এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হারিয়ে গেছি আমি  -- (১)

    Manali Moulik লেখকের গ্রাহক হোন
    ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • পর্ব ১
    -- "এই মহিলা সারাজীবন জ্বালিয়ে মারলো আমাকে !" রাগতভাবে বিড়বিড় করতে করতে পার্কিং লট থেকে দৌড়ে বেরোয় সঙ্কর্ষণ। চকোলেট-মেরুণরঙা টয়োটা গাড়িতে অটোমেটিক লকিং কী-র আলো দুবার মৃদু শব্দ তুলে বেজে উঠলো যেন ওর জমে থাকা রাগের মতোই। আগে এই গাড়ি সম্পর্কেই কী অবিশ্বাস‍্য সতর্কতা ছিলো সঙ্কর্ষণের। গ‍্যারেজে বা ফ্ল‍্যাট থেকে বেরোনোর পথে কোনোভাবে গাড়িতে স্ক্র‍্যাচ না লাগে, রাস্তায় বেখেয়ালে কোনোভাবে কাদাজলের ছিটে না উঠে আসে, তারপর হাজার একটা যত্ন। ঋদ্ধিরূপা বলতো, "পরজন্মে ফোর-হুইলার হবো, মেরুণ-রঙা টয়োটা ঠিক, সকাল-সন্ধ‍্যে ভাববে আমায়, মনে থাকবে?"
    সঙ্কর্ষণ মুখ বেঁকিয়ে বলতো, "রক্ত-জল করা টাকা ইএমআই দিয়ে কিনতে হলে সবাই যত্ন করে!"
    -- "সে অবশ‍্য ঠিক। " ঋদ্ধি চোখ নাচিয়ে বলতো, "আর এফর্ট না দিয়ে ফোকটে পাওয়া জিনিসকে পাত্তা দেবেই বা কেন কেউ?" সঙ্কর্ষণের চিবুক রক্তিম হয়ে উঠতো। তা অবশ‍্য ঠিক। কে কবে ভেবেছিলো ভার্সিটি টপার ঋদ্ধিরূপা, ডিবেটিং চ‍্যাম্পিয়ন ঋদ্ধিরূপা, অপরূপা ঋদ্ধিরূপা কেবল গান আর পার্টি অন্ত প্রাণ সঙ্কর্ষণের প্রেমে পড়বে? প্রেম বলতে ফাজিল ছেলেমেয়েদের মতো ভিক্টোরিয়া আর মোহরকুঞ্জ নয়, রীতিমতো তাকে ক‍্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠা করে নিজের সংসার গুছিয়ে বসা! তাও আবার ইউরোপে ডক্টরেটের সুযোগ বাতিল করে দিয়ে! অবশ‍্য ওই মেয়েটার সবই উল্টোপাল্টা ছিলো। সেসব ভেবে আর লাভও নেই। ঋদ্ধিরূপা এখন সঙ্কর্ষণের চ‍্যাটলিষ্টে নীচের দিকে পড়ে থাকা একটা নামমাত্র।
    গেটের সামনে জীর্ণ চেয়ারে বসে ঢুলছে সিকিউরিটি পালকাকা। ঢাউস চেয়ারের চেহারা কাঠ আর নারকেল ছোবড়া বেরিয়ে এসে আরো দুরবস্থায় পর্যবসিত। পিঠের দিকে একটা পুরোনো কুশন দিয়ে মাথাটা হেলিয়ে এই দুপুরের চড়চড়ে রোদেও ওনার ঢুলুনিতে বিরক্তি নেই। কাঁচাপাকা গোঁফ ঝুলে পড়েছে ঘুমের মধ‍্যে মুখ হাঁ হয়ে আসায়, সিকিউরিটির ইউনিফর্ম ঘামে ভিজে উঠেছে। এই গরমে মানুষ ঘুমোতে পারে? সঙ্কর্ষণ প্রয়োজনের থেকে বেশী চড়া গলায় বললো, "পালকাকা, লিফ্ট সার্ভিসিং হয়েছে?"
    ইহজগতে ফিরে এসে চট করে খেই ধরতে পারে না দ্বাররক্ষী। প্রথমে কথাটা কে বললো, আর কী নিয়ে বললো এইদুটো প্রশ্ন বুঝতে সময় নেয়। বয়স হয়েছে, সোসাইটির সবার মত এক করে তবু রাখতেই হয়েছে বহু পুরোনোদিনের মানুষটাকে।
    -- "অ‍্যাঁ...হ‍্যাঁ বাবা.. লিফ্টের? না না, তেঁয়ারা আসেন নাকি? ওই তো সেকেন ফ্লোরের আহুজা স‍্যার বিশবার ফোন কল্লেন ! না না বাবুদের আসার নাম নেই...সিঁড়িই ভরসা বাবা....হ‍্যাঁ বাবা, কাল সামনের টেকনিশিয়ানদের দোকান থেকে....."
    শোনার প্রয়োজন বোধ না করে দুড়দাড় করে সিঁড়িতে উঠতে থাকে সঙ্কর্ষণ। আশ্চর্য ! পালকাকার উপর তার মমতা নেই এমন নয়, কিন্তু যে দায়িত্ব পালনের তিনি উপযুক্ত নন সেটা তাকে দেওয়া হবে কেন? এতো একজনকে দয়া করতে গিয়ে দশজনের ক্ষতি করা! লিফ্ট মহাশয় বিগড়েছেন গতকাল দুপুর থেকে, নামকরা 'মেঘচুম্বিত অ‍্যাপার্টমেন্টে' এখনো কোনো ব‍্যবস্থা হলো না। চারতলার বাসিন্দা হলে বুঝতে মালাইচাকি ঘুরে যাওয়া কাকে বলে! কাঁচের স্লাইডিং ছুঁয়ে কলকাতা শহরের দুপুরমাখা রোদ টুকরো টুকরো আছড়ে পড়ছে ল‍্যান্ডিংয়ে। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘর্মাক্ত শরীরে যখন সঙ্কর্ষণ কলিং বেলটার কন্ঠনালী চেপে ধরলো, ভারী কাঠের দরজা খোলার আগে চোখে পড়লো দীর্ঘ সোনালী রোদের রশ্মি। ভরদুপুরে নিশ্চয়ই জানালায় ভারী পর্দা টেনে দিয়েছে কর্ণাবতী। তা হতে পারে। ওর সাইনাস আছে, দুপুর রৌদ্রে অসুবিধা হবারই কথা। ছুরির মতো সতেজে ঋজুভঙ্গীতে চলে যাওয়া রোদের ফালিটার দিকে চেয়ে থাকে সঙ্কর্ষণ। ছোটোবেলায় সন্তোষপুরের ভাড়াবাড়িতে দুপুরে মা সস্তা ভারীকাপড়ের পর্দায় জলন্ত জানালা ঢেকে দিতো। সুতির টেবিলক্লথে তখন এমন রোদের সরু সরু ফালির আনাগোনা। অন্ধকার ঘরে বোঝা যায়, ধুলোরা মিছিল করে ঢুকছে ওই পথে। দিদির আর তার প্রিয় খেলা ছিলো ওই রৌদ্রময় পথে সোনালী পরীদের খুঁজে বার করা। সোনালী স্বপ্নের যেসব রূপকথা ভাত আর ডালের গন্ধে মিশে থাকে, তারা হাতে ধরা দিলে কতো দ্রুত সব রূপকথারা হাস‍্যকর হয়ে যায়!
    পার্পলরঙা স্লিভলেস টপ আর বাদামী প্লাজোতে কর্ণাবতী এসে দাঁড়ালো।
    -- "দুঃসময়েই ফোনে পাওয়া যায় না কেন তোমাকে বলো তো? ফোন তো দেখলাম সুইচড্ অফ!"
    দুঃসময় ! শব্দটা কী অদ্ভুত ! সঙ্কর্ষণের ছাপা শাড়ি আর সিঁদুর টিপের মায়ের দুঃসময় কিছুতেই কাটতে চাইতো না। তাঁর কুলুঙ্গির কোনো দেবদেবীই মুখ তুলে তাকাতেন না। ঋদ্ধিরূপা ডিবেটের পোডিয়ামে বলতো, "সভ‍্যতার ঘোর দুঃসময় আজ", লিফ্ট বিগড়ে গিয়ে সঙ্কর্ষণের থেকে বেশী দুঃসময়ে বিগত দশ-বারো মিনিটে কেউ অনুভব করেনি। কর্ণাবতী কোমল মাখনরঙা স্লিং ব‍্যাগটা তুলে নেয় সোফা থেকে,
    -- "তোয়াদির বাড়ি যেতে হবে।"
    -- "হঠাৎ?"
    -- "পিনাকীদা ফোন করেছিলেন। তোয়াদির একটা মানে...মাইল্ড ষ্ট্রোক মতো হয়েছে। জুপিটারে ভর্তি। না না হসপিটাল না...এখন ওদের বাড়িই যেতে হবে একবার। তিতলি একা।"
    -- "মিঠুদিকে এলগিন থেকে তুলে নিচ্ছি তাহলে।" শার্টের কলার ঠিক করতে করতে অন‍্যদিকে দৃষ্টি রেখে বললো সঙ্কর্ষণ। কর্ণাবতী দরজা বন্ধ করার আগে ঠোঁটে লিপগ্লস বুলিয়ে নেয় একবার। ব‍্যাগটা হাতে তুলে নিতে নিতে মিষ্টত্ব - জড়িত ধারালো কন্ঠে বলে, "হ‍্যাঁ। মরার সময়ে হরিনাম। আচ্ছা, পিনাকীদা কি জানতেন যে বউ লেসবিয়ান?"
    একটা রোদের ছুরি সঙ্কর্ষণের উন্নত কপাল ছুঁয়ে চলে যায়। কলকাতায় গ্রীষ্ম এক দানব হয়ে দেখা দিচ্ছে প্রতিদিন। নাকি মানুষের রক্তের শীতলতা বাড়ছে? মেঘচুম্বিত অ‍্যাপার্টমেন্টের সবার কি এতো গরম হচ্ছে? এখন, এইমুহূর্তে সঙ্কর্ষণের যেরকম হচ্ছে?
    (চলবে)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    পর্ব ১
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে প্রতিক্রিয়া দিন।