটো ছেলেরাও বড়োদের মিনিয়েচার সংস্করণ। ঐ পাড়ায় রেস্টুরেন্ট খোলা বেশ সাহসী পদক্ষেপ। কেন? সে প্রসঙ্গ পরে আসবে। যাইহোক বেলাইন হবার আগে জানাই যে, প‍্যাটেল দেশে গিয়ে মোটা ডাউরি নিয়ে বিয়ে করে এল ডোরাডোয় ফিরে এলো। বর বৌ দুজনে মিলে ব‍্যবসা করে সেই সঙ্গে সংসার বাচ্চা কাচ্চা, সবই চলছে। মাঝে প‍্যাটেলের শালা এল প‍্যাটেলের ইনভিটেশনে বেড়াতে এলডোরাডোয়। তারপরে সেই শালা দুম করে উধাও। খুঁজে খুঁজে প‍্যাটেল হয়রান। বৌ কে ধমক, গালিগালাজ, চেল্লামিল্লি, কিন্তু শালা সেই যে গনগনাগন পালিয়ে গেল সে গেলোই, ফুল বেপাত্তা। এদিকে প‍্যাটেলের নামের পাশে কলঙ্ক এঁরে দিল পুলিশ। তোমার গেস্ট উধাও হয়ে গেল কী করে? টুরিস্ট পালালে বা নজর এড়িয়ে ভিড়ে মিশে গেলে যে তারে ইনভাইট করেছিল তার ঝামেলা। প‍্যাটেল আর নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবে না অন্ততঃ দশ বছর কি আরও বেশি সময়ের জন‍্য। সে তখনও রয়ে গেছে ভারতীয়ই, যদিও ঘোর অনিচ্ছায়। ওদিকে শেষে শালার খোঁজ মিলল, সে পালিয়ে লুকিয়ে কাগুজে বিয়ে টিয়ে করে শেষমেশ সুইস বনে গেছে। এইসব ব‍্যাথা বুকে বড়ো বাজে প‍্যাটেলের। রাগের চোটে গোল্ডিজিকে একদিন চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দিল সে।
  • . | ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ ০৫:৩৫744405
  • একজন মানুষ তো কখনো একমাত্রিক জীবনকে ধারণ করে না। জীবন বহুমাত্রিক। মাত্রিক মানে মাত্রা থেকে যেটা হচ্ছে এরকমও বোধহয় না। পরত বললে হয়তো কাছাকাছি হবে। নানান রকমের পরত নিয়েই তো জীবন। ঠিক গল্প উপন‍্যাস কি সিনেমার মতো চরিত্র তো আসল একটা মানুষ হয় না। অত‍্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনও গল্প নাটক উপন্যাসের চরিত্রগুলোর চেয়ে অনেক বেশি জটিল, মাত্রাতিরিক্ত পরতময়। একটা লোক বেসিক‍্যালি পাজি, কিন্তু শেষে দেখা গেল যে তার মধ্যে কিছু একটা মহৎ গুণ ও ছিল, কাহানি মেঁ টুইস্ট দিয়ে গল্পকার বাজিমাত করে ফেললেন। একাদশী বৈরাগী র গল্প কিংবা প্রেমদাস গুঁই কবিতা পড়ে আমরা তৃপ্তি পেলাম কিছু, তবে সেসব গল্পেই মানায়। এতসব কেন বলছি ,  ঠিক করে বোঝাতে পারি না বলেই হয়তো।
    যাইহোক, চাকরি যাবার পরে গোল্ডিজি গোঁ ধরলেন, আর দুনম্বরি মালিকদের আন্ডারে কাজ নয়। ইজ্জত বলে একটা জিনিস আছে, সেটা ফেলনা নয়। ইন্ডিয়ান পাকিস্তানি এদের কারবারে অনেক দুনম্বরি ব‍্যাপার, সবসময় লেক ঠকানোর মতলব। চেষ্টা করলে কি একটা ভদ্র গোছের সুইস রেস্টুরেন্টে রাঁধুনির চাকরি জোগাড় করা সম্ভব নয়?
    —কেন নয়, গোল্ডিজি? আপনি চেষ্টা করুন, আনুষঙ্গিক কী কী জিনিস লাগবে বলুন, আমরা আপনাকে হেল্প করে দেব।
     
    উনি দিন কয়েকের মধ্যেই খবর নিয়ে এলেন যে জুরিখ লেকের ধারে, যে পাশটা গোল্ড কোস্টের কাছে, সেখানে ক‍্যাসিনোর অনতিদূরেই একটা দামি রেস্টুরেন্টে লোক নিচ্ছে। অ‍্যাপ্লাই করতে হবে পেশাদার পদ্ধতিতে। মালিকের কাছে গিয়ে হাত কচলাতে কচলাতে চাকরির জন‍্য রিকোয়েস্ট করার কোনো চান্স নেই। প্রোফেশনাল সিভি চাই, তাতে বুলেট পয়েন্ট করে সব কিছু লেখা থাকবে চোস্ত জার্মানে, হাইলাইট করা থাকবে ওঁর ইউনিক সেলিং পয়েন্ট না কীসব যেন বলে, মানে ইউএসপি। আর লাগবে একটা ঝকঝকে প্রোফেশনাল ফোটো। সেটা পেশাদার ফোটোগ্রাফির দোকান থেকে করালে কড়কড়ে দেড়শো ফ্রাংক গচ্চা যাবার রিস্ক রয়েছে, ওটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে, প্রথমে আমরা গোল্ডিজিকে নিয়ে সিভি বানাতে বসলাম। কয়েক ঘন্টার ম‍্যারাথন পরিশ্রম এবং ব্রেইন স্টর্মিং এর ফলে  তৈরি হয়ে গেল হালকা রংচঙে ঝক্কাস একটা সিভি। যেমন তার ভাষার বুনন, তেমনি মার্জিতভাবে হাইলাইট করা হয়েছে ওঁর ইউএসপি। গোটা সিভিতে এক কণাও মিথ‍্যা কথা বা বাড়িয়ে বলা হয় নি কিছু। এবার বাকি রইলো একটা ফোটো। 
    আমার মেয়ে তখন ফোটো তোলে ভালোই, ওঁকে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে আলো কতটা দরকার সেটা দেখে নেওয়া হলো। ঘাড় সোজা করে দাঁড়ানোর ট্রায়াল দেওয়ানো হলো। বাবু তার একটা ব্লেজার দিলো পরতে, সঙ্গে পরিস্কার এবং কলার ওলা একরঙা শার্ট। টাই পরালে বাড়াবাড়ি হতে পারে, ওটা বাদ দিতে হলো। কোটটা টাইট হচ্ছে ওঁর, তবে ক‍্যামেরায় যতটুকু আসবে ততটুকু ম‍্যানেজ হয়ে যাচ্ছে। গোটা কুড়ি ফোটো নেওয়া হলো পরপর, উনি ক‍্যামেরার দিকে তাকালেই স্টিফ হয়ে যান, তাই আমি কথার ছলে ভুলিয়ে রাখি এবং মেয়ে পরপর ফোটো তোলে।
    কিন্তু দেখা গেল ওঁর মুখ সর্বদাই স‍্যাড স্মাইলির মত ঠোঁটের দুপাশ নীচের দিকে ঝুলে থাকে। 
    পরে আবার চেষ্টা করা হয়, গোল্ডিজি একটু হাসুন। উনি হাসতে চান না। ওঁর ধারণা হাসলে চেহারার গ্র‍্যাভিটি নষ্ট হবে। সে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। ভুলিয়ে ভালিয়ে হাসিমুখের ছবি তোলার পরে ঠোঁটের দুপাশ সমান্তরাল হলো। তারপরে গালের কপালের গলার বলিরেখা হালকা করে মুছে ফেলা হলো সফ্টওয়্যার দিয়ে। ফাইনাল ফোটো সিভিতে এককোণে ফিক্স করে ওঁকে দেখতে দেওয়া হলে উনি আনন্দে সত‍্যিই হেসে ফেললেন। সেই সিভি জমা দেওয়ার পরপরই ইন্টারভিউ এর ডাক পড়ল, এবং পরের মাসের প্রথমে জয়েনিং ডেট।
    গোল্ডিজির এই সুখবর পেয়ে আমরা সকলেই আনন্দিত এবং এখানে মাইনে পত্র ভালো। মাসে হাজার ছয়েকের মতো সুইস ফ্রাংক মন্দ না। গ্রস স‍্যালারি যদিও। তবে প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব‍্যবস্থাটা আগের কোম্পানির চেয়ে বেটার। গোল্ডিজি বুঝতে পেরেছেন যে উনি জাতে উঠেছেন। আমরাও তেমনই ভেবেছিলাম।
  • . | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ০২:৫৩744416
  • এর পর কী কী হতে পারে বা কী কী হয়েছিল, সেটা জানানোর আগে কিছু জিনিস বলে নিই, তাহলে বুঝতে সুবিধে হবে।
    সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে থেকে, যখন সঞ্জয় গান্ধির হেভি রমরমা, না না গণ হারে নাশবন্দির মতো কোনও ঘটনার কথা বলছি না, তখনই ট্রামের ভেতরে বা নানান জায়গায় বিজ্ঞাপনের মতো এঁর বাণী লেখা থাকত। তার দুটো এখন মনে পড়ছে। একটা হচ্ছে "দেশ প্রগতির পথে", অন‍্যটা "কথা কম, কাজ বেশি"।
    তো মধ‍্য ইয়োরোপের অলরেডি প্রগতিপ্রাপ্ত তিনটে দেশের কথা বলতে পারি ( বাকিগুলো সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত কম জানি, জাজ করতে পারব না), দেশ তিনটে হচ্ছে অস্ট্রিয়া, জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ড, এই দেশগুলো ঐ দ্বিতীয় প্রিন্সিপল অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলে। কথা কম, কাজ বেশি। কাজ শুধু বেশিই নয়, কাজের কোয়ালিটি অনেক হাই। সুচারু পদ্ধতিতে করা হয় সব কাজ।
    এটা গেল এক নম্বর পয়েন্ট। ইন জেনারেল কর্মের পরিবেশ বোঝানোর জন‍্য।
    দু নম্বর পয়েন্ট হচ্ছে, যে টাইমফ্রেমে গোল্ডিজি ঐ চমৎকার ঝাঁ চকচকে দামী রেস্টুরেন্টে চাকরি পেলেন সেই সময়ের কিছু আগে থেকেই অ‍্যামেরিকায় দমাদ্দম কালো মানুষদের পুলিশ মেরে ফেলছিল। একটা  নিরস্ত্র টিনজার কালো ছেলেকে এর অল্প আগেই এক সাদা  গুলি করে মেরেছিল, তার পরে তো পর পর খবর আসছিল, যে এরকম খুন পুলিশও করে থাকে। তখন ব্ল‍্যাক লাইভস ম‍্যাটার আন্দোলনের খবর অ‍্যাটলান্টিকের এ প্রান্তের সংবাদ মাধ্যমে আসতে থাকে। গোল্ডিজি দেখা গেল এই আন্দোলন ভালো চোখে দেখছেন না। উনি নিজেকে যেহেতু ব্ল‍্যাকদের থেকে যোজন দূরের অবস্থানে বিশ্বাস করতেন, বরং সাদাদের কাছাকাছি অবস্থানেই কল্পনা করে এসেছেন, তাই গোল্ডিজি ইন্টারনেট খুঁড়ে খুঁড়ে এই আন্দোলনের সমালোচনামূলক পোস্ট/লিংক জোগাড় করে আমাদের তো পাঠাতেনই, সঙ্গে অল্প মন্তব‍্যও করতেন।
    জিনিসটা অদ্ভুত লাগলেও, ঘটনা সত‍্য। 
    এর সঙ্গে কালো মানেই চোর গণ্ডা বদমাইশ এবং সাদা মানেই "প্রভু আমার প্রিয় আমার পরম ধন হে"  মেন্টালিটি যে কেবলই কলোনিয়াল হ‍্যাংওভারপ্রসূত, তা কিন্তু নয়। এই মানসিকতা জটিল। গোল্ডিজি একবার সপ্তাহান্তে মধ‍্যাহ্নভোজের জন‍্য এলেন আমাদের বাড়িতে। খাওয়া দাওয়ার চেয়েও বেশি যেটা হয়, সেটা আড্ডা। তর্ক হতে হতে ঝগড়ার লেভেলও পৌঁছেছে বহুবার। 
    এবার নতুন চাকরির কথা বেশি হলো না, যেটা হলো সেটা ঐ "কালোগুলোর বাড় বড্ড বেড়েছে" ট‍্যাগওয়ালা মন্তব্যের উত্তর প্রত‍‍্যুত্তর হতে হতে প্রায় মারামারির আগের লেভেলে তর্ক বন্ধ করা।
    মনকে এই বলে প্রবোধ দিই, কার সঙ্গে কথা বলছি আমি? এই লোক ক্লাস ফোরও পাশ করে নি, এর নলেজ বেস টুকটাক ইন্টারনেটের খবর, কেন সময় নষ্ট করছি? কেন উত্তেজিত হয়ে নিজের মেজাজ নষ্ট করছি?
    তবে মন খারাপ হয়ে যায়। এরকম মানুষ তো আরও অনেক আছে সমাজে। এরা বোঝে এদের অবস্থান? বোঝে না তো হান্ড্রেড পারসেন্ট, কিন্তু বুঝতে চেষ্টাও করে না, বোঝানোর চেষ্টা করলেও মনের দরজা বন্ধ করে রাখে। সমাজ কেন বদলায় না, সেটার বড়ো কারণ তো এখানেই নিহিত।
  • . | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ০৩:৩২744417
  • কেবল উপরোক্ত দুটো পয়েন্টই নয়, আরও পয়েন্ট আছে। 
    মানুষের প্রতি মানুষের হিংস্রতা এবং অত‍্যাচারের তীব্রতা মাপার জন‍্যও আমরা হত‍্যা, জখম, ধর্ষণ, চুরি ডাকাতি, রাহাজানি, সম্পত্তি বেদখল, নিজের বাসভূমি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া, ভূমিচ‍‍্যুত করা, ইত‍্যাদি, অথবা এ সবের কম্বিনেশন হলেই সেগুলোকে যথেষ্ট অত‍্যাচার বলে মান‍্যতা দিতে অভ‍্যস্থ। হয়তো এগুলো যথেষ্ট দৃশ‍্যমান বলেই। চট করে চোখে ধরা পড়ে। কানে শুনলেও বোঝা যায়। হয়তো সেকারণেই টিভি অ‍্যাংকারগণ সর্বক্ষণ চেঁচান। মহিলা অ‍্যাংকারেরা হয় চুড়ান্ত হাই পিচ এ চেঁচিয়ে ভয়াবহতা বোঝানোর চেষ্টা করেন, কেউ এত বেশি কোঁৎ পেড়ে হুংকার দেন, যে সন্দেহ হয় এত কোঁৎ পাড়ার ফলে মলত‍্যাগ না হয়ে যায়। মারাত্মক ভায়োলেন্স ছাড়া অত‍্যাচার মাপার আর কোনও একক নেই। মারধোর শব্দটার আগে বেধড়ক কথাটা অনায়াসে জুড়ে দেওয়া হয়। হয়তো এসবের সূত্রপাত অনেক অনেক বছর আগেই। যখন হিন্দি সিনেমায় অত‍্যধিক মারামারি দেখানোর চল শুরু হয়েছিল। ফাইট ফাইট ফাইট। যে ফাইটের শেষে কয়েকশো ঘুঁষি লাথি লাঠিপেটা ইত‍্যাদি প্রভৃতি সহ‍্য করেও বেঁচে থাকবে, সে ই হিরো। সেই জিতে গেল। 
    অল্প একটা দুটো চড় থাপ্পড় ভায়েলেনিস বা অত‍্যাচার হিসেবে স্বীকৃতিই পায় না, শারীরিক অত‍্যাচার না হলে তো সেসব ফালতু ব‍্যাপার।
    এই নর্ম তৈরি হয়ে গেছে। কেউ দিনের পর দিন অপমান করলেও সেটা যেন কোনও স্বীকৃত আঘাতই নয়। 
    তবে এ সমস্তই অন‍্যের ওপর হলে, তখনই।
    এখন আসব আসল ঘটনায়, যেটার জন‍্য এই তিনটে পয়েন্ট নিয়ে ভ‍্যানতাড়া করলাম।
  • . | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ০৫:০৫744418
  • হ‍্যাঁ, মূল প্রসঙ্গ ফিরি। আমি মারাত্মক কোনও খাদ‍্যরসিক নই। ঘন ঘন নানান রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাবার চেখে দেখার নেশাও নেই আমাদের দুজনেরই। সহজে রাঁধা যায় এবং যথাসম্ভব স্বাস্থ্যকর খাবারই তিনবেলা খাওয়া হয় এ বাড়িতে। মাঝে সাঝে সখ করে কিছু এক্সপেরিমেন্টাল রান্না হয় যে না,  তা নয়। তবে সারা শহরের যাবতীয় রেস্টুরেন্টে ঘুরে ঘুরে খেয়ে বেড়ানোর চেয়ে অন‍্য জিনিসে আমরা বেশি আনন্দ পাই। হয়তো এই কারণেই গোল্ডিজির নতুন কর্মস্থলে একটিবারের জন্যও যাওয়া হয়ে উঠল না। 
    উনি যেদিন এসেছিলেন, প্রথম দিকে কী কী খাবার ঐখানে পাওয়া যায় জিজ্ঞাসা করতেই উনি মেন‍‍্যুকার্ডের খাবার দাবারের নাম বলেছিলেন। চেনা সব নাম। এসব অঞ্চলের প্রচলিত খাবার। 
    উনি নিজে কোন কোন পদ বানাচ্ছেন জানতে চেয়েছিলাম। নতুন কোনও পদ রাঁধতে শিখলেন কিনা সে নিয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছিলাম। উনি সংক্ষেপে উত্তর দেন, কিংবা হুঁ হাঁ করে এড়িয়ে গিয়ে অন‍্য প্রসঙ্গে ঘুরিয়ে দেন আলোচনার মোড়।  যখন ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে দিনে বারো ঘন্টা কাজ করতেন, তখন কত উৎসাহের সঙ্গে আমাকে লতুন রেসিপি শিখিয়েছেন। আমি ইডলি, দোসা, সম্বর, নানাবিধ চাটনি, দইবড়া থেকে শুরু করে চিকেন বাটার মসালা লেভেলের রান্না টুকটাক বানিয়ে ফেলতে পারতাম। সেই গোল্ডিজির রান্নার গল্পে অনীহা দেখা দিয়েছে। লেকের ধারে এই সীজনে বারবিকিউ হয় বলছেন, কিন্তু কেমন করে সেসব হয় তা চেপে যাচ্ছেন। দুনিয়ার পোলিটিক্স নিয়ে এত গভীর আগ্রহ আগে কিন্তু দেখা যায় নি।
    তর্ক বিতর্কের সেই এপিসোডের পর হপ্তা দুয়েক যোগাযোগ রইল না। কিন্তু পুরোনো বন্ধু বলে কথা, ফের উনি মেসেজ করতে লাগলেন, তবে ব্ল‍্যাক লাইফের ওপরে না, ভারত পাকিস্তান কিংবা অন‍্য কোনও কারেন্ট অ‍্যাফেয়ারের সংবাদের লিংক। 
    মাসখানেক কাটবার আগেই উনি যোগাযোগ করে একদিন এসে উপস্থিত। একটু দমে যাওয়া বিদ্ধস্ত মতো দেখাচ্ছে।
    শরীর স্বাস্থ‍্য মোটের ওপর চলছে, নতুন ফ্ল‍্যাটে রয়েছ্ন এখন, এই রেস্টুরেন্টে মালিক বাসস্থান দেয় না যেহেতু। পুত্র এবং কন‍্যা সামনের মাসেই বেড়াতে আসবে এদেশে। তবে ওঁর একটা সমস‍্যা হচ্ছে কাজের জায়গায়। আমতা আমতা করে গোল্ডিজি বলেই ফেললেন ব‍্যাপারটা। নতুন কর্মস্থলে লোকজন যেন কেমনধারা।
    — তার মানে? আপনার সঙ্গে মন্দ ব‍্যবহার করেছে?
    — না। মন্দ ব‍্যবহার না।
    — তাহলে?
    গোল্ডিজি চুপ। এক্সপ্রেস করতে পারছেন না সিচুয়েশন।
    — খুলে বলুন গোল্ডিজি। 
    — মানে, আমার সঙ্গে যারা কাজ করে, তারা ...
    — হ‍্যাঁ বলুন, তারা কী?
    ফের চুপ উনি।
    — আপনাকে অসম্মানজনক কিছু বলেছে?
    — না না! অসম্মানজনক কী বলবে? সেরকম কিছু না। 
    — গালি টালি দেয় নি তারমানে, তাইত?
    — না না, ছি ছি গালি দেবে কেন? 
    — মারে তো নি ই, বোজা যাচ্ছে।
    — মারবে রেন? হি হি.... ছি ছি...
    — তাহলে? আপনি তো কিছুই বলছেন না।
    — মানে, অনেকরকমের কাজ করায়, কিন্তু কিচেনে রান্নাটায় হাত ও লাগাতে দেয় না।
  • kk | 172.58.***.*** | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ০৫:২৫744419
  • আরে কী সমাপতন! যখন পড়লাম গোল্ডিজী হাই-ফাই রেস্তোরাঁয় কাজ পেয়েছেন, তখনই ভাবলাম আপনাকে প্রশ্নটা করবো... যার উত্তর পেয়েও গেলাম ,ঐ লাস্ট লাইন। রান্নাটায় হাত লাগাতে দেয়না। ঠিক এই নিয়ে একজন যথেষ্ট বিখ্যাত শেফের বক্তব্য শুনছিলাম ক'দিন আগেই। আপনার লেখায় বিস্তার হোক। সম্ভবত আমি যা ভাবছি তাইই। দেখি, পড়ি।
  • . | 194.56.***.*** | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:১৪744420
  • রান্নাবান্নায় হাত লাগাতে দিচ্ছে না শুনে বাবু এবং আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। মনের মধ্যে একটা সন্দেহ তৈরি হলো আমাদের দুজনেরই। আগের একটা ঘটনা, যা বাবু আমাকে আগে বলেছে, সেইটের সঙ্গে কোথায় যেন মিল পাচ্ছি।
    তবু একেবারে শিওর না হওয়া পর্যন্ত আমরা সরাসরি মুখ খুললাম না গোল্ডিজির সামনে।

    - হাত লাগাতে দেয় না মানে? আপনি কি অ্যাসিস্ট করতেও পারেন না?
    - অ্যাসিস্ট বোলে তো...?
    - এই মনে করুন কুটনো কোটা, যেমন ধরুন আলু পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো, স্যালাদের জন্য শশা টম্যাটো লেটুস শাকপাতা বা অন্য কিছু আর কি...

    ফ্যালফ্যাল করে অল্প চেয়ে রইলেন গোল্ডিজি আমাদের দিকে। যেন চিন্তায় পড়ে গেছেন, কী উত্তর দেবেন ভেবে পাচ্ছেন না। আসলে সব প্রশ্নের উত্তর তো বাইনারি হ্যাঁয়ে বা নায়ে হয় না। একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে যেন কতকটা ইম্প্রোভাইজ করে উত্তর দেন গোল্ডিজি।
    - না, মানে স্যালাদ তো নানান রকমের হয়, ইন্ডিয়ান ফুডের স্যালাদ আর ইয়োরোপিয়ান ফুডের স্যালাদের মধ্যে তো বিশাল ডিফারেন্স।
    - সেতো বটেই। তা সেগুলোতেও কি হাত লাগাতে দিচ্ছে না?
    নেতিবাচক মাথা নাড়লেন গোল্ডিজি।

    - আচ্ছা, বুঝলাম। তার মানে খাবার দাবারের কাছাকাছি কোনও কাজ আপনার নেই, তাই তো?

    গোল্ডিজি এবারও উত্তর দেবার বেলায় কতকটা কন্ফিউজড। তবুও হ্যাঁয়ে নায়ে মিলিয়ে মিশিয়ে কী যে ঠিক বললেন বিড়বিড়িয়ে তাতে কথা বা বাক্য স্পষ্ট করে বোঝা না গেলেও বোঝা গেল, যে এতকাল ধরে রান্নাবান্না করাটাই যে লোকের প্রোফেশন, সেই লোককেই রান্নার কাজের চাকরিতে বহাল করে খাবার দাবারের থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। কিন্তু কেন দূরে রাখছে ওরা? আর আসলে কোন কাজটা করাচ্ছে ওঁকে দিয়ে? বসিয়ে বসিয়ে নিশ্চয় মাসে মাসে হাজার পাঁচেক করে সুইস ফ্র্যাংক এবং আরও আনুষঙ্গিক খরচাপাতির দায়ভার বহন করবে না মালিক।

    - না না, কাজ আমার আচ্ছে, তবে কুকিং এর কাজ নয়।

    আমার করা প্রশ্ন যাতে জেরার মতো না শোনায়, সেজন্য আমাকে সতর্ক থাকতে হয়। মাঝে মধ্যে আমি অধৈর্য হয়ে পড়ি উত্তর শোনার জন্য, এটা আমার দোষ। একটু কফি বানানো হলো এই ফাঁকে। দুপুরের খাবার খেতে খেতে বিকেল হয়ে যাবে জানি, তবে তাড়া নেই আমাদের কারওরই।

    এর মধ্যে গোল্ডিজি ধাতস্থ হয়েছেন কিছুটা।
    বললেন, ওঁকে দিয়ে সাফ সাফাইয়ের কাজগুলোই করানো হয়ে চলেছে। একমাসের কিছু বেশি সময় কেটে গেছে, তবে ক্লিনিং এর কাজের ভারই দেওয়া হয়েছে ওঁকে। যদিও সাধারণ বাসন কোসন থালা বাটি ধোবার জন্য মেশিন থাকে, তা সত্ত্বেও প্রচুর ক্লিনিং এর কাজ থাকে যা মেশিন করতে পারে না। সেইসবই করানো হয়। রান্না করে একজন কি দুজন রাঁধুনি। জোগাড়ের কাজেও গোটা দু তিনজন আছে। রেস্টুরেন্টের সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতার দিকে সর্বক্ষণ নজর দেওয়া হয়। এসব ছাড়াও বাংলায় যাদের আমরা জমাদার বলি, কি জানিটর বলে সম্ভবতঃ ইংরিজিতে, সেরকম সাফাই কর্মীও আসে টয়লেট সাফ করতে বা মেঝে ঝাড়পোঁছ করতে। বাকি যাবতীয় সাফাই গোল্ডিজির দায়িত্ব।
  • | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:২৫744421
  • হুম্ম রান্নায় হাত লাগাতে দেয় না পড়ে এটসি আন্দাজ করছিলাম। 
  • . | 194.56.***.*** | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:৪৬744423
  • বাবু এবার আলোচনার সঠিক পয়েন্টে চলে আসে। তারও পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে এই ব্যাপারে। তার কর্মজীবনের একটা সময়ে অফিসের ক্যান্টিনে একটা ঘটনা হয়, যেটা তার মনে আছে। সেই ঘটনাই আমাদের মনে পড়ে গেছল একই সঙ্গে, সেই জন্যই মুখ চাওয়া চাওয়ি করে ফেলেছিলাম এক ঝলক।
    বাবুদের অফিসে একবার দেখা গেছল ক্যান্টিনে এক পাকিস্তানি মানুষকে, যিনি খাবার সার্ভ করতেন। মানে ক্রেতারা ট্রে নিয়ে পরপর যেত খাবার দাবার যেখানে রান্না করে রাখা আছে, কার কোনটা চাই তারা বলে দিলেই সেই ব্যক্তি থালায় মেন্যুমাফিক খাবার বেড়ে দিতেন। স্টেক, আলুসেদ্দ, বীনস, মিক্সড ভেজিটেবল, সসেজ, যার যেমন পছন্দ। তারপরে ক্রেতারা নিজ নিজ ট্রে নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে বিল চুকিয়ে টেবিল বেছে নিয়ে বন্ধুবান্ধব কোলিগ মিলে মিশে খাওয়া দাওয়া করবে গল্প করবে, যাকে বলে পরিচিত লাঞ্চ ব্রেকের পরিবেশ।
    খাবার বেড়ে দেবার কাজের জন্য নিযুক্ত ঐ পাকিস্তানি লোকটিকে কিছুদিন পরে আর দেখা যাচ্ছিলো না। ঐ অফিসে বাবুই একমাত্র মানুষ, যার গায়ের রং কালো (আচ্ছা, কালো নয়, বাদামিই সই)। পাকিস্তানি লোকটি তাকে খাবার বেড়ে দিতে দিতে কয়েকবার উর্দুতে কথাও বলেছিলো, বাবু উর্দু বা হিন্দি কোনওটাই জানে না, তবে মোটামুটি আঁচ করে নিয়েছিলো লোকটি কী বলছে, ভালো কথাই সে বলছে, আদর আপ্যায়নই করতে চায় যথাসাধ্য সেরকমই বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলো সে। দেখলেই হাসিমুখে এগিয়ে আসতো। হঠাৎ করে লোকটি টানা অনুপস্থিত দেখে, বাবু ক্যান্টিন ম্যানেজারটিকে প্রশ্ন করে বসে - ঐ আপনাদের নব নিযুক্ত পাকিস্তানি লোকটিকে দেখছি না বেশ কয়েক দিন, সে কি আর এখানে কাজ করছে না?
    ম্যানেজার সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন। সঙ্গে কারণটাও বলে দেন। ঐ লোক খাবার সার্ভ করায় কাস্টমারেরা আপত্তি জানিয়েছিলো। তারা একটু ঘেন্না ঘেন্না মতো পাচ্ছিল ঐ লোকটির বেড়ে দেওয়া খাবার খেতে। কাস্টমারের কম্প্লেইন শিরোধার্য। এটা তো বিজনেস, তাই নয় কি? কাস্টমারদের খুশি রাখলে তবেই তো বিজনেস টিঁকে থাকবে।
    আমরা আসলে বুঝি এই ঘৃণাবোধ। কালো মানুষের হাত থেকে খাবার খাওয়ার পেছনে কোন ঘৃণা কাজ করে। আমাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে ভারতবর্ষের সংস্কৃতি আছে। জাতপাত, ধর্ম, গায়ের রং, অনেকরকমের ঘৃণার কম্বিনেশনই আমরা দেখতে দেখতে বেড়ে উঠেছি, এ জিনিস এসবখানেও বিদ্যমান, অল্প হোক কি বিস্তর, আছে।
    এই ঘটনাটাই বাবু গোল্ডিজিকে বলল।
    গোল্ডিজি কিন্তু সেটা মানতে চাইলেন না।
    মানলে উপরোক্ত দু নম্বর পয়েন্টকে কন্ট্রাডিক্ট করা হয়। গোল্ডিজি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে তখনও এই দুনিয়ার সাদা মানুষদের সঙ্গে অনেক বেশি একাত্ম বোধ করে চলেছেন।
  • . | 194.56.***.*** | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১২:৪৪744424
  • তাঁকে যে গাত্রবর্ণের কারণেই জনসমক্ষ থেকে দূরে রাখা হচ্ছে, এটা অ্যাকসেপ্ট করতে গোল্ডিজির অসম্ভব কষ্ট হচ্ছিলো। যে কাজ ওঁকে দিয়ে করানো হচ্ছে, সেই কাজ করতে যত না কষ্ট, যত না হীনমন্যতায় এবং অপমানের জ্বালায় উনি ভুগতেন, তার চেয়ে কিছু কম যন্ত্রণা নেই এই সত্যটিকে অ্যাকসেপ্ট করায়, যে তিনি যতই কল্পনার জগতে বিচরণ করুন না কেন, বাস্তব পুরোটাই তার বিপরীতে।
    যাইহোক, এটা উনি মানলেন না যদিও, তবে কর্মক্ষেত্রে কী রেটে টর্চার হচ্ছে সেটা ক্রমে ক্রমে জানা গেল। অত্যাচারের তীব্রতা ভালো করে দেখিয়ে না দিলে, বুঝিয়ে না দিলে যদি আমরা যথেষ্ট সহানুভূতি দেখাতে না পারি, সেই প্রচেষ্টায় তিনি বলে চলেন, কী কী করা হয় ওঁর সঙ্গে।
    এমনিতে মেশিনে ঢোকানোর আগে বাসনকোসনের হাল্কা সাফাইয়ের পাশাপাশি জঞ্জাল একত্র করা, রেগুলার ইন্টারভ্যালে জঞ্জালের পাত্র খালি করে আনার পাশাপাশি রয়েছে বারবিকিউ করার সরঞ্জামের দাগ ওঠানোর কাজ। একটা রাফ সারফেসের পাথরের স্ল্যাবের ওপরে নিত্যদিনের বারবিকিউয়ের সরঞ্জাম এনে দিয়ে বলা হয় ঘষে ঘষে ঝকঝকে করে তুলতে। তেল কালি জং সমস্তই ঘষে ঘষে তুলতে হবে। সঙ্গে কিছু ফ্যাট বা তেলচিটে পদার্থ তুলে ফেলার কেমিক্যালও দেওয়া হবে। উনি ঘন্টার পর ঘন্টা পাথরের স্ল্যাবের পাশে উবু হয়ে বসে অড সাইজের সেইসমস্ত ঝাঁঝরি বা শিক বা আরও নানান সরঞ্জামের কোণ থেকে ময়লা কালি তেল তুলতে থাকবেন। কখনও সেই সমস্ত উনুনও ঝঝকিয়ে তুলতে হবে। মাঝে মধ্যে তরুণ কর্মচারীরা এসে দেখে যাবে, পরীক্ষা করে দেখবে জিনিসগুলোয় ঠিকঠাক চমক আসছে কি না, তারা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করবে, সিগারেট খেতে চলে যাবে রেস্টুরেন্টের পেছনে বাগানের ধার ঘেঁষা নির্দিষ্ট জায়গায়। এই তরুণ কর্মীরাই জোগাড়ের কাজ করে। গোল্ডিজি এই চাকরিতে জয়েন করবার আগে কে বা কারা এই ধরণের সাফাইয়ের কাজ আগে করেছে জানতে আগ্রহ হয়।
    তবে এই প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন না। হয়ত সেরকমভাবে সাফাই আগে হতো না, বা এরাই করত মিলেমিশে, কিংবা আগেও এরকম আরেক কোনও গোল্ডিজিকে দিয়ে এই কাজ করানো হতো। অনেক রকমের অনুমানই আমরা করতে পারি।
    যেটা জানলাম, এই ধরণের টর্চার করে ঐ তরুণ কর্মীগুলো বেশ আনন্দ পায়, মাঝেমধ্যে এসে ধমকে যায়, তবে আলতো করে বকে দেয়। এদেশে কথা কম, কাজ বেশি। খারাপ কথা একদম বলা যাবে না। খারাপ কথা বললেই তো প্রমাণ হয়ে যাবে, যে মন্তব্যটার মধ্যে রেসিজিম ছিলো। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে ভুক্তভোগীকে, "আপনাকে কি মেরেছে না বকেছে?", তখন উত্তর হবে, না মারে নি, বকেও নি। তবে কি গালি দিয়েছে? কোনও রেসিস্ট রিমার্ক? এর উত্তরও নেতিবাচক হতে বাধ্য। অর্থাৎ আইনের সামনে, আদালতের সামনে (সে যদিও কেউ যায়ই না), সে বোকা প্রমাণিত হয়ে যাবে, কিংবা মিথ্যেবাদি, কোনও কোনও ক্ষেত্রে বড্ড সেনসিটিভ ইমোশনাল, পারহ্যাপ্স এই লোকের সাইকোলজিস্টের কাছে যাওয়া দরকার, কিংবা দায়সারা ভাবে এটাও বলা যেতে পারে, লোকটি এই সমাজে ইন্টিগ্রেটেড হতে পারে নি।
    যদি কেউ শুধোয়, হ্যাঁ গোল্ডিজি আপনার কেন এমন মনে হচ্ছে, যে ওরা আপনাকে নিয়ে রঙ্গ করছে বা বুলি করছে? কোনও সঠিক গ্রাউন্ড আছে কি?
    উনি কিন্তু দিশেহারা হয়ে যাবেন এর উত্তর দিতে গিয়ে। কংক্রিট কোনও প্রমাণ দিতে পারবেন না। হ্যাঁ, কাজ করিয়েছে। তাতে দোষ কোথায়? কাজের জন্যই তো বেতন দেওয়া হয়, কাজ তো করতেই হবে। না, মানে রান্নার কাজ করায় নি, কেবলই বারবিকিউয়ের সরঞ্জাম ঘষতে হতো। কারওকে না কারওকে তো সরঞ্জামগুলো পরিষ্কার করতেই হতো, তাই নয় কি? নইলে আর পাঁচজন মানুষ, যারা বাইরবিকিউ খাবে, তাদের অসুস্থ হবার উপক্রম হবে না কি? গ্যাস্ট্রোনমিতে পরিচ্ছন্নতা কিন্তু একটা দরকারি এরিয়া। মিলেমিশে কাজ করতে হবে। আপনি কি ইয়োরোপিয়ান রান্নাবান্নায় এক্সপার্ট? সে বিষয়ে কত বছরের অভিজ্ঞতা? ওহো, ইন্ডিয়ান কুইজিন? সেতো বেশ ভালো, বেশ টেস্টি টেস্টি স্পাইসি খাবার, খুব ভালো, খুব ভালো। তবে যেখানে এখন কাজ করছেন, তারা কেউ মারে নি, কেউ বকে নি, কাজ করতে বলেছে, এই নিয়ে আপনার অসন্তোষের কারণটা ঠিক কোনখানে? আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে? আপনি শিওর? আপনিও হাসুন। হাসা তো ভালো জিনিস। ওদের সঙ্গে গিয়ে মিশুন না। ওদের কাছে গিয়ে ব্রেকের টাইমে আড্ডা দিন, গল্পগুজব করুন, মিশুন ওদের সঙ্গে, দেখবেন আপনার মনের ভুল ধারণাগুলো ভেঙে যাবে। কী বললেন? আগে বেশ কয়েকবার মিশতে গেছেন, কিন্তু ওরা তখন সরে গেছে? গল্পে আড্ডায় অংশগ্রহণ করতে দেয় নি? য্যাঃ, এটা আপনার ধারণা, এরকম নয়, আপনি জার্মান ভাষায় হয় ভালো করে কমিউনিকেট করতে পারেন নি, ভাষার প্রতিবন্ধকতার কারণে আপনি ওদের সঙ্গে মিশতে পারছেন না।
  • . | 194.56.***.*** | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১৫:০৩744425
  • এক্ষেত্রে কেউ কেউ বলতে পারে, যে আপনি আপনার বস কে জানিয়েছেন কি এসব কথা? আপনার বস অবগত এ ব্যাপারে? যেহেতু একটা রেস্টুরেন্টের মত কর্মক্ষেত্রে হিউম্যান রিসোর্স টাইপের কোনও ডিপার্টমেন্ট থাকে না, আপনার উচিৎ মালিক কিংবা বস, যদি মালিকই বস হন তাহলেও, তাঁকেই পরিষ্কার করে ব্যাপারটা জানানো। বুলিইং কিন্তু শাস্তিযোগ্য অপরাধ এল ডোরাডোয়। একবার যদি বুলিইং প্রমাণিত হয়ে যায়, ঐ যারা আপনার পেছনে লাগছে, সবকটার কড়া সাজা হবে। হতেই হবে।
    এই কথাগুলো শুনলে কেমন একটা জোশ এসে যায় না মনে? মনে হয় না কি যে, হ্যাঁ আমি কমপ্লেইন করব, জানাবো বসকে সমস্ত অন্যায়ের কথা, যা যা হয়েছে যাবতীয় অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে।
    জোশ আসাটাই স্বাভাবিক। মনের সমস্ত কষ্ট উজাড় করে বলে দেবার মতো স্কোপ কে ই বা ছাড়তে চায়? প্রভু আমার, বস আমার, তিনিই পরম পিতা, তিনিই সুবিচার করবেন, এরকম আশা জেগে উঠতেই পারে মনে।
    তবে এই সাজেশান আমি অন্ততঃ গোল্ডিজিকে দেবো না। নিরপেক্ষ বিচার পাবার আগে দরকার অত্যাচারের প্রমাণ। খুন টুন হয়ে গেলে, সেগুলো এক্সট্রিম কেস, সেসব ক্ষেত্রে ক্রিমিনাল অফেন্সের প্রমাণ জোগাড় করে, অপরাধীকে আইনের দোরগোড়ায় নিয়ে আসাটা পুলিশের কাজ। কিন্তু এটা অতি তুচ্ছ ব্যাপার, এটা নিয়ে জল ঘোলা করলে তেমন কিছুই হবে না, মধ্যিখান থেকে চাকরিটি খোওয়া যাবে ঐ গোল্ডিজিরই।
    কারণ অতীব সিম্পল। মালিক হোক কি বস, সে কখনই চাইবে না যে কর্মক্ষেত্রে একটা ঝামেলার পরিস্থিতি তৈরি হোক। গোল্ডিজির কাছে কোনও প্রমাণ নেই, কোনও সাক্ষী নেই। ঐ তরুণদের এক দুজনকে ডেকে হয়ত মালিক জিজ্ঞাসা করল নিয়মরক্ষার খাতিরে, কী ব্যাপার, তোমরা নাকি ঐ লোকটিকে জ্বালাতন করো? তারা কি স্বীকার করবে? একজন শিশুও জানে যে তারা চুপটি করে ভালোমানুষের মতো মুখ করে, অবাক হয়ে চেয়ে থাকবে। উল্টে বলবে, সেকী! ছি ছি না না, উনি তো ভীষণ ভালো মানুষ, ওঁকে কতো সম্মান করি আমরা, জ্বালাতন করব কেনো?
    তারপরে গোল্ডিজি যদি সেখানে উপস্থিত থাকে, তবে তো কথাই নেই, এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করে কি মিষ্টি হেসে বলবে, মিসটেক মিসটেক, একদম না, আপনাকে নিয়ে আমরা মোটেই কখনো হাসি নি। প্লিজ ভুল বুঝবেন না আমাদের। হয়তো আপনি ভাষাটা ভালো করে বুঝতে পারেন না, শত হলেও আপনার মাতৃভাষা তো নয়, কী বুঝতে কী বুঝেছেন, ইশ্্‌ ছি ছি, না না। মন থেকে থেকে একদম ওসব ভাবনা সরিয়ে দিন।
    ব্যাস গোল্ডিজির অভিযোগ নস্যাৎ হয়ে যাবে। উপরন্তু ঐ ছেলের দল এর পরে কটা দিন চুপচাপ থাকবে, ফের পরম বিক্রমে আরও নতুন নতুন পন্থা খুঁজবে অত্যাচারের, এবং আবারও চলতে থাকবে বুলিইং। এর পরেও যদি তিনি ফের অভিযোগ জানান, মালিক ওঁকেই তাড়াবে, উনি না থাকলে ছেলেপুলেরা টর্চার করার লোক পাবে না, ফলে অভিযোগও আসবে না। ন্যায় বিচার করা মালিকের কাজ নয়, তার কাজ নিজের বিজনেসটা শান্তিপূর্ণভাবে চালানো। সমাজ সংস্কার করবার জন্য সে রেস্টুরেন্ট খুলে বসে নি। তার ওপরে এই ঝুট ঝামেলা থেকে কবে কী হয়ে যায়, মারপিট কি জখম টখমের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেলে ব্যবসারই ক্ষতি। একটা গোল্ডিজি গেলে, কালকেই আরেকটাকে ধরে আনা যাবে, ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না এল ডোরাডোয়।
    তাহলে হাতে রইল কী উপায়? এক, এভাবেই যতদিন চলে চলুক, ওঁকে ভালো মাইনে দিচ্ছে এখানে, টাকাপয়সা এবং অপমান সইবার ক্যাপাসিটি, দুটোই দরকার এখানে। দ্বিতীয়টি বিশেষ করে দরকার। তবে, আরও অপশন রয়েছে, অন্যত্র কাজ খোঁজা। সেসব কাজ আবারও ঐ প্যাটেলের ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের মতো হবে। অত্যাচারগুলো লাউড অ্যান্ড ভিজিবল, তবু সহ্য করা যায় হয়তো। দিনের শেষে তো দেশে টাকা পাঠানো, সম্পত্তি কেনা, মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু সোনাদানা, কিলোর হিসেবে স্টেইনলেসস্টিলের বাসন, পুত্রের ভবিষ্যতের জন্য একটা দোকানঘর, ব্যবসার জন্য পুঁজি। এসবের জন্যই তো এল ডোরাডোয় এসেছিলেন।
    সুবিচার টুবিচার সব মিথ্যা দুরাশা। সব বিচারই নানান কন্ডিশনের ওপর নির্ভরশীল।
    কোনও সময়ে হাজার প্রমাণ দিলেও গ্রাহ্য হয় না বুলিইং এর অভিযোগ, "প্রমাণের অভাবে" বুলিইং (জার্মান ভাষায় একে বলে মবিং) এর বিচার হয় না, নিষ্পত্তি হয় না, বরং অবিচারই হতে থাকে, আবার এমন কিছু ক্ষেত্রও আছে, যখন প্রমাণ ছাড়াই আশাতীত ন্যায় বিচার মিলে যায়। যেমনটি ঘটেছিল ওঁর প্রথম চাকরির ক্ষেত্রে। এল ডোরাডোয় প্রথম সেই অভিজ্ঞতা, মাসের পর মাস গা ঢাকা দেওয়া অবস্থায়, ওয়ার্কপার্মিটহীন অন্ধকারের জীবন, মনে নাই সেকি মনে নাই? কেমন এক ঝটকায় ইল্লিগাল ইমিগ্র্যান্ট থেকে লিগ্যাল বনে গেছলেন গোল্ডিজি, মনে আছে তো সবই। সেই পথ পার করে আজ হাতে সোনায় বাঁধানো পাসপোর্ট, ঐটে দেখালেই কতো লোকে স্যার স্যার  করে মাথা ঝুঁকিয়ে রেসপেক্ট দেখাবে, ঐ জিনিস তো কম স্ট্রাগল করে মেলে নি। তবে খটকা লাগে, ঐদিন তো গোল্ডিজিকে দয়াপরবশ হয়ে লিগ্যাল বানিয়ে তুলবার মাথার দিব্যি কারও ছিলো না, তবে কেন এত বেশি বেশি ন্যায় বিচার হয়েছিলো সেদিন। সম্ভবতঃ আর্বাইসামটের কাছে হিসেব ছিলো তখন, যে গায়ে গতরে খেটে খাবার লোকজনের টানাটানি যাচ্ছে এলডোরাডোয়। বাবু বিবিরা কেউ নীচু কাজ করতে চায় না, ঘাম ঝরানো কাজ করতে তাদের ঘোর আপত্তি।
     
  • . | 194.56.***.*** | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১৭:২৬744426
  • এলডোরাডোয় একটা জার্মান শব্দ বহুল প্রচলিত - গাফফার।
    এটি একটি বিশেষ্য পদ। এর ক্রিয়াপদটি হচ্ছে সম্ভবতঃ গাফফেন।
    ঠিক হুবহু ইংরিজি অনুবাদে এর অর্থ কতটা বোঝানো সম্ভব তা জানি না।
    এলডোরাডীয় যাবতীয় জার্মান উপভাষা অর্থাৎ ডায়ালেক্টেও এই গাফফার শব্দটার বেশ চল আছে। কোনও শব্দের যখন বেশি চল থাকে, তখন মোটামুটি একটা সিদ্ধান্তে আসা যেতেই পারে, যে শব্দটার সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা যথেষ্ট। তবে ভাষা শিক্ষার পাঠক্রমে এটি শেখানো হয় না, অন্ততঃ আমাদের সিলেবাসে এটি ছিলো না। এটি এক ধরণের স্ল্যাং। গালিগালাজ নয়, স্রেফ স্ল্যাং।
    কিছু উদাহরণ দিই, তাহলে অর্থ পরিস্ফুট হবে।
    ধরা যাক, একটি বাড়িতে আগুন লেগেছে। দাউ দাউ করে দেখা যাচ্ছে তার লেলিহান শিখা। দমকলের দুটো কি তিনটে ইঞ্জিন এসে গেছে ঘটনাস্থলে। বাড়ির ভেতর থেকে লোকজনকে উদ্ধার করে বাইরে আনা হচ্ছে, হোসপাইপের জলের তোড়ে আগুন নিভছে কোনও কোনও অংশে। জায়গাটা ধোঁয়া, আগুন, জল, আহত ব্যক্তি, দমকল কর্মী, অ্যাম্বুলেন্স, ইত্যাদি মিলিয়ে মিশিয়ে রীতিমতো জমজমাট। এখন দেখা যাবে বেশ কিছু লোক অল্প তফাতে দাঁড়িয়ে এই পুরো দৃশ্য দেখছে। তারা সাহায্য করছে না, হয়ত সাহায্য করবার জন্য কোয়ালিফাইও করে না, তবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব দেখতে থাকে। হয়ত নিজের কাজের জায়গায় যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে, হয়ত বাসস্টপে পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল, একটা বাস মিস হয়ে গেল, তবু নড়তে পারে না, অন্ততঃ কিছুক্ষণ তো তারা এই মজা দেখবেই। এই দর্শককেই বলা হয় গাফফার। এটা কোনও সম্মানজনক বিশেষ্যপদ নয়।
    আগেই বলেছি, এল ডোরাডোয় লোকে কথা কম বলে বাঙালিদের তুলনায়। তবে দেখে। খুব দেখে।
    গাফফার যে শুধু অগ্নিকাণ্ডের টাইমেই দেখা যাবে, এমনও না। হয়ত কারও হেনস্থা হচ্ছে, সেখানেও গাফফার থাকবে। আমার আপনার মতো মানুষই তারা, নিপাট নির্বিবাদী ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা তরুণ তরুণী বৃদ্ধ বৃদ্ধ, যে কেউ হতে পারে। যেমন ধরা যাক, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে টিকিট চেকারের আগমন ঘটেছে। সকলেরই টিকিট একে একে চেক করা হচ্ছে, কারও কাছে হয়ত ভ্যালিড টিকিট পাওয়া গেল না, তখন ঐ বাস, ট্রাম বা ট্রেনের কামরাতেই দেখা যাবে গাফফারেরা রয়েছে, তারা সরাসরি দেখছে কেউ এই নাটক, কেউ আড়চোখে, যে নাটকে বিনা টিকিটের যাত্রীটির হেনস্থা হচ্ছে।
    নাটকগুলো মোটামুটি চেনা ছকের হয়। বিনাটিকিটের যাত্রী তার ব্যাগ, পকেট, পার্স, সর্বত্র টিকিট খুঁজবে, বলাই বাহুল্য যে পাবে না। কিংবা পুরোন তারিখের টিকিট দেখাবে, এই সমস্ত হাবিজাবি হবে। তারপরে চেকার তাকে তার আইডি কার্ড দেখে ফাইন করবে। এই নাটক দেখার জন্য সাধারণতঃ উদগ্রীব হয়ে থাকে গাফফারেরা, যখন টিকিট চেকার ওঠে কামরায়। হেনস্থার দৃশ্য তারা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো।
    এই একই জিনিস হয় আরও নানান ক্ষেত্রে। বিশেষ করে বুলিইং এর ক্ষেত্রে। সত্যি কথা বলতে কি প্রমাণাভাবে বুলিইং এর কেস যে খারিজ হয়ে যায়, সেটার পেছনে রয়েছে এই গাফফারেরা। কেউ দেখেনি, কেউ শোনেনি, অথচ বুলিইং হয়েছে, এটা কাঁচা ঢপ। সকলে বুলিইং এ পার্টিসিপেট করেছে এমন না ও হতে পারে, হয়ত একজন কি দুজন মিলে করেছে। বাকিরা জাস্ট গাফফার, মজা নিয়েছে। সাক্ষী দেবার বেলায় সব ভোঁ ভা হাওয়া হয়ে যাবে।
    শুধু গাফফার হবার ব্যাপারই না। আরও একটা জিনিসের অভাব এই এল ডোরাডোয়। সেই জিনিসটার নাম সিভিল কারেজ। সম্ভবত ভুল শব্দ নয়, তবুও বুঝিয়ে বলি।
    এরকম কেস কম হয় না। ধরা যাক ভিড়ভাট্টাহীন চলন্ত ট্রেনের কামরায় একজন মাতাল এসে ঝামেলা করছে এক তরুণীকে। মেয়েটি হয়ত ঐ মাতাল লোকটিকে প্রথমে ইগনোর করছিলো, পরে লোকটি আরও ঝামেলা শুরু করেছে। কামরায় আরও যাত্রী রয়েছে কিন্তু। কেউ কিচ্ছুটি বলবেও না, করবেও না। বরং আশেপাশের সীট থেকে উঠে একটু তফাতে গিয়ে বসবে, সেখানে দূরত্বটা নিরাপদ, তবে গাফফার হবার বাধাও নেই। যদি দশজন যাত্রীর একজনও উঠে এসে ঐ বদ মাতালটিকে বলে - অ্যাই, কী হচ্ছে? তাহলেই কিন্তু মাতাল চুপ করে নিজের জায়গায় চলে যাবে, বা ঝামেলা করবার সাহস পাবে না।  কিন্তু তা হয় না। সবাই দেখে আড়চোখে, ভাণ করে কিছুই জানে না। যৌথভাবে এই আচরণকে বলা যেতে পারে সিভিল কারেজের অভাব। এল ডোরাডোয় এই আচরণ বড্ড বেশি মাত্রায় দেখা যায়।
    আর যারা বুলিইং করে, তারা যে সবসময় স্বার্থসিদ্ধির কারণে করে, তা কিন্তু নয়।
    গোল্ডিজিকে বুলি করে ঐ ছোকরাদের কী এমন স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছিলো? কিছুই না। তারা আগেও যেমন আরামসে চাকরি করে দিনযাপন করছিল, পরেও তেমনই করবে। একটা মানুষকে অপেক্ষাকৃত অসহায় অবস্থায় পেয়ে, তাকে কোণঠাশা করে অল্পবিস্তর অত্যাচার করে একটা অদ্ভূত তৃপ্তি আছে, লোকটা কষ্ট পাচ্ছে, যন্ত্রণা পাচ্ছে, অথচ কিছু করতে পারছে না, সেই অভিব্যক্তি দেখার মধ্যেও একটা এন্টার্টেইনমেন্ট হয়, যাকে বলে বিনোদন। সিনেমা থিয়েটার দেখা, খেলা দেখতে যাওয়া যেমন বিনোদন, এটাও তেমনই। যাকে হিন্দিতে বলে, মস্তি।
    তবে এই মস্তি অনেকটাই নেশার মতো হয়ে যেতে পারে। যায়ও। তখন নেশার ডোজ বাড়াতে হয়, নইলে নেশা জমবে না।
    গোল্ডিজির ক্ষেত্রেও কেসটা ওরকমই হয়ে গেল। এর পরে, গোল্ডিজি ইগনোর করবার পথ বেছেছিলেন, কারণ দুটোই তো মোটে অপশন ছিলো, সমস্যাটাকে ইগনোর করা বা অ্যাড্রেস করা।
    অ্যাড্রেস করলে এইসমস্ত ক্ষেত্রে নীট ফল শূণ্যের চেয়েও কম হতে পারে। তাই ইগনোর করা চলছিল। কিন্তু যারা বুলি করছিলো, তারা তো রেজাল্ট দেখতে চায়। লোকটাকে টর্চার করলে লোকটা কেমন করে রিয়্যাক্ট করবে সেইটে দেখার মজা আছে না? অথচ লোকটা সেটা করছেই না। করলেও বড্ড অল্প রিয়্যাক্ট  করছে, হাউ বোরিং! ডোজ বাড়াও।
    একদিন তারা বার্বিকিউয়ের সেই উনুনটাই ভেঙে দিল। উনুন পরিষ্কার করতে করতে মাঝখানে গোল্ডিজি একটু টয়লেটে গেছলেন, সেই ফাঁকেই ভেঙে রেখেছে। উনি ফিরে এসে দেখেন এই অবস্থা। দামি জিনিস, এইভাবে ভেঙে রাখলটা কে? বাইরের কেউ তো আসে নি। গোল্ডিজির মাথায় হাত। যে বা যারা করেছে, তারা সব নিপাট ভালোমানুষের মতো নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। গোল্ডিজি বিপাকে পড়লেন। মালিককে বলবেন, যে জিনিসটা হঠাৎ করে ভাঙা অবস্থায় দেখতে পেলেন? মালিক কি এখন এসে পৌঁছেছেন রেস্টুরেন্টে? এইসব করতে করতে, ঐ রান্নার মূল রাঁধুনিকেই জানানো হলো, টুকটাক অন্যরাও উঁকি দিলো, যে যেমন করে পারলো দোষারোপ করল লোকটাকে। অচিরেই মালিক এসে উপস্থিত। তাকে এদের মধ্যেই কেউ খবর দিয়ে ফেলেছে। সন্ধেবেলায় বার্বিকিউ হতে বিস্তর ঝামেলা হবে সেটা অনুমান করা গেছে, তবে একেবারেই যে হবে না, তা নয়। মালিকের বকুনি উনি খাবেন, ওরা তো সেটাই দেখতে চেয়েছিলো, উপভোগ করতে চেয়েছিলো। মালিক সেরকম বকেন টকেন নি। তবে চাকরিটি খোওয়া গেল ওঁর। তখনই। প্রোবেশন পিরিয়ডের মধ্যেই কিনা, তাই অত্যল্প নোটিস পিরিয়ড।
    নাহ, জলে পড়ে যাবার মতো সিচুয়েশন কিছু নয়। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই ছেলেমেয়েরা আসছে বাবার কাছে বেড়াতে, খরচাপাতি আছে, অনেক ঘুরে বেড়ানোর প্ল্যান ছিলো, এর মধ্যে এই হয়ে গেল, আবার চাকরি খোঁজোরে।
     
  • . | 194.56.***.*** | ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১৭:৫৫744427
  • kk,দ,
    সঙ্গে থাকো।
    কেকেদা কোন শেফের কথা? ডিটেইলে জানতে চাই।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন