কর। কর। কর। শব্দটা ছোট। শব্দটা তীক্ষ্ণ। শব্দটা ছুরির মতো। শব্দটা কাটে। শব্দটা কাটে বণিকের গলা। শব্দটা কাটে মাঝির হাত। শব্দটা কাটে শ্রমিকের পিঠ। শব্দটা কাটে ক্রেতার পেট। শব্দটা কাটে বিক্রেতার স্বপ্ন। শব্দটা কাটে জাহাজের পাল। শব্দটা কাটে গুদামের তালা। শব্দটা কাটে বন্দরের হিসাব। শব্দটা কাটে খাতার পাতা। শব্দটা কাটে। কাটে। কাটে। কর। কর। কর। কে দেয়? সবাই দেয়। কে নেয়? সে নেয়। সে। সে। সে। যে সিংহাসনে বসে। যে মুকুট পরে। যে রাক্ষস। যে দশ মাথা। যে দশ মুখ। যে দশ চোখ। যে দশ কান। যে দশ নাক। যে দশ জিভ। তার দশটি জিভ প্রত্যেকে বলে – আরও কর। আরও কর। আরও কর। কিন্তু তার দশটি কান শোনে না কারও কান্না। তার দশটি চোখ দেখে না কারও অভাব। তার দশটি নাক শোঁকে না কারও ঘামের গন্ধ। তার দশটি জিভ শুধু চাখে তার নিজের লোভের স্বাদ। তার দশটি হাত শুধু নেয়। কখনো দেয় না। কারণ তার হাত যদি দিত, তার মুকুট হালকা হত। আর মুকুট হালকা হলে তার মাথা নিচু হত। আর মাথা নিচু হলে তার দর্প ভাঙত। আর দর্প ভাঙলে সে রাজা থাকত না। সে ঈশ্বর থাকত না। সে সবকিছু থাকত না। তাই সে নেয়। নেয়। নেয়।
আমি দেখেছি। আমি। আমি। আমি। যে ভাই। যে সিংহাসনের ছায়ায় বসে ছিল। যে হিসাবের খাতায় লিখত। যে বন্দরের হিসাব রাখত। যে মুক্তা গুনত। যে মশলা মাপত। যে সোনা ওজন করত। যে জাহাজের খবর রাখত। যে বণিকের নাম লিখত। যে মাঝির মজুরি লিখত। যে শ্রমিকের খাদ্য লিখত। আমি দেখেছি বণিকের মুখ। বণিক আসে। বণিক হাসে। বণিক পণ্য নামায়। বণিক দাম বলে। আমি দাম লিখি। তারপর সে আসে। সে। সে। সে। সে বলে – আরও। আরও। আরও। আরও কর। আরও লাভ। আরও সোনা। আমি লিখি। আমি যোগ করি। আমি বিয়োগ করি। আমি ভাগ করি। আমি গুণ করি। আমি হিসাব করি। হিসাব মেলে না। হিসাব কখনো মেলে না। কারণ হিসাবটা তার পক্ষে। আমার পক্ষে না। বণিকের পক্ষে না। মাঝির পক্ষে না। শ্রমিকের পক্ষে না। ক্রেতার পক্ষে না। বিক্রেতার পক্ষে না। শুধু তার পক্ষে। সে। সে। সে।
বণিক প্রথমে হাসে। তারপর কাঁদে। তারপর চুপ করে। তারপর ভাবে। তারপর হিসাব করে। হিসাব করে দেখে – লাভ নেই। লাভ নেই। লাভ নেই। কর দিলে থাকবে না। জাহাজ ভাড়া দিলে থাকবে না। মাঝির মজুরি দিলে থাকবে না। শ্রমিকের খাদ্য দিলে থাকবে না। নিজের পেট চালালে ছেলের পেট চলবে না। ছেলের পেট চালালে বউয়ের পেট চলবে না। বউয়ের পেট চালালে মায়ের ওষুধ চলবে না। মায়ের ওষুধ চালালে ঘরের ভাড়া চলবে না। ঘরের ভাড়া চালালে দেবতার পূজা চলবে না। দেবতার পূজা না করলে পাপ। পাপ করলে নরক। নরক ভোগ করার চেয়ে দস্যু হওয়া ভালো। তাই বণিক দস্যু হয়। না। বণিক দস্যু হয় না। বণিককে দস্যু বানানো হয়। কে বানায়? সে বানায়। সে। সে। সে। যে সিংহাসনে বসে। যে মুকুট পরে। যে কর বাড়ায়। যে কর বাড়ায়। যে কর বাড়ায়।
মাঝি প্রথমে গান গায়। নদীর গান। সমুদ্রের গান। জাহাজের গান। তারপর সে গান থামায়। কারণ গান গাইলে পেট চলে না। গান গাইলে কর দেওয়া যায় না। কর না দিলে চাবুক। চাবুক খেলে পিঠ ফাটে। পিঠ ফাটলে নুন লাগে। নুন লাগলে চিৎকার। চিৎকার করলে কেউ শোনে না। কেউ শোনে না। কেউ শোনে না। তাই মাঝি চুপ করে। চুপ করে। চুপ করে। তারপর মাঝি নামে। তারপর মাঝি ছুরি ধরে। তারপর মাঝি জাহাজের পণ্য লুট করে। না। মাঝি লুট করে না। মাঝি বাঁচে। কিন্তু বাঁচতে গিয়ে মাঝি ডাকাত হয়। কে বানায়? সে বানায়। সে। সে। সে। যে কর বাড়ায়। যে চাবুক মারে। যে ফাঁসি দেয়। যে নদীর গান থামায়। যে সমুদ্রের গান থামায়। যে জাহাজের গান থামায়। যে সব গান থামায়। শুধু তার গান বাজে। তার। তার। তার। যে গান – আমি রাজা। আমি মহান। আমি সর্বশক্তিমান। আমি। আমি। আমি।
শ্রমিক প্রথমে কাজ করে। কাঁধে বোঝা। পিঠে ঘাম। হাতে কড়া। পায়ে ফোস্কা। তারপর কাজ করে। তারপর কাজ করে। তারপর কাজ করতে করতে সে ভাবে – কেন? কেন আমি কাঁধে বোঝা নিই? কেন আমি পিঠে ঘাম ঝরাই? কেন আমি হাতে কড়া পরি? কেন আমি পায়ে ফোস্কা সহ্য করি? কার জন্য? কার জন্য? কার জন্য? তার জন্য? তার জন্য? তার জন্য? সে কি আমার কথা ভাবে? না। সে আমার কথা ভাবে না। সে শুধু কর ভাবে। সে শুধু সোনা ভাবে। সে শুধু মুকুট ভাবে। সে শুধু সিংহাসন ভাবে। সে শুধু নিজের কথা ভাবে। শুধু নিজের। শুধু নিজের। শুধু নিজের। তাই শ্রমিক থামে। শ্রমিক কাজ থামায়। থামলে খিদে পায়। খিদে পেলে চোখে অন্ধকার। চোখে অন্ধকার হলে হাত নিজে থেকে কিছু করে। শ্রমিকের হাত তার না। শ্রমিকের হাত ক্ষুধার। ক্ষুধার হাত যা পায় তা নেয়। যা নেয় তা খায়। খায়। খায়। এটাই দস্যুতা। এটাই। এটাই। এটাই। কে বানায়? সে বানায়। সে। সে। সে।
আমি দেখেছি। আমি। আমি। আমি। আমি দেখেছি বণিকের ছেলে। বণিকের ছেলে দস্যু হয়। বণিকের ছেলের হাতে তলোয়ার। বণিকের ছেলের চোখে আগুন। বণিকের ছেলের মুখে হাসি। হাসি? না। হাসি না। হাসি ভুয়া। কারণ দস্যু হাসে না। দস্যু ভয় দেখায়। দস্যুর হাসি রক্তের। আমি দেখেছি মাঝির মেয়ে। মাঝির মেয়ে বিক্রি হয়। কার কাছে? তার কাছে? না। তার কাছে না। বণিকের ছেলের কাছে। দস্যুর কাছে। রাতে। দিনে। বাজারে। ঘাটে। জাহাজে। মাঝির মেয়ের দাম কত? কত? কত? হাত। পা। চুল। চোখ। ত্বক। সব মিলিয়ে। সব মিলিয়ে। সব মিলিয়ে। মাঝির মেয়ের দাম তার করের সমান। ঠিক তার করের। নাকের কর। কানের কর। জিভের কর। জীবনের কর। আমি দেখেছি শ্রমিকের বউ। শ্রমিকের বউ অনাহারে। তার পেটে সন্তান। সন্তান জন্মাবে। জন্মালে কর দিতে হবে। জন্ম না হলে কর লাগবে না। তাই শ্রমিকের বউ নিজেই পেটে পাথর বাঁধে। নিজেই নিজের সন্তান মারে। নিজেই নিজের গর্ভ শূন্য করে। কে বানায়? সে বানায়। সে। সে। সে।
আমি হিসাব রাখি। আমি। আমি। আমি। আমি খাতায় লিখি। সংখ্যা। সংখ্যা। সংখ্যা। এক। দুই। তিন। চার। পাঁচ। ছয়। সাত। আট। নয়। দশ। দশ। দশ। দশ দিক। দশ মাথা। দশ মুখ। দশ চোখ। দশ কান। দশ নাক। দশ জিভ। দশ হাত। দশ কর। আমি লিখি – এই মাসে বন্দর থেকে এল এত। মুক্তা এল এত। মশলা এল এত। সোনা এল এত। কর এল এত। কর গেল এত। কোথায় গেল? তার ভান্ডারে। তার। তার। তার। তার ভান্ডার ভরে। আমার খাতা ভরে। কিন্তু বণিকের ভান্ডার? মাঝির ভান্ডার? শ্রমিকের ভান্ডার? খালি। খালি। খালি। শুধু খালি। আমি দেখি। আমি লিখি। আমি শুধু লিখি। লেখা ছাড়া আর কিছু করতে পারি না। কারণ আমি সে নই। আমি। আমি। আমি। আমি শুধু ভাই। যে ভাই সিংহাসনের ছায়ায় বসে। যে ভাই হিসাব রাখে। যে ভাই খাতা লেখে। যে ভাই কিছু করতে পারে না। পারে না। পারে না। পারে না। কিন্তু পারে না বললে ভুল হবে। সে পারে। সে পারে। সে পারে। সে পারে হাত মেলাতে। সে পারে শত্রুর সাথে কথা বলতে। সে পারে সন্ধি করতে। সে পারে তার ভাইকে বিক্রি করতে। কিন্তু সে তা করে না। কেন? কেন? কেন? কারণ সে ভয় পায়। কারণ সে দুর্বল। কারণ সে কাপুরুষ। না। না। না। সে কাপুরুষ না। সে ভয় পায় না। সে দুর্বল না। সে শুধু হিসাব জানে। সে জানে তার ভাই যদি কর বাড়াতে থাকে, তাহলে বণিক দস্যু হবে। দস্যু হলে বাণিজ্য বন্ধ হবে। বাণিজ্য বন্ধ হলে বন্দর শুকাবে। বন্দর শুকালে লঙ্কা খালি হবে। লঙ্কা খালি হলে শত্রু আসবে। শত্রু এসে লঙ্কা জিতবে। আর লঙ্কা জিতলে কার ক্ষতি? তার? তার? তার? না। তার ক্ষতি না। তার লাভ। কারণ সে শত্রুর পাশে থাকবে। সে শত্রুর হিসাব রাখবে। সে শত্রুর বন্দর চালাবে। সে শত্রুর বাণিজ্য চালাবে। সে শত্রুর কর আদায় করবে। সে শত্রুর সবকিছু করবে। শুধু একবার। একবার। একবার। একবার হাত মেলালেই সব হয়ে যায়। একটা হাত। একটা। একটা। একটা।
কিন্তু হাত মেলানো সহজ? না। সহজ না। হাত মেলাতে হয় ছায়ায়। রাতে। অন্ধকারে। গোপন কক্ষে। লুকানো দরজায়। যেখানে কেউ দেখে না। যেখানে কেউ শোনে না। যেখানে কেউ জানে না। সেখানে বসে দুজন। একজন সে। আরেকজন শত্রু। শত্রু শান্ত। শত্রু ভদ্র। শত্রু সভ্য। শত্রু বলে – আপনার ভাই তো কর বাড়িয়েছে? আমি বলি – হ্যাঁ। শত্রু বলে – আপনার বণিকরা তো দস্যু হয়েছে? আমি বলি – হ্যাঁ। শত্রু বলে – আপনার বন্দর তো শুকাচ্ছে? আমি বলি – হ্যাঁ। শত্রু বলে – আপনার লঙ্কা তো খালি হচ্ছে? আমি বলি – হ্যাঁ। শত্রু বলে – তাহলে? আমি বলি – তাহলে কী? শত্রু বলে – তাহলে? আমি বলি – আমি কী করতে পারি? শত্রু বলে – আপনি করতে পারেন অনেক কিছু। আমি বলি – কী? শত্রু বলে – আপনি আমার সাথে হাত মেলাতে পারেন। আমি বলি – কেন? শত্রু বলে – কারণ আমি চাই আপনার লঙ্কা বাঁচুক। আমি বলি – কেন? শত্রু বলে – কারণ আমি চাই বাণিজ্য চলুক। আমি বলি – কেন? শত্রু বলে – কারণ আমি চাই বন্দর থাকুক। আমি বলি – কেন? শত্রু বলে – কারণ আমার লাভ হবে। নাম হবে। আমি হাসি। শত্রু হাসে। দুই হাসি মিলে এক হাসি হয়। সেই হাসির নাম চুক্তি। চুক্তির নাম ব্যবসা। ব্যবসার নাম বিশ্বাসঘাতকতা। না। না। না। ব্যবসা কখনো বিশ্বাসঘাতকতা না। ব্যবসা ব্যবসা। ব্যবসা মানে দুই পক্ষের লাভ। বিশ্বাসঘাতকতা মানে এক পক্ষের লাভ। কিন্তু এই চুক্তিতে দুই পক্ষের লাভ আছে। এক – শত্রুর লাভ, লঙ্কা পাবে। দুই – তার লাভ, বন্দর পাবে। বাকিদের? বাকিরা কে? বণিক? মাঝি? শ্রমিক? তাদের লাভ? তাদের লাভ? তাদের লাভ? তাদের লাভ কি ভাই বাঁচা? না। ভাই তো মরবে। ভাই তো জ্বলবে। ভাই তো ছাই হবে। তাদের লাভ কী? তাদের লাভও আছে। আছে। আছে। বণিক দস্যু হওয়া থেকে বণিক হবে। মাঝি ডাকাত হওয়া থেকে মাঝি হবে। শ্রমিক ভিক্ষুক হওয়া থেকে শ্রমিক হবে। তারা কর দেবে না। তারা চাবুক খাবে না। তারা ফাঁসি পাবে না। তারা বাঁচবে। বাঁচবে। বাঁচবে। কিন্তু ভাই? ভাই বাঁচবে না। ভাই মরবে। ভাই। ভাই। ভাই। আর সেই ভাই যে বাঁচতে পারত, যদি না কর বাড়াত। যদি না লোভ করত। যদি না দর্পে থাকত। যদি না তার দশ মাথা একসাথে আরও চাইত। আরও। আরও। আরও।
আমি ভাইকে বলেছিলাম। বলেছিলাম। বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম – কর কমাও। আমি বলেছিলাম – বণিককে বাঁচতে দাও। আমি বলেছিলাম – মাঝিকে গান গাইতে দাও। আমি বলেছিলাম – শ্রমিককে খেতে দাও। আমি বলেছিলাম – বন্দর শুকিয়ে যাচ্ছে। আমি বলেছিলাম – লঙ্কা খালি হচ্ছে। আমি বলেছিলাম – শত্রু ওঁত পেতে আছে। আমি বলেছিলাম। বলেছিলাম। বলেছিলাম। সে শুনেছিল? না। সে শোনেনি। সে শোনেনি। সে শোনেনি। সে বলেছিল – তুমি ভয় পাচ্ছ। ভয়। ভয়। ভয়। আমি বলেছিলাম – না, আমি হিসাব জানি। আমি বলেছিলাম – না, আমি খাতা জানি। আমি বলেছিলাম – না, আমি বন্দর জানি। আমি বলেছিলাম – না, আমি মাঝি জানি। আমি বলেছিলাম – না, আমি বণিক জানি। আমি বলেছিলাম – না, আমি শ্রমিক জানি। আমি বলেছিলাম – না, আমি কর জানি। আমি বলেছিলাম – না, আমি লোভ জানি। আমি বলেছিলাম – না, আমি ধ্বংস জানি। সে হেসেছিল। তার হাসি দশবার। কারণ তার দশটি মুখ। দশটি হাসি। একসাথে। দশটি। আমার মুখে একটাই। একটা। একটা। আমি একটা হাসি দিয়ে দশ হাসি পারি না। পারি না। পারি না। পারি না।
তাই আমি গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম। শত্রুর কাছে। রাতে। অন্ধকারে। গোপন কক্ষে। শত্রু ছিল। শত্রু শান্ত। শত্রু ভদ্র। শত্রু সভ্য। শত্রু বলেছিল – আপনি এসেছেন? আমি বলেছিলাম – এসেছি। শত্রু বলেছিল – কেন? আমি বলেছিলাম – কর। কর। কর। শত্রু বলেছিল – কর? আমি বলেছিলাম – হ্যাঁ। কর। কর আমার ভাইয়ের। কর তার লোভের। কর তার দর্পের। কর তার দশ মাথার। কর তার দশ মুখের। কর তার দশ হাতের। কর তার দশ জিভের। শত্রু বলেছিল – তাহলে? আমি বলেছিলাম – আপনার সঙ্গে হাত মেলাব। শত্রু বলেছিল – কেন? আমি বলেছিলাম – লঙ্কা বাঁচাব। শত্রু বলেছিল – কীভাবে? আমি বলেছিলাম – আপনার সঙ্গে। শত্রু বলেছিল – আমার সঙ্গে? আমি বলেছিলাম – হ্যাঁ। শত্রু বলেছিল – আমি কী পাব? আমি বলেছিলাম – বন্দর। শত্রু বলেছিল – আর আপনি? আমি বলেছিলাম – হিসাব। শত্রু বলেছিল – আর আপনার ভাই? আমি বলেছিলাম – সে পোড়াবে। শত্রু বলেছিল – আর লঙ্কার মানুষ? আমি বলেছিলাম – তারা বাঁচবে। শত্রু বলেছিল – তাহলে চুক্তি? আমি বলেছিলাম – চুক্তি। চুক্তি। চুক্তি। আর সেই চুক্তি হল। হল। হল। হল। হাত মেলানো হল। শত্রু হাসল। আমি হাসলাম। আমার হাসি ভাঙা। কারণ আমার হাত কাঁপছিল। কাঁপছিল। কাঁপছিল। কিন্তু আমি হাসলাম। কারণ হাসলেই চুক্তি টেকে। কাঁদলে চুক্তি ভাঙে। তাই হাসলাম। হাসলাম। হাসলাম।
তারপর যুদ্ধ। যুদ্ধ। যুদ্ধ। তারপর আগুন। আগুন। আগুন। তারপর ভাই। ভাই। ভাই। তারপর ছাই। ছাই। ছাই। তারপর সিংহাসন। সিংহাসন। সিংহাসন। তারপর মুকুট। মুকুট। মুকুট। তারপর খাতা। খাতা। খাতা। তারপর হিসাব। হিসাব। হিসাব। তারপর কর। কর। কর। কিন্তু এবার কর কম। কারণ বণিক বাঁচে। মাঝি বাঁচে। শ্রমিক বাঁচে। বন্দর বাঁচে। বাণিজ্য বাঁচে। মুক্তা বাঁচে। মশলা বাঁচে। সোনা বাঁচে। কিন্তু ভাই বাঁচে না। ভাই। ভাই। ভাই। আমি খাতায় লিখি – আজ কর এল এত। আজ মুক্তা এল এত। আজ মশলা এল এত। আজ সোনা এল এত। আজ লাভ হল এত। কিন্তু খাতার শেষে একটা লাইন থাকে। ফাঁকা লাইন। সেখানে কিছু লেখা হয় না। কিছু লেখা যায় না। কারণ সেখানে লেখা থাকত – ভাই। ভাই। ভাই। ভাই। ভাই। ভাই। আমি সেই লাইন পড়ি। পড়ি। পড়ি। পড়তে পড়তে আমার চোখ ভিজে যায়। কিন্তু জল পড়ে না। কারণ জল শুকিয়ে গেছে। শুকিয়ে গেছে। শুকিয়ে গেছে। শুধু আছে শূন্যতা। শূন্যতা। শূন্যতা। আর সেই শূন্যতার নাম – বন্দর। বন্দর। বন্দর। যে বন্দর আমি বাঁচিয়েছি। যে বন্দর আমি চালাই। যে বন্দর আমি হিসাব রাখি। যে বন্দরে জাহাজ আসে। জাহাজ যায়। পণ্য নামে। পণ্য ওঠে। বণিক হাসে। মাঝি গান গায়। শ্রমিক কাজ করে। সব ঠিক। সব ঠিক। সব ঠিক। কিন্তু কিছুই ঠিক না। কিছুই ঠিক না। কারণ সব ঠিক থাকার জন্য একটা জিনিস লাগে। সেটা টাকা না। সেটা সোনা না। সেটা মুক্তা না। সেটা মশলা না। সেটা বন্দর না। সেটা বাণিজ্য না। সেটা কর না। সেটা হিসাব না। সেটা খাতা না। সেটা – ভাই। ভাই। ভাই। আর ভাই নেই। নেই। নেই। শুধু আছে। আছে। আছে। শুধু আছে সেই শব্দ। ভাই। ভাই। ভাই। শব্দটা জ্বলছে আমার জিভে। পুড়ছে আমার তালু। গলে যাচ্ছে আমার দাঁত। ঝরে পড়ছে আমার গলায়। ঢুকছে আমার পেটে। নেমে যাচ্ছে আমার অন্ত্রে। মিশে যাচ্ছে আমার রক্তে। রক্ত। রক্ত। রক্ত। রক্তে মিশে যাচ্ছে ভাই। ভাই মিশে যাচ্ছে রক্তে। রক্ত মিশে যাচ্ছে ভাইয়ে। ভাই রক্ত। রক্ত ভাই। এক। এক। এক। আমরা এক ছিলাম। না। আমরা এক ছিলাম না। আমরা দুই ছিলাম। দুই। দুই। দুই। দুই হাত। দুই পা। দুই চোখ। দুই কান। দুই নাক। দুই জিভ। দুই হৃদয়। দুই আত্মা। দুই শরীর। কিন্তু এক রক্ত। এক মাংস। এক হাড়। এক মজ্জা। এক মা। এক বাবা। এক ঘর। এক উঠোন। এক স্বপ্ন। এক দুঃস্বপ্ন। এক ভোর। এক সন্ধ্যা। এক রাত। এক তারা। এক চাঁদ। এক সূর্য। এক আগুন। এক জল। এক মাটি। এক বাতাস। এক আকাশ। এক সবকিছু। এক। এক। এক। কিন্তু এখন? এখন দুই। দুই। দুই। দুই রাজ্য। দুই ধর্ম। দুই পথ। দুই সত্য। দুই মিথ্যা। দুই ভালোবাসা। দুই ঘৃণা। দুই অশান্তি। দুই বন্দর। দুই বাণিজ্য। দুই হিসাব। দুই খাতা। দুই মুক্তা। দুই মশলা। দুই সোনা। দুই রক্ত। দুই ছাই। দুই পূর্ণতা। দুই অনন্ত। যা আসে না। কিন্তু আসবে। আসবে। আসবে?
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।