এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আজকের দূর্গা 

    Rajat Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ৫৯ বার পঠিত
  • [এক]

    গুহ বাড়ির বৌরা যে খুব আরামেই থাকে একথা সব্বাই মানে। কত বড় বাড়ি, কত টাকাপয়সা। গুহদের বিশাল ব্যবসা। পুরো গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক তারা। রণজিত গুহ আর তার ছেলেরা এই ব্যবসা চালায়। এ বাড়িতে সবাই যে তাদের মেয়েদের বিয়ে দিতে চাইবে এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। নিজের একটি মাত্র মেয়ের জন্য এমন একটি বাড়িই তো সুমন্তবাবু চেয়েছিলেন। সুমন্ত বাবুর এক মেয়ে, এক ছেলে। ছেলে বড়, মেয়ে ছোট। ছেলের নাম রাতুল আর মেয়ের নাম রীমা। ছোট মেয়ে দেখতে সুন্দর, পড়াশোনাতেও বেশ ভালো। আগের বছর M.B.A. পাস করেছে। গোটা ইউনিভার্সিটির মধ্যে সবথেকে বেশি নাম্বার পেয়ে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়েছিল সুমন্ত বাবুর ছোট মেয়ে রীমা। রীমার এখনই বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না। আরও পড়তে চেয়েছিলো। কিন্তু সুমন্ত বাবু আর দেরী করতে চাননি। তাই গুহ বাড়ির সম্বন্ধ আসতেই সেটা পাকা করে ফেলেছেন। দেনাপাওনা অনেক হলেও বিন্দুমাত্র দরদস্তুর করেননি তিনি। গুহ বাড়ি গিয়ে কথা একেবারে পাকা করে এসেছেন। গুহ বাড়ির ছোট ছেলে সুজয় গুহ'র সাথে বিয়ের জন্য তৈরি হতে থাকল দুই পরিবার। আর একই সঙ্গে মৃত্যু হতে থাকল পড়াশোনাতে খুব ভালো, স্বনির্ভর হতে চাওয়া এক মেয়ের স্বপ্ন।

    [দুই]

    গুহ বাড়িতে বৌ হয়ে এসে থেকে রীমা একটা জিনিস বুঝে গেছে। এখানে নারীর পরিচয় কারো বৌ কিম্বা কারো মেয়ে হিসাবে। কোন মেয়ের এখানে নিজস্ব কোন পরিচয় নেই। আসলে এখানে মেয়েদের নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে দেওয়া হয় না। এত বড় বিজনেস আছে এদের। বাড়ির চারিদিকে আধুনিকতা, তবু এদের মনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে প্রাচীনতা। এ বাড়ির বৌদের সব সময় মাথায় ঘোমটা দিয়ে রাখার নিয়ম। রীমা এগুলো একদম মেনে নিতে পারে না। সে চিরকাল নারী স্বাধীনতার কথা ভেবেছে, নারীমুক্তির কথা চিন্তা করেছে, ভেবে এসেছে সে একদিন চাকরি করে অনেক টাকা রোজগার করবে, আর্থিক ভাবে স্বাধীন হবে। কিন্তু সে সবই এখন স্বপ্ন। তার এখন একমাত্র পরিচয় সে গুহ বাড়ির ছোট বৌ। এখানেই শেষ নয়, বন্ধ দরজার ওপারে গুহ বাড়ির বৌদের অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। এরকম বাড়িতে বৈবাহিক ধর্ষণ নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনকি যখন তখন বৌ দের গায়ে হাত তোলা খুব সাধারণ ব্যাপার। মাঝেমধ্যে এই সব কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করে রীমার। পারেনা শুধু তার বাবার কথা ভেবে। বাবা অনেক সাধ করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন যদি সে শ্বশুরবাড়িতে ঝামেলা করে বাপের বাড়িতে গিয়ে ওঠে সেটা তার বাবার ভালো লাগবে না। তাই রীমা, গুহ বাড়ির “ভালো বৌ” হয়ে থাকাটাই ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিল।

    [তিন]

    গুহ বাড়ির বৌদের নিজস্ব কোন ইচ্ছার দাম নেই। সেটা রীমা জানত এবং মেনেও নিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা সহ্যের বাইরে চলে গেল যখন রীমা প্রথম প্রেগনেন্ট হল। প্রেগ্নেন্সীর শুরু থেকেই রীমাকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য। ব্যাপারটাতে শুরু থেকেই তীব্র আপত্তি করেছিল রীমা। কারণ সে জানত তার পেটে যদি মেয়ে থাকে তাহলে সেই বাচ্চার জন্ম তাকে দিতে দেওয়া হবে না। এদিকে শ্বশুরবাড়ির চাপ বেড়েই চলেছে। রীমা একদিন সবার সামনে বলে দিল যে, তার গর্ভে ছেলে থাকুক বা মেয়ে... তাতে তার কোন অসুবিধা নেই, কিন্তু সে কিছুতেই ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ করতে দেবে না। সেদিন গুহ বাড়ির বৌ উঁচু গলায় কথা বলার মত অন্যায় করেছে। তাই গুহ বাড়িতে সেদিন অশান্তি চরমে উঠল। সেদিন সুজয় আবার হাত তুলতে গেল রীমার ওপর। কিন্তু রীমা সেদিন আর সহ্য করেনি সুজয়ের অত্যাচার। সপাট এক ধাক্কা মেরেছিল সুজয়কে। ব্যাপারটার জন্য একেবারে তৈরি ছিল না সুজয়। পৌরুষে ঘা লাগায় আবার রীমাকে মারতে উদ্দত হল সে। কিন্তু এবার তার দিকে একটা ফুলদানি ছুঁড়ে দিয়ে সে ঘরের বাইরে চলে এল। তারপর ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। শ্বশুর রণজিত গুহ'র সামনে দিয়ে শ্বাশুড়ির আলমারিতে থাকা তার বিয়ের সব গয়নাগুলো বের করল রীমা।
    শাশুড়ি বললেন, “এসব গয়না তুমি নিয়ে যেতে পারো না।”
    রীমা বলল, “একশবার পারি। এগুলো আমার বাপের বাড়ি থেকে আমার বিয়েতে দেওয়া গয়না। আমি যখন এ বাড়িতে থাকছি না তখন এগুলোও থাকবে না।”
    এই বলে ব্যাগ নিয়ে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে এল রীমা।
    বেরোনোর সময় সুজয় চেঁচিয়ে বলে দিল, “যাচ্ছ নিজের ইচ্ছেতে, কিন্তু মনে থাকে যেন এ বাড়ির দরজা তোমার জন্য চিরকালের মত বন্ধ।”
    আর একটুও দাঁড়াল না রীমা, রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল। বাড়ির সামনে রাস্তাটার অবস্থা খুব খারাপ। সুজয় দেখতে পেল রাস্তাটা সারানোর জন্য হঠাৎ কাজ শুরু হয়ছে।

    [চার]

    বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাপের বাড়িতেই উঠল রীমা। বাপের বাড়ির লোকজন মুখে কিছু না বললেও মনে মনে যে খুব একটা খুশি হয়নি সেটা বেশ বুঝতে পারছিল। তা সত্ত্বেও ওই বাড়িতেই থেকে যেতে বাধ্য হল সে। এছাড়া তার কাছে আর কোন উপায়ও ছিল না।
    ঠিক সময়ে রীমার কোল আলো করে মেয়েই হল। এতদিন ধরে তার মনে চলা সব দ্বন্দ্ব কেটে গেল। রীমা পরিষ্কার বুঝতে পারল যে সে ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়ে ছিল। আজ যদি সে গুহ বাড়িতে থেকে যেত তাহলে এই মেয়ের জন্ম কিছুতেই দিতে পারত না। আদর করে মেয়ের নাম রাখল সৌরদীপা।
    একটা কথা প্রায়ই মনে হত যে সে এ বাড়িতে অনাহূত অতিথি। কোন টাকা না দিয়ে সে এ বাড়িতে আছে।
    এই তো সেদিন বৌদি কথায় কথায় বলে দিল যে সংসারের খরচ খুব বেড়ে গেছে। রীমার মনে হতে থাকে এবার তার কিছু করা উচিত। শুধু সে নয়, তার মেয়েরও খরচ আছে। সারা জীবন তো সে বাপের বাড়িতে দাদা বৌদির অনুগ্রহ নিয়ে বাঁচতে পারবে না। তাই চাকরির চেষ্টা শুরু করল। চাকরি জোগাড় করা তার জন্য যে খুব কঠিন হবে তা নয়। পড়াশোনাতে চিরকাল সে খুব ভালো ছিল। চাকরি জোগাড় করার পথে প্রধান সমস্যা তার পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে। মেয়েকে রেখে কি করে সে চাকরি খুঁজতে যাবে ?

    [পাঁচ]

    রীমা আর বেশি দেরী করল না। চাকরি সংক্রান্ত সবকটি পোর্টালে সিভি আপডেট করে দিল।
    মাস খানেকের মধ্যেই তিন চারটে ইন্টারভিউয়ের কল্ এলো। ইন্টারভিউয়ের দিনে রাস্তায় বেরিয়ে মেয়েটার জন্য খুব মন খারাপ করছিল। সে নিজের মনকে বোঝাল। যা করছে তা তো তার আর মেয়ের ভালো থাকার জন্যই করছে। আর এটা তাকে করতেই হবে।
    সপ্তাহখানেক হয়ে গেল। সেইরকম ভাল কোনো চাকরি রীমা পায়নি। যে কয়েকটি পেয়েছে সেগুলোর মাইনে খুবই কম। নিজে পড়াশোনাতে কত ভালো ছিল সেটা জানে সে। ওই রকম চাকরি সেইজন্যই রীমা করতে চাইছিল না। আগামীকাল একটা খুব বড় ফাইন্যান্স কোম্পানিতে চাকরির ইন্টারভিউ আছে। যদি চাকরিটা হয়ে যায় তাহলে এর থেকে ভালো আর কিছু হয় না। চাকরিটা বেশ ভালই হবে মনে হয়। আর মাইনেও অনেক। দেখা যাক কি হয় !
    প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে ইন্টারভিউ হল রীমার। অনেক প্রশ্ন করেছিল রীমাকে। বেশিরভাগ প্রশ্নেরই ঠিক ঠিক জবাব দিয়েছিল সে। তার M.B.A এর রেজাল্ট দেখে ইন্টারভিউয়াররা যে খুব খুশি হয়েছে সে কথা বুঝতে পারল রীমা। দেখা যাক, চাকরিটা হয়েও যেতে পারে।
    আরো অনেকগুলো ইন্টারভিউয়ের পর্ব পেরিয়ে চাকরিটা অবশেষে ফাইনাল হল।
    তিন সপ্তাহ বাদে অফার লেটারটা হাতে পেয়ে আনন্দে চোখে জল চলে এলো রীমার। রিলেশনশিপ ম্যানেজার হয়ে চাকরিতে জয়েন করবে সে। বাড়ির সবাই খুব খুশি। মা শুধু বললেন, "মেয়েটাকে ছেড়ে কি করে অতক্ষণ কাজকর্ম করবি ?" রীমা বলল, “তোমরা সবাই তো আছ, তোমরা ওকে দেখবে।"

    [ছয়]

    শুরু হল রীমার নতুন জীবন। A.।.C.C. নামের এই সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন বড় বড় কোম্পনিকে মূলধনের জোগান দেয়। আর সেই কোম্পনির রিলেশনশিপ ম্যানেজার হিসাবে কাজ করে রীমা। খুব যেমন কাজের চাপ। তেমনি বেতনটা ও বেশ...। বাড়িতে সে এখন অনেকগুলো টাকা দিতে পারে। তাই বৌদিও আর কথা শোনায় না। ছয়মাস রীমার প্রচন্ড পরিশ্রমের ফল স্বরূপ ম্যানেজমেন্ট তাকে একটু ভাল গ্রেডে ডেপুটি ম্যানেজার পদে স্থায়ী করে দিল।

    দেখতে দেখতে মেয়েটার বয়স এক বছর হয়ে গেল। যতই টাকা দিক না কেন, রীমা একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝতে পারছিল যে তার আর তার মেয়ের এই বাড়িতে থাকাটা তার দাদা বৌদির ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। মনে মনে মেয়েকে নিয়ে অন্য কোথাও সরে যাওয়ার প্ল্যান করতে থাকে। অফিসে কয়েকজনকে বলল একটা ফ্ল্যাট দেখার কথা। মাসখানেকের মধ্যে ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে বুক করেও ফেলল কসবা এলাকাতে পনেরো তলা বিল্ডিংএর বারো তলায় একটি হাজার স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট।

    বাড়িতে ব্যাপারটা জানানোর পর দাদা বৌদি মুখে একটু আপত্তি জানালো বটে। যদিও মনে মনে যে খুশিই হয়েছে সেটাও রীমা বুঝতে পারল। মা বাবা কিন্তু সত্যিই খুব দুঃখ পেয়েছে। সব কিছুকে উপেক্ষা করে মেয়েকে নিয়ে একদিন শুভক্ষণে নতুন ফ্ল্যাটে চলেই এলো রীমা। নতুন ফ্ল্যাটে এসে মেয়ের জন্য সর্বক্ষণের একজন মহিলাকে রাখল সে। মেয়েকে নিয়ে দিনগুলো ভালই কেটে যাচ্ছিল তার।

    [সাত]

    এরমধ্যে কেটে গেছে আরও দুটো বছর। মাসদুয়েক আগে A.।.C.C. এর এরিয়া ম্যানেজার সুদীপ বসু কোম্পানি ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে ভাল অফার পেয়ে চলে গেছেন। A.।.C.C এর মত এত বড় ফিনান্স সংস্থার এরিয়া ম্যানেজারের পদ বেশিদিন খালি রাখা সম্ভব নয়। তাই সবদিক বিবেচনা করে ওই পদে রীমাকেই বসিয়ে দেওয়া হল। এত কম বয়সে এরিয়া ম্যানেজারের পদে রীমাকে বসানো নিয়ে কোম্পানির অভ্যন্তরে একটু শোরগোল পড়েছিল বৈকি। কিন্তু এখানে রীমার M.B.A. এর রেজাল্ট আর চাকরিতে এই কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা ম্যাজিকের মত কাজ করেছিল। তাই শেষ পর্যন্ত সেভাবে আর কেউ কিছু বলেনি।

    রীমার কাজের চাপ এখন আরও অনেক বেড়ে গেছে। যদিও কাজের জন্য মেয়েকে কখনও অবহেলা করেনি সে। চেষ্টা করে নিজের মত করে মেয়েকে সময় দিতে।
    সেদিন রীমা নিজের চেম্বারে বসে কাজ করছিল। সেদিন সেকেন্ড হাফে রীমার একটা মিটিং ছিল। তাই কাজগুলো তাড়াতাড়ি সেরে নিচ্ছিল সে। কয়েকটা কোম্পনি নতুন করে লোনের জন্য অ্যাপ্লাই করেছিল। রীমা সেই অ্যাপ্লিকেশনগুলো দেখছিল। একটা অ্যাপ্লিকেশন দেখতে গিয়ে চমকে গেল ও। এটা কী দেখছে সে ! একটা লোনের আ্যপ্লিকেশন এসেছে গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজের কাছ থেকে ! রীমার পায়ের তলার মাটিটা কেঁপে উঠলো। তার দোর্দণ্ডপ্রতাপ শ্বশুর রণজিত গুহ তার কোম্পানির জন্য A.।.C.C তে লোনের অ্যাপ্লিকেশন করেছে। আর সেই লোন স্যাংসান করার ক্ষমতা একমাত্র রীমার হাতেই। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রীমা। ষোল তলায় তার চেম্বার থেকে কলকাতা শহরকে দেখতে ভারী অদ্ভুত লাগছিল তার। মাত্র বছর তিনেক আগে রীমা যার বাড়ীতে ছোট বৌ হয়ে গিয়েছিল, সেই রণজিত গুহ আজ তার কাছে লোনের অ্যাপ্লাই করেছে ! কী অদ্ভুত এই পৃথিবী ! কত সহজেই সবকিছু বদলে যায় এখানে !

    ইন্টারকমে তার সহকারীকে ধরল রীমা। গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজের ফাইলটা চাইল। রীমাকে এখন নিরপেক্ষ ভাবে দেখতে হবে যে সত্যিই গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজকে লোন দেওয়া যাবে কিনা।

    [আট]

    বাড়ি এসে সারা রাত ধরে ফাইলগুলো দেখল রীমা। গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বর্তমান অবস্থা একদম ভালো নয়। যদিও লোনটা পেলে হয়ত ব্যবসাটা নতুন করে দাঁড় করাতে পারবে। কিন্তু গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজমেন্টের সাথে একটা মিটিং করলে ভালো হয়। কিন্তু সেটা বাস্তবিকই অসুবিধার। কিন্তু এটা তার কাজ। আর সেটা তাকে করতেও হবে।

    পরদিন অফিসে গিয়ে রীমা তার সহকারীকে বলল গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজের হেড রণজিত গুহকে খবর দিতে। তার সঙ্গে একটা মিটিং করতে চায় রীমা। রীমা যতই মিটিং করতে চাক না কেন, তার মনে একটা ইচ্ছা আছে তার শ্বশুরকে নিজের জায়গাটা দেখানোর। সেই কারণেই রণজিত গুহকে ডেকে পাঠায় রীমা।

    কয়েক ঘন্টা পরে রীমার সহকারী খবর দিল রণজিত গুহ এসেছেন। রীমার হৃদস্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সহকারীকে বলল পাঁচ মিনিট পর রণজিত গুহকে তার চেম্বারে পাঠিয়ে দিতে। রীমা নিজেকে সংযত করল। একদিন এই বাড়ি থেকে চরম অপমানিত হয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল তাকে। আর আজ তারই হাতে সেই বাড়ির, আর ব্যবসার জীবন মরণ। রীমা রিভলভিং চেয়ারে উল্টো দিকে ঘুরে বসল। কয়েক মিনিট পর দরজায় টোকা শুনতে পেল রীমা। সঙ্গে একটা ভারী পুরুষ কন্ঠস্বর - “May। come in madam ?” এই কণ্ঠ তার ভীষণ চেনা।

    রীমা পরিস্কার বুঝতে পারল “প্রাক্তন” শ্বশুরমশাই রণজিত গুহ'র উপস্থিতি। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল রীমা। রিভলভিং চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল - “Yes “.

    ভূত দেখলে মানুষ যতটা চমকে যায় তার থেকেও বেশি চমকে গেলেন রণজিতবাবু। চেম্বারে ঢোকার আগে এরিয়া ম্যানেজারের নামটা দেখলেও তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি সেই এরিয়া ম্যানেজার তারই বাড়ির বৌ রীমা ! তারই বাড়ির বৌ রীমার হাতে গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জীবন মরণ সেটা মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। কয়েক মিনিট পরে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। রীমা বলল, "দাঁড়ান। আমার পারমিশন ছাড়া এই চেম্বার থেকে কেউ বেরিয়ে যেতে পারে না।”

    রণজিত বাবু দাঁড়ালেন। রীমা আবার বলল, ”বসুন। গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজকে লোন দেওয়া যাবে কিনা সেটা ঠিক করতেই আমি এই মিটিংটা ডেকেছি। কারণ আপনাদের কোম্পনির অবস্থা খুব একটা ভালো না। গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজকে লোন দিলেও তারা যে লোন শোধ করতে পারবে এমন কোন গ্যারান্টিও নেই।"

    রণজিতবাবু নিশ্চুপ। রীমা আবার বলতে শুরু করল, "তবে কয়েকটা terms and conditions add করে আমি লোনটা স্যাংসন করতে পারি। এই নিন সেই terms and conditions এর পেপারটা।”
    এই বলে রীমা একটা কাগজ রণজিত গুহকে দিল। তারপর বলল, "এবার আপনি আসতে পারেন। লোনটা দেব কিনা সেটা আমিও ভাল করে ভেবে দেখছি।”
    রণজিত গুহ ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
    একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে রীমার। সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
    বাড়ি গিয়ে সব বললেন রণজিত বাবু। বাড়ির বৌ এর হাত থেকে খাওয়া এত বড় থাপ্পড়টা কারো হজম হচ্ছে না। বাড়ির “সামান্য” বৌ এর হাতে এ বাড়ির ব্যবসা বাঁচানোর ক্ষমতা ! কেউ সহ্য করতে পারছে না। সহ্য করতে না পারলেও আজ কারোর কিছু করারও নেই।

    [নয়]

    আজ মহালয়া। রীমা সেকেন্ড হাফে তার মেয়েকে অফিসে নিয়ে এলো। গুহ এন্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজের লোনের পেপারগুলো সব তৈরি ছিল। পেপারগুলোতে সই করে সেগুলোকে একটা খামে ভরল রীমা। তারপর অফিস থেকে বেরোনোর জন্য পা বাড়ালো রীমা। এরিয়া ম্যানেজার অফিস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, তাই সবাই শশব্যস্ত হয়ে পথ ছেড়ে দিল। ড্রাইভারকে আসতে বারণ করল রীমা।
    আজ নিজেই ড্রাইভারের আসনে বসে মেয়েকে পাশের সিটে বসালো। তারপর গাড়িটা ছুটে চলল গুহ বাড়ির দিকে।
    গুহ বাড়ির সামনে এসে গাড়িটাকে দাঁড় করালো রীমা। শেষ বিকালের আলো এসে পড়ছে বিশাল বাড়িটার ওপর। রীমা মেয়েকে কোলে নিল আর অন্য হাতে নিল লোনের পেপারগুলো। তারপর দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেল গুহ বাড়ির দিকে।
    বিকেলের চায়ের আসর বসেছে গুহ বাড়ির বিশাল ডাইনিংয়ে। সেখানে এসে দাঁড়াল রীমা। তারপর বলল, ”মিঃ গুহ, আমি আপনার লোনটা স্যাংশন করে দিয়েছি। এই নিন পেপারগুলো।”
    কয়েক মিনিট পর রণজিত গুহ হাত বাড়িয়ে পেপারগুলো নিলেন। বাড়ির সবাই সেখানে রয়েছে। এমনকি সুজয়ও। কোলের মেয়েটি নজর এড়ায়নি কারোর। রীমা বলল, ”চলি মিঃ গুহ। আশা করি আপনি ব্যবসাটা আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।”
    কথাগুলো বলে রীমা দরজার দিকে পা বাড়াল। সবাই দেখল রীমা দৃঢ় পায়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
    এ যেন গুহ বাড়ির বৌ নয়, A।CC এর এরিয়া ম্যানেজার এগিয়ে যাচ্ছে। শাড়ি পড়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে নয়। ছাই রঙা স্যুট পরিহিতা একটি যুবতী। গাড়িতে গিয়ে উঠলো রীমা।

    সুজয় শুনতে পেল পাড়ায় মহালয়ার অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেখানে কেউ আবৃত্তি করছে,
    "….আমার দুর্গা পথে প্রান্তরে ইস্কুল ঘরে থাকে /আমার দুর্গা বিপদে আপদে আমাকে মা বলে ডাকে।
    আমার দুর্গা আত্মরক্ষা শরীর পুড়বে মন না /আমার দুর্গা নারী গর্ভের রক্ত মাংস কন্যা।
    আমার দুর্গা গোলগাল মেয়ে, আমার দুর্গা তন্বী /আমার দুর্গা কখনও ঘরোয়া কখনো আগুন বন্হি।
    আমার দুর্গা মেধা পাটেকর, তিস্তা শীতলা বাদেরা / আমার দুর্গা মোম হয়ে জ্বলে অমাবস্যার আঁধেরা।
    আমার দুর্গা মণিপুর জুড়ে নগ্ন মিছিলে হাঁটে / আমার দুর্গা কাস্তে হাতুড়ি আউশ ধানের মাঠে।
    আমার দুর্গা ত্রিশূল ধরেছে স্বর্গে এবং মর্ত্যে /আমার দুর্গা বাঁচতে শিখেছে নিজেই নিজের শর্তে।….”

    রীমার গাড়ি চলতে শুরু করেছে। সুজয় নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকল। খারাপ রাস্তাটা এখন সুন্দর করে তৈরি হয়ে গেছে ॥
    ___________________
    ।। জয়তু নারীশক্তি।।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • দীপ | 2402:3a80:1989:3bfa:578:5634:1232:***:*** | ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:২৯737752
  • দূর্গা নয়, দুর্গা।
    অনুগ্রহ করে ঠিক করে নেবেন।
  • Ripon | ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:২২737760
  • বাস্তবে এরাম হয় বিশ্বাস করতে পারলে ভালই হত 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন