আমি আবার ফেবু ইনফ্লুয়েন্সারের এই সাম্প্রতিক ভাইরাল পোস্টটা পড়ে কিছুটা হুব্বা হলাম।'মিনিংফুল' এর মানে নিজের বাড়ি গাড়ি?
-------
"মার্কিন মুলুকে থাকার সময় শুক্রবার তাড়াতাড়ি অফিস থেকে কেটে কলীগদের সাথে আটলান্টিক এভিনিউতে একটা পাবে যেতাম। বছরখানেক আগে এক শুক্কুরবারের সন্ধ্যেয় ব্রুকলিন ডাউনটাউনের একটা পাবে আমার মার্কিনী ম্যানেজার, স্টিভ একটা কথা বলেছিলো, the rise of meaningless jobs. কথাটা যদিও আমেরিকার ক্ষেত্রে বলেছিলো। আমরা না হয় পরে সেটাকে ভারতের জন্য মেপেজুপে দেখবো। ব্যাপারটা মোটের ওপর এরকম যে আমরা যে কথাগুলো শুনে বড় হই, যে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, পড়াশোনা করে ভালো দেখে চাকরি করতে হবে, চাকরি করে সেভিংস করতে হবে, যা খুশি খরচ করলে হবে না, এবং চাকরিতে উন্নতি-টুন্নতিও করতে হবে। এই পুরো জার্নিটা সফলভাবে করে ফেলতে পারলেই 'American Dream' ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব।
পরের প্রশ্ন, কি সেই আমেরিকান ড্রিম? সাফল্য কারে কয়? ড্রিমটা হলো এরকম যে বাপ-ঠাকুরদার সম্পত্তি ছাড়াই, সম্পূর্ণ শূন্য থেকে শুরু করেও একটা মানুষ একটা বাড়ি কিনে, হোমলোন শোধটোধ করে ফেলে, সংসার করে, দুতিনটে বাচ্চা বড় করে, রিটায়ার করতে পারে। রিটায়ার করেও সোশাল সিকিয়োরিটির টাকায় বুড়ো বয়সটা চলে যাবে। সোশাল সিকিয়োরিটি ব্যাপারটা আপাতত ছেড়ে দিচ্ছি, আমাদের দেশে এরকম কিছু নেই। the rise of meaningless jobs বলতে এটাই বোঝায় আমেরিকাতে এবং স্টিভের মতে ইয়োরোপেও ক্রমশ, এবং খুব দ্রুত এরকম চাকরি বা পেশা কমে যাচ্ছে, যে চাকরি একজন মানুষ সততার সাথে পঁয়ত্রিশ বা চল্লিশ বছর ধরে ঘাড়- গুঁজে করলেও মাত্র একটা প্রজন্মের মধ্যে বাড়ি কিনে, অল্প সখ-আহ্লাদ করে, ছেলেমেয়ে বড় করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে।
ঠিকই বলেছে। আমেরিকাতে নিউইয়র্ক-ক্যালিফোরনিয়া বলছি না, একটু ঠিকঠাক জায়গায়, এখন বাড়ির এভারেজ দাম চারলক্ষ ডলার মত। ডিম-দুধ-পাউরুটি, গাড়ি, তেল, ইন্সিউরেন্স সমস্ত কিছুর দাম দুমদাম বাড়ছে। খুব কম চাকরি আছে, যেটা দিয়ে ২০২৫-এ শূন্য থেকে শুরু করে সত্তর বছর বয়সে এসে এইসব হিসেব মেলানো সম্ভব। এবার ভারতে আসি। ভারতে তো এই হিসাবে অধিকাংশ চাকরিই তাই! অসংগঠিত ক্ষেত্রে বলে না, সংগঠিত ক্ষেত্রেও। যেখানে ভালো শার্ট-প্যান্ট পরে বাবু হয়ে চাকরি করতে যেতে হয় সেখানেও। নতুন করে rise আর কি হবে! forever existence of meaningless jobs. আপনাদের আশেপাশে এরকম কজন দেখতে পান যারা কোন ইনহেরিটেন্স ছাড়া, মানে বাপ-ঠাকুদ্দার বিন্দুমাত্র সম্পত্তি ছাড়া শুরু করে এই কাজগুলো করতে পারবে? আপনি বলবেন, সে কি আমিই তো করেছি! আমার বাবা-মা-ই তো করেছেন।
অনেকেই করেছেন, আমাদের বাবা-কাকার প্রজন্ম অবধি। শূন্য হাতে শুরু করেছেন। পরীক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষক হয়েছেন। রেলে চাকরি করেছেন, ইউকো ব্যাঙ্কে চাকরি করেছেন, হার্ডওয়ারের দোকান সামলেছেন। দু-কাটা জমি কিনে একতলা বাড়ি করেছেন। সেই বাড়ি দোতলা হয়েছে একদিন। ছেলের বাইক, মেয়ের পড়াশোনা, বিয়ে দেওয়া সবই হয়েছে। এই কাজটা আজ কতজন করতে পারবে? আজ, ২০২৫-এর মার্চ মাসে। কতজন কুড়ি-বাইশ বছরের ছেলে খালি হাতে শুরু করে কিছু একটা করে বাড়ি করবে, বা ফ্ল্যাট কিনবে, হাসিকান্নার সংসার করে সব হিসেব মিলিয়ে দিয়ে যাবে সত্তর- পঁচাত্তরে? জমির দাম কত? আচ্ছা বাড়ি ছেড়ে দিলাম। মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদ, কোচি, নাগপুর, কোলকাতা, ভুবনেশ্বরে ফ্ল্যাটের দাম কত? বাচ্চা হলে প্রাইভেট স্কুলের ফিজ কত? হেলথ-কেয়ারের খরচ কি?
কোন কোন চাকরি বা পেশায় এইগুলো করা যায়? ডাক্তার? সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার? এক্সিস বা বন্ধন ব্যাঙ্কে চাকরি? মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ? জানি না কতোটা যায়। হয়তো যায়। যদি যায় কত শতাংশ চাকরি বা পেশা সেই অর্থে 'meaningful' যা একটা বছর পঁচিশের ছেলে বা মেয়ে পরের তিরিশ-চল্লিশ বছর করতে পারলে হিসেবগুলো মিলিয়ে দিতে পারবে? এইরকম পেশার সংখ্যা কমছে। দ্রুত। খুব দ্রুত। AI কথাটা অতিরিক্ত ইউজ করে করে এতোটা হেজে গেছে যে, লোকে শুনলে বলে, হ্যাঁ, AI, আসছে তো, জানি তো! আসছে না, এসে গেছে। এই এখন। BPO,KPO, সাপোর্ট সেন্টারের কোন কাজ থাকবে না। এখুনি প্রায় নেই, আরোই থাকবে না। অধিকাংশ কোম্পানিতে সাপোর্টে কল করে মানুষের গলা অবধি পৌঁছনো যায় না।
একটা এন্ট্রি লেভেল বা মিড লেভেল সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারকে Cursor বা Trae.AI দিয়ে রিপ্লেস করে দেওয়া যায় এখুনি, আজকেই। কোড লেখার দরকারই নেই, লো-কোড, নো-কোড প্লাটফর্ম আর্কিটেকচার। আজ থেকে এক-দুবছর পরে সিনিয়ার সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারকে, আর্কিটেক্টকে রিপ্লেস করা যাবে। ব্যাঙ্কিং এর ভবিষ্যৎ Branchless Banking , ব্রাঞ্চ সার্ভিস থাকবে শুধু প্রিমিয়াম কাস্টমার এক্সেসের জন্য, যেমন এয়ারপোর্টে লাউঞ্জ হয়। একটা গ্রাফিক্স ডিজাইনার, প্রচ্ছদ শিল্পীকে, কন্টেন্ট রাইটার,কপি-রাইটারকে, আইনজীবীকে এমনকি একজন ডাক্তারকে রিপ্লেস করা সম্ভব। ভবিষ্যতে না, doomsday prophecy না, এখুনি যায় এবং প্রথম বিশ্বে হচ্ছে। এর উত্তরে পডকাস্টে, রেডিট থ্রেডে একটা ছেলেভোলানো কথা শোনা যায়, যে প্রচুর পুরনো চাকরি যেমন যাবে, কিন্তু ভয়ের কিছুই নেই। নতুন অনেক চাকরি, পেশা তৈরি হবে। হ্যাঁ এবং না। হ্যাঁ কারণ সত্যি হবে। না কারণ সেটা সংখ্যায় এতোই অল্প যে আনুপাতিক হারে সেটা ধর্তব্যের মধ্যে আসে না। একটা ফিল-গুড, আব্বুলিশ আর্গুমেন্ট মাত্র।
যে সমস্ত ছেলেমেয়ে আজ পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে, জলের বোতল নিয়ে প্রথমবার নার্সারিতে স্কুলে গেলো, তারা যদি মন দিয়ে পড়াশোনা করে, পড়াশোনা করে চাকরি করে, চাকরি করে সেভিংস করে এবং চাকরিতে উন্নতি-টুন্নতিও করে, তাহলেও তারা আর হয়তো কোনদিন, কখনো আগের প্রজন্মের সম্পত্তি ছাড়া একটা ঠিকঠাক, হাসিকান্নার জীবনে পোঁছতে পারবে না। কোন মানুষের প্রতিভা ও পরিশ্রম হয়তো মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবার যথেষ্ট নয় অন্য কারুর জন্মসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের সামনে দাঁড়ানোর জন্য।
the rise of meaningless jobs is already here!
পরের প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাবো the rise of meaningless human talent & effort."