বাঙালি প্রতিবাদ ভালোবাসে। এটা জিনগত। ডিএনএ পরীক্ষা করলে দেখা যাবে প্রতিটি বাঙালির ক্রোমোজোমে একটি ক্ষুদ্র মাইক্রোফোন এম্বেড করা আছে, যেটা সুযোগ পেলেই অ্যাক্টিভেট হয়ে যায়। জন্মের সময় বাঙালি কাঁদে না — স্লোগান দেয়। "আমাকে ঠিকঠাক খাওয়ানো হচ্ছে না, এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করি।" তারপর সারাজীবন এই থিমের ওপর ভ্যারিয়েশন চলতে থাকে।
তো যখন খবর এলো যে এস্প্ল্যানেড মেট্রো চ্যানেলের সামনে 'SIR 2026' — অর্থাৎ ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে পাঁচদিনের মহাধরনা হবে — তখন বাঙালি মন একটা অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল। অবশেষে। কিছু একটা হচ্ছে। কোথাও একটা অবিচার হচ্ছে। এবং সেই অবিচারের বিরুদ্ধে কেউ একজন রাস্তায় বসছেন। বাঙালির সকালটা সার্থক হলো।
প্রথমে বলা দরকার, বাঙালি ভোটার তালিকা কী সেটা জানে না। জানার দরকারও মনে করে না। কিন্তু সেটা যে 'সংশোধন' করা হচ্ছে — এই খবরটুকুই যথেষ্ট। কারণ বাঙালির কাছে যেকোনো 'সংশোধন' মানেই হলো হস্তক্ষেপ, হস্তক্ষেপ মানেই ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্র মানেই প্রতিবাদ, এবং প্রতিবাদ মানেই মাঠে নামা। এই চেইন রিঅ্যাকশন এতটাই স্বাভাবিক যে মাঝখানে 'বিষয়টা আসলে কী?' — এই প্রশ্নটা পড়েই না।
---
ধরনামঞ্চে যখন পৌঁছলাম, দেখলাম একটি সুবিশাল তাঁবু। ভেতরে এয়ার কন্ডিশনার চলছে। বাইরে বোর্ডে লেখা — "এ অন্যায় সহ্য করব না।" ভেতরে আরামসে বসে যাঁরা অন্যায় সহ্য করছেন না, তাঁদের দেখে মনে হচ্ছিল অন্যায়টা সহ্য করার কাজটি অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য। তাই বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। যুক্তিটা মন্দ নয়। ক্লান্ত হয়ে পড়লে প্রতিবাদের মান কমে যায়। প্রতিবাদের মান বজায় রাখতে হলে ফ্রেশ থাকা দরকার। ফ্রেশ থাকতে হলে এসি দরকার। এসি থাকলে তাঁবু দরকার। তাঁবু থাকলে ক্যাটারিং দরকার। ক্যাটারিং থাকলে... আস্তে আস্তে বুঝলাম, এটা আসলে একটা দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক প্রজেক্ট যার সাথে অনশনের সম্পর্ক শুধু নামে।
বাঙালির অনশন প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়। বাঙালি অনশনে বসে ঠিকই, কিন্তু অনশন শুরুর আগে একবার ভালো করে খেয়ে নেয়। "আজ থেকে খাব না" বলার আগে আগের রাতে বিরিয়ানি খাওয়াটা বাঙালির কাছে প্রায় আচারের মতো। শেষ ভোজন। এতে অনশনের প্রতি সম্মান দেখানো হয়। নইলে হঠাৎ না খেলে পেট রাগ করে। পেট রাগ করলে মেজাজ খারাপ হয়। মেজাজ খারাপ হলে ভালো স্লোগান মনে আসে না। তাই ভালো স্লোগানের স্বার্থে খেয়ে নেওয়া জরুরি। এই সার্কুলার লজিকটি বাঙালি স্বভাবতই বোঝে।
---
দ্বিতীয় দিন মঞ্চে বক্তৃতার ধুম। একের পর এক বক্তা উঠছেন। সবার বক্তব্যের মূল থিম একটাই — "এ ষড়যন্ত্র।" বক্তাদের মধ্যে একজন এমন আছেন যিনি 'ষড়যন্ত্র' শব্দটি এক বক্তৃতায় সাতাশবার বললেন। আমি গুনেছি। সাতাশবার। এই সংখ্যাটি মনে রাখবেন — এটি একটি কীর্তি। বাঙালি বুদ্ধিজীবীর কাছে 'ষড়যন্ত্র' শব্দটি যা, সেটা হলো ইউনিভার্সাল সলভেন্ট। যে কোনো প্রশ্নে ঢেলে দাও, সব গলে যায়। "কেন বিদ্যুৎ নেই?" — ষড়যন্ত্র। "কেন রাস্তা ভাঙা?" — ষড়যন্ত্র। "কেন বৃষ্টিতে শহর ডুবে যায়?" — ষড়যন্ত্র। এই শব্দটি আবিষ্কার করা যে বাঙালির কাজ, সে যে নোবেল পায়নি, সেটাও অবশ্যই একটি ষড়যন্ত্র।
প্রতিবাদীরা বলছেন, ভোটার তালিকা সংশোধন মানে 'বাংলার মানুষকে বঞ্চিত করা।' এই যুক্তিটি শুনলে একটু থামতে হয়। কারণ ভোটার তালিকায় যদি মৃত মানুষের নাম থাকে, তাহলে সেই মৃত মানুষকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া তো তাঁকে সম্মান করা। মৃত্যুর পরেও তাঁকে ভোটারের মর্যাদা দিয়ে রাখাটা কি সম্মানজনক? এই প্রশ্নটি মঞ্চে কেউ তোলেননি। কারণ এই প্রশ্ন তুললে পরবর্তী প্রশ্নটি আসবে — মৃত মানুষের নামে ভোট পড়ে কার সুবিধা হয়? এবং এই প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার চেয়ে 'ষড়যন্ত্র' বলাটা অনেক সহজ এবং পরিশ্রমও কম।
বাঙালি মধ্যবিত্ত কিন্তু মনে মনে এই প্রশ্নটা করে। তারপর চা খেতে খেতে ভুলে যায়। চা ভুলিয়ে দেওয়ার জন্যই আছে। বাঙালির চা হলো সেই যন্ত্র যা দিয়ে বিবেক নিষ্ক্রিয় করা হয়। দুই চামচ চিনি, একটু দুধ, আর বিবেক নিখোঁজ।
---
তৃতীয় দিনে মঞ্চের আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম, এস্প্ল্যানেডের এক বয়স্ক রিকশাচালক অত্যন্ত বিরক্ত মুখে বসে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম, "কী হয়েছে দাদা?"
তিনি বললেন, "তিনদিন হলো রাস্তা বন্ধ। ভাড়া নেই।"
বললাম, "কিন্তু এই আন্দোলন তো আপনার জন্যই। জনগণের জন্য।"
তিনি বললেন, "আমি জনগণ না?"
এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। বাঙালি রাজনীতিতে 'জনগণ' একটি বিশেষ ধারণা। জনগণ সবসময় মঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকে, হাততালি দেয়, কিন্তু রাস্তায় হেঁটে যায় না। যারা রাস্তায় হাঁটে এবং রাস্তা বন্ধ পেয়ে বিরক্ত হয় — তারা 'জনগণ' নয়, তারা হলো 'সাধারণ মানুষ।' 'সাধারণ মানুষ' এবং 'জনগণ' — এই দুই শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য হলো মাইক্রোফোনের দূরত্ব। যার কাছে মাইক্রোফোন, সে জনগণের প্রতিনিধি। যার কাছে নেই, সে জনগণ।
কিন্তু মুশকিল হলো, বাঙালি মধ্যবিত্ত এই বিষয়টা জানে। জানা সত্ত্বেও চুপ থাকে। কারণ চুপ থাকাটাও একটা সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের জন্য কোনো পরিশ্রম নেই। রাজনৈতিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে সেতু হলো বাঙালির চুপ করে থাকার ক্ষমতা। এটা একটা শিল্প। এই শিল্পে বাঙালি পৃথিবীর মধ্যে সেরা।
---
চতুর্থ দিনে মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলো। বাঙালির প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না হলে প্রতিবাদটা সম্পূর্ণ হয় না। এটা নিয়মের মধ্যে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ একটু পড়তে হবে, একটা গান গাইতে হবে, একটা কবিতা আবৃত্তি করতে হবে — তারপর স্লোগান। এই ক্রমটি বাঙালি বিপ্লবের সংবিধানে লেখা আছে।
কবিতায় এল 'SIR মানে সাম্রাজ্যবাদ।' এই লাইনটি শুনে আমার পাশে দাঁড়ানো একজন ভদ্রলোক আস্তে বললেন, "SIR মানে Special Intensive Revision।"
আমি বললাম, "হ্যাঁ।"
তিনি বললেন, "কবিতায় কি সেটা বলা যেত না?"
আমি বললাম, "তাহলে মিলটা কীভাবে করতেন?"
তিনি চুপ হয়ে গেলেন। কারণ কবিতায় বাস্তবতার চেয়ে মিল বেশি জরুরি। বাঙালি কবি জানেন, সত্যের সাথে মিলের চেয়ে শব্দের সাথে মিল অনেক সহজ। 'সাম্রাজ্যবাদ' শব্দটা অনেক কাজের — যেকোনো কিছুর সাথে মেলে, যেকোনো কবিতায় ঢোকে, এবং দর্শক হাততালি দেয়। 'ভোটার তালিকা পর্যালোচনা' নিয়ে কবিতা লেখা কঠিন। শব্দগুলো ভারী, ছন্দ মেলে না, এবং হাততালি পাওয়া যায় না।
এই হলো বাঙালি সংস্কৃতির মূল সমস্যা। আমরা সত্যের চেয়ে সৌন্দর্য পছন্দ করি। সত্য যদি কুৎসিত হয়, তাহলে সেটা না বলে একটা সুন্দর মিথ্যা বলাই ভালো। মিথ্যাটা যদি ছন্দে বলা যায়, তাহলে সেটা আর মিথ্যা থাকে না, সংস্কৃতি হয়ে যায়।
---
এখন একটু গুরুতর কথা বলি, কারণ হাসতে হাসতে থামলে চলবে না।
বাঙালি বিরোধিতা করতে ভালোবাসে — এটা সত্যি। কিন্তু কোন বিরোধিতা? শুধু সেই বিরোধিতা যেটা নিরাপদ। যেটা করলে পুরস্কার আছে, শাস্তি নেই। রাস্তায় বড় দলের মঞ্চে গিয়ে স্লোগান দেওয়া নিরাপদ বিরোধিতা। কিন্তু পাড়ার মাস্তান যখন দোকানদারকে তোলা তোলে — তখন বাঙালি মধ্যবিত্ত জানালা বন্ধ করে দেয়। সেটা নিরাপদ বিরোধিতা নয়। তখন 'ষড়যন্ত্র' শব্দটাও মাথায় আসে না।
ভোটার তালিকা সংশোধন — এর বিরুদ্ধে পথে নামা নিরাপদ, কারণ পেছনে একটি বড় দল আছে। পেছনে দল না থাকলে একই মানুষ একই বিষয়ে রাস্তায় নামত না। এই সত্যটা বাঙালি জানে। কিন্তু স্বীকার করে না। স্বীকার করলে আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। বাঙালির আত্মসম্মান অত্যন্ত নাজুক এবং পরিচর্যা-নির্ভর। প্রতিদিন একটু করে মিথ্যা দিয়ে সেচন করতে হয়, নইলে শুকিয়ে যায়।
---
পঞ্চম দিনে ধরনার সমাপ্তি ঘোষণা হলো। ঘোষণা এলো — "আমরা জিতে গেছি।"
সারা জীবনে বাঙালির সবচেয়ে পরিচিত বাক্য এটি। "আমরা জিতে গেছি।" এই বাক্যটির বিশেষত্ব হলো, এর জন্য কোনো বাস্তব জয়ের দরকার নেই। জয়ের অনুভূতিটুকুই যথেষ্ট। কমিশন পিছিয়েছে? না। কেন্দ্র মাথা নত করেছে? না। তালিকা সংশোধন থামানো গেছে? না। কিন্তু "জনগণের সমর্থন পেয়েছি" — এই এক বাক্যে সব জয়।
আমাদের পাড়ায় এক বৃদ্ধ থাকেন। তিনি প্রতিদিন সকালে উঠে বলেন, "আজ ভালো দিন হবে।" সারাদিন নানা সমস্যা হয়। রাতে ঘুমানোর আগে বলেন, "আজ ভালোই কাটল।" এই মানসিক স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী বাঙালি রাজনীতিও চলে। প্রতিটি প্রতিবাদ সফল। প্রতিটি আন্দোলন ঐতিহাসিক। প্রতিটি ধরনা মাইলফলক। ইতিহাসে কোনো ব্যর্থ আন্দোলন নেই — শুধু "এখনো সময় হয়নি" আন্দোলন আছে।
এই আশাবাদটি মনোরোগের কাছাকাছি এবং এটাই বাঙালির বেঁচে থাকার শক্তি — এই দুটো সত্য একসাথে সত্যি। এটা মাথায় রাখলে বাঙালিকে বোঝা অনেক সহজ হয়।
---
ধরনা শেষে রাস্তা পরিষ্কার হলো। তাঁবু উঠল। ক্যাটারিং ভ্যান চলে গেল। রিকশাচালক আবার প্যাডেল মারতে শুরু করলেন। দোকানপাট খুলল।
এবং কলকাতার সকাল আবার স্বাভাবিক হলো।
স্বাভাবিক মানে কী? স্বাভাবিক মানে রাস্তায় গর্ত আছে। জলের পাইপ ফুটো। স্কুলে শিক্ষক নেই। হাসপাতালে ওষুধ নেই। ট্রামলাইনে ঘাস গজিয়েছে। এই 'স্বাভাবিক'-এর বিরুদ্ধে কেউ পাঁচদিন এসি তাঁবুতে বসে প্রতিবাদ করেননি। কারণ এই সমস্যাগুলো রাজনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। এগুলো 'প্রশাসনিক সমস্যা।' আর প্রশাসনিক সমস্যার জন্য ক্যাটারিং বুক করা যায় না।
বাঙালির কাছে সমস্যার দুটো শ্রেণি আছে। এক — রাজনৈতিক সমস্যা, যেগুলো নিয়ে রাস্তায় নামা যায়, পত্রিকায় ছবি আসে, ইউটিউবে সাবস্ক্রাইবার বাড়ে। দুই — বাস্তব সমস্যা, যেগুলো মোকাবিলা করতে হলে রোজ কাজ করতে হয়, ক্যামেরা থাকে না, হাততালিও আসে না। বাঙালি প্রথম শ্রেণির সমস্যায় দারুণ উৎসাহী এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে ক্রমাগত ফেল করছে। কিন্তু ফেলের মার্কশিটটা লুকিয়ে রাখে এবং উৎসাহের শংসাপত্রটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেওয়ালে ঝোলায়।
---
সবশেষে একটা কথা বলি।
এই ধরনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী? শিক্ষা হলো — বাঙালি একদিন নিজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে। নিজের অভ্যাসের বিরুদ্ধে, নিজের কাপুরুষতার বিরুদ্ধে, নিজের সুবিধাবাদিতার বিরুদ্ধে, নিজের ভুলে যাওয়ার অভ্যাসের বিরুদ্ধে। সেদিন তাঁবু থাকবে না, ক্যাটারিং থাকবে না, ক্যামেরা থাকবে না — শুধু একটা খালি রাস্তা আর একজন বাঙালি, যে মুখোমুখি হচ্ছে নিজের আয়নার।
সেই প্রতিবাদের কোনো স্লোগান নেই। সেই প্রতিবাদে হাততালি নেই। কিন্তু সেই প্রতিবাদটুকু হলে বাংলা বাঁচবে।
তার আগে পর্যন্ত — চা খান। সিগারেট ধরান। পত্রিকা পড়ুন। এবং মনে মনে ভাবুন, "কিছু একটা করা উচিত।"
এটুকুই বাঙালির বিপ্লব। এটুকুতেই বাঙালি সুখী।
এবং এই সুখটুকু — এই অদ্ভুত, অযৌক্তিক, আত্মঘাতী সুখটুকু — কেড়ে নিলে বাঙালি আর বাঙালি থাকে না।
তাই কেউ কেড়ে নেয় না।
---
লেখকের নোট: এই রচনাটি লেখার পর লেখক নিজেও অনুভব করলেন যে তাঁর একটা চা দরকার। তিনি রান্নাঘরে গেলেন। চা হলো। পৃথিবী একইরকম রইল।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।