যে ভাষার জন্যে এমন হন্যে,এমন আকুল হলাম
সে ভাষায় আমার অধিকার
এ ভাষার বুকের কাছে মগ্ন আছে আমার অঙ্গীকার।"
ধর্ম দেশ ভাষা জাত বর্ণ সম্প্রদায়, এগুলোর মধ্যে ভাষা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে আপনার। মায়ের ভাষা আমার কাছে মায়েরই প্রতিচ্ছবি।
মায়ের ভাষায় ভালোবাসি, রেগে যাই, কাঁদি, হাসি, ঘেন্না পাই, নতুন কিছু শিখি, অভিমান করি, ভুল বুঝি, ভুল শোধরাই। যন্ত্রণার আর্তিও সেই মায়ের ভাষায়। প্রার্থনাও। দাবি-দাওয়া, অভিযোগ, খিস্তি... প্রতিদিন পরিণত হতে হতে নিজের ক্রমশ কমতে থাকা জীবনকাল উদযাপন... সেই ভাষা-মায়ের কোলেই তো...
তাই, মায়ের ভাষার ওপর আক্রমণ, আমার চোখে, মায়ের ধর্ষণ হওয়ার সমতুল।
এই আক্রমণ চলতে দেখেও নীরব থাকা, যেন বিছানার কাছেই একটা স্টুল টেনে নিয়ে বসে মায়ের ধর্ষণ দেখা।
আর এই আক্রমণকে উৎসাহ দিয়ে আক্রমণকরীদের মদত দেওয়ার মানে, মায়ের ধর্ষকদের ভায়াগ্রা সরবরাহ করা।
বর্তমানে, গোবলয়ের নেতাদের পায়ুলেহী কিছু পদ্মফুলী নেতা, বৈদ্যুতিন প্রচার মাধ্যম, আর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ঐ শেষোক্ত কাজটা করে চলেছে। এতে অবশ্য তাদের স্বার্থ আছে। তারা তাদের প্রভুদের থেকে এই ন্যক্কারজনক কাজের বিনিময়ে প্রচুর অর্থলাভ করছে। এক এক জনের আঙুল ফুলে আরাবল্লী হয়ে উঠেছে। এই শ্রেণির মানুষদের 'গ্লোরিফায়েড পিম্প' বললে অত্যুক্তি হবে না। তবে, পিম্পরাও নিজেদের মায়ের সওদা করে বলে মনে হয় না। সেই অর্থে, এরা পিম্পদের চেয়েও নিকৃষ্ট। এই ধরণের মানুষ (?) অবশ্য আগেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।
আমার বয়স হয়েছে। পেশীগুলোতে আর যৌবনের সেই তেজ, সেই দার্ঢ্য নেই। কিন্তু চোয়ালের হাড় আর দাঁতগুলো এখনও সতেজ আছে। তার ওপরে, এক কামড়ে কেমন করে গলার নলী ছিঁড়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে রটওয়েলারের কাছ থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। কাজেই, আমার মায়ের ধর্ষকদের আমি ছেড়ে দেবো না। আমার মতো করে লড়াই চালিয়ে যাবো।
কথাগুলো শুনে হয়তো মনে হবে আমি ইনসেন অথবা ভাট বকছি। জোর গলায় ঘোষণা করছি, হ্যাঁ, আমি ইনসেন! এক ধরণের গোদা শয়তানি সুপরিকল্পিতভাবে প্রয়োগ করে আমার মায়ের ভাষাকে প্রতিদিন মলেস্ট করা হচ্ছে, রেইপ করা হচ্ছে। এই ভাষায় কথা বলার অপরাধে জঘন্য অত্যাচার প্রতিদিন হয়ে চলেছে দরিদ্র, খেটে খাওয়া, পেটের তাগিদে অন্য রাজ্যে গিয়ে বসবাস করা মানুষগুলোর ওপরে। অথচ আমরা জানি, যে কোনো ভারতীয়, ভারতের যে কোনো রাজ্যে বসবাস করতে পারে। সেই অধিকার ভারতের সংবিধান তাকে দিয়েছে। এই সব দেখার পরেও স্যানিটি দেখানোটা, আমার মতে, হয় ইনস্যানিটি নয়তো কাওয়ার্ডিস।
হয়তো আমাকে এই কথা বলা হবে, হিংসা কোনো সমাধান নয়। তা সদাই ধ্বংসাত্মক। এর উত্তরে বলবো, এক একটা সময় এমন আসে যখন ধ্বংস প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে নতুন সৃষ্টির জমিন তৈরির জন্য।
আমি সেই সব মানুষদের দলে থাকি না যারা টি-শার্টের বুকে চে-র ছবি ঝুলিয়ে নিজেদের যুগপৎ 'বীরপুরুষ' আর 'আ্যভো গ্যাঁদ' ভেবে শ্লাঘা বোধ করে। আর জীবনচর্যায়, মাতৃস্তন্য ছেড়েই বান্ধবীর স্তনবৃন্ত, এবং অবশেষে, বৌয়ের স্তনবৃন্ত আশ্রয় করে দিনাতিপাত করে।
চে আমার টি-শার্টের বুকের ওপরে থাকেন না, থাকেন টি-শার্টের ভেতরে, বুকের গভীরে কারণ উনিও তথাকথিত 'সুস্থ' সমাজের নিরিখে 'ইনসেন' ছিলেন। আর এই ইনস্যানিটির মূল্যও চুকিয়েছিলেন নিদারুণ যন্ত্রণার কারেন্সিতে।
এসব কথা যাদের কাছে 'ভাট বকা' বলে মনে হচ্ছে তারা নিশ্চিতভাবে উইকেন্ডে মাতৃধর্ষণের পিপ শো-এর অগ্রিম টিকেট কেটে রাখে। আর মাসে মাসে ডিশের টাকা পে করে, সোফায় বসে, ছাপ্পান ইঞ্চি টিভির স্ক্রিনে, গোদি মিডিয়ায় দেখানো, মাতৃধর্ষণের স্বপক্ষে উচ্চারিত যুক্তি শুনে সায় দিয়ে শিং আর মাথা নাড়ে।
যদি মনে হয়, এই গেরিলা মনোভাব আসলে অপরিণামদর্শিতা, গোবলয়ের নেতারা এটাই চাইছে, এই জন্যই ওরা পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া বাধানোর চেষ্টা করছে যাতে এরকম কিছু হলেই এই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে দিতে পারে, তাহলে বলতে হয়, এরকম কিছু না হলেও ওরা আমার মা-কে ছেড়ে কথা বলবে না। ওদের উদ্দেশ্য, আমার ভাষা-মাকে ওদের বাঁদী বানানো, তাই আমার লক্ষ্য, ঐ বনেদি জারজগুলোর কন্ঠনালী।
যদি মনে হয়, ভোটবাক্সে এর সমুচিত জবাব দেওয়া যাবে তাহলে বলি, আমার মতে, সেই সম্ভাবনাও অতি ক্ষীণ। এই রাজ্যে জবাব দেওয়া গেলেও সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সেই আশা সুদূরপরাহত। অর্থাৎ , ভাষার নিরিখে আমার মায়ের ভাষাকে হেয় করা, তাকে ব্যাক ফুটে রাখার প্রয়াস চলতেই থাকবে।
এটাকে উস্কানিমূলক বিবৃতি মনে হলে আমার কিছু করার নেই। তবে, আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে বলতে পারি, আমি কাওকে উস্কাচ্ছি না। আমার বক্তব্যের সাথে একমত হতেও বলছি না। আমার মনোভাব ব্যক্ত করছি মাত্র। তবে কেউ যদি আমার বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হন তো তাঁকে নিবৃত্ত করার বিষয়ে আমি অসহায়। আমি, নেতা হিরো বা শহিদ, কোনোটাই হতে চাই না। কিন্তু মাতব্বরি আর গোদা শয়তানি দেখলে মাথা ঠিক রাখতে পারি না। প্রয়োজনে, সচেতনভাবে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন মগজকে ক্লোজ করে আবেগের কম্যান্ডে কাজ করি, পরিণতির কথা না ভেবেই।
পরিশেষে জানাই, আজকের সংবাদপত্রে একটা সংবাদ চোখে পড়ল। বনগাঁ পুরসভার অন্তর্ভুক্ত খয়রামারির একটা বাড়িতে ১৬ জন যুবক ভাড়া থাকে যারা উত্তর প্রদেশ থেকে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ওদের চলে যেতে বলেছেন। বাংলার বাইরে বাঙালিদের ওপরে অযথা অত্যাচারের প্রতিবাদ হিসেবেই এটা করা হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। ওনাদের আমার সেলাম জানাই।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।