এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  অন্যান্য

  • সিঁদেল

    DB
    অন্যান্য | ২২ নভেম্বর ২০১৮ | ১২০১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • DB | unknown.*** | ২২ নভেম্বর ২০১৮ ১৭:২২379948
  • সিঁদেল

    সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা গ্রাম মঠদিঘী। গ্রামের একধারে স্বচ্ছ টলটলে মিষ্টি জলের একটা বেশ বড়সড় একটা দিঘী, আর তারই পাড়ে ঝোপজঙ্গলে ঘেরা পাঁচ ছটা খুপরি ওয়ালা একটা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। জনশ্রুতি বাড়িটা নাকি একসময়ে কোন সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের মঠ ছিল। সেই মঠ আর দিঘীই হয়ে দাঁড়িয়েছিল ছোট্ট গ্রামটা পরিচয়। গ্রামের নাম হয়ে গিয়েছিল মঠদিঘী।
    কয়েকঘর অবস্থাপন্ন চাষি যাদের নিজস্ব ধানি জমিজিরেত আছে, দু-ঘর বামুন ছাড়া গ্রামের অধিকাংশ লোকই মুসলমান ক্ষেতমজুর শ্রেণীর। তাদের না আছে জমি জমা না আছে কোন স্থায়ী উপার্জন। চাষবাসের কয়েকটা মাসই শুধু তারা কাজ পায় ক্ষেতমজুর হিসেবে। সেই সময়গুলোতে হাতে আসে সামান্য কিছু অর্থ যা দিয়ে কটাদিন একটু মানুষের মত খেয়ে বাঁচে, ঘরের ছেলেপুলেগুলোর মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে পারে। বছরের বাদবাকি সময়টা কাটে অর্ধাহারে, মণিব-বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে আনা ভাতের ফ্যান আর বুনো শাকপাতা সিদ্ধ খেয়ে। সেটুকুও না জুটলে দিনের পর দিন চলে উপবাস। ছেলে মেয়েগুল তাদের কঙ্কালসার শরীর আর স্ফীত উদর নিয়ে ধুকতে থাকে বা পড়ে থাকে ঘরের মধ্যে নির্জীবের মত। তবে ওদের মধ্যে সবাই শুধু পড়েপড়ে ভাগ্যের মার সহ্য করতে নারাজ। খিদের জ্বালায় উপায়ান্তর না দেখে কেউ করে ডাকাতি কেউ সিঁদ কাটে সম্পন্ন গৃহস্তের ঘরে। পেটের দায় কখনো কখনো খুন খারাপিও ঘটে যায়।
    যে সময়ের গল্প বলতে বসেছি সেটা ছিল উনিশশো ষাটের শেষ ভাগ। এই উনিশশো ছেষট্টি কি সাতষট্টি হবে। দেশ জুড়ে চলছে তীব্র খাদ্য সঙ্কট – প্রায় দুর্ভিক্ষের মতই অবস্থা। সরকার লেভি ধার্য করেছে ক্ষেতের ফসলের ওপরে। ফসলের একটা নির্দিষ্ট অংশ সরকারের ভান্ডারে দিতে হবে। তাই দিয়ে চলবে শহর গঞ্জের মানুষদের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা।
    সরকারের নজর কৃষকের ঘরে মজুদ করা উদ্বৃত্ত ফসলের দিকে আর কৃষকে নজর সরকারের শ্যেন দৃষ্টি এড়ানো। তাই তারা ফন্দি এঁটে কিছু কিছু ধানচাল বোঝাই বস্তা গরীব ক্ষেত মজুরদের ঘরে লুকিয়ে রাখা।
    এমতাবস্থায় মঠদিঘী গ্রামের ওস্তাদ সিঁদেল চোর বড়কচি স্যাঙাত আয়নুদ্দিন দপ্তরীর মাধ্যমে খবর পায় মন্ডল্ বাবুদের কয়েকবস্তা চাল নাকি গচ্ছিত রাখা আছে তাহের আলির ঘরে। সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে বড়কচি “আজ রাতে তাহের আলির ঘরে সিঁদ কেটে দু বস্তা চাল যে করে হোক বের করে আনতেই হবে।অনেকদিন হয়ে গেল পেটে একদানা ভাত পড়েনি।”
    উল্লসিত আয়নুদ্দিন আনন্দে মাতোয়ারা। -“কদ্দিন পরে ঘরের ছেলেপিলেগুলোর মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে পারব ভাবদিকি ওস্তাদ” তার আর তর সয়না।
    গ্রামে গঞ্জে সুজ্জি ডুবলেই নিশুত রাত। তাও বেশ রাত করে সাগরেদ আয়নুদ্দিনকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বড়কচি সিঁদ কাটে তাহের আলির ঘরে। অন্ধকারের মধ্যেই বড়কচির চোখে পড়ে দুপাশে রাখা বেশা কয়েকটা চালের বস্তার মাঝখানে একপাল অনাহারক্লিষ্ট আন্ডাবাচ্চা সহ তাহের আলি আর তার বিবি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।
    দেরি করেনা বড়কচি। একবস্তা চাল দুজনে মিলে ধরে চুপিসাড়ে বেরিয়ে আসে সেই সুড়ঙ্গ ধরে। তার পর চালের বস্তা মাথায় নিয়ে দ্রুত পদে হাঁটা দেয় ন্যাড়ামাঠের দিকে। পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে আয়নুদ্দিন তার উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারেনা। লোভে তার চখদুট চকচক করতে থাকে। কেবলি বলে চলে “উফফফ কতদিন পরে দুমুঠো ভাত খাব বলতো ওস্তাদ। ছেলেমেয়েগুলো কি রকম আহ্লাদ হবে একবার ভাব দি’নি ওস্তাদ!” স্যাঙাতের ঘ্যানঘ্যানিতে বিরক্ত হয়ে এক সময়ে চলা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বড়কচি। ধমক লাগায় আয়নুদ্দিনকে –“অ্যাই, থাম তো দেহি। সেই থেকে সেই এক কতা ঘ্যানঘ্যান করে চলেচে কানের কাছে। ইদিকে আমি ভাবচি অন্য কতা”
    “কি কতা ওস্তাদ”? উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করে আয়নুদ্দিন।
    ক্লিষ্ট স্বরে বড় কচি জবাব দেয় “দেখ, আমরাতো এই চাল ফুটিয়ে ভাত খাব। ওদিকে তাহের আলির হেনস্তার কতাটা একবার ভাবতো। কত্তাদের গচ্ছিত চাল তাহের আলির হেপাজত থেকে খোয়া গেলে তাহের আলি নিস্তার পাবে ? কত্তারা খোয়া যাওয়া মালের খেসারত আদায় করবেনা তাহের আলির কাছে থেকে ?হয়ত তাহের আলির মজুরি থেকে লোসকানের উসুলি করবে কত্তারা। এমনিতেই খেতে পায়না তার ওপর মজুরি কাটা গেলে কি হবে তাহের আলির? ওর ঘুমন্ত ছেলেপিলে কটার মুখগুলো বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে আসচে। চল বস্তাটা তাহের আলিকে ফেরৎ দিয়ে আসি গে”
    আকাশ থেকে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে আয়নুদ্দিন। বল কি ওস্তাদ মুখের গেরাস মুখে না তুলে ফেরৎ দিয়ে আসবে তাহের আলিকে !! পারবে ফেরৎ দিতে?”
    মাঠের মধ্যে দুজনের এই কথাপোকথনের মধ্যে তাদের চোখে পড়ে দূর থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে দ্রুতবেগে ছটে আসছে একটা ছায়া মূর্তি। পালানর ভাবনা মাথায় আসার আগেই কাছে এসে পড়গে ধাবমান ছায়া মূর্তি। অন্ধকারের মধ্যেই চেনা যায় তাহের আলিকে। ঘুমের মধ্যেই খুটখাট আওয়াজে সে জেগে ওঠে। ঠিক কি কান্ড হটেছে বুঝে উঠতে একটু সময় লাগে তার। তার পরেই পাগলের মত ছুট লাগায় মাঠের দিকে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ই তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে হাজির করে বমাল সমেত চোরেদের সুমুখে। হাতের লাঠিটা তুলে ধরে চোর নিধনের জন্যে। ঠিক সেই সময়েই ধপ করে তাহেরের পায়ের কাছে মাটিতে চালের বস্তাটা নামিয়ে রাখে বড়কচি। কাতর কন্ঠে তাহের আলিকে উদ্দেশ্য করে বলে “বড় ভুল করিচি রে বাপ। চালের বস্তাটা নে’ যেতে যেতে দেকতে পাচ্ছিলুম তোর কচিকাচাগুলানের মুখগুলো। ফেরৎ নে যা ভাই তোর চালের বস্তা। ওচালের ভাত আমার পেটে সইবেনি রে”
  • রুকু | unknown.*** | ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮ ১০:৪১379949
  • মিষ্টি
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন