এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ভোটের 'লাইফ সার্টিফিকেট': শতাংশের সার্কাস আর অস্তিত্বের লড়াই

    অখিল রঞ্জন দে লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ২১ বার পঠিত
  • ভোটের 'লাইফ সার্টিফিকেট': শতাংশের সার্কাস আর অস্তিত্বের লড়াই

    গবেষক থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের জিতেন কাকা—সবাই এখন ক্যালকুলেটর নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। এবারের ভোটের এই ৯২ শতাংশের গগনচুম্বী ফিগার দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা যেন একটা পেল্লায় সাইজের অংকের ল্যাবরেটরিতে পরিণত হয়েছে। সোজা কথায় বললে, রাষ্ট্র যখন ডাস্টার দিয়ে ভোটার তালিকার ‘হর’ কমিয়ে ছোট করে দিল, তখন লাইনে চারটে লোক বাড়লেও ‘লব’ এমন লাফ মারল যে স্বয়ং আর্যভট্টও দ্বিতীয়বার জিরো আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ হতেন। কিন্তু এই সংখ্যার ভেল্কির আড়ালে উঁকি দিলে দেখা যায় এক অদ্ভুত মনের লড়াই—যার পোশাকি নাম ‘বিস্মৃতির ভয়’।

    সবচেয়ে করুণ অথচ কড়া দৃশ্যটা দেখা গেল পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার মিছিলে। এই মানুষগুলো স্রেফ দু-পয়সা বেশি রোজগারের আশায় বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র যখন যান্ত্রিক ‘শুদ্ধিকরণ’-এর নামে ভোটার তালিকার প্যাঁচে ফেলে তাদের অস্তিত্ব টলিয়ে দিল, তখনই স্বপ্নটা দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াল। এই যে হাজার মাইল দূর থেকে ট্রেনের দরজায় বাদুড়ঝোলা হয়ে শ্রমিকদের ঘরে ফেরা—এটা কোনও রাজনৈতিক উৎসব নয়, বরং নিজের নাগরিকত্ব বাঁচানোর এক করুণ আকুতি। রাষ্ট্র খুব কৌশলে এদের অবচেতন মনে এই ভয়টা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে যে—বাপু, ভোট না দিলে কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নামটা চিরতরে ডিলিট হয়ে যেতে পারে!

    এরই মধ্যে আবার নতুন এক গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে বাজারে।পরিযায়ী শ্রমিকদের এই ঘরমুখী মিছিলে কেবল অস্তিত্বের টান ছিল না, ছিল ভিনরাজ্যের ‘রাজনৈতিক দাদাদের’ কড়া ফরমান। কাজের জায়গায় শান্তি আর রুটিরুজি বজায় রাখতে যদি কোনও বিশেষ রঙের বোতাম টেপার শর্তে টিকিট কাটতে হয়, তবে তো বলতেই হবে—সোনায় সোহাগা! একদিকে ঘরের টানে ফেরা, অন্যদিকে দাদাদের নির্দেশ মেনে চলা—এই দুই যাঁতাকলে পড়ে শ্রমিকদের অবস্থা এখন ‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ’। এই অদৃশ্য চাবুকের ঘায়েই তারা আজ কামধাম ফেলে নিজের শেকড়ে ফিরে এসেছে। এদের ফেরার জন্য যে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ হলো, ওটা স্রেফ নোট নয়; ওটা হলো তপ্ত রোদে হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘাম দিয়ে কেনা জমানো পুঁজি। রাষ্ট্রের এই প্রশাসনিক সার্কাস আর রাজনীতির এই কারিকুরিতে তাদের যে আর্থিক জরিমানা দিতে হলো, তাকে দর্শনের ভাষায় বলা যায় এক নিষ্ঠুর ‘অস্তিত্বের কর’।
    আবার বুথের সামনে মহিলাদের সেই লম্বা লাইন এক অন্য গল্পের সাক্ষী। সমাজবিজ্ঞানের চোখে এই মহিলারা আজ কেবল ভোটার নন, তাঁরা আসলে পরিবারের ‘অস্তিত্বের পাহারাদার’। বাড়ির পুরুষটি যখন কেরালা বা দিল্লিতে ঘাম বিক্রি করে টিকে থাকার রসদ জোগাচ্ছে, ঘরের লক্ষ্মীরা তখন চড়া রোদে দাঁড়িয়ে সরকারি নথিতে বংশের নামটুকু বাঁচিয়ে রাখার লড়াই লড়ছেন। তাঁরা জানেন, আঙুলের ওই নীল কালির দাগটুকু না থাকলে কাল থেকে রেশন বা সরকারি প্রকল্পের ‘পাসওয়ার্ড’ আর কাজ করবে না।
    পরিশেষে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র এক তথাকথিত ‘পরিচ্ছন্ন তালিকা’র দাবি তুললেও, তার আড়ালে রয়ে গেছে হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস। প্রশাসনিক জাঁতাকলে পড়ে যাঁদের নাম আজও তালিকায় ঢুকল না, সেই নতুন প্রজন্ম আজ নিজের দেশেই যেন ‘ডিজিটাল ব্রাত্য’। তারা ল্যাপটপ খুলে রাষ্ট্রের ‘উইন্ডোজ’ আপডেট হওয়ার অপেক্ষায় বসে আছে, আর রাষ্ট্র তাদের বলছে—"তোমার ফাইল নট ফাউন্ড!" দর্শনের সেই পুরনো প্রশ্ন—"আমি কে?"—আজ বাংলার বুথে বুথে এসে ঠেকেছে "তালিকায় কি আমার নাম আছে?"-তে। এই ৯২ শতাংশের ভিড়ে জয় কার হবে তা মহাকাল জানে, কিন্তু রাষ্ট্রের এই যান্ত্রিক শুদ্ধিকরণ যে মানুষের ঘাম দিয়ে কেনা সঞ্চয়কে স্রেফ ‘অস্তিত্ব’ প্রমাণের লড়াইয়ে খরচ করাল, তার হিসেব কি কোনো ইভিএম (EVM) রাখতে পারবে?









     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন