চপলা
বৌদি ও বৌদি! বৌদি! বলি কাল রেতে বিষ্টি হয়েছে বলে কি নাকে সষ্যের তেল দে সকলে ঘুম্মে পড়িছো? বলিহারি জেবন তোমাদের।খাচ্ছো দাচ্ছো আর ঘুমুচ্ছো। আম্মো তো রাত তিনটেয় ঘর ছেড়ে বেইরে আসি হররোজ। এতোগুলো বাড়ির কাজ সারতে সারতে দুকুর গইরে যায়। আবার সেই ভিড় ঠেলে ঘরে ফেরা। টেরেনে টেরেনেই জেবনের অধ্যেক সময় কেটি গেল। কি আর করবো বলো! জম্মের সময় তোমাদের ওই বিধাতা না কি বলে গো, কপালে যে ছাপটা দে দেছেন, তারে খণ্ডাবো এমন সাধ্যি কি আর এই চপলা দাসীর আছে? তিনি যা যা নিখে দেছেন তা সবটাই ভুগতে হবে এই জেবনে, ফাঁকি দিয়ে সটকে পড়ার কোনো উপায় নাই। এই যে আমি তোমার এখানে ঠিকে ঝি এর কাজ কচ্ছি তাও ওই
তিনিই নাকি ছাপ মেরে ঠিক করে দেছেন।আমার মা বলতো – চপলা,গত জম্মের জোয়াল এখন এই জম্মেও টানতি হবে। এ হলো এক নম্বা চক্কোরের খেলা। যতোদিন বেঁচে ছিল মা বুড়ি, ততদিন ঐ জোয়াল টেনে গেছে সমানে। আমার বাপটা তো কোথায় ভেগে পড়লো! পাড়া পেতিবেশিরা অবশ্য বলে তারে মেইরে গুম কইরে দেছিলো ওই বিষ্টু মোড়লের নোকজন। বিষ্টুর কি একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাপ রুখে দাঁড়ায়ে ছিলো। ব্যস, অমনি খতম। সেই থেকে মা আমারে সামলায়ে রেখিছে, বড়ো করিছে। আমারে বয়ে যেতি দেয় নাই। তেমনটি হলে মোরে কোথায় পেতে ?
এ্যাই দেখো দিখি, সেই থিকে আম্মো একাই কেটলিতে জল ফোটার মতো নাগাড়ে বকবক করে চলেছি। দাও দেখিনি আমার সকালের দানাপানি। খেইয়ে কাজে লেগে পড়ি। আজ ওই লাহিড়ী বাড়িতে কাজে যেতি হবে নি। তেনারা সব কোথায় ঘুরতে গেছেন দিন সাতেকের জন্যি। তাই একটু হাপ ছেড়ে গপ্পো করছি। নইলে তো এতোক্ষণে আরও দুই বাড়িতে ঢু মারার পালা শেষ হয়ি যেতো। লাহিড়ী বাড়িতে আমার বেজায় দাপট! তাই বলে কি আম্মো কাজিয়া করে বেড়াই নাকি? আসলে ও বাড়ির বৌদি আমার কথাকে মান্য করে, বলে চপলা দিদি আমার তো বড়ো দিদি নেই, তুমিই হলে আমার দিদি। এই হলো তোমার কাজ, সুবিধা মতো গুছিয়ে করে ফেলবে। সমপক্কটারে যদি মাইনষের সম্পক্ক বলি মনে করো তাহলি সেখানে টানাপোড়েনের বালাই থাকেনা। আমরা তারে কেটে কুটে জট পাকয়ে ফেলি,তাই সব্বো সময় তারে নে খিটিমিটি লেগেই থাকে।
ওই বৌদির হয়ে দুটি ভালো কথা কইছি দেখে তুমি আবার আমার উপর রাগ করতিছো না তো? রাগ হলি পষ্ট করি বলবে, আম্মো আমার রেকডের পিন বদলায়ে দেবো। পাচ বাড়ি কাজ করি খেতি হয়।পাচ রকমের মাইনষের সঙ্গে নিত্য ওঠাবসা।একটু আধটু এদিক ওদিক হতিই পারে। সবাই যদি এক ছাঁচের পুতুল হয় তাহলে মজা কুথায়? এতো রকমারি মাইনষের সঙ্গে নিত্য রোজ কাটাই বলে আমি মনের দিক থে একদম নিম্মল। মা গঙ্গারে দেখো! কতরকমের জল আসি তাঁর শরীলে মেশে, কিন্তু মা গঙ্গারে কেউ ময়লা করতি পারেনা। গঙ্গার জল সদা পবিত্তই থাকে। এই চপলা দাসীও যে তেমনটাই থাকতি চায়, কিন্তু পারে কই?
আজ আম্মোরে বোধহয় ভূতে ধরিছে। কত্তো ভালো ভালো কথা মুখ ফখসে বেরোয়ে যাতিছে অনগ্গল। এখন তো কথা কওয়ার লোক মেলা ভার। যে বাড়িতেই যাই সেখানেই সব ফাঁকা সুনশান চেহারা। দেবা আর দেবী, না হয় টোনা আর টুনির সংসার। দেখি মনে হয় সবই তো আছে, কেমন ভরপুর ব্যবস্থা অথচ খুঁটিয়ে দেখতে গেলে দেখা যাবে বেবাক ফাঁকা।
ঐ যে গোলাপি বাড়ির মাসিমা আর মেসোমশাই – দুজনেই কেমন নিব্বাক হয়ে গেছে। দুই ছেলে আর ছেলে বউয়ের তুখোড় কাজিয়া! ছেলেরা তো তাদের পরিবার নে দূরে কোথায় থাকে আর থেকে থেকে হুমকি ছাড়ে – ও বাড়ি বেচে দাও। দুজনেই পাল্টে পাল্টে আমাদের দু ভাইয়ের কাছে থাকবে। মাসিমা তো কেবলই চোখের জল ফেলে। এতোকাল কত্তা গিন্নি একসাথে থেকে এখন বাটোয়ারা সইবে ? এরা সব শিক্ষিত বলে গব্বো করে? এমন শিক্ষার কাঁথায় আগুন।
না না আম্মো রেগে যাইনিগো বৌদি,রেগে যাইনি।
আসলে তোমাদের সঙ্গে থাকতি থাকতি কখন যে তোমাদের সুখ দুখের ভাগীদার হয়ে গেছি তা টের পাইনি একদম। আমিতো আগে মানুষ, তাপ্পর আমার অন্য পরিচয়। কি বলো বৌদি! আমি ঠিক বলিছি না? ও মা! এযে আটটা বাজলো! ওই বুড়ো বাবা নিঘ্ঘাত এক পেয়ালা চায়ের জন্য হা পিত্যিশ করে বসে আছে? আমি দু পেয়ালা চা বানায়ে ফেলাক্সে ভরে রাখি।সময় মতো ঠিক খেয়ে নেবে। চায়ের বড্ডো নেশা।দিদিমা চলি গিয়ে দাদুরে একেবারে ভেঙি ফেলিছে। সেই দুকুরে ওই হোম ডেলিভারির ছেলেটা এসে খাবার দে যাবে। তাই খাবে। আসিগো বউদি। কাল কিন্তু এতো কথা কইবার সময় মিলবে না। কাল তাড়া থাকবে।
সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
আগস্ট ১৩.২০২৬
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।