এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • চপলা 

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ২১৫ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  •  
     
    চপলা
    বৌদি ও বৌদি! বৌদি! বলি কাল রেতে বিষ্টি হয়েছে বলে কি নাকে সষ্যের তেল দে সকলে ঘুম্মে পড়িছো? বলিহারি জেবন তোমাদের।খাচ্ছো দাচ্ছো আর ঘুমুচ্ছো। আম্মো তো রাত তিনটেয় ঘর ছেড়ে বেইরে আসি হররোজ। এতোগুলো বাড়ির কাজ সারতে সারতে দুকুর গ‌ইরে যায়। আবার সেই ভিড় ঠেলে ঘরে ফেরা। টেরেনে টেরেনেই জেবনের অধ্যেক সময় কেটি গেল। কি আর করবো বলো! জম্মের সময় তোমাদের ওই বিধাতা না কি বলে গো, কপালে যে ছাপটা দে দেছেন, তারে খণ্ডাবো এমন সাধ্যি কি আর এই চপলা দাসীর আছে? তিনি যা যা নিখে দেছেন তা সবটাই ভুগতে হবে এই জেবনে, ফাঁকি দিয়ে সটকে পড়ার কোনো উপায় নাই। এই যে আমি তোমার এখানে ঠিকে ঝি এর কাজ কচ্ছি তাও ওই
    তিনিই নাকি ছাপ মেরে ঠিক করে দেছেন।আমার মা বলতো – চপলা,গত জম্মের জোয়াল এখন এই জম্মেও টানতি হবে। এ হলো এক নম্বা চক্কোরের খেলা। যতোদিন বেঁচে ছিল মা বুড়ি, ততদিন ঐ জোয়াল টেনে গেছে সমানে। আমার বাপটা তো কোথায় ভেগে পড়লো! পাড়া পেতিবেশিরা অবশ্য বলে তারে মেইরে গুম ক‌‌ইরে দেছিলো ওই বিষ্টু মোড়লের নোকজন। বিষ্টুর কি একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাপ রুখে দাঁড়ায়ে ছিলো। ব্যস, অমনি খতম। সেই থেকে মা আমারে সামলায়ে রেখিছে, বড়ো করিছে। আমারে বয়ে যেতি দেয় নাই। তেমনটি হলে মোরে কোথায় পেতে ?
     
    এ্যাই দেখো দিখি, সেই থিকে আম্মো একাই কেটলিতে জল ফোটার মতো নাগাড়ে বকবক করে চলেছি। দাও দেখিনি আমার সকালের দানাপানি। খেইয়ে কাজে লেগে পড়ি। আজ ওই লাহিড়ী বাড়িতে কাজে যেতি হবে নি। তেনারা সব কোথায় ঘুরতে গেছেন দিন সাতেকের জন্যি। তাই একটু হাপ ছেড়ে গপ্পো করছি। ন‌ইলে তো এতোক্ষণে আরও দুই বাড়িতে ঢু মারার পালা শেষ হয়ি যেতো। লাহিড়ী বাড়িতে আমার বেজায় দাপট! তাই বলে কি আম্মো কাজিয়া করে বেড়াই নাকি? আসলে ও বাড়ির বৌদি আমার কথাকে মান্য করে, বলে চপলা দিদি আমার তো বড়ো দিদি নেই, তুমিই হলে আমার দিদি। এই হলো তোমার কাজ, সুবিধা মতো গুছিয়ে করে ফেলবে। সমপক্কটারে যদি মাইনষের সম্পক্ক বলি মনে করো তাহলি সেখানে টানাপোড়েনের বালাই থাকেনা। আমরা তারে কেটে কুটে জট পাকয়ে ফেলি,তাই সব্বো সময় তারে নে খিটিমিটি লেগেই থাকে।
     
    ওই বৌদির হয়ে দুটি ভালো কথা ক‌ইছি দেখে তুমি আবার আমার উপর রাগ করতিছো না তো? রাগ হলি পষ্ট করি বলবে, আম্মো আমার রেকডের পিন বদলায়ে দেবো। পাচ বাড়ি কাজ করি খেতি হয়।পাচ রকমের মাইনষের সঙ্গে নিত্য ওঠাবসা।একটু আধটু এদিক ওদিক হতিই পারে। সবাই যদি এক ছাঁচের পুতুল হয় তাহলে মজা কুথায়? এতো রকমারি মাইনষের সঙ্গে নিত্য রোজ কাটাই বলে আমি মনের দিক থে একদম নিম্মল। মা গঙ্গারে দেখো! কতরকমের জল আসি তাঁর শরীলে মেশে, কিন্তু মা গঙ্গারে কেউ ময়লা করতি পারেনা। গঙ্গার জল সদা পবিত্ত‌ই থাকে। এই চপলা দাসীও যে তেমনটাই থাকতি চায়, কিন্তু পারে ক‌ই?
     
    আজ আম্মোরে বোধহয় ভূতে ধরিছে। কত্তো ভালো ভালো কথা মুখ ফখসে বেরোয়ে যাতিছে অনগ্গল। এখন তো কথা ক‌ওয়ার লোক মেলা ভার। যে বাড়িতেই যাই সেখানেই সব ফাঁকা সুনশান চেহারা। দেবা আর দেবী, না হয় টোনা আর টুনির সংসার। দেখি মনে হয় সব‌ই তো আছে, কেমন ভরপুর ব্যবস্থা অথচ খুঁটিয়ে দেখতে গেলে দেখা যাবে বেবাক ফাঁকা।
    ঐ যে গোলাপি বাড়ির মাসিমা আর মেসোমশাই – দুজনেই কেমন নিব্বাক হয়ে গেছে। দুই ছেলে আর ছেলে ব‌উয়ের তুখোড় কাজিয়া! ছেলেরা তো তাদের পরিবার নে দূরে কোথায় থাকে আর থেকে থেকে হুমকি ছাড়ে – ও বাড়ি বেচে দাও। দুজনেই পাল্টে পাল্টে আমাদের দু ভাইয়ের কাছে থাকবে। মাসিমা তো কেবল‌ই চোখের জল ফেলে। এতোকাল কত্তা গিন্নি একসাথে থেকে এখন বাটোয়ারা স‌ইবে ? এরা সব শিক্ষিত বলে গব্বো করে? এমন শিক্ষার কাঁথায় আগুন।
    না না আম্মো রেগে যাইনিগো বৌদি,রেগে যাইনি।
     
    আসলে তোমাদের সঙ্গে থাকতি থাকতি কখন যে তোমাদের সুখ দুখের ভাগীদার হয়ে গেছি তা টের পাইনি একদম। আমিতো আগে মানুষ, তাপ্পর আমার অন্য পরিচয়। কি বলো বৌদি! আমি ঠিক বলিছি না? ও মা! এযে আটটা বাজলো! ওই বুড়ো বাবা নিঘ্ঘাত এক পেয়ালা চায়ের জন্য হা পিত্যিশ করে বসে আছে? আমি দু পেয়ালা চা বানায়ে ফেলাক্সে ভরে রাখি।সময় মতো ঠিক খেয়ে নেবে। চায়ের বড্ডো নেশা।দিদিমা চলি গিয়ে দাদুরে একেবারে ভেঙি ফেলিছে। সেই দুকুরে ওই হোম ডেলিভারির ছেলেটা এসে খাবার দে যাবে। তাই খাবে। আসিগো ব‌উদি। কাল কিন্তু এতো কথা ক‌ইবার সময় মিলবে না। কাল তাড়া থাকবে।
     
     
    সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
    আগস্ট ১৩.২০২৬

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পৌলমী | ১৩ আগস্ট ২০২৬ ২২:১৩742231
  • নাটককার চপলার মুখ দিয়ে এ সময়ের সমাজ সম্পর্কে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলিয়ে নিয়েছেন। নাটকের লাহিড়ী বৌদি, বুড়ো বাবা বা গোলাপি বাড়ির মাসিমা মেসোমশাই খুব পরিচিত চরিত্র এই সময়ে। নাটককার আমাদের বেশ কয়েকটি মনোড্রামা উপহার দিয়েছেন।
  • Bannhi Bhattacharjee | ১৩ আগস্ট ২০২৬ ২৩:১৬742232
  • চোখের সামনে চপলাকে যেন কথা বলতে দেখলাম মনে হলো...অসাধারণ!
  • Somnath mukhopadhyay | ১৩ আগস্ট ২০২৬ ২৩:২৬742233
  • @ পৌলমী
    সময়ের কথা বলবো বলেই যে নাটকের মধ্য দিয়ে সবকিছু তুলে ধরার চেষ্টা। চপলারা আমাদের অত্যন্ত কাছের এবং কাজের মানুষ। চপলাদের চেনা চোখে সবটাই খুব স্পষ্ট করে ধরা পড়ে।
     
    @ বহ্নি
    চপলার কথা ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম। অভিনয় হয়ে যাক্।
  • sarmistha lahiri | ১৪ আগস্ট ২০২৬ ০৮:৩৯742243
  • লাহিড়ী বাড়ির বৌদির ভাগ্য ভালো।এই রকম অতি সরব এক সহায়িকা পেয়েছেন।তা না হলে এখন মানুষের এই একাকী ত্বের জীবন যেন আর কাটতে চায়না। এমন সুখ দুঃখের ভাগীদার পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।
  • Somnath mukhopadhyay | ১৪ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৪০742247
  • ধন্যবাদ জানাই মতামত জানানোর জন্য। নিঃসঙ্গতার শিকার হতে হচ্ছে এই সময়ের অনেককেই। কর্মসহায়িকার উপস্থিতি এক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা বিরতি নিয়ে আসে,বিশেষ করে চপলার মতো কথা বলতে ভালোবাসে এমন কেউ হলে সময়টা বেশ কেটে যায়। ভালো থাকবেন সবাই মিলে।
  • ritabrata gupta | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ১৭:৩১742315
  • মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা! অসাধারণ লাগলো . এ এক জীবনদর্পন . আরো লিখুন এরকম লেখা . পড়েই অন্যরকম আনন্দ !
  • #+: | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ২২:৩৪742322
  • আমাদের বাড়ির কাজের মাসিকে খুঁজে পেলাম এই চপলা দিদির ভেতরে। এদের কথা তুলে ধরে খুব ভালো কাজ করলেন।
  • Somnath mukhopadhyay | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৫৮742323
  • ঋতব্রত এবং #+:(?)
    দুজনকেই অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই মতামত জানানোর জন্য।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন