এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • রাত্রি ঝড় 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ৮৫ বার পঠিত
  • ত্রিদিবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল গড়িয়াহাটের মোড়ে। একটা ঢাউস গাড়ি থেকে নেমে একটা ঝলমলে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকতে যাচ্ছিল। সুমন্ত্র ওখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তার বৌ সংহিতার সঙ্গে। ত্রিদিবের মুখোমুখি পড়ে গেল। এড়ানো গেল না। ত্রিদিব তার সামাজিক অবস্থান, যাকে বলে স্টেটাস নিয়ে সর্বদাই বেশ বিড়ম্বনার মধ্যে থাকে। বিশেষ করে এককালের অতি ঘনিষ্ঠ সাফল্যের পাহাড়ে ওঠা বাল্যবন্ধুদের সামনাসামনি একেবারেই হতে চায় না।
    ----- ' আরে সুমন্ত্র না ! '
    সুমন্ত্র ত্রিদিব শিকদারকে দেখতে পেয়েছে একটু দূর থেকে। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পরে দেখেও স্পষ্ট চিনতেও পেরেছে। শিবপুর বি ই-র ইঞ্জিনীয়ার ত্রিদিব এবং বাবার অবর্তমানে তার নিজের হাতে গড়া ব্যবসার মালিক হয়ে টাকা করেছে প্রচুর। বিয়ে টিয়ে করেছিল একসময়ে । এখনও চালিয়ে যাচ্ছে সেই সাত পাকে বাঁধা সম্পর্কটা। সবই পুরনো বন্ধুবান্ধবের মুখে শোনা।
    সে যাই হোক, সুমন্ত্র ত্রিদিবের চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছিল। তার ব্যর্থতাভারাক্রান্ত অকিঞ্চিৎকর জীবন নিয়ে উজ্জ্বল সফলতায় মোড়া ছোটবেলার প্রাক্তন সাথীদের মুখোমুখি পারতপক্ষে হতে চায় না। কিন্তু তা করা গেল না।
    ----- ' আ... রে ... ত্রিদিব যে .... ' শুকনো গলায় বলল সুমন্ত্র। ত্রিদিবকে এড়ানো গেল না, আবার সহজও হতে পারল না সে।
    ত্রিদিবের সঙ্গী এক ভদ্রমহিলা এবং একজন একুশ বাইশ বছরের মেয়ে দোকানের ভিতর ঢুকে গেল। সুমন্ত্র আন্দাজ করল ওরা নিশ্চয়ই ত্রিদিবের বৌ এবং মেয়ে। ত্রিদিব ওদের থামিয়ে সুমন্ত্রর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার কোন প্রয়োজন বোধ করল না। সুমন্ত্র কানাঘুষায় দু একজন পুরনো বন্ধুর কাছে শুনেছে মদ আর নারীর নেশায় আকন্ঠ ডুবে আছে ত্রিদিব। পয়সার আগুনে জ্বলছে শরীর। ত্রিদিবের বৌ অনামিকার দুচোখে খুব সম্ভবত ঠুলি। কিছু দেখেও দেখে না, শুনেও শোনে না। পয়সার জলে ধৌতিকরন প্রক্রিয়া চলছে। মেয়ে রাত্রি শুধু গুমরে মরে। দেয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে জীবনটা বের করে দিতে ইচ্ছে করে ওর। রক্তে যেন ঘেন্নার বিষ জমতে থাকে।
    বাইরে দাঁড়িয়ে ত্রিদিব মুরুব্বীর চালে সুমন্ত্রর কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়াল।
    ----- ' তার পর ... তুই কি করছিস এখন ? '
    ---- ' ওই ... একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে আছি। ইঞ্জিনীয়ারিং কোম্পানি। আমি কমার্শিয়াল কাজ দেখি ... '
    ত্রিদিব তাচ্ছিল্যভরে বলল, ' ও আচ্ছা ... তা ভাল দেয় টেয় তো ? ' ত্রিদিব নগ্ন ভঙ্গীতে জিজ্ঞাসা করে।
    সুমন্ত্র তার স্বভাবগত অস্বস্তিবোধ করতে থাকে। অসংলগ্নভাবে বলল, ' হ্যা ... ওই আর কি ... চলে যায় .... '
    ত্রিদিব হাত বেড় দিয়ে আলতোভাবে সুমন্ত্রর কাঁধ ধরেই আছে। ওর কাঁধে হাত দিয়ে সংহিতার চোখে হাসিমাখা চোখ রেখে বলে, ' শুধু চলে গেলে তো হবে না বৌদি ... এ দুনিয়ায় যার টাকা নেই, তার কিছুই নেই ... টাকা থাকলে সবকিছু আপনার পায়ের তলায় ... '
    সংহিতা শান্তভাবে বলল, ' তা হবে হয়ত .... '
    ---- ' আরে ... হয়ত কি বলছেন ... সেটাই ঘটনা। ' বলে সুমন্ত্রর কাঁধ ছেড়ে দিয়ে সংহিতার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল অমায়িক মুখে জুলজুলে চোখে, বোধহয় টাকার কিস্যাটা আরও ভালভাবে বোঝানোর জন্য। পাহাড়ি কোন পাইথনের মতো ধীর লয়ে স্থির চোখে শিকারের দিকে এগোতে লাগল।
    সুমন্ত্র বুঝতে পারল না তার ঠিক কি করা উচিত। ত্রিদিব এখনও এমন কিছু করেনি যে জন্য ঝগড়া করা যায়। তাছাড়া ঝগড়া প্রতিবাদ ... এসব করা তার ধাতে নেই। কোনদিনই উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত কাজটা সে করে উঠতে পারেনি জীবনে। তাই তো আজ এই অবস্থা তার।
    সংহিতা যে ভীষণ বিপন্ন বোধ করছে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
    ' শুনুন ... আপনাকে বুঝিয়ে বলি ... আপনি সুমন্ত্রর ইয়ে ... তাই আমারও তো আপনজন ... তাই বলছি ... ' বলে তার জানা খেলার পুরনো অনুশীলন এখানে আবার খেলে দিল। সংহিতার একটা হাত নিজের দুহাতে তুলে নিল। বিশাল এক দোকানের সামনে জনাকীর্ণ ফুটপাথের ওপর ত্রিদিবের এরকম বেপরোয়া এবং লাগামছাড়া উন্মাদনা দেখে সংহিতা বিস্ময়ে লজ্জায় হতচকিত এবং ভীষণ জড়োসড় হয়ে গেল। এরকম ধরনের পুরুষ সে আগে কখনও দেখেনি। নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেবার শক্তিও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে।
    ত্রিদিব বলল, ' তোমাকে আপন ভাবি বলেই তো .... '
    তার বাকি কথাগুলো আর মুখ থেকে বেরোল না। ত্রিদিবের বাঁ গালে আছড়ে পড়ল প্রচন্ড এক চড়। তার সোনালী ফ্রেমের চশমাটা ছিটকে পড়ল মাটিতে।
    হতচকিত, বিমূঢ় ত্রিদিব শিকদার দেখতে পেল
    তার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে সংহিতার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার মেয়ে রাত্রি। দুচোখের তারা থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে গনগনে ঘৃণার আগুন।
    *******************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন