এসআইআর প্রক্রিয়ার পরোক্ষ প্রভাব । [যা মূল উদ্দেশ্য]
প্রাচীন কাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিন্যাসে "গো বলয়" বা গোষ্ঠীগত ক্ষেত্রগুলির একটি জটিল ও প্রভাবশালী ভূমিকা রয়েছে। এই বলয়গুলি ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতিসত্তা ও আঞ্চলিক পরিচয়ের উপর ভিত্তি গড়ে উঠেছে। এগুলির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা হল বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা এবং মানুষের প্রতি একটি গভীর-মূলক বিদ্বেষ। এই বিদ্বেষ শুধু সামাজিক বা সাংস্কৃতিক স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতও বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে গৃহীত "স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন" (বিশেষ তীব্র সংশোধনী) প্রক্রিয়াটি, এই বিদ্বেষের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও ইচ্ছাকৃত বহিঃপ্রকাশ বলে বিবেচিত হতে পারে। এই প্রবন্ধে, ঐতিহাসিক পটভূমি বিশ্লেষণ করে, বর্তমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাঙালিদের উপর কীভাবে হেনস্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য চালানো হচ্ছে, তা একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট—প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাঙালি বিদ্বেষের বীজ
বাঙালি বিদ্বেষের শিকড় প্রোথিত আছে প্রাচীন আর্য-অনার্য সংঘাত, ভাষাগত বিভাজন এবং ভারতীয় উপমহাদেশের কেন্দ্রীয় শক্তিসমূহের সাথে বাংলার আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের দ্বন্দ্বে। সংস্কৃত সাহিত্যে "বঙ্গ" ও "গৌড়" অঞ্চলের মানুষদের প্রায়শই "ম্লেচ্ছ" বা বর্বর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মনুস্মৃতিতে পূর্বাঞ্চলীয়দের (প্রাচ্য) নিম্ন মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। মধ্যযুগে দিল্লি সালতানাতের সময় বাংলা একটি স্বাধীন সুলতানাত হিসেবে গড়ে উঠলে কেন্দ্রীয় শক্তির সাথে এর বিরোধ তীব্র হয়। এ সময় বাংলার স্বাধীনতাকামী সুলতানদের প্রতি "বিদ্রোহী" ও "অবাধ্য" আখ্যা দেওয়া হত। মোগল আমলে বাংলা বিজয় একটি রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান ছিল; বাংলার মানুষদের প্রতি মোগল অভিজাতদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক ও শোষণমূলক। ব্রিটিশ পূর্ববর্তী যুগে উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি বাংলাকে একটি পৃথক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে স্বীকার করতে চায়নি, যা বাঙালির প্রতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবজ্ঞার জন্ম দেয়।
ঔপনিবেশিক যুগ—বিদ্বেষের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও ভাষার লড়াই
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এই বিদ্বেষ নতুন মাত্রা পায়। বাংলাকে "ভারতের আয়রল্যান্ড" বলা হত, যেখানে বিপ্লবী চেতনা প্রবল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং পরবর্তী স্বদেশী আন্দোলন বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শক্তিশালী করে, কিন্তু একই সাথে এটি কেন্দ্রীয় ভারতীয় নেতৃত্ব এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যে বাংলা-বিরোধী মনোভাবকেও তীব্র করে। হিন্দি-উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব ও প্রচেষ্টা, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত হিসেবে দেখা দেয়। সর্বোপরি, ১৯৪৭ সালের বিভাজন বাংলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অখণ্ডতার উপর এক মর্মান্তিক আঘাত ছিল। পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের শিকার হয়, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। পশ্চিমবঙ্গও ভারতীয় ইউনিয়নে প্রান্তিক হওয়ার অভিযোগ করে আসছে। ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোয় বাঙালিকে "অবিশ্বাসী", "অস্থির" ও "রাষ্ট্রবিরোধী" হিসেবে চিহ্নিত করার একটি প্রবণতা গড়ে উঠে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে গো বলয়ের রাজনীতি ও বাংলা বিরোধিতা
ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে গো বলয়ের রাজনীতি (Caste and Identity Politics) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান ধারার উত্থানের সাথে সাথে আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতি, বিশেষ করে বাংলা, একটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। "বাঙালিত্ব"কে প্রায়শই "অ-জাতীয়তাবাদী" বা "প্রগতিশীল উগ্রবাদী" হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (NRC) প্রভৃতি ইস্যুতে বাংলা ও বাঙালি মুসলমানদের একটি বিশেষ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি ভোটব্যাংক তৈরির জন্য নির্দিষ্ট গো বলয়কে ব্যবহার করার সময়, বাংলার বহুত্ববাদী ও সমন্বয়বাদী সংস্কৃতিকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। শিক্ষাক্রম থেকে বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ হ্রাস, বাংলা ভাষায় শিক্ষার উপর আক্রমণ, এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি অসম্মান—এগুলি সবই এই বিদ্বেষের প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ।
২০২৫-২৬—প্রক্রিয়া, উদ্দেশ্য ও কৌশল
২০২৫-২৬ সালের "স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন" (এসআইআর) নামক প্রক্রিয়াটি একটি প্যান-ইন্ডিয়া প্রশাসনিক ও নীতিগত পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ হিসেবে চালু করা হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়নে বাংলা ও বাঙালিদের প্রতি একটি সুস্পষ্ট পক্ষপাত ও বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়।
১. প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস: পশ্চিমবঙ্গ, আসামের বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য বাংলা ভাষী অঞ্চলগুলির প্রশাসনিক সীমানা ও ক্ষমতা পুনর্নির্ধারণের বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাকে ভাগ করে দেওয়া বা তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
২. সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত হস্তক্ষেপ: বাংলা মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির উপর অত্যধিক নিয়ন্ত্রণ, পাঠ্যক্রম থেকে বাংলার মুক্তিযুদ্ধ, নবজাগরণ, এবং বাঙালি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলিকে হ্রাস বা বিকৃত করা, "জাতীয় সংহতি"র নামে বাংলা ভাষার ব্যবহার সীমিত করার প্রস্তাব।
৩. অর্থনৈতিক অবহেলা: বাংলা অঞ্চলের কেন্দ্রীয় অনুদান হ্রাস, অবকাঠামো প্রকল্পে বিলম্ব, ঐতিহ্যবাহী শিল্প (যেমন চা, জুট) এর ক্ষতি সাধন, এবং নতুন বিনিয়োগকে অন্যান্য অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া।
৪. নিরাপত্তা ও আইনের নামে হেনস্তা: "রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা"র অজুহাতে বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ও কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার, ও হয়রানি বৃদ্ধি। সীমান্তবর্তী বাংলা ভাষী এলাকাগুলিতে "বিদেশি" তকমা লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি।
৫. ভাষাগত আগ্রাসন: সরকারি কাজে বাংলার পরিবর্তে হিন্দি বা ইংরেজির বাধ্যবামূলক ব্যবহার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে বাংলা ভাষার বিকল্পকে হ্রাস করা, এবং বাংলা ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে "অশুদ্ধ" বলে প্রচার করা।
এই সমস্ত কর্মকাণ্ড ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে বাঙালি পরিচয়, গর্ব, এবং অস্তিত্বকে দুর্বল করার জন্য পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।
ফলাফল—একটি সমাজ ও সংস্কৃতির উপর আঘাত
- সাংস্কৃতিক সংকট: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা হারাচ্ছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি অনীহা তৈরি হচ্ছে।
- মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: একটি গোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিদের মধ্যে হতাশা, অনিশ্চয়তা, এবং রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে মনে করছে।
- রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ: বাঙালি ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলির প্রভাব হ্রাসের মাধ্যমে জাতীয় স্তরে তাদের ভূমিকা কমিয়ে আনা হচ্ছে।
- অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা: অর্থনৈতিক অবহেলা দীর্ঘমেয়াদে বাংলা অঞ্চলের উন্নয়নকে ব্যাহত করবে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও প্রভাবিত করবে।
- সামাজিক বিভাজন: বাঙালি-বিরোধী বিদ্বেষ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে,
ষষ্ঠ অধ্যায়: আইন, নীতি ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ
আন্তর্জাতিক আইন, ভারতীয় সংবিধান, এবং মানবাধিকার চুক্তি অনুযায়ী, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সংবিধানের ২৯ ও ৩০ ধারা, ত্রিভাষা সূত্র, এবং বিভিন্ন রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের রিপোর্টে আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলা হয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার বর্তমান রূপ এই সমস্ত নীতিমালা ও নৈতিক বাধ্যবাধকতার স্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি একদেশদর্শিতা, যা একটি গণতান্ত্রিক, বহুসংস্কৃতিবাদী সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা গো বলয়ের বাঙালি বিদ্বেষ, ২০২৫-২৬ সালের বিশেষ তীব্র সংশোধনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি নতুন ও ভয়ঙ্কর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি সভ্যতা, একটি ভাষা, এবং কয়েক কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার উপর সুপরিকল্পিত আক্রমণ। বাংলা ও বাঙালির বহুত্ববাদী, সমন্বয়বাদী, এবং প্রগতিশীল চেতনা ভারতীয় গণতন্ত্র ও সমাজের জন্য একটি অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদকে ধ্বংস করার চেষ্টা কোনো একটি গোষ্ঠীর ক্ষতি করবে না, বরং সমগ্র ভারতীয় সংঘবদ্ধতা, গণতন্ত্র, এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধেরই অপূরণীয় ক্ষতি করবে।