এলেবেলে রঞ্জনবাবুকে ডাকলে তিনি আসেন না! কিন্তু রঞ্জনবাবুর আহ্বান এলেবেলে ফেলতে পারে না। তাই আমার দু'পহা।
আগে অয়নেশের বক্তব্যটা দেখা যাক। ওঁর মতে, //জাগিরদার বা মনসবদারের জমির মালিকানা ছিল না। শুধুমাত্র খাজনা তোলার অধিকার ছিল। রায়তের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের চূড়ান্তভাবে ছিল না। রায়ত উৎপাদন খাজনা দিয়ে ইচ্ছেমতো বাজারে বিক্রয়ের ক্ষমতা রাখতো। অন্যদিকে ইউরোপে ল্যান্ডলর্ড জন্মসূত্রে জমির মালিকানা ভোগ করতো। এবং ছোট ছোট মালিকানাধীন এলাকায় ল্যান্ডলর্ডদের নিজের স্বেচ্ছাচারী আইন চলতো। রাজার কেন্দ্রীয় আইন নয়।//
প্রায় পুরোটাই ঠিক বলেছেন।
এ প্রসঙ্গে অল্বট যে প্রশ্নটা করেছেন - //তাতে কি প্রান্তিক মানুষদের খুব কিছু সুবিধা হয়েছিল? খাজনা না দিতে পারলে শাস্তি গুলোর রকম ফের হতে পারে কিন্তু পুরো ব্যবস্থা সবসময় কোনো ব্যক্তির খেয়াল খুশির উপর এবং মাঝে মাজেই ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর নির্ভর করত।//
হ্যাঁ, সুবিধা হয়েছিল। অনাবৃষ্টি বা অন্য কারণে ফসল উৎপাদন কম হলে সে বছরে রাজস্ব কম নেওয়া হত, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মকুবও করা হত। তার ওপরে ছিল দেশ জুড়ে নিষ্কর বা লাখেরাজ জমি। এর পরিমাণ ছিল মোট চাষযোগ্য জমির ৪১%। অর্থাৎ এই জমিতে রায়তদের খাজনা দিতে হত না। প্রসঙ্গত এই লাখেরাজ জমির আয় থেকে দেশ জুড়ে চলত অসংখ্য ধর্মীয়, দাতব্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মক্তব ও পাঠশালা)।
ব্রিটিশরা (রঞ্জনবাবুর কথা অনুযায়ী) সুবে বাংলায় যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে, তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ ছিল মূলত দুটো। রাজনৈতিক দিক থেকে তখনও ব্রিটিশদের কাজকারবার মূলত বাংলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ক্যাপ্টেন লেক দিল্লি দখল করেন সম্ভবত ১৮০৩ সালে। বোম্বে আরও পরের ব্যাপার। আর মাদ্রাজ তখন নেহাতই শিশু। কাজেই রাজস্ব ব্যবস্থার পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য বাংলাই ছিল আদর্শ জায়গা। ফলে পাঁচ, এক ও দশসালা বন্দোবস্তের শেষে ১৭৯৩-এ, মানে পলাশির ৩৬ বছর পরে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
এ কথা ঠিক যে, ১৭৮৪ সালের ১৩ অগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাশ হওয়া পিট-এর ভারত শাসন আইনের ৩৯ ধারায় কোম্পানিকে অবিলম্বে একটি চিরস্থায়ী রাজস্ব ব্যবস্থার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে বলা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ১৭৭৫ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক আঙিনায় নানা রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য, ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে বছরে একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে উদ্যোগী হতে শুরু করে। বিশেষত ১৭৭৬-এ ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে আমেরিকার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, ১৭৮৯-এ ফরাসি বিপ্লব, ১৭৯৩-এ ফ্রান্সের যুদ্ধ এবং আঠারো শতকের শেষ দিকে নেপোলিয়নের আবির্ভাব ও বিশ্বব্যাপী ইঙ্গ-ফরাসি সংঘর্ষের কারণে ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রচণ্ড ব্যাঘাত ঘটে। এমনকি ভারতবর্ষ শাসনের ক্ষেত্রেও ১৭৭৫-এ মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধ, ১৭৮০-তে দ্বিতীয় মহীশূর যুদ্ধ, ১৭৯০-এ তৃতীয় মহীশূর যুদ্ধ ইত্যাদির কারণে তারা আরও কোণঠাসা হতে শুরু করে। এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে এ দেশে অতি দ্রুত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে।
এর জমি প্রস্তুত করে বন্দোবস্তের অন্যতম তাত্ত্বিক ফিলিপ ফ্রান্সিস ১৭৭৬-এর ২২ জানুয়ারি বাংলার গভর্নর ইন কাউন্সিলের কাছে এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব পেশ করে জানান- জমি রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়, তা ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং জমিদার রাষ্ট্রের কর্মচারী নন, তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে এই সম্পত্তির মালিক। পাশাপাশি জমিদার-রায়ত সম্পর্কের প্রশ্নে তাঁর মূল যুক্তির জের টেনে তিনি বলেন: "জমি জমিদারেরই উত্তরাধিকারগত সম্পত্তি। দেশের সংবিধান অনুযায়ী গভর্নমেন্টকে একটা রাজস্বভাগ দিয়ে জমিদার এই সম্পত্তি ভোগ করে। যত দিন সে এই শর্ত মেনে চলবে, তত দিন মালিকানা তারই এবং যাকে ইচ্ছা সে জমি ভাড়া দিতে পারে।"
অতঃপর বছরের শেষে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে চালু হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। কোম্পানির প্রাপ্য ভূমিরাজস্ব নির্ধারিত হয় ২৬ লক্ষ ৮০ হাজার পাউন্ড, যা ছিল মীরজাফরের শাসনের (১৭৬৪-৬৫) প্রথম বছরে মহারাজা নন্দকুমারের আদায়ীকৃত রাজস্বের (প্রায় ৮ লক্ষ ১৮ হাজার পাউন্ড) তিন গুণের সামান্য বেশি।এই বন্দোবস্তে জমিদারদের ওপর যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— ১. ধার্য রাজস্ব কিস্তিবন্দি অনুসারে নিয়মিত সিক্কা টাকায় শোধ করতে হবে; ২. খরা, বন্যা, মড়ক, লোকক্ষয় বা অন্য কোনও অজুহাতে রাজস্ব বাকি রাখা যাবে না; ৩. রাজস্বের জন্য নির্ধারিত জমি নিষ্কর জমি হিসেবে দান করা যাবে না এবং স্বীকৃত নিষ্কর জমিতে সরকারের অনুমতি ছাড়া কর আরোপ করা যাবে না; ৪. জমিদার তার জমিদারির অন্তর্গত যাবতীয় সেচব্যবস্থা নিজের খরচে রক্ষণাবেক্ষণ করবে, না করলে সাজা পেতে হবে এবং ৫. উত্তরাধিকারীহীন কোনও জমিদার মারা গেলে তার জমি সরকার বাজেয়াপ্ত করে নেবে।
তার পরে কুখ্যাত ‘হফ্তম’ (১৭৯৯) এবং ‘পন্জম’ (১৮১২) আইন। তারও পরে ১৮১৯ সালের ‘অষ্টম’ আইনে মধ্যস্বত্বভোগীদের আইনগত স্বীকৃতি। পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য অক্ষয় দত্তের প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য। বাংলার 'নবজাগরণ', বর্ণহিন্দু বাঙালির ইংরেজি শিক্ষার শুরুয়াত এবং উনিশ শতকি জমিদারি লাম্পট্যের প্রায় সমস্তটাই এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তবে রায়তওয়ারি নিয়ে রঞ্জনবাবুর স্মৃতিবিভ্রম হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ১৮২০-তে প্রবর্তিত রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে বরাদ্দ ছিল ব্রিটিশ-অধিকৃত ভারতবর্ষের মোট আবাদি জমির ৫১%। বাকি ৪৯ শতাংশ জমি চিরস্থায়ী (১৯%) ও মহলওয়ারি (৩০%)-র অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কেন ব্রিটিশরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে অন্য ভূমি বন্দোবস্তে গেলেন, তার কারণ আলাদা।