এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ময়ূরপঙ্খী নাও

    Amitava Sen লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • ২২শে জানুয়ারি, সময় সন্ধ্যে ৭.১৫। 
    স্থান আলিপুর মিউজিয়াম, কলকাতা লিটারেসি মিট ২০২৬।

    অভিজিতের সাথে এক মঞ্চ থেকে আর এক দিকে যাচ্ছি, হঠাৎ পিছনে জোর আওয়াজ, খুব ভারী কোনো ধাতব জিনিষ বাঁধানো কংক্রিটের রাস্তায় পড়ল মনে হলো। অভিজিতের আঁতকে ওঠার আওয়াজে পিছন ঘুরে দেখলাম একজন বয়স্ক মানুষ, নাম পরের দিন জেনেছি, অরুণাভ সেনগুপ্ত, রাস্তায় পড়ে গেছেন, হোঁচট খেয়ে। ধরে দাঁড় করাতে না করাতেই, মুহূর্তের মধ্যে চেয়ার নিয়ে দৌড়ে এলেন এক তরুণ সংগঠক, পরে নাম জেনেছি সুপ্রিয় ঘোষ। বসানোর পর বোঝা গেলো মাথার সামনের দিক ফেটেছে, ফিনকি দিয়ে রক্তের বন্যা। আনাড়ি চোখে আঘাতের জায়গা দেখে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার জোগাড়। মনে হলো খুলির হাড় ভেঙ্গেছে। রুমাল দিয়ে চেপে ধরতেও ভয় লাগছে, আরো ক্ষতি হবে কিনা অভিজিত আর আমি কেউই বুঝতে পারছি না। 

    সেই সময়েই উদয় হলেন এক যুবক। বললেন "আমি দেখছি"। আমরা তার দিকে সন্দিহান চোখে তাকাতে ভরসা দিলেন, "আমি ডাক্তার"। বিদায় নেবার আগে জেনেছিলাম নাম, ফারহান আনোয়ার। সুপ্রিয় ফোন করে আনতে দিয়েছেন ফার্স্ট এইড বক্স। তরুণ ডাক্তার আর অপেক্ষা না করেই রুমাল ও জলের সাহায্যে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। ফার্স্ট এইড বক্স এলো, সেখান থেকে তুলো বিটাডিন ইত্যাদি নিজে নিয়ে, সুনিপুণ হাতে রক্তপাত বন্ধ করে জায়গাটা বাঁধলেন তুলো আর রুমাল দিয়ে। আফসোস করলেন micropore না থাকায় কাজটা মনমতো হলো না। ভয়ে ভয়ে শুধোলাম আঘাত কতটা গুরুতর। ডাক্তার জানালেন superficial injury, চামড়া গুটিয়ে গেছে বলে দেখতে ওরকম লাগছে। সেলাই করতে হবে, আর একবার স্ক্যান করিয়ে নেওয়া ভালো। বললেন সব কিছু থাকলে উনি নিজেই করে দিতেন স্টিচ। 

    যখন ডাক্তার আনোয়ার তাঁর কাজ করছেন, তখন আমরা জিজ্ঞেস করছি সেনগুপ্ত স্যার কে "আপনার বাড়ির লোকের নম্বর বলুন।" উনি বলছেন "না না কাউকে ব্যস্ত করার দরকার নেই।" জিজ্ঞেস করে জানা গেল উনি কসবা থেকে এসেছেন গণ পরিবহনে।  অনেক উপরোধ অনুরোধে পকেট থেকে বার করলেন একটি ফিচার ফোন। তারপর অন হলো সেটি। যেহেতু আলোচনা শুনছিলেন, ফোন বন্ধ ছিল। তা থেকে ফোন করলেন ওনার আত্মীয়কে। তারপর আমরা কথা বলে সেই আত্মীয়কে আশ্বস্ত করে আসতে বললাম আলিপুর। সুপ্রিয় বললেন "কাউকে আসতে হবে না।" ডেকে আনলেন আলাদিন কে। আলাদিন হাজির হলো গল্ফ কার্ট নিয়ে। তবে আলাদিন পৌঁছানোর আগেই স্যার হাত পা খেলিয়ে, একটু হেঁটে দেখে নিলেন অন্য কোথাও বড় চোট আছে কিনা। যখন হেঁটেছেন তখন অবশ্য আপত্তি না শুনে আমরা ওনাকে ধরে রেখেছিলাম। মুখে স্মিত হাসি নিয়ে স্যার বিদায় নিলেন সবার কাছ থেকে। গল্ফ কার্ট করে যাবেন গেট অব্দি, তারপর সুপ্রিয়র দেওয়া গাড়িতে ঢাকুরিয়ার বাড়ি, সাথে আলাদিন। আমরা সবাই মিলে ওনাকে কার্টে তুলে সমস্বরে বললাম 'আগামীকাল আবার দেখা হবে!" পড়ে যাওয়ার সময় থেকে এই চলে যাবার সময় অব্দি মুখ দিয়ে কোনো যন্ত্রনার আওয়াজ নেই, কোনো ভয় বা বিরক্তির প্রকাশ নেই, একবারও অভিযোগ করলেন না, কেন এরকম উঁচু নিচু থাকবে হাঁটার জায়গা, বিশেষ করে যেখানে জোরাল আলো নেই। একবার ও ফারহানকে জিজ্ঞাসা করলেন না ভয়ের কিছু আছে কিনা। শান্ত অবিচল ভাবে বসে থেকে যা করতে বলছিলেন ফারহান সেটা করছিলেন। 

    কোনো যন্ত্রণার প্রকাশ ছিল না সুপ্রিয়র মুখেও। আমরা পরে খেয়াল করেছিলাম ওনার আঙুলের ব্যান্ডেজ। নখকুনি, খুব বাড়াবাড়ি হয়েছে, বেশ ব্যথা আছে সেখানে, দুপুরেই গিয়েছিলেন হাসপাতালে, এসব কিছুকে পাত্তা না দিয়েই নিজের কর্তব্যে অবিচল মানুষটি।

    ফারহান হাতে তুলে নিলেন সদ্য কেনা বই দুটি, আমরা যত ধন্যবাদ দিই ততই লজ্জা পেয়ে, বিদায় নিলেন। সুপ্রিয় গেলেন নিজের কাজে, এনারও ধন্যবাদ নিতে খুব লজ্জা, আমরা ও চললাম আমাদের পরের গানের অনুষ্ঠান দেখতে, যার থিম - "মিলে সুর হামারা।"

    ২০২৬ এর ভারতে তথা বাংলায় এক শ্রেণীর ঘৃণার ব্যাপারী অমানুষ ও তাদের ডিগ্রিধারী অশিক্ষিত খদ্দেরদের অশ্লীল চিৎকারে যখন মাথা খারাপ হবার জোগাড়, তখন আমার ভারতবর্ষ নীরবে সুরক্ষিত থাকে সেনগুপ্ত, ফারহান, সুপ্রিয়, আলাদিনের মত নাইয়াদের হাতে। 

    এনারাই নীরবে বেয়ে যান - দৃঢ়তার, ভালোবাসার, সবার ভালো থাকার, সবাইকে ভালো রাখার ময়ূরপঙ্খী নৌকা।

    অনেক পিছনে আবছা হয়ে যায় সংখ্যালঘিষ্ঠ জল্লাদের উল্লাস।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন