গুরুংবাবুরা ফতোয়া জারি করে সমতল বাসীদের যখন পাহাড়ে ঢোকা নিষিদ্ধ করলেন তখন নিঃশব্দে হয়ে গেল তার জন্ম শতবর্ষ। ফতোয়া না থাকলে হয়ত আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। সুন্দর করে সেজে উঠতো সে, বিশেষ বিশেষ অতিথিরা আসতেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত, কেক কাটা হত আরও কত কিছু হতে পারত।কথা হচ্ছে, কেভেন্টার্স রেস্তোরাঁ নিয়ে। হ্যাঁ, দার্জিলিং এর সেই বিখ্যাত কেভেন্টার্স। যার পথচলা শুরু হয় ১৯১১ সালে।
আমি আবার স্রোতের বিপরীতে যাওয়া সৃষ্টি ছাড়া এক মহিলা । এই যেমন, আমি একা একা বেড়াতে ভালোবাসি। আর সেই জায়গা গুলো যদি ইতিহাসের গন্ধ মাখা হয় তাহলে তো কথাই নেই। আমি একবার হলেও একা যাবোই যাবো। অন্তত যাওয়ার চেষ্টা তো করবই।
একা বেড়ানোর অনেক সুবিধের মধ্যে একটা সুবিধা হল বহু অপরিচিতর সাথে পরিচিত হওয়া যায়। এমনই একবার পুণে থেকে গাড়ি নিয়ে একা বেরিয়ে
গেছিলাম মধ্যপ্রদেশের পাঁচমারি। সেখানে আলাপ হয়েছিল আমারই মতো পাগল এক জাপানি মহিলা - হিমারি র সাথে। তার সাথে আমার তফাৎ হল - আমি শুধুই নিজের দেশে একা ঘুরে বেড়াই আর উনি দেশ বিদেশ একা ঘুরে বেড়ান। তার কাছে গল্প শুনেছিলাম দার্জিলিং এর কেভেনটার্সের । রাগ হয়েছিল নিজের ওপর এটা ভেবে যে আমার চেয়ে আমার দেশের ইতিহাস এক বিদেশিনী অনেক বেশি জানেন। সবচেয়ে বেশি ধিক্কার দিয়েছিলাম নিজেকে, যখন হিমারির কাছ থেকে জেনেছিলাম সত্যজিৎ রায় কাঞ্চনজঙ্ঘার শ্যুটিং ওই রেস্তোরাঁর ছাদের ওপর করেছিলেন। দার্জিলিংয়ে এ শ্যুটিং হয়েছিল জানতাম কিন্তু কোথায় হয়েছিল জানা ছিল না।
কেভেন্টার্সের নাম এবং তার ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য জানার পর। আরও জানবার জন্য উঠৈ পড়ে নেট ঘাঁটতে শুরু করলাম। জানলাম কে যান নি ওখানে? এডমন্ড হিলারি থেকে তেনজিং নোরগে, অমিতাভ বচ্চন থেকে রাজেশ খান্না, সত্যজিৎ রায় থেকে ঋত্বিক ঘটক সকলের পায়ের ধুলো পড়েছে ওখানে। এমন একটা জায়গায় যে আমি একা একবার ঢুঁ মারতে চাইবো এতে আশ্চর্যের কিছু নেই।
এই বছর জানুয়ারির শেষের দিকে আচমকা
কলকাতা যাওয়ার একটা সুযোগ এসে গেল।
কলকাতার কাজ সেরে সত্যজিৎ রায়ের বেশ কয়েকটি বই বগলদাবা করে পৌঁছে গেলাম দার্জিলিং। ঠিক করেছিলাম দুদিন যে থাকবো তারমধ্যে একটা দিন শুধুই কেভেন্টার্স আর সত্যজিৎ প্রেমে মাতিয়ে রাখব নিজেকে।
হোটেল আগে থেকেই বুক করেছিলাম। হিমারির কাছ থেকেই জেনে নিয়েছিলাম। এমনভাবে হোটেল বুক করেছিলাম যাতে কেভেন্টার্সের দূরত্ব পাঁচশ থেকে সাতশো মিটারের মধ্যে হয়। হোটেল এলগিন এমনই একটি হোটেল।
কেভেন্টার্স নিয়ে ছোটো করে যদি বলি তাহলে বলতে হয় এটি মিল্ক শেক এর জন্য বিখ্যাত। অন্তত আমরা সমতলের লোকজন তো তাই জানি। কিন্তু স্মৃতির সমুদ্রে একটু প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্য চালিয়ে গুগল অন্তত বলছে - ১৯১১ তে এডওয়ার্ড কেভেন্টার্স নামের এক ব্যক্তি কিছু ইংলিশ ব্রেকফাস্ট এবং প্রিমিয়াম কোয়ালিটির দার্জিলিং টি সাথে করে কেভেন্টার্স নামক এই ধাবা টি শুরু করেছিলেন। পরে ১৯৩৭ সালে নেপালের সাহ্ পরিবার এটি অধিগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে এই সাহ্ পরিবার ওই রেস্তোরাঁর ই ম্যানেজার ঝা পরিবার কে রেঁস্তোরা টি বিক্রি করে দেন।
কেভেন্টার্সের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কথা শুনে প্রথমে ভাবলাম ওখানকার খাওয়ারের দাম বোধহয় আকাশ ছোঁয়া হবে। কুছ পরোয়া নেহি? যে ছাদে সত্যজিৎ রায়ের পায়ের ধুলো পড়েছে, যে ছাদ তাঁর ক্যামেরার স্পর্শ পেয়েছে, যেখান থেকে তাঁর ওই গুরু গম্ভীর গলায় রোল সাউন্ড , রোল ক্যামেরা, অ্যাকশন শুনে রূপসী কাঞ্চনজঙ্ঘাও শিহরিত হয়েছে - এমন একটা জায়গায় পয়সার হিসেব করব? এতো বড়ো পাষন্ডও আমি নই। সারা বছর মুখে রক্ত তুলে খাটি। শপিং এর নাম শুনলেই পায়ের তলা জ্বালা করে বলে নিজের অথবা স্বামীর কারও পয়সাতেই কেনাকাটা করি না। আমার স্বামীর মতো নিন্দুকেরা অবশ্য বলে পা জ্বালা টা আমার বাহানা, আমি নাকি 'হাড় কিপ্টে'।
আমার সবচেয়ে প্রিয় সাহিত্যিক এবং পরিচালকের পছন্দের জায়গায় বসতে পারবো, তাঁদের অনুভব করতে পারব, তার জন্য যদি একটু বেশিই কড়ি খসল তাতে কি এসে যায়?
কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলাম খাওয়ারের দাম অসম্ভব সস্তা। নিজের কিপ্টে হওয়ার বদনাম ঘোচানোর সুবর্ন সুযোগ টা হাতছাড়া হয়ে গেল ।
যেসব মনীষীদের পায়ের ধুলোয় সাহিত্য প্রিয় বাঙালির কাছে প্রায় তীর্থস্থান হয়ে গেছে ক্যাভেন্টার্স, তাঁদের বেশ কয়েকজনের ছবি ওখানে থাকলেও যতটা আশা করেছিলাম তত টা পেলাম না। বারবার হাত বদলে যাঁরা এখন পরিচালনার দায়িত্বে, ইতিহাস জানা থাকলেও তাঁদের ইতিহাস নিয়ে কোনো গর্ববোধ আছে বলে তো মনে হল না। ক্যাভেন্টার্সের ঐতিহ্য কে আরও ভালোভাবে জনগনের কাছে তুলে ধরার কোনও উদ্যোগও দেখলাম না।
এবার রেস্তোরাঁর কথায় ফিরি। খোলা ছাদ, বেশ ছিমছাম সাজানো গোছানো রেস্তোরাঁ। ওপরে উঠলে দুটো ছাদ। একটা নতুন আর একটা পুরনো। পুরোনো ছাদ টা একেবারে খোলা আকাশের নীচে। সাদামাটা ছিমছাম। ওই ছাদেরই ডান দিকের কোনোও একটি চেয়ারে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর মেঘে ঢাকা তারার দুই শ্রষ্টা এক কাপ দার্জিলিং টি বা কফি তে ঠোঁট ছুঁইয়ে রূপসী কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহোময়ী রূপে মুগ্ধ হয়ে সময়ের হিসেব ভুলে গেছিলেন - ভেবেই মুহূর্তে লোমকূপ খাড়া হয়ে গেছিল।
সপ্তাহের মাঝামাঝি গেছিলাম বলে ভীড় একেবারেই ছিল না। পুরোনো ছাদে এক্কেবারে শেষের ডানদিকের টেবিল টা পেয়ে গেলাম।ঝকঝকে রৌদ্রজ্জ্বল পরিস্কার আকাশে দার্জিলিং এর গলায় হীরের একফালি হারের মতো চকচক করছিল কাঞ্জনজঙ্ঘা।
বসেই হারিয়ে গেলাম কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপে। কিন্তু সামনের কংক্রিটের জঙ্গল বারেবারে বাধা হয়ে বিরক্তি তৈরী করছিল।
সত্যজিৎ কোথায় এসে ক্যামেরা বসিয়েছিলেন? ঋত্বিক ঘটক এক কাপ কফি নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার নীলাম্বরী চোখে নিজের সর্বনাশ দেখতে দেখতে
ঠিক কোন্ কোন্ কালজয়ী সিনেমার গল্পের প্লট খুঁজে পেয়েছিলেন এখানে? তেনজিং নোরগে যখন কফি খেতে আসতেন, এখানে বসে এভারেস্ট যাত্রার কোন স্মৃতি গুলোতে তিনি ডুব দিতেন? রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, আমজাদ খান,রাখী,শর্মিলা ঠাকুর, শক্তি সামন্ত এখানে বসে এক কাপ কফি তে চুমুক দিয়ে শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা কে দেখতে পেয়েছিলেন, নাকি সই শিকারী এবং ভক্তদের ছবি তোলার ভিড়ে সেই অপার্থিব আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন তাঁরা? এইসব ভাবতে ভাবতেই মেনু কার্ড ঠিক ঠাক না দেখেই অর্ডার করে বসলাম একটা ননভেজ ব্রেকফাস্ট প্ল্যটার আর আমার প্রিয় দার্জিলিং ব্ল্যাক টি। নিজের অজান্তেই যে নিজের জন্য বিপদ ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছি বুঝলাম খানিক বাদে যখন সসেজ, মিট লোফ, বেকান, সালামি, ডিমের পোচ সহযোগে পাঁচশ গ্রাম মাংসের একটি দানবীয় প্ল্যাটার সামনে হাজির হল। আমি একেই স্বল্পাহারী এতবড়ো একটা প্ল্যাটার দেখে প্রায় কেঁদেই ফেলি আর কি। ওখানকার ম্যানেজার এসে উদ্ধার করলেন। বললেন সপ্তাহের মাঝামাঝি, ভীড় নেই । আপনি সময় নিয়ে খান। বেঁচে যা যাবে প্যাক করে দেবো। আমিও হাড় বজ্জাত বাঙালি, ঝোপ বুঝে কোপ মারলাম। বললাম তাহলে আমি কি একটা বই পড়তে পারি? তিনি বললেন, আপনি যা খুশি করুন। ভালোই হল। একটা কাঁচুমাচু মুখোশের আড়ালে এই থোবড়া টাকে সুড়ুৎ করে পাচার করে দিয়ে ঝাড়া চার ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম বহুবার পড়ার পরেও একেবারেই পুরোনো না হওয়া প্রফেসর শঙ্কু আর তারিনী খুড়োর সাথে। তবে হ্যাঁ আমার দার্জিলিং টির "চেইন ড্রিংকার" এর সত্ত্বা ক্যাভেন্টার্সের কোনও লোকসান হতে দেয় নি। আমি মোট ষোলো কাপ চা খেয়েছিলাম ওখানে।
উঠে আসার আগে মনে মনে বললাম । আবার আসব। বারবার আসব তোমার কাছে কেভেন্টার্স। জানি যতবার আসব তুমি ততবার আমাকে আমার প্রিয় সাহিত্যিক ও পরিচালকের অস্তিত্বের অনুভব করাবে।
কেভেন্টার্স কেভেন্টার্স ই। এখানকার কফি, হট চকলেট, মিট লোফ, সসেজ সহযোগে প্রাতঃরাশ ই বলুন বা শুধুই কয়েক কাপ ধোঁয়া ওঠা দার্জিলিং ব্ল্যাক টির সাথে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন - ক্যাভেনটার্স আপনাকে কোনোদিক থেকেই হতাশ করবে না।
দার্জিলিংয়ের ঘন কংক্রিটের জঙ্গল থেকে পর্যটকরা যতই দুরত্ব বাড়িয়ে নিন ক্যাভেন্টার্স একটি কারন যার জন্য অনেক খাদ্য রসিক এবং সিনেমা ও সাহিত্যের নস্টালজিয়ায় কাবু পর্যটক আজও একবার দার্জিলিং না ছুঁয়ে যান না।
লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ুক তার মাহাত্ম্য। দেশী বিদেশীরা আরও বেশি করে ছুটে আসুক, ভীড় করুক তার ঐতিহ্যের টানে। বেশি করে জানুক আমার বাংলার সিনেমা এবং সাহিত্য শ্রষ্টা দের। এক কাপ কফি এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপের ছটায় আমার প্রিয় সত্যজিৎ, ঋত্বিক এমন করেই বারবার বেঁচে উঠুন সিনেমা এবং সাহিত্য প্রেমীদের মননে ।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।