এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মেঘ ব্যানার্জি ও নকল বৃষ্টিপাতের কথা 

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ৬১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • মেঘ ব্যানার্জি ও নকল বৃষ্টিপাতের কথা।

    বাংলায় একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে – ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রি। এটির গূঢ়ার্থ বা মর্মার্থ হলো – ১. অতিরিক্ত আড়ম্বরের আতিশয্যে আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হ‌ওয়া। ২. মূল খরচাপাতির অপেক্ষা জাঁকজমকের খরচ অনেকটাই বেশি হ‌ওয়া। এবং ৩. অনাবশ্যক আড়ম্বরের কারণে আসল উদ্দেশ্য পণ্ড হ‌ওয়া। দিল্লির বায়ুদূষণের বিষয়টি আজ আর গোপন কথা নয় , প্রকাশিত বাস্তবতা - নির্মম সত্য। এই মুহূর্তে দিল্লির তখত্ তাউসে যে রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রতিনিধি আসীন তিনি, দূষণের মাত্রা কমিয়ে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসার জন্য আর্টিফিসিয়াল রেন বা কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানোর কথা ঘোষণা করলেন। বৃষ্টি হলে, বাতাসে ভর করে ভেসে থাকা ধুলোবালিছাই বৃষ্টির জলের সঙ্গে নিচে নেমে আসে। বায়ুদূষণের মাত্রা খানিকটা কমে যায়।

    অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে,বহু অর্থ খরচ করে কৃত্রিম উপায়ে দিল্লির আকাশে বৃষ্টিপাত ঘটানোর চেষ্টা করা হলো, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা বিলকুল জলে গেল। অর্থাৎ সাত মণ তেল পুড়িলো বটে কিন্তু শ্রীমতী রাধা নাচিলেন না। প্রচারের হাটে বিস্তর শোরগোল উঠিয়ে ব্যাপারটা কেমন যেন মিইয়ে গেল। দিল্লির সরকারের তরফ থেকে এমন একটা ঘোষণা করার পর এই বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞেরা আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন যে, আবহিক পরিস্থিতি এই ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার উপযুক্ত নয়, কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত করেনি কেউ। অথচ আজ থেকে সাত দশকের‌ও বেশি সময় আগে ১৯৫২ সালে,এই কলকাতার বুকে বসে সম্পূর্ণ দেশীয় উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এক বঙ্গ সন্তান কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে ছিলেন নামমাত্র খরচে। পরিচিতি পেয়েছিলেন সম্পূর্ণ নতুন নামে। আজ কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানোর ক্ষেত্রে দিল্লি সরকারের প্রায় দুই কোটি টাকা বাজেটের প্রচেষ্টার ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে সাত দশকের‌ও আগে এই ক্ষেত্রে ভারতের এক সফল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার গৌরবজনক কাহিনি নিয়ে আলোচনা করবো।

    ডঃ সুধাংশু কুমার ব্যানার্জি – ভারতের এক কৃতী সন্তান যিনি ১৯৫২ সালে কলকাতায় সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টিপাত ঘটাতে। বৃষ্টিপাতের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো বাতাসে উপস্থিত জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বা আর্দ্রতা। এই জলীয়বাষ্প শীতলতার কারণে ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। দেশি বিদেশি কোম্পানির প্রচার সর্বস্বতাকে সরিয়ে রেখে সুধাংশু কুমার নিজের প্রচেষ্টায় স্থির কল্প ছিলেন। উপকরণ হিসেবে কাজে লাগিয়েছিলেন একটা হাইড্রোজেন বেলুন আর কয়েক কিলোগ্রাম ড্রাই আইস। প্রবলভাবে বিশ্বাসী ছিলেন বাঙালির চিরন্তন প্রয়োগ কুশলতা এবং উদ্ভাবনী শক্তির ওপর। এই রসায়নের ওপর ভরসা করেই বাজিমাত করলেন সুধাংশু কুমার ওরফে মেঘ ব্যানার্জি – ভারতে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানোর পথিকৃৎ।

    প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাওয়া এই মানুষটিই আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন দিল্লির প্রচেষ্টার ব্যর্থতার সিঁড়ি বেয়ে। ঢাল তরোয়াল হীন নিধিরাম সর্দার‌ও যে বাজি জিতে নিতে পারে ডঃ সুধাংশু কুমার ব্যানার্জি ওরফে মেঘ ব্যানার্জি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেটিরিওলজি ও জিও ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রধান আজথেকে ৭৩ বছর আগে সেটাই প্রমাণ করেছিলেন। কীভাবে সম্ভব হয়েছিল এমন চমকপ্রদ প্রচেষ্টা? একবার পাতা উল্টে সেই কাহিনির খোঁজ নেওয়া যাক্।

    ১৯৫০ এর দশকের গোড়ার দিকে গোটা দুনিয়ার কাছেই ক্লাউড সিডিং বা মেঘ বীজ বপনের বিষয়টি নিছক খাতায় কলমের তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়মাত্র ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টি নিয়ে সবেমাত্র কাজকর্ম শুরু করেছেন। বিমানে করে সিলভার আয়োডাইড কণিকা ছড়িয়ে সবে বড়ো মাপের জলবিন্দু গঠনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ঘরের ছেলে সুধাংশু কুমারের না ছিল বিমান পরিষেবা পাওয়ার সম্ভাবনা, না ছিল পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যয়ভার বহনের জন্য কোনো বিদেশি সাহায্য, না ছিল এমন একটা জটিল গবেষণার কাজে ব্যবহার করার মতো যথেষ্ট আধুনিক যন্ত্রপাতি। তাহলে ছিলটা কী? ছিল বিভাগের চিলেকোঠার ঘরের একটা ছয় ছোট্ট ল্যাবরেটরি, আবহাওয়া দফতরের কাছ থেকে ধার করে আনা একটা হাইড্রোজেন বেলুন এবং একেবারে ঘরোয়া প্রযুক্তিতে তৈরি সোডিয়াম আয়োডাইড কৃস্টাল।

    ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসের ১৭ তারিখটিকে ঠিক করা হয়েছিল এই পরীক্ষা চালানোর জন্য। দক্ষিণ কোলকাতার নির্বাচিত অঞ্চলের আকাশে ১০ কিলোগ্রাম ড্রাই আইস্ ও একটি ছোট সিলভার আয়োডাইড জেনারেটরকে সঙ্গে নিয়ে হাইড্রোজেন বেলুন উড়লো আকাশে। সবার‌ই মনে একটিমাত্র প্রশ্ন – পরীক্ষা সফল হবে তো? বেলুন আকাশে ওড়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই বালিগঞ্জ, গড়িয়াহাট এবং যাদবপুরের আকাশ ভেঙ্গে নামলো অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ডঃ সুধাংশু কুমারের সহযোগীদের সাথে সাথে ঐ অঞ্চলের মানুষজন উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রায় নাচানাচি শুরু করে দিল। আর করবে নাই বা কেন? এ যে স্বদেশীয় কর্ম তৎপরতা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার জয়! জয় নিরলস পরিশ্রম আর নিমগ্ন গবেষণার জয়।

    সেদিনের সেই গৌরবময় ইতিহাস আমরা সবাই বেমালুম ভুলে গেছি। আজ দিল্লির বিফলতা আবার সেই হারানো স্মৃতি পথে হাঁটবার সুযোগ করে দিল। এটাও কি কম পাওয়া!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সৌমেন রায় | 2409:40e1:1069:9a9e:8000::***:*** | ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:১৭736269
  • একেবারে নূতন তথ্য জানলাম। লেখককে ধন্যবাদ। বেশ কিছু বাঙালি অতীতে অসাধ্য সাধন করেছেন । তাদের সকলকে শ্রদ্ধা। একইসঙ্গে বোধহয় ক্ষমাও চাওয়া উচিত নিম্নগতির জন্য।
  • Somnath mukhopadhyay | ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:১৪736271
  • ধন্যবাদ সৌমেন বাবু। দুঃখ করবেন না। কোন্ একজন গুণী মানুষ বলেছেন -- বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি। এই মন্তব্য অবশ্য কমবেশি সকলের পক্ষেই প্রযোজ্য। বরণীয়দের কথা স্মরণ করলেও আত্মশুদ্ধি হয়। তাই মনে করে আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানালাম।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন