হারামির হাতবাক্স কী? ভূমিকা: যখন বিদ্যালয় বন্ধ হয়, তখন উৎসব খোলা থাকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে। "মা-মাটি-মানুষ" থেকে "বাংলার গর্ব" — স্লোগানের অভাব কখনো হয়নি। কিন্তু যে রাজ্যে গত দেড় দশকে হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় চিরতরে তালাবন্দি হয়ে গেছে, যেখানে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে, এবং যেখানে ২০২৬ সালের বাজেটে সাধারণ বিদ্যালয়ের তুলনায় মাদ্রাসা খাতে অনুপাতহীন বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে — সেই রাজ্যে শিক্ষার উৎসব পালন করা অনেকটা জ্বলন্ত ঘরে আলোর উৎসব পালনের মতো। প্রশ্ন হল, এই আগুন কে লাগিয়েছে — এবং কে বাঁচিয়ে রাখছে? --- তৃণমূলের ১৫ বছর: স্কুলের দরজা বন্ধ, স্লোগানের ... ...
মুষ্টিমেয় বাঙালি এখন আর চায়ের দোকানে তুফান তোলে না। তারা এখন ফেসবুকের পাতায় ভবিষ্যদ্বাণী বিলায়। কারোর দাবি দুইশ ত্রিশ আসন, কারোর দাবি তেষট্টি। সঙ্গে অমোঘ নির্দেশ—"স্ক্রিনশট নিয়ে রাখুন"। যেন ভোট গণনার দিন গণৎকারের ভবিষ্যৎবাণী না মিললে ওই স্ক্রিনশট দেখিয়ে পাড়ার রেশনে দু-কিলো চাল বেশি পাওয়া যাবে। অথচ প্রোফাইল নামের বানান ভুল। 'হার্টথ্রব হারু' লিখতে গিয়ে যে থ্রম্বোসিসে হারুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলে, তার কাছে রাষ্ট্রনীতির জটিল সমীকরণ আশা করা আর ডোডো পাখির কাছে ওড়ার কায়দা শেখা একই কথা। এই 'স্ক্রিনশট' সংস্কৃতি আসলে আমাদের এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। আমরা বিশ্বাস করি, ডিজিটাল দলিলে যদি একবার লিখে রাখা যায় যে অমুক পক্ষ জয়ী ... ...
— যাঁরা সংখ্যা দিয়ে কবিতা লেখেন, তাঁদের জন্য একটি বিনীত নিবেদন। --- গল্পটা শুরু হয় যেখানে তৃণমূল সমর্থকদের একটি বিশেষ প্রতিভা আছে—তাঁরা রাজ্যের উন্নয়নের এমন একটি ছবি আঁকেন, যেখানে আলো এত উজ্জ্বল যে ছায়াগুলো আর দেখাই যায় না। Kanyashree আছে, Lakshmir Bhandar আছে, Duare Sarkar আছে—সব আছে। শুধু নেই পরিসংখ্যান, প্রেক্ষাপট, এবং সততার সামান্য একটু আলো। তো চলুন, সেই আলোটা একটু জ্বালাই। --- ১. অর্থনীতি: "বাংলা এগিয়ে চলেছে"—কোথায়? TMC-র আখ্যান: GSDP বাড়ছে, বাংলা উন্নতির পথে। বাস্তবতা: পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে নিচে। RBI-র রাজ্য অর্থনীতির তথ্য অনুযায়ী, বাংলার মাথাপিছু NSDP দেশের রাজ্যগুলির মধ্যে মাঝামাঝি থেকেও নিচে—মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা তো দূরের কথা, বেশ কিছু "পিছিয়ে পড়া" বলে ... ...
রাজনীতি জিনিসটা পাড়ার রকে বসে চা খাওয়া নয়, বরং দাবার বোর্ডে এমন এক চাল দেওয়া যেখানে বিপক্ষ কিস্তিমাত হওয়ার আগেই নিজের পরাজয়টাকে ‘ঐতিহাসিক বিপর্যয়’ বলে ঘোষণা করে দেয়। সম্প্রতি লোকসভায় ‘৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল ২০২৬’ নিয়ে যে কাণ্ডটি ঘটল, তাকে খবরের কাগজে ‘পরাজয়’ বলা হলেও বুদ্ধির বাজারে একে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলতেই হবে। কেন? কারণ বিজেপি কেবল একটা রাজনৈতিক দল নয়, ওটা একটা সুশৃঙ্খল ‘কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান’, যেখানে স্ট্র্যাটেজি তৈরি হয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে, আর তার ইমপ্যাক্ট পড়ে একদম তৃণমূল স্তরের ইমোশনে। বিজেপি জানে যে বিরোধীরা ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাসের গেরোয় পা দেবেই। দক্ষিণ ভারতের জনমিতি আর উত্তর ভারতের সংখ্যামাতাল রাজনীতির দ্বন্দ্বে বিলটি আটকে ... ...
আজকাল বাজারে সততার দাম ঠিক কত, সেটা জানার জন্য আপনাকে কোনো অর্থশাস্ত্রীর কাছে যেতে হবে না; পাড়ার মোড়ে নীল-সাদা রঙের একটা জীর্ণ ল্যাম্পপোস্ট দেখলেই বুঝবেন—এখানে উন্নয়ন এখন ফেরিওয়ালার হাঁকডাকের মতো। আমাদের প্রিয় রাজনৈতিক দলটির বিবর্তন অনেকটা সেই বিরিয়ানির আলুর মতো—আগে যা ছিল পার্শ্বচরিত্র, এখন তা-ই হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল আকর্ষণ। বাকি চাল-মাংসের (পড়ুন: সাধারণ জনতা) অস্তিত্ব এখন কেবল সেই আলুকে মহিমান্বিত করার জন্য। বাংলার আকাশ-বাতাস এখন এক অদ্ভুত 'ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে' বন্দি। আগে লোকে দলবদল করত আদর্শের টানে, এখন করে আর্দ্রতার টানে। বর্ষা নামলেই যেমন ব্যাঙেরা ডাক পাড়ে, তেমনি নির্বাচনের হাওয়া দিলেই এ-ফুল ও-ফুলে ঝাঁপ দেওয়াটা এখন কোনো নৈতিক স্খলন নয়, বরং একটি ... ...
ধরুন আপনি পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে বসে আছেন। পাশে দুইজন লোক মারামারি করছে — একজনের নাম আমেরিকা, আরেকজনের নাম ইরান। তাদের মারামারি দেখতে দেখতে আপনি লক্ষ করলেন, একটু দূরে দাঁড়িয়ে দুটো লোক নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে, মাঝেমধ্যে একজনের হাতে চুপিচুপি কিছু একটা দিয়ে দিচ্ছে। সেই দুটো লোকের নাম রাশিয়া এবং চীন। এই পরিস্থিতি দেখে হান্স জে. মর্গেনথাউ নামক এক জার্মান-আমেরিকান ভদ্রলোক — যিনি ১৯৫০-এর দশকে বলেছিলেন, "আন্তর্জাতিক রাজনীতি মানেই ক্ষমতার সংগ্রাম" — তিনি তাঁর কবরে নিশ্চয়ই মৃদু হেসে বলছেন, "বলেছিলাম না?" কিন্তু আমরা — মানে আমজনতা — এখনও বিশ্বাস করি যে যুদ্ধ মানে দুটো দেশের ঝগড়া। ঠিক যেমন আমরা বিশ্বাস করি ... ...
বাঙালি জাতির একটি সুপ্রাচীন ও সুমহান ঐতিহ্য আছে। সেটি হলো, যেকোনো বিষয়ের "আসল সত্যি" জানা। পাড়ার মাছওয়ালা কেন আজ ইলিশ আনেনি, তার আসল সত্যি আমরা জানি। প্রতিবেশীর মেয়ের বিয়ে কেন ভেঙে গেল, তার আসল সত্যি আমরা জানি। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের আসল সত্যি আমরা জানি। মহাবিশ্বের উৎপত্তির আসল সত্যি আমরা জানি। শুধু নিজেদের আসল সত্যি জানি না। সেটা জানার দরকারও নেই, কারণ নিজেদের নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? Dhurandhar সিনেমার "আসল সত্যি" বের করতেই তো রাত তিনটে বেজে গেল। --- Dhurandhar মুক্তি পেয়েছে। রণবীর সিং করাচিতে আন্ডারকভার এজেন্ট হয়েছেন। ISI ভেঙে পড়েছে। দেশ রক্ষা পেয়েছে। তিন ঘণ্টা চৌত্রিশ মিনিটে পুরো পাকিস্তানের আন্ডারওয়ার্ল্ড গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ... ...
বাঙালি খবরের কাগজ পড়ে একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। প্রথমে রাশিফল — কারণ দিনটা মঙ্গলময় হবে কি না সেটা না জানলে বাকি সব খবর পড়ে কী লাভ। তারপর বিজ্ঞাপন — কারণ সরষের তেলে ছাড় আছে কি না সেটা আন্তর্জাতিক রাজনীতির চেয়ে জরুরি। তারপর মৃত্যু সংবাদ — কারণ পাড়ায় কে গেলেন সেটা না দেখলে বিকেলের আড্ডায় মুখ দেখানো যায় না। এই সুশৃঙ্খল অগ্রাধিকারের পর যদি চা এখনও গরম থাকে এবং বাড়িওয়ালার গলার আওয়াজ না আসে, তবেই বাঙালি বাকি খবরে চোখ বোলায়। কিছুদিন আগে এমন একটি খবর বেরোল যা রাশিফলের পাতা পেরিয়েও মাথায় ঢুকে গেল — এবং সেটা মাথায় ঢুকে গেলে বিপদ, কারণ ... ...
বাঙালি প্রতিবাদ ভালোবাসে। এটা জিনগত। ডিএনএ পরীক্ষা করলে দেখা যাবে প্রতিটি বাঙালির ক্রোমোজোমে একটি ক্ষুদ্র মাইক্রোফোন এম্বেড করা আছে, যেটা সুযোগ পেলেই অ্যাক্টিভেট হয়ে যায়। জন্মের সময় বাঙালি কাঁদে না — স্লোগান দেয়। "আমাকে ঠিকঠাক খাওয়ানো হচ্ছে না, এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করি।" তারপর সারাজীবন এই থিমের ওপর ভ্যারিয়েশন চলতে থাকে। তো যখন খবর এলো যে এস্প্ল্যানেড মেট্রো চ্যানেলের সামনে 'SIR 2026' — অর্থাৎ ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে পাঁচদিনের মহাধরনা হবে — তখন বাঙালি মন একটা অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল। অবশেষে। কিছু একটা হচ্ছে। কোথাও একটা অবিচার হচ্ছে। এবং সেই অবিচারের বিরুদ্ধে কেউ একজন রাস্তায় বসছেন। বাঙালির সকালটা সার্থক হলো। প্রথমে বলা দরকার, ... ...
বাঙালি যখন কাউকে 'চাণক্য' বলে ডাকে, তখন বুঝতে হবে সে লোক হয় অত্যন্ত চালাক, নয়তো অত্যন্ত দুর্ভাগা। কারণ বাঙালির কাছে চাণক্য মানেই এমন কেউ, যিনি সারাজীবন অন্যের জন্য জাল বুনলেন, আর শেষমেশ সেই জালেই নিজে জড়িয়ে পড়লেন। মুকুল রায়ের জীবনটাও ঠিক এইরকম একটি অদ্ভুত বাঙালি গল্প — যেখানে চতুরতা আর ভাগ্য, দুটোই পাল্লা দিয়ে হেরেছে। ২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। মাসের শেষ দিন। বাঙালি সাধারণত মাসের শেষে বেতন পায়, কিন্তু মুকুল রায় সেদিন পেলেন পদচ্যুতির নোটিশ। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো — দলের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে, একটি ঘোষণার মাধ্যমে, অত্যন্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। বাঙালি রাজনীতিতে 'গণতন্ত্র' মানে হলো, নেত্রী ... ...