ঋতু, সম-যৌনতা, বৃহন্নলা এবং অতীত ও বর্তমানের রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজ : বিশ্বেন্দু নন্দ
বুলবুলভাজা | অন্য যৌনতা | ০৮ জুলাই ২০১৩ | ৫৭৭৩ বার পঠিত | মন্তব্য : ৪৭
দেবতাদের মধ্যে সমযৌনতা খুব একটা অপ্রচলিত নয়, যদিও অনেক সময় এগুলি সঙ্গমের চিত্র বহন করে না, বরং আচারে প্রকাশ পায়। অগ্নি অন্য দেবতার বীর্য গ্রহণ করে। যদিও তিনি স্বাহার স্বামী, তিনি সোমের(চাঁদ) সঙ্গে রমণ করেন, কেননা তিনি মুখ দিয়ে পৃথিবীর উৎসর্গ স্বর্গে বসে পান করেন। হিন্দু শাস্ত্র বলে এটি আসলে মিথুন ভঙ্গিমা, যেখানে অগ্নির মুখ যোনির কাজ করে। রামায়ণ আর শৈব পুরাণে যখন পার্বতী আর শিব উপগত হন, তখন দেবতাদের আশঙ্কা হল এই অনন্ত কাল ধরে চলা সঙ্গমে বিশ্বে প্রলয় আসন্ন। এবং তাঁরা বিশ্ব পিতামাতার মিলনে বাধা দান করে। উচ্ছ্রিতদণ্ড রাগান্বিত শিব স্বর্গে উপগত তাঁর অস্খলিত বীর্য কোনও দেবতাকে ধারন করার নির্দেশ দিলে, অগ্নি সেই বীর্য ধারণ করে পান করেন। তবে কথাসরিৎসাগরে বলা হয়েছে শিব অগ্নিকে এটি পান করতে বাধ্য করেন। বেদে মিত্রা আর বরুণের বহু অন্তরঙ্গতার গল্প রয়েছে। ভগবৎপুরাণে এদের দুজনের এক অযোনিসম্ভূত সন্তানের কথা বলা হয়েছে। বরুণের বীর্য বল্মীক স্তুপের ওপর পড়লে বাল্মিকির জন্ম হয়। উর্বশীকে দেখে মিতা এবং বরুণ বীর্য স্খলন করে জলে পড়লে অগস্ত্য আর বশিষ্ঠ্যর জন্ম হয়।
লকডাউনে ব্যতিক্রমী হকারটাউনে : বিশ্বেন্দু নন্দ
বুলবুলভাজা | আলোচনা : সমাজ | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২৯৪৪ বার পঠিত | মন্তব্য : ৪
আমরা যেন মাথায় রাখি, বঙ্গভাগের পর বছরের পর বছর ভূমিভাগের ব্যথা সহ্য করে বাংলার নানান অঞ্চল উদ্বাস্তুদের আত্মীকরণের লড়াই চালাচ্ছিল, সে সময় বিপুল সংখ্যক প্রায় সব হারিয়ে আসা মানুষ পথকে বেছে নিয়েছিলেন জীবিকার পাথেয় হিসেবে। কলকাতা, অন্যান্য অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল শহুরে নিম্নবিত্তদের জন্যে বিপুল স্বাভাবিক বাজার এবং ক্রমশ কলকাতার কপালে উঠেছিল শস্তাতম শহরের তকমা।
বেণীর সঙ্গে মাথা : বিশ্বেন্দু নন্দ
বুলবুলভাজা | আলোচনা : রাজনীতি | ১৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ৫৭৩৩ বার পঠিত | মন্তব্য : ২৬
আমরা কারিগর ব্যবস্থার মানুষেরা, বড় কৃষক বা কুলাক আর কর্পোরেট কৃষকের মধ্যে মৌলিক ভেদ করি। কুলাকেরা গ্রামের মাটিতে থাকে। সে বৃহত্তর গ্রাম সমাজের অংশ, গ্রামের ওঠাপড়া, অন্যান্য সমাজের ভাল থাকা মন্দ থাকায় তার যায় আসে, গ্রামের কারিগরদের, তার কৃষির কাজের অঙ্গাঙ্গী হাতিয়ার। সে সাধারণত একফসলি চাষ করে না – তাই সামগ্রিকভাবে যান্ত্রিক পুঁজিনির্ভর কৃষি তার পথ নয়। তার উৎপন্ন ফসলের বাজার গ্রামে বা তার আশে পাশে। তার মূল লক্ষ্য বিদেশের বাজার নয়, স্থানীয় বাজার, উদ্বৃত্ত সে বিদেশে পাঠায়। কিন্তু কর্পোরেট কৃষকেরা দেশিয় চাষের জোর, তার মৌলিকতা, ফসল বৈচিত্র বিষয়ে চরম উদাসীন।
উপনিবেশ, আর্যতত্ত্ব এবং কেশব সেনের ব্রাহ্মসমাজ (১) : বিশ্বেন্দু নন্দ
বুলবুলভাজা | বিতর্ক | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ৩৭১৬ বার পঠিত | মন্তব্য : ১৫
১৮৫৭-র যুদ্ধের কাছাকাছি সময়ে ম্যাক্সমুলারের রান্না করা ‘ভারতভূমিতে ককেসাসিয় আর্য আগ্রাসন তত্ত্ব’ (এখন থেকে আর্যতত্ত্ব) ঔপনিবেশিক বাজারে সভ্যতা-বিস্তার আর সাম্রাজ্যরক্ষার ককটেল বানিয়ে খাইয়ে দেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে প্রাচীন আর্যতত্ত্বের নবতম রূপকার ম্যাক্সমুলার প্রথমে আর্যকে জাতিবাচক অভিধায় অভিহিত করে যতদূর-সম্ভব ভুল করেছিলেন। কিছু পরে, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে সংস্কৃত ভাষায় বডিন অধ্যাপনার প্রতিযোগিতায় ছিটকে গিয়ে তিনি পূর্বের নিজ-অবস্থান সংশোধন করে, আর্য শব্দের জাতিবাদিতা কেড়ে, তার নখ-দাঁত বিচ্ছিন্ন করে নিরীহ ভাষাগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিলেন। কিন্তু ততদিনে আর্যতত্ত্ব মোটামুটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি তৈরি এবং তাকে জোরদার করার কাজে সহায়ক হয়েছে। কেশবচন্দ্র শুধু যে ‘বৈজ্ঞানিক’ আর্যতত্ত্ব অবলম্বনে ব্রিটিশদের ভারতবর্ষের ‘বিছড়ে হুয়ে ভাই’ বলবেন না, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ‘গডসেন্ড, ভগবৎ-ইচ্ছা’ আখ্যায় ভূষিত করে ব্রাহ্ম ভাইবেরাদারদের উপনিবেশ লুঠে ছোটতরফ ভদ্রবিত্তের চাকুরি, দালালি, উমদোরির অংশিদারিত্বও নিশ্চিত করবেন....
উপনিবেশ, আর্যতত্ত্ব এবং কেশব সেনের ব্রাহ্মসমাজ (২) : বিশ্বেন্দু নন্দ
বুলবুলভাজা | বিতর্ক | ১৮ মার্চ ২০২২ | ৩০৪১ বার পঠিত | মন্তব্য : ১৫
রামকমল যখন কলকাতার শাসক কেষ্টুবিষ্টুদের সঙ্গে দিনরাত ওঠাবসা করছেন, সেই সময় ১৮৩০-এর অগাস্টের গোড়ার দিকে কলকাতায় পাদ্রি হিলের প্রথম বক্তৃতা। বক্তা একে প্রণম্য ইওরোপীয় পাদ্রি, তায় বক্তৃতার বিষয় রাজার ধর্ম, [কলকাতার] হিন্দু সমাজের পাঁজর পর্যন্ত কেঁপে উঠল। কলকাতার সমাজ কাঁপল ইয়ং বেঙ্গলিদের নতুন খাদ্যাভ্যাসে। রায়বাহাদুর প্রমথনাথ মল্লিক, কলিকাতার কথায় লিখছেন,
‘... হিন্দু কলেজের ছেলেরা হেনরী ভিভিয়ান ডিরোজিও এবং হেয়ার সাহেবের শিক্ষায় প্রকাশ্যভাবে অখাদ্য খাইতে আরম্ভ করিয়াছিল ও হিন্দুধর্মের প্রতি অনাস্থা দেখাইতে লাগিল। মহেশচন্দ্র ঘোষ ও কৃষ্ণ[মোহন] বন্দ্যোপাধ্যায় খৃষ্টান হইল। রামমোহন ব্রাহ্মধর্ম (তখনও ধর্ম হয়নি) প্রচার করিলেন। সমাজে ও কলিকাতার হিন্দুধর্ম গেল গেল রব পড়িয়া গেল। রামকমল সেন হিন্দু কলেজ হইতে উক্ত ডিরোজিওকে ছাড়াইতে গেলেন, কিন্তু উইলসন, হেয়ার ও শ্রীকৃষ্ণ সিংহের (কালীপ্রসন্ন সিংহের পিতামহ) জন্য তাহা পারিলেন না। উক্ত সেনকে মিন্টের ও ব্যাঙ্কের দেওয়ান করিয়া কোম্পানি বশ করিয়া ফেলিল। ডিরোজিও নিজে ইহাদের ধন্যবাদ দিয়া চাকরি ছাড়িয়া দিলেন। ... ডিরোজিওর ছাত্রেরা সকলেই কোম্পানির বড় চাকরীয়া ডিপুটি কলেক্টর হইল’।
উপনিবেশ, আর্যতত্ত্ব এবং কেশব সেনের ব্রাহ্মসমাজ (৩) : বিশ্বেন্দু নন্দ
বুলবুলভাজা | বিতর্ক | ০১ এপ্রিল ২০২২ | ২২২০ বার পঠিত
... সাম্রাজ্যের মানুষেরা যে কেশবচন্দ্রকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে চায়, সেটা কোনও গোপন এজেন্ডা ছিল না। কেশবের খ্রিস্টধর্মে মতি দেখে ম্যাক্সমুলার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, একমাত্র বিশপ কটন কেশবচন্দ্রকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে পারেন। কেশবচন্দ্রকে যে সাম্রাজ্য উপনিবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রজা হিসেবে গণ্য করছে, সেই ইঙ্গিতটা স্পষ্ট হয়ে যায় সাম্রাজ্য-কর্ত্রী ভিক্টোরিয়া তাঁকে দু’টি বই উপহার দেওয়ায়। সাম্রাজ্য তাঁকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়ায় তিনি ৪০টা ব্রিটিশ শহর এবং আমেরিকা থেকে বক্তৃতা দেওয়ার ডাক পাবেন ...
উপনিবেশ, আর্যতত্ত্ব এবং কেশব সেনের ব্রাহ্মসমাজ (৪) : বিশ্বেন্দু নন্দ
বুলবুলভাজা | বিতর্ক | ২২ এপ্রিল ২০২২ | ২২৮৭ বার পঠিত
শেষ বয়সে জনগণের ওপরে কেশবচন্দ্রের প্রভাব দৃশ্যত কমে গিয়েছিল; কিন্তু তাঁর প্রচারিত আর্যতত্ত্বের রেশ থেকে যায় বুদ্ধিজীবি মহলে। আর্যতত্ত্ব প্রচারে কেশবচন্দ্রের প্রভাব আজও এতটাই গুরুত্বের, যে এখনও প্রায় প্রত্যেকটি জাতীয় দল/গোষ্ঠীকে আর্যতত্ত্ব বিষয়ে নির্ণায়ক অবস্থান নিতে হয়। কেশবচন্দ্র সেন এবং ব্রাহ্ম সমাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই। মুলার শেষ বয়সে তার সন্তান আর্যতত্ত্বকে নিয়ে কী করবেন সে বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি, যদিও তিনি আর্যতত্ত্বের দাঁত-নখ উপড়ে দিয়েছেন। আধুনিককালে আর্যতত্ত্বের অন্যতম প্রধান প্রবক্তার দ্বিধা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আর্যতত্ত্বকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার, সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষার কাজে সফল হয়েছে। খ্রিস্ট মিশনারি, প্রাচ্যবাদী এবং ব্রিটিশ সরকার যৌথভাবে মুলার এবং কেশবচন্দ্রের এই তত্ত্বকে তাদের স্বার্থে বারংবার ব্যবহার করেছে