এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ছেঁড়া তার 

    Rajat Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত
  • পার্থদা, আড়াইশো মুড়ির একটা প্যাকেট দেবে আর একটা সিগ্রেট দিও  প্রলয়কে দুটো জিনিস বাড়িয়ে দিয়ে পার্থ দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে উদ্যোগী হল। এবারের পুজোর ফাংশনে তুমি গাইলে না কেন? প্রলয় পয়সা গুনতে গুনতে পার্থর দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো। আমি গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছি রে.. পার্থর গলায় খেদোক্তি। আরো কিছুক্ষণ প্রলয়ের সঙ্গে গান ছেড়ে দেয়া নিয়ে বাদানুবাদ সেরে দোকানের দরজায় তালাগুলো ঝুলিয়ে পার্থ হাতের ঝোলাটা নিয়ে বাড়ির পথ ধরল। মনে মনে হিসেব কষছিল, কাল ছেলের কলেজের ফিস্ জমা দিতে হবে। ছেলেটার পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। তমালিকার দুটো ওষুধও কদিন হল একদমই শেষ হয়ে গেছে। সে দুটোর দামও নেহাত কম নয়। এই দু বছরের মুদিখানা দোকান থেকে এত কিছু চালানো সত্যিই অসম্ভব হয়ে উঠছে। দু বছর আগেও একটা চাকরি তবু ছিল। সে কম মাইনের হলেও, মাসের শেষে একটা থোক টাকার মুখ দেখা যেতো। হঠাৎই চাকরিটা বুড়ো বয়েসে চলে যেতে পার্থ, পরিবার নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। শেষমেষ এই ধারদেনা করে দোকানটা দিয়ে বসলো। রাস্তার ধার ঘেঁষেই যাচ্ছিল সে। দুপুর দুটো বেজে গেছে, তাই এদিকে আর তেমন একটা গাড়ি ঘোড়া চলে না। এইভাবে চলতে হবে! এটাতো স্বপ্নেও কখনো ভাবেনি। এলআইসির এজেন্সিটা নেওয়া ছিল বলে এখনো দু চার টাকা কমিশন যা আসে। পঞ্চাশের দোরগোড়ার বয়েসে এসে পার্থ উপলব্ধি করলো, জীবনের হিসেবের খাতাটা তার শূন্যই থেকে গেছে। অথচ এমন একটা দিন গেছে যখন নামীদামী সব শিল্পীরা এক ডাকে পার্থকে চিনত। গানের গলায় যেমন কাজ ছিল তেমনই মন দিয়ে গানটা শিখেও ছিল। যৌবনে তমালিকা, সেই গানের টানেই মন দিয়ে বসেছিল। 

    সেবারের পুজোয় পার্থর গানের এ্যালবাম বের হচ্ছেই। শাইন মিউজিক কোম্পানীটি যে গায়ক রুদ্রনীলের সেটা সকলেই জানে। রুদ্রনীল নিজে আশ্বাস দিয়েছে। সে পার্থর গান আগেই কয়েকটা শুনেছিল। সেদিন পার্থকে ডেকে আরো চারটে রেকর্ড করা গান চেয়ে নিয়েছে। রুদ্রর বাড়িতে অনেকদিন ধরেই পার্থর যাওয়া আসা রয়েছে। অনেকবার ওরা দুজনে ফাংশনে স্টেজ শেয়ারও করেছে। সেভাবে দেখতে গেলে রুদ্র খুব ভালই বোঝে যে ওর থেকে গানটা পার্থই ভাল গায়। রুদ্রর কপাল জোর, তাই সে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে পার্থকে বহু যোজন পিছিয়ে দিয়ে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। আজ পার্থ চেষ্টা করলেও তাকে আর ধরতে বা ছুঁতে পারবেনা। পার্থ বহুদিন হল ফাংশনে গেয়ে দু পয়সা আয় করছে বটে, কিন্তু একটা এ্যালবাম না বের হলে কিংবা প্লে ব্যাকে সুযোগ না পেলে গায়ক হিসেবে মূল্য যে বাড়ে না! তাবড় নামী অনেকজনই আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিল, কিন্তু কাজের কাজ কিস্যু হয়নি। দীর্ঘ দশবছর ধরে শুধু মাচার ফাংশনই কপালে জুটেছে, তার বেশিকিছু আর... এইবার এ্যালবামটা বের করে বেশকিছু লোককে দেখিয়ে দেবে যে, গানটা নেহাত সে মন্দ গায় না। ভাবতে ভাবতে বাস থেকে নেমে পার্থ পায়ে হেঁটে রুদ্রর ফ্ল্যাটে বেল বাজালো। আজ রুদ্র ফাইনাল করবে কোন কোন গানটা রেকর্ডিংয়ের জন্য বাছাই হয়েছে। রুদ্রর বাড়ির কাজের লোক পার্থকে ভাল করেই চেনে, তাই এসে দরজা খুলে দিলো। ভিতরে ঢুকতে গিয়ে পার্থ বুঝতে পারলো, রুদ্র ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। একটু ঠাহর করতেই পার্থ স্পষ্ট বুঝতে পারলো যে রুদ্র তাকে নিয়েই কারোর সাথে কথা বলছে। সে রুদ্রর ঘরের দিকে না এগিয়ে, একটু থেমে কথাগুলো কানে নেবার চেষ্টা করল। রুদ্র বোধহয় বুঝতে পারেনি যে পার্থ তার বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। "দ্যাখ ভাই! এটা প্রফেশনাল জগত। এখানে দান ধ্যানের কোনো জায়গা নেই। আমার শাইন থেকেতো বের হবেই না, তুই শুধু দেখে নিস যেন কলকাতার কোনো কোম্পানীই একে প্রমোট না করে। একবার ও ক্লিক করে গেলে আমাদের ছুটি হয়ে যাবে ভাই... কথাটা মনে রাখিস।" এই কথাগুলো পুরোটাই পার্থর কান দিয়ে মর্মে সেঁধিয়ে গেল যেন। সে আরো বেশি করে নিশ্চিত হল, রুদ্র তার নামটা দুই তিনবার ফোনের অপরপ্রান্তের মানুষটিকে স্মরণ করিয়ে তবেই ফোনটা ছাড়ল। এ কি শুনল? রক্ষকের মুখোশ পরে আবারও একজন ভক্ষক। আর রুদ্রর ঘরের দিকে তার পা আর এগোলো না। চটি জোড়া পায়ে গলিয়ে একেবারে রাস্তায়। মাথাটা কেমন করছে, সঙ্গে গা'টাও গোলাচ্ছে। পার্থর মনে হচ্ছে সে বুঝি এখনই বমি করে ফেলবে। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত গঙ্গার ঘাটে বসে মদ খেয়েছিল। গভীর রাতে প্রায় টলতে টলতে কোনরকমে বাড়ি এসে ঢুকেছিল। তারপর থেকেই অজানা কারণে ক্রমে ক্রমে ফাংশনও আসা কমে যেতে থাকলো। রোজগারের প্রয়োজনে ছাত্রজীবনের করে রাখা এলআইসির এজেন্সির পাশাপাশি একটা চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিল। শেষ অবলম্বন চাকরিটুকু ছিল। দু বছর আগে পার্থর কোম্পানীটা পূর্বাঞ্চল থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল। ওর চাকরি গেল। টুকটাক করে গানটা ধরে রেখেছিল এতদিন। সাত আট মাস আগে মনের মধ্যে জমে থাকা তীব্র রাগ হতাশা আর দুঃখে পার্থ আর গীটারটার দিকে তাকায় না পর্যন্ত। 

    দুশ্চিন্তার পাখনায় ডানা মেলে আনমনে হাঁটছিল, পকেটে ফোনটা বাজছে বুঝতেই পারেনি। পার্থর নিজেরই গাওয়া একটা গান রিং টোন হয়ে বেজে চলেছে..। অজানা নম্বর, জিরো টু টু কোড, মানে মুম্বাই থেকে কে আবার ফোন করল! কৌতুহলী মন নিয়ে ফোনটা ধরল। ওপার থেকে হিন্দিতে কথা বলছে, আপ মিস্টার পার্থ রয় বোল রহে হ্যায়? এরপর দীর্ঘক্ষণ কথোপকথনের পরে পার্থর ভেঙে যাওয়া বুকে একঝলক তাজা বাতাস এসে ভিড় করল যেন। ফোনটা রাখার পর, ওর শুকিয়ে যাওয়া মুখটা কেমন যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। প্রায় আট নয় মাস আগে 'শিপচার্ট' বলে সুবিখ্যাত অনলাইন শপিং কোম্পানীটি বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, তারা অনলাইনে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় পড়াশোনার এবং গানের কোচিং অ্যাপ্ বাজারে আনতে চায়। বলাই বাহুল্য গানের ব্যাপারটা পার্থর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। বিজ্ঞাপনে নির্দেশিত বর্ণনা অনুযায়ী নিজের গানের রেকর্ডিংয়ের সফটকপি, ইমেল মারফত পাঠিয়ে দিয়েছিল। ফাটা কপালে সেরকম কিছু আশা করে নি। বিজ্ঞাপনে চোখ পড়েছিল বলে, নিজের কর্তব্যটা শুধু করে রেখেছিল। আজ সেই কোম্পানী এতদিন পরে জানালো, সে তাদের ফ্যাকাল্টি পদে মুখ্য পর্যায়ে নির্বাচিত হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে এসে ওদের টিম কলকাতায় নির্দ্দিষ্ট হোটেলে পার্থর ফাইনাল রাউন্ডের পরীক্ষাও নিয়ে গিয়েছিল। তারপর এতদিন সব চুপচাপ ছিল। কোনো খবরই আর পায় নি। বড় কোম্পানীর ব্যাপার তাই এতদিন বাদে সুখবরটি পেলো। এবার মুম্বাইয়ে গিয়ে জয়েন করে আসতে হবে। উফ্! ভাবতেই মনে মনে পার্থ শিউরে উঠছে। সারাবিশ্বব্যাপী স্টুডেন্টদের অনলাইনে গান শেখাতে হবে। তারজন্য পাবে প্রতি মাসে বেশ স্বাস্থ্যকর বেতন। পার্থর মনের মত কাজ। নিজের জীবনে গান গেয়ে গায়ক হল না বটে, তবে পৃথিবী জুড়ে কিছু গায়ক গায়িকা তো সে তৈরি করে যেতে পারবে। ভীষণ শান্তিতে চোখটা বুজে রাস্তার ধারের একটা বন্ধ চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়লো। বাড়িতে গিয়েই তমালিকাকে সব খুলে বলে সারপ্রাইজটা দেবে বলে ভাবছিল। হাতে ধরা ফোনটা আবারও বেজে উঠলো, পর্দায় তমালিকার নামটা ভেসে উঠেছে... পার্থ দেখে আবার নিজের চোখ বুজিয়ে ফেলল আবেশ ভরে। রিং টোনে পার্থর গাওয়া গানটা বেজেই চলেছে, "দূর নয় বেশিদূর ঐ সাজানো সাজানো বকুল বনের ধারে, আর বাঁধানো ঘাটের পারে... যাক যা গেছে তা যাক....॥

    (শুভারম্ভ)
    ____________
    ©রজত দাস
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন