এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  আলোচনা   সমাজ

  • বর্তমান বাংলাদেশ !!!

    দীপ
    আলোচনা | সমাজ | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৩৪ বার পঠিত
  • বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা করলেন ইমতিয়াজ মাহমুদ।
    স্বাভাবিকভাবেই মহাবিপ্লবীরা এখন মৌনব্রত অবলম্বন করবেন!
    মেরুদণ্ডহীন প্রাণীদের কাছ থেকে এই মৌনতা প্রত্যাশিত।
     
    -------------------------------------------------------------------
     
    বন্দী অবস্থায় প্রাণ হারালেন আরেকজন সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন। তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের একটি আসন থেকে পাঁচবার সংসদসদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং শেষ দিকে আওয়ামী লীগের সরকারে পানিসম্পদ মন্ত্রী ছিলেন। ২৪ সনের ৫ই আগস্টের পর তাকে ঐসব ভুয়া হত্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়। পঁচাশি ছিয়াশি বছরের বুড়ো একজন মানুষ, তাঁকে দেশের কোন আদালত জামিন দেয়নি। 
     
    বয়স্ক মানুষ, শারীরিক অসুস্থতা তো থাকবেই, কারাগারে কি চিকিৎসা হয়েছে আমরা অনুমান করতে পারি। কারাগারেই মারা গেছেন। সকাল নয়টার দিকে তাঁকে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা বলে দেন যে তিনি আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। যেসব আদালতে তাঁর জামিনের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, আমি সেরকম কোন আদালতের জজ হলে আমি আর শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম না। 
     
    না, মৃত্যু তো অনিবার্য- জগত অনিত্য; কেবল মৃত্যুই নিত্য। তথাপি আমরা বাঁচতে চাই, চিকিৎসা নিই, হাসপাতালে যাই- জীবন প্রলম্বিত করার চেষ্টা করি। সময় মতো জামিনে মুক্ত থাকলে কি তিনি বেঁচে থাকতেন? জানিনা। আমরা কেউ সেটা জানিনা। কিন্তু তখন অন্তত এই প্রশ্নটা থাকতো না মনের কোনে, লোকপ্রিয় এই বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতাকে কি কারাগারে আটকে রেখে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হলো? এখন প্রশ্নটা থেকেই যাবে। 
     
    একজন লোক যখন পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তখন তাঁর সংসদীয় আসনে তাঁর লোকপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকার কথা নয়। জেতার দরকার নাই, যদি কোন ব্যক্তি পাঁচবার সেকেন্ড থার্ডও হয় তবুও তাঁকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ নেতা মানি। রমেশ সেন জিতেছিলেন ৯৬এর নির্বাচনে, ২০০৮এর নির্বাচনে এবং এর পরবর্তী তিনটি ইলেকশনে। জাতি হিসাবে তাঁর প্রতি আমরা সুবিচার করতে পারিনি। এটা তাঁর প্রাপ্য ছিল না। 
     
    এর আগেও কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতা মৃত্যুবরণ করেছেন জেলে। এইসবের জন্যে কি কোন মূল্য আমাদের দিতে হবে না?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:০৩746744
  •  মৃতদেহ ও রাজনীতি: শোককে যেখানে অপব্যবহার করা হয় না

     প্রস্তাবনা: মৃত্যু ও রাজনীতির জটিল সমীকরণ

    মানব সভ্যতার শুরু থেকেই মৃত্যু ও রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মৃত্যু যেমন জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা, তেমনি রাজনীতি হলো জীবনের চলমান সংগঠন প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন এই দুইয়ের ছেদবিন্দুতে মৃতদেহকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা সমাজ, নৈতিকতা ও মানবিকতার জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা বারবার দেখেছি কীভাবে একটি মৃতদেহ শুধু একটি প্রাণহীন দেহ নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতীক, প্রতিবাদের হাতিয়ার কিংবা ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়। কিন্তু কেন মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়? কেন প্রতিটি মৃত্যুর ন্যায্য বিচার ও তা থেকে গঠনমূলক পরিবর্তনের দাবি উঠতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে মৃত্যুর অর্থ, শোকের রাজনীতি এবং ন্যায়বিচারের সামাজিক চাহিদা নিয়ে।

     মৃত্যুর তাৎপর্য: ব্যক্তিগত শোক থেকে সামাজিক প্রতীক

    মৃত্যু প্রথমত এবং সর্বাগ্রে একটি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ট্র্যাজেডি। প্রতিটি মানুষের জীবন অনন্য, প্রতিটি মৃত্যুর পর শোকের পালা ব্যক্তিক ও অনন্য। কিন্তু মানব সমাজে মৃত্যু কখনো শুধু ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। বিশেষ করে যখন মৃত্যুটি হয় অস্বাভাবিক, হিংসাত্মক বা রহস্যজনক, তখন তা সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনায় পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিভিন্ন গণআন্দোলন—বাংলাদেশের ইতিহাসে মৃতদেহ রাজনৈতিক প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে বারবার।

    ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের মৃত্যু এবং দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়, তারা আমাদের রাষ্ট্রীয় চেতনার ভিত্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুগুলোকে কীভাবে স্মরণ করা হচ্ছে? সেগুলোকে কি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের চেতনা জাগানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি ক্ষমতা দখল ও ধরে রাখার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?

     মৃতদেহের রাজনীতিকরণ: বিশ্ব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

    বিশ্বজুড়ে মৃতদেহের রাজনৈতিক ব্যবহার নতুন নয়। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে 'গায়েব' করা মানুষের দেহ, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামে হত্যাকৃত কর্মীদের শবদেহ, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহতদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া—সবই রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন কিংবা বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের মৃতদেহ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।

    কিন্তু মৃতদেহের রাজনীতিকরণের বিপদ কোথায়? প্রথমত, এটি শোক ও সমবেদনার প্রকৃতিগত আবেগকে বিকৃত করে। পরিবারের ব্যক্তিগত শোককে যখন রাজনৈতিক মঞ্চে উপস্থাপন করা হয়, তখন শোকের স্বাভাবিক প্রকাশ ব্যাহত হয়। দ্বিতীয়ত, মৃতদেহকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হলে ব্যক্তির নিজস্ব পরিচয়, জীবনদর্শন ও ইচ্ছা উপেক্ষিত হয়। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায় থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়। একটি মৃত্যু কীভাবে ঘটলো, কীভাবে ভবিষ্যতে এমন মৃত্যু রোধ করা যায়—সেসব আলোচনা গৌণ হয়ে যায় যখন মৃতদেহ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান ও প্রতিপক্ষকে আক্রমণের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

     ন্যায়বিচারের দাবি: প্রতিটি মৃত্যুর বিচার চায়

    "প্রতিটি মৃত্যু বিচার চায়"—এই কথার গভীর অর্থ হলো প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেভাবে গেঁড়ে বসেছে, তাতে অনেক সময় মৃত্যুর বিচার না পেয়ে মানুষ মৃতদেহকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।  গুম, পুলিশের গুলিতে মৃত্যু, জেলখানায় অস্বাভাবিক মৃত্যু—এসব ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব পরিবারকে রাজপথে নামতে বাধ্য করে।

    ন্যায়বিচারের এই দাবি কিন্তু রাজনীতিকরণ নয়, বরং একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। যখন রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন ব্যক্তির শোক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৯৬ সালের নূর হোসেনের মৃত্যু থেকে ২০১৮ সালের আবরার ফাহাদের মৃত্যু—বাংলাদেশের ইতিহাসে অসংখ্য মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থাকেনি, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

     পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা: মৃত্যু থেকে উদ্ভূত গতিশীলতা

    প্রতিটি সমাজেই কিছু মৃত্যু পরিবর্তনের বীজ বপন করে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের শহীদরা আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা এনে দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের শহীদরা একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজকের দিনে মৃত্যুগুলো কী ধরনের পরিবর্তন আনছে? আমরা কী শিখছি এই মৃত্যুগুলো থেকে?

    মৃতদেহের রাজনীতিকরণ যখন ঘটে, তখন পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বিকৃত হয়ে যায়। পরিবর্তনের দাবি যখন দলীয় স্বার্থে ব্যবহার হয়, তখন তার গতিপথ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসে যখন একটি মৃত্যুকে সামাজিক সংলাপের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, যখন তদন্তে স্বচ্ছতা আনা হয়, যখন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

     শোকের রাজনীতি বনাম রাজনীতির শোক

    এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে—"শোকের রাজনীতি" (Politics of Mourning) এবং "রাজনীতির শোক" (Mourning as Politics)-এর মধ্যে। শোকের রাজনীতি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে শোককে সামাজিক পরিবর্তনের বাহন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, একে কেন্দ্র করে সংহতি গড়ে তোলা হয়। অন্যদিকে, রাজনীতির শোক হলো শোককে দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করা, একে প্রতিপক্ষকে দোষারোপের হাতিয়ার বানানো।

    বাংলাদেশে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিতীয়টির প্রাদুর্ভাব দেখি। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের কর্মী নিহত হলে তা সর্বোচ্চ প্রচার করে, কিন্তু প্রতিপক্ষের পক্ষে নিহত হলে নিশ্চুপ থাকে কিংবা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। মৃত্যুর এই নির্বাচনী শোক সমাজকে বিভাজিত করে, সংহত করে না।

     মৃতদেহ ও মিডিয়া: সংবেদনশীলতা বনাম সেনসেশনালিজম

    আধুনিক যুগে মৃতদেহের রাজনীতিকরণে মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো মৃতদেহের ছবি বারবার দেখিয়ে দর্শক আকর্ষণ করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মৃতদেহের ছবি ভাইরাল হয়ে যায় মিনিটের মধ্যে। এই সেনসেশনালিজম মৃতদেহের প্রতি শ্রদ্ধাবোধকে ধ্বংস করে। পরিবারের শোককে গণসম্পত্তিতে পরিণত করে।

    মিডিয়ার দায়িত্ব হওয়া উচিত মৃত্যুর খবর দেওয়ার সময় সংবেদনশীলতা বজায় রাখা, তথ্য আদান-প্রদানে ভারসাম্য রাখা জন্য চাপ তৈরি করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তারা সংবেদনশীলতার চেয়ে সেনসেশনালিজমকে প্রাধান্য দেয়, যা মৃতদেহের রাজনীতিকরণকে উৎসাহিত করে।

     আইন-কানুন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো

    বাংলাদেশে মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতিকরণ রোধ করতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। তৃতীয়ত, মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

    আইনী কাঠামোয় মৃতদেহের প্রতি শ্রদ্ধা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সীমিত। পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা—এসব ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে মৃতদেহ নিয়ে রাজপথে আসার প্রয়োজনীয়তা কমবে।

     সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি: মৃত্যু ও জীবনচক্র

    বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে মৃত্যুকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব ধর্মেই মৃত্যুপরবর্তী জীবন ও পুনরুত্থানের ধারণা রয়েছে। মৃতদেহের প্রতি শ্রদ্ধা সকল ধর্ম ও সংস্কৃতির সাধারণ শিক্ষা। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত এই সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ণ করে।

    মৃতদেহের রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলোকে জাগ্রত করতে হবে। মৃত্যুকে জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে মেনে নেওয়া, মৃতদেহের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, শোক পালনে সহমর্মিতা প্রকাশ—এই মূল্যবোধগুলো রাজনীতিকরণের ঊর্ধ্বে উঠতে সহায়তা করবে।

     যুবসমাজ ও মৃতদেহের রাজনীতি

    বাংলাদেশের যুবসমাজের একটি বড় অংশ আজ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মৃতদেহের ছবি ও ভিডিও দেখতে অভ্যস্ত। এই প্রজন্মের জন্য মৃত্যু ও মৃতদেহ ভিন্ন অর্থ বহন করে। একদিকে, তারা মৃতদেহের রাজনীতিকরণের শিকার হয়, অন্যদিকে তারা নিজেরাও কখনো কখনো অজান্তেই এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।

    যুবসমাজকে সচেতন করতে হবে যে মৃতদেহের ছবি শেয়ার করা, মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করা—এগুলো শুধু অশোভনই নয়, মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর আলোচনা, মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা, মিডিয়া সাক্ষরতা—এসবের মাধ্যমে যুবসমাজকে মৃতদেহের রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে সচেতন করা সম্ভব।

     নারীর দেহ ও রাজনীতি: একটি ভিন্ন মাত্রা

    মৃত নারীর দেহ নিয়ে রাজনীতিকরণ একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করে। বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী হত্যার শিকারদের দেহ কখনো কখনো এতটাই রাজনীতিকরণ করা হয় যে, নারীর ব্যক্তিত্ব, ইচ্ছা ও স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়। নারীর দেহকে শুধু প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করলে তার জীবনের অন্যান্য দিক, তার সংগ্রাম, তার স্বপ্ন—সবই ঢাকা পড়ে যায়।

    নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মৃত নারীর দেহের রাজনীতিকরণ নারীর শরীরের উপর পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণেরই বহিঃপ্রকাশ। নারীর দেহ মৃত্যুর পরও সমাজ ও রাজনীতির মালিকানায় থাকে। এই চক্র ভাঙতে হলে মৃত্যু নারীর মর্যাদা ও স্বায়ত্ত্বশাসনকে সম্মান করতে হবে।

     প্রতিকার ও পথনির্দেশ

    মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতি না করার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:

    ১. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: প্রতিটি মৃত্যুর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে।

    ২. মিডিয়া নীতিমালা: মৃতদেহের ছবি প্রচারে সংবেদনশীলতা বজায় রাখার জন্য মিডিয়া নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

    ৩. সামাজিক সচেতনতা: জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর সামাজিক আলোচনা প্রসারিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

    ৪. রাজনৈতিক সংস্কৃতি: রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গীকার করতে হবে যে তারা মৃতদেহ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে না।

    ৫. আইনী সুরক্ষা: মৃতদেহের প্রতি অসম্মান ও অপব্যবহার রোধে আইনী কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।

    ৬. স্মৃতি সংরক্ষণের বিকল্প পথ: মৃত্যুকে স্মরণ করার জন্য রাজনৈতিক মঞ্চের বাইরে সাংস্কৃতিক, শৈল্পিক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ নিতে হবে।

     উপসংহার: মৃত্যু থেকে উদ্ভূত জীবন

    মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু মৃতদেহের অপব্যবহার অনিবার্য নয়। একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব হলো মৃত্যুকে মর্যাদার সাথে স্মরণ করা, মৃতদেহকে সম্মান করা এবং জীবিতদের জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব গড়ে তোলা। মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতি করা মানে শোককে অপব্যবহার করা, মানবিকতাকে ক্ষুণ্ণ করা এবং সামাজিক বিভাজনকে গভীর করা।

    প্রতিটি মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে বিচার চায়, পরিবর্তন কামনা করে। কিন্তু এই বিচার ও পরিবর্তন আসতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক পথে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটার চেষ্টায় নয়। বাংলাদেশের জন্য এটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের ইতিহাসে মৃত্যু ও আত্মত্যাগের এত গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় কম নেই। আমরা যদি সেই আত্মত্যাগকে সঠিকভাবে স্মরণ করতে চাই, যদি শহীদদের রক্তকে সার্থক করতে চাই, তবে মৃতদেহকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর প্রথা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে।

    মৃত্যু শেষ কথা নয়, বরং নতুন ভাবনার শুরু। প্রতিটি মৃত্যু আমাদের জীবনের মূল্য বুঝতে শেখায়, সমাজের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয়। মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতি না করে যদি আমরা প্রতিটি মৃত্যু থেকে শিক্ষা নিই, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে উদ্যোগী হই, এবং মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখি, তবেই আমরা একটি সত্যিকারের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
     
  • albert banerjee | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:১৯746745
  • এটি একটি আবেগপূর্ণ পোস্ট , কিন্তু কঠিন দৃষ্টিতে এটি অসম্পূর্ণ, একপক্ষীয় এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এটি সংশোধন করে আরও দায়িত্বশীল করে তুলুন।
    নিরপেক্ষতা যোগ করুন: সূত্রসহ প্রমাণ দিন, অন্যথায় দাবিগুলি অস্বীকার করুন। একপক্ষীয়তা এড়িয়ে সকল পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করুন
    দীপ উত্তর দেবেন? না "মেরুদণ্ডহীন প্রাণীদের কাছ থেকে  মৌনতা প্রত্যাশিত"
  • albert banerjee | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:২৩746746
  •  সংবেদনশীলতা?  না  সেনসেশনালিজম? noনা "মেরুদণ্ডহীন প্রাণীদের কাছ থেকে  মৌনতা প্রত্যাশিত"
  • দীপ | 2402:3a80:197f:acf7:878:5634:1232:***:*** | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৩২746747
  • শ্রদ্ধেয় ইমতিয়াজ মাহমুদের প্রতিবেদনে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে।
    এর অধিক বাক্যব্যয় নিষ্প্রয়োজন।
  • albert banerjee | ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৩746750
  • পাস্ কাটানো জবাব।  সূত্রসহ প্রমাণ দিন, অন্যথায় দাবিগুলি অস্বীকার করুন।"মেরুদণ্ডহীন প্রাণীদের কাছ থেকে  মৌনতা প্রত্যাশিত"no
  • albert banerjee | ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৫746753
  • সংবেদনশীলতা?  না  সেনসেশনালিজম? 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন