এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হোমো সেপিয়েন্স থেকে ডি-ভোটার: মানচিত্রের জঠরে হারানো মানুষ

    অখিল রঞ্জন দে লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত
  • হোমো সেপিয়েন্স থেকে ডি-ভোটার: মানচিত্রের জঠরে হারানো মানুষ

    বিবর্তনের আদিম লগ্নে মানুষ ছিল এক নিখাদ যাযাবর, যার কাছে গোটা পৃথিবীটা ছিল অবারিত বৈঠকখানা আর নীল আকাশটা ছিল উন্মুক্ত ছাদ। কিন্তু বিবর্তনের এক কুক্ষণে মানুষ শিকার ছেড়ে লাঙল ধরল, আর সেই সঙ্গেই জন্ম নিল ‘সীমানা’ নামক এক অদ্ভুত ভূত। যাযাবর যুগের সেই অবাধ মস্তানি থমকে গেল জমির সংকীর্ণ আলপথে; মানুষ ভাবল মাটি চাষ করে সে প্রকৃতিকে জিতছে, কিন্তু আসলে সে নিজেকেই এক-একটা ‘রাজনৈতিক খোপে’ বন্দি করে ফেলল। শুরু হলো ‘আমার জমি-তোমার জমি’র সেই আদিম ক্যাচাল, যা আজ আধুনিক রাষ্ট্রে এসে এক চূড়ান্ত ‘বেনাগরিক সার্কাসে’ পরিণত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, মানুষ কাঁটাতার দিয়ে মানচিত্র আঁকলেও প্রকৃতি কিন্তু আজও সেই আদিম যাযাবর নিয়মেই অটল।

    প্রকৃতি কেবল মানুষ বা পশুপাখিকেই নয়, এমনকি স্থবির উদ্ভিদকেও এক অলিখিত ‘এলাকা’ বা টেরিটরি তৈরি করতে শেখায়।প্রকৃতিতে এলাকা দখল বা 'টেরিটরি' বজায় রাখাটা কোনো ইগো নয়, ওটা পেটের দায়। একটা কুকুর যখন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ার কুকুরের দিকে ঘেউ ঘেউ করে, সে আসলে তার 'রেশন কার্ড' বা খাদ্যের এলাকা বাঁচাচ্ছে। এমনকি একটা আম গাছও পাশের জাম গাছকে একটু কনুই মেরে সরিয়ে দিতে চায় যাতে নিজের রোদটুকু ঠিকঠাক পায়। প্রকৃতিতে এই ‘পুশব্যাক’ বা এলাকা দখল বেশ সপ্রতিভ; সেখানে পরিচয়পত্র লাগে না, লাগে গায়ের জোর আর উপযোগিতা। সমতলের বট-অশ্বত্থ যেমন নোনা জলের ম্যানগ্রোভ অরণ্যে গিয়ে টিকে থাকতে পারে না, তেমনি সমুদ্র উপকূলের নারকেল গাছ হিমালয়ের বরফে গিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ায় না। এমনকি একই পাহাড়ে উচ্চতার সামান্য হেরফেরে গাছের প্রজাতি আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমূল বদলে যায়—পাদদেশে যে শাল-সেগুন, চূড়ায় সে-ই হয়ে যায় পাইন বা রডোডেনড্রন। প্রকৃতির এই বিভাজন আসলে টিকে থাকার কৌশল, যেখানে প্রতিটি প্রাণের জন্য একটি নির্দিষ্ট নিরাপদ আশ্রয় বরাদ্দ থাকে। মানুষের দেশ বা এলাকা তৈরির আদিম পাঠটিও হয়তো এসেছিল প্রকৃতির এই বিবর্তনীয় ইশারা থেকেই। কিন্তু প্রকৃতির এই সীমানা হলো প্রাণ বাঁচানোর জীবনরেখা, আর মানুষের তৈরি রাজনৈতিক বর্ডার হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার কাঁটাতার। গাছেরা নিজ নিজ এলাকায় সগৌরবে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়, কিন্তু রাষ্ট্র যখন কোনো মানুষকে ডি-ভোটার করে তাকে শিকড়হীন করে ফেলে, তখন সে প্রকৃতির সেই অমোঘ নিয়মের বিরুদ্ধেই এক যান্ত্রিক যুদ্ধ ঘোষণা করে।

    একটু ভেবে দেখলে দেখা যায়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মশাগুলো যখন ওপার থেকে এপারে এসে আমাদের রক্ত খায়, বিএসএফ কি তাদের থামিয়ে জিজ্ঞাসা করে—"এই! তোমার এনআরসি-র কাগজ কোথায়? এমনকি বর্ডার পার করা চতুর শেয়ালটা যখন ওপার থেকে এপারে এসে মুরগি চুরি করে পালায়, তখন কি তাকে 'ইন্টারপোল' দিয়ে ধরানো হয়? আকাশের মেঘেরা যখন ভেসে আসে, তারা কি কোনো চেকপোস্টে ভিসা দেখায়?এমনকি এপারের বুনো ঘাস যখন কাঁটাতারের তলা দিয়ে ওপারে গিয়ে মাথা চাড়া দেয়, তখন কি কেউ তাকে উপড়ে ফেলে দিয়ে বলে— 'তুমি ঘুসপেটিয়া', তোমাকে বন্দী করা হলো? গঙ্গার ইলিশ মাছ তো দিব্যি দুই দেশের জলসীমায় দাদাগিরি করে বেড়ায়। এমনকি কুকুরদের কথা ভাবুন, পাড়ার বর্ডার নিয়ে তাদের লড়াই আছে ঠিকই, কিন্তু এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় তাড়া খেলে তারা পাশের গলিতে গিয়ে আশ্রয় পায়; সমাজ তাকে বে-পাড়ার কুকুর ঘোষণা করে বনবাসে পাঠায় না। অথচ সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ আজ এক কাগজের মায়াজালে বন্দি; প্রকৃতির কাছে মানুষের এই সীমানা-বিলাস এক বিরাট কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়।

    প্রাচীন ধর্ম বা দর্শন মানুষকে আত্মা বা সজীব মানুষ হিসেবে চিনত। সেখানে 'হিজরত' বা 'মুসাফির' হওয়া ছিলসম্মানের।প্রাচীন ভারতে রাজারা কাউকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করলেও সে অন্য রাজ্যে গিয়ে প্রজা হওয়ার সুযোগ পেত; রাষ্ট্র তাকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে ‘দেশহীন মানুষ’ বানিয়ে দিত না। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র মানুষকে দেখে স্রেফ একটি 'সিরিয়াল নম্বর' হিসেবে। আপনি মানুষ হিসেবে কতটা সৎ বা আপনার পূর্বপুরুষ এই মাটিতে কতটা ঘাম ঝরিয়েছে, তার চেয়ে বড় পরিচয় হলো আপনার পকেটে প্লাস্টিকের একটি আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড আছে কি না। যখনই সেই নম্বরটি ডেটাবেস থেকে মুছে যায় বা কার্ডটি হারিয়ে যায়, তখনই আপনি রাষ্ট্রের কাছে স্রেফ একটা 'এরর মেসেজ' বা জ্যান্ত মৃতদেহ। আপনার অস্তিত্ব এখন আর আপনার হৃদস্পন্দনে নেই, আছে সরকারি সার্ভারের সিগন্যালে।

    এখানেই আধুনিক সভ্যতার ট্র্যাজেডি। আন্তর্জাতিক আইন খুব গম্ভীর গলায় বলে — "প্রত্যেক মানুষের একটি নাগরিকত্বের অধিকার আছে এবং কাউকে অন্যায়ভাবে দেশহীন করা যাবে না।" কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রাষ্ট্র যখন কাউকে ডি-ভোটার বা ‘বেনাগরিক’ তকমা দিয়ে এক জৈবিক শূন্যতা বা ব্ল্যাকহোলে পাঠিয়ে দেয়, তখন সেই গালভরা আইন কেবল ড্রয়িংরুমের বইয়ের পাতাতেই শোভা পায়। বিবর্তন শিখিয়েছিল "লড়াই করো নয়তো জায়গা ছাড়ো" — বাঘের এলাকা দখল হলে সে লড়াই করে অথবা অন্য জঙ্গলে চলে যায়। কিন্তু একজন দেশহীন মানুষ লড়াই করতে গেলে ‘সন্ত্রাসী’ আর অন্য দেশে যেতে চাইলে ‘অনুপ্রবেশকারী’। আধুনিক বর্ডার মানুষের লড়াই করার আদিম শক্তি কেড়ে নিয়েছে এবং পালানোর পথও বন্ধ করে দিয়েছে।প্রকৃতির লড়াইয়ে অন্তত একটা সম্মানজনক প্রস্থান থাকে, কিন্তু মানুষের তৈরি এই আইনি জালে কেবল আছে দীর্ঘশ্বাস আর আমলাতান্ত্রিক রসিকতা। তবে বিবর্তন সাক্ষী দেয়, কোনো কৃত্রিম দেয়ালই চিরস্থায়ী নয়। তাই আশা করি এমন এক নতুন বিশ্ব-দর্শনের, যেখানে মানুষের পরিচয়তার পকেটের কাগজের নম্বর দিয়ে নয় বরং তার ‘প্রাণশক্তি’ দিয়ে হবে।প্রযুক্তির যুগে মানুষ যখন ইন্টারনেটে একাকার, তখন ভৌগোলিক কাঁটাতারগুলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। হয়তো এমন এক দিন আসবে যখন মানুষের পরিচয় তার 'দেশ' দিয়ে নয়, তার 'মানবিক অবদান' দিয়ে হবে। আধুনিক আইনবিদরা এখন নদী বা জঙ্গলকে 'আইনি ব্যক্তি' হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। যদি একটি নদী স্বাধীন হতে পারে, তবে সেই নদীর পাড়ে থাকা মানুষটি কেন 'দেশহীন' হয়ে খাঁচায় বন্দি থাকবে? এই বোধদয় থেকেই নতুন দর্শনের জন্ম হবে। নদীর জল যেমন দু-দেশের মাঝখানে বয়ে চলে কিন্তু কোনো দেশেরই গোলাম নয়, মানুষও তেমনই প্রকৃতির স্বাধীন সন্তান হিসেবে তার হারানো অধিকার ফিরে পাবে। কারণ দিনশেষে প্রকৃতি কোনোদিন ‘বেনাগরিক’ চেনে না, সে চেনে শুধু তার অবাধ্য ও জীবন্ত সন্তানদের।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন