
সরকার-ভজনা হল মূর্তিপূজার আধুনিক রূপ, আর এর বিপদ সাঙ্ঘাতিক। এখনো পর্যন্ত এর সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক হিসেবে পাওয়া গেছে – দ্বিপাক্ষিক (two-party) ব্যবস্থা। আমি রুজ়ভেল্টের সময় আমেরিকায় থাকতাম। সেখানে যতজনের সঙ্গে মিশেছি, অধিকাংশের মতে লোকটি এক ভয়ঙ্কর উন্মাদ। আমি তাদের সঙ্গে একমত না হলেও, সরকারের মাথা-র সম্পর্কে লোকের এমন ধারণা – এ আমার খুবই স্বাস্থ্যকর এক অভ্যেস বলে মনে হয়েছিল। স্বাধীনতা একমাত্র টিকতে পারে, যখন দুই পক্ষের প্রভাবশালী মানুষজনের মধ্যে একটা ঠিকঠাক কার্যকরী মতপার্থক্য থাকে। পশ্চিমে এই বিরোধ শুরু হয়েছিল সন্ত অ্যাম্ব্রোজ় (Ambrose)-এর সময়, চার্চ ও রাষ্ট্রের বিরোধের মধ্যে দিয়ে। বর্তমানে, ইংল্যান্ডে এটি রক্ষণশীল ও সমাজবাদীদের দ্বন্দ্বের মাধ্যমে আর ওদিকে, আমেরিকায়, রিপাবলিকান ও ডেমোক্রাটদের বিভেদের মাধ্যমে টিকে আছে। প্রাশ্যা (Prussia)-র রাজকোষের বেতনভোগী স্তাবক হয়ে হেগেল যে ‘রাষ্ট্রই ঈশ্বরের পরিধেয়’ (State as the Garment of God) – এই তত্ত্ব কপচেছিলেন, গণতন্ত্র জোরদার হলে তেমন রাষ্ট্র-ভজনা মোটেই সম্ভব না। ... ...

সমাজের স্বার্থে করা যেসব কাজের গুরুত্ব আনাড়ি জনতার পক্ষে বোঝা মুশকিল, গণতন্ত্রে সেইসব কাজের স্বাধীনতা বজায় রাখাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। আনকোরা ধরনের বৌদ্ধিক কাজ সবসময় জনগণের অপ্রিয় হয়, কারণ তা মনের গভীরে লালিত কুসংস্কারগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখায়, আর অশিক্ষিত মন সেই কাজগুলিকে দুশ্চরিত্রের নষ্টামি হিসেবে দেখে। লুথারের ধারণা ছিল – কোপার্নিকাস নেহাতই সাধারণ এক ঘোলাটে ধাঁধাঁপ্রেমী (paradox-monger) মানুষ, নিজের খামখেয়ালী চেহারাটিকে জনমধ্যে প্রচার করাই যাঁর মূল উদ্দেশ্য। কেলভিনেরও তা-ই মনে হয়েছিল, আর গ্যালিলিও-র ক্ষেত্রে চার্চও ঠিক একই কথা ভেবেছিল। গণতন্ত্র গ্যালিলিও-কে বাঁচাতে পারতো না। ... ...

গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্যে অনেকভাবেই সহিষ্ণুতা অবশ্য-প্রয়োজনীয়। মানুষ যদি তার নিজের আদর্শ এতটাই তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরতে চায়, যার ফলে তার আদর্শের জন্যে মরতে বা মারতে ইচ্ছে করে, তবে প্রতিটি মতপার্থক্য হয় যুদ্ধে, নয় কু-দে-তা (coup d’état; অভ্যুত্থান)-য় শেষ হবে। গণতন্ত্র আসলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ আর সংখ্যাগুরুর প্রতি আনুগত্যের এক জটিল মিশ্রণ দাবি করে। একদিকে তার দাবি – জোরালো রাজনৈতিক ধ্যানধারণা-ওয়ালা ব্যক্তির উচিত তার নিজের মতামতের সপক্ষে তর্ক করা, আর সংখ্যাগুরু যাতে সেই মত মেনে নেয় – সেই চেষ্টায় অবিচল থাকা; অন্যদিকে, সংখ্যাগুরু যদি তখনো অমত হয়, তবে ভদ্রভাবে সেই জনাদেশ মেনে নিতে হবে ... ...

সর্বকালে, সর্বত্র – ক্ষমতা যাদের হাতে, তারা ক্ষমতাহীনদের ভালোমন্দের ব্যাপারে উদাসীন; তাদের একমাত্র লাগাম টেনে রাখে ‘ভয়’। কথাটা খুব কর্কশ শোনাতে পারে। ভালো মানুষেরা অন্যদের ওপরে এক বিশেষ সীমা লঙ্ঘন করে অত্যাচার করবে না – এমনটা বলা যেতেই পারে। বলা হয়তো যায়, কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। নিজেদের সুখে রাখতে ঠিক কতটা নির্যাতন চালানো হচ্ছে – সে কথা ভালো মানুষেরা দিব্যি না জেনে, বা না জানার ভান করে থাকতে পারে। রানী ভিক্টোরিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, লর্ড মেলবোর্ন ছিলেন এইরকমই একজন ভালো মানুষ। .... ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যৎসামান্য অর্থের বিনিময়ে কয়লাখনির অন্ধকারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেটে তাঁর সম্পত্তির জোগান দিত। ওইসব শিশুদের যন্ত্রণাই ছিল তাঁর শহুরে জীবনের জিয়নকাঠি। তিনি যে ব্যতিক্রম ছিলেন, এমন নয় কিন্তু! .... যে অবিচার আমাদের পক্ষে লাভজনক, তাকে সর্বদাই কোনো না কোনো কথার মারপ্যাঁচে (sophistry) জায়েজ় বলে দেখানো সম্ভব ... ...

আমাদের কাছে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার আর গণতন্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ মনে হলেও, এমন যে হতেই হবে – তার কোনো কারণ নেই, কেননা, নির্বাচনী কেন্দ্রগুলির ক্ষমতা খুবই সীমাবদ্ধ করে রাখা সম্ভব। আমাদের স্কটিশ বেরাদরেরা হাউস অব লর্ডসে নিজেদের প্রতিনিধি পাঠান, কিন্তু তাকে কোনোভাবেই গণতন্ত্র বলা যায় না। কিন্তু, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ছাড়া এমন কোনো প্রক্রিয়া খুঁজে বের করা প্রায় কার্যত অসম্ভব, যার ফলে ভৌগোলিকভাবে আয়তনে বড় কোনো রাষ্ট্রের কোনো সাধারণ নাগরিক সরকারি নীতি নির্ধারণে অংশ নিতে পারেন। ... ...

রোহার অফিস ঘরের অর্ধেকটা জুড়েই ট্রোফি ক্যাবিনেট। বছর ষাটের ভদ্রমহিলা। গোলগাল, সাদা ফুরফুরে চুল। দেখে মনে হয় মিষ্টি দিদিমাটি। কিন্তু বাপ রে কী মেজাজ তাঁর! আর কথার ধার! কিন্তু ওঁর কাছেই আমাদের মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে। উনি আমাদের শপ-লিফটিং এর ঘাঁতঘোঁত শেখাবেন। ... ...