কবিগান , শ্যামাসংগীত আর কীর্তন , এঁদের তো ঠিক লোকসঙ্গীত বলা চলে না , তাই না?
আন্তরিক ধন্যবাদ, কৌতুহলী।
তবে কবিগানের উৎপত্তি লোকসমাজের অভ্যন্তর থেকেই। অনেকটা আজকের ডিবেটের মতো। প্রেম - সমাজ, ভক্ত -নাস্তিক এসব নিয়ে গান চলে, একপক্ষ হেরে গেলে জোটক দেয়। 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' র "তোমারই জয় হলো ভোলা" অবশ্যই শুনেছেন। আর শ্যামাসংগীত হলো মা কালীর প্রতি উদ্দিষ্ট সংগীত যেটা একটা খুব turbulent সময়ের অমৃতস্বরূপ। রামপ্রসাদ সেন বা কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের কালে তখন বাংলার ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা। বৌদ্ধতন্ত্রের শেষপর্বে তান্ত্রিক চিন্তন বৃদ্ধি পেয়েছে। বামাচার, ভন্ড সাধক ও কুটিল ধনবানরা সমাজজীবনকে অস্থির করে তুলছে। এইসময়ে যে শাক্ত সাধনার সুরে শান্তির খোঁজ পাওয়া যেতে পারে, সেটা এনারাই বোঝালেন। শোনা যায়, নবাব সিরাজদ্দৌল্লা নাকি একদা রামপ্রসাদের গান শুনেছিলেন। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জীবনে হয়তো সিরাজের কাছে শ্রেষ্ঠ রাত্রি ছিলো ওটাই।
কীর্তনের অনুষঙ্গ রাধাকৃষ্ণ হলেও তার সুর লোকসমাজে আছে আর উপাদানও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে। তবে কঠিন অবস্থার বাংলায় নগরসংকীর্তনের সুরেতালে যিনি নবজীবন এনে দিলেন, তিনি তো মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য। সহস্র জনতা মিশে গিয়ে একটি দুঃসাহসী নতুন কথা আকাশে - বাতাসে ধ্বনিত হয়ে উঠলো,
"চন্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তিপরায়ণ।"
চন্ডাল আর কবে এমন সম্মান পেয়েছে সেইযুগের বঙ্গে? রাধাভাবে সখার আরাধনা করা এই প্রথম বিপ্লবী মানবধর্মের সেরা মন্ত্রটি শিখিয়ে দিলেন, "তৃণাদপি সুনীচেন তরুরাপি সহিষ্ণুনাঃ" ভাবুন তো, কতোবছর পরেও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো কবি লিখছেন
"বাঙালীর হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া।"
তাই ওনার জীবনীবৃত্তান্ত বা গৌরচন্দ্রিকা গাওয়াটা কীর্তনের অনুষঙ্গ হয়ে পড়ে একটা সময় থেকে। বৃন্দাবন দাস বা লোচন দাস ছাড়া শ্রেষ্ঠ চৈতন্য-জীবনীকার হলেন কৃষ্ণদাস কবিরাজ। মনে পড়ে এই প্রশ্নটার কথা, "সব গৌরচন্দ্রিকাই কীর্তন কিন্তু সব কীর্তন গৌরচন্দ্রিকা নয়-- বিশ্লেষণ করো।" যাইহোক, এর অজস্র ভাগ আছে। প্রভাতী, লীলাকীর্তন, বাল্যলীলা গান, রাসলীলা বা ধরুন প্রেমের অবস্থাগুলো যেমন পূর্বরাগ, বয়ঃসন্ধি, মিলন, মাথুর, ভাবসম্মিলন এগুলোকে উপলক্ষ্য করেও।