এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নাটকঃ ফুসমন্তর

    Sagarmay Mandal লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৩ মার্চ ২০২৬ | ৮৬ বার পঠিত
  • দ্বিতীয় দৃশ্য

    [ গনক ঠাকুরের আশ্রম। মা কালির ছবিতে মালা পড়িয়ে ধুপ ধুনো জ্বেলে পুজোয় রত গনক : ঠাকুর। গায়ে লাল পট্টবস্ত্র, কপালে বড় সিন্দুরের টিপ। ধুপ কাঠি হাতে নিয়ে আরতি করতে করতে গাইছে। ]

    গনক : পৃথিবীর কেহ ভালো তো বাসে না
    এ পৃথিবী ভালো বাসিতে জানে না,
    যেথা আছে শুধু ভালোবাসা বাসি সেথা যেতে মন চায় মা,
    আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলই ফুরায়ে যায় মা।

    [ গান চলাকালীন মহাদেব ও উমা আশ্রমে প্রবেশ করে। তারা চুপ করে গনকের পিছনে বসে। গান শেষ হলে সবাই হাঁটু গেড়ে প্রনাম করে। ]

    গনক : কি ব্যাপার মহাদেবদা? বউঠানকে সঙ্গে নিয়ে হঠাৎ আমার আশ্রমে উপস্থিত হলে যে! সব ঠিক আছে তো?

    মহাদেব : ওই যে গাইছিলে না, আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল।।

    গনক : হে হে হে। তোমার সাধ এখনও মেটেনি বুঝি! তা তোমার আবার অভাব কি গো? ছেলেকে বড় করেছো, তার বিয়ে দিয়ে বউমাকে ঘোরে এনেছো, এখন তো তোমার ভরা সংসার। মানুষ এর বেশি আর কি চায়? আমার তো মনে হয় তোমার তো সব সাধ পূরণ হয়ে গেছে।

    উমা : আমাদের সব সাধ পূরণ হয়ে গেলে আমরা কি আর তোমার আশ্রমে এসে তোমাকে জ্বালাতন করতাম ভাই? আমাদের সাধ আহ্লাদ সব মাটি হয়ে গেছে।

    গনক : দাঁড়াও, দাঁড়াও। কি বলতে চাইছো তোমারা, পরিস্কার করে বলো তো।

    মহাদেব : আমারা বড় বিপদে পড়েছি ভাই। একমাত্র তুমিই পারো আমদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে।

    গনক : আমি!

    উমা : হ্যাঁ ভাই, তুমিই পারো। তুমিই অগতির গতি।

    গনক : তাতো বুঝলাম। কিন্তু তোমাদের সমস্যাটি কি, সেটি না জানতে পারলে গতি হবে কি করে?

    মহাদেব : হ্যাঁ হ্যাঁ, খুলেই বলি তাহলে?

    উমা : বল বল, বলতেই তো এসেছো।

    মহাদেব : তুমি অভয় দিচ্ছ?

    উমা : হ্যাঁ বললাম তো।

    গনক : বল গো বল। নির্ভয়ে বল। তোমাদের গোপন কথা এই আশ্রমের বাইরে কেউ জানতে পারবে না।

    মহাদেব : তুমি তো জানো ভাই, কিছুদিন হল ছেলের বিয়ে দিয়েছি, কিন্তু বৌমা যা একখানা পেয়েছি না! হাড়মাস সব কালি করে দিলে গা।

    গনক : খুব দজ্জাল বুঝি?

    মহাদেব : দজ্জাল বলে দজ্জাল। মুখের কোন আগল নেই। যা মনে আসে তাই বলে। শ্বশুর ভাসুর মানে না।

    গনক : তা ছেলে কি বলে?

    উমা : সে আবার কি বলবে? সে দিনরাত বাঁশি বাজিয়ে রেফারিগিরি করে বেড়াচ্ছে।

    গনক : সে ভালো তো সারদিন খেলাধুলো নিয়ে থাকে। আর বাঁশি তো খেলার মাঠে বাজায়। কেষ্ট ঠাকুরের মতো গোপিনীদের নিয়ে কদমতলায় তো বাঁশি বাজায় না।

    উমা : সে মুরদ কি তার আছে? থাকলে তো বেঁচে যেতাম। ওই পোড়ারমুখীর মুখে ঝামা ঘসে দিয়ে আমার সাধনের জন্য অন্য একটা ভালো বৌ নিয়ে আসতাম।

    গনক : আচ্ছা, আচ্ছা বুঝলাম। বউমার সঙ্গে তোমাদের বনিবনা হচ্ছে না। সে আবার মুখে মুখে ঝগড়া করে। ছেলে তোমাদের পক্ষেও না বৌয়ের পক্ষেও না। একদম নিরপেক্ষ। বুদ্ধিমান ছেলে।

    মহাদেব : কিছু বললে?

    গনক : না না। কিছু বলি নি। ব্যাপারটা আন্দাজ করার চেষ্টা করছি। তোমরা চাইছ, বউটাকে বাড়ি থেকে বিদেয় করে দিয়ে আবার ছেলের বিয়ে দিয়ে নতুন বৌ ঘোরে আনতে। তাই তো?

    মহাদেব : একদম। ঠিক ধরেছো ভাইয়া। দাও তো ভাই বউটাকে আচ্ছা করে টাইট দিয়ে দাও। বাছাধন যেন বেশি ট্যাঁফোঁ করতে না পারে। যেন সুড়সুড় করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে যায়।

    গনক : (উমাকে) তুমিও তাই চাও বউঠান?

    উমা : হ্যাঁ ভাই। আর এটা তোমাকে করতেই হবে। আমাদের বিশ্বাস আছে তুমিই একমাত্র এটা করতে পারবে।

    গনক : শুধু বিশ্বাস থাকলে তো হবে না, মালকড়িও তো কিছু খরচ করতে হবে।

    মহাদেব : খরচ করতে হলে করবো। তুমি শুধু ওই মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বিদেয় করে দাও। দুশো, পাঁচশো কত টাকা লাগবে বলো?

    গনক : দুশো পাঁচশো তে এখন কিছু হয় না। কমপক্ষে হাজার টাকা খরচ করতে হবে। রাজী আছো?

    মহাদেব : হাজার টাকা!

    গনক : অনেক খাটনি আছে। মায়ের পুজো আরচা আছে। যাগযজ্ঞ করতে হবে। তাছাড়া এ বড় পাপের কাজ। একটা বৌকে তার স্বামীর ভিতে থেকে উচ্ছদ করা! ওর কমে হবে না। অন্য কেউ হলে বেশি বলতাম, নেহাত তুমি চেনা জানা, তাই রেটটা কম করে বললাম।

    মহাদেব : হাজার টাকা একটু বেশি হয়ে গেল না?

    গনক : বেশি হলে বেশি। দিও না। বাড়ি গিয়ে ছেলের বৌয়ের গঞ্জনা সহ্য করগে। [উমা ও মহাদেব পরস্পরের মুখের দিকে চায়] আজকাল লোকে কুকুর বিড়াল বশ করতে হাজার হাজার টাকা খরচ করছে, আর তোমরা চাইছ জলজ্যান্ত একটা মানুষকে হাফিস করে দিতে। এর কমে হবে না।

    মহাদেব : আচ্ছা, ঠিক আছে হাজার টাকাই দেব।

    উমা : তুমি শুধু ওই অলক্ষ্মীকে ঘোড় থেকে বিদেয় করে দাও।

    গনক : বিদেয় তো করে দেবই। চাইলে আমি আজিই বিদেয় করে দিতে পারি। কিন্তু ..

    উমা : কিন্তু কি?

    গনক : হুটপাট করে কিছু করলে আবার ফিরে আসার চান্স আছে। তাই এই বিদায়ের কাজটা দু দফায় করতে হবে।

    মহাদেব : তার মানে একেবারে যাবে না। আবার ফিরে আসতে পারে?

    গনক : আরে দাদা, আমাকে যখন দায়িত্ব দিয়েছো তখন আমাকে আমার কাজ করতে দাও। সে যাতে আর ফিরে আসতে না পারে তার ব্যবস্থা আগে করতে হবে।

    উমা : তার মানে খুন খারাপি নয়তো। বৌ তাড়াতে গিয়ে জেল খাটতে পারবো না।

    গনক : ছিঃ ছিঃ মায়ের সামনে ওসব কথা মুখেও আনতে নেই। ও কথা মনে আনাও পাপ।

    মহাদেব : তাহলে উপায়?

    গনক : উপায় আছে। প্রথম দফায় আমি তোমাদেরকে এক শিশি তেল-পড়া দেব। সেই তেল মায়ের নাম করে বউমার মাথায় তিন দিন মাখিয়ে দিতে হবে।

    উমা : এ্যাঁ, তা কি করে সম্ভব! আমাদের দেওয়া তেল সে মাথায় মাখবে কেন? সে তো তুলকালাম কাণ্ড করে দেবে।

    গনক : না না। কিচ্ছু করবে না। সবটা ভালোবেসে করতে হবে।

    উমা : ভালবেসে করতে হবে! ওকে কি ভালোবাসা যায় নাকি? না না , আমার দ্বারা ওসব হবে না। তুমি অন্য উপায় দেখ।

    মহাদেব : যা বাবা! ভুতের ভয়ে উঠলাম গাছে, ভুত বলে পেলাম কাছে। এলাম ঘাড় থেকে ভুত নামাতে, আর ইনি বলেন কিনা, ভুতকে ভালবেসে কাছে টেনে নিতে হবে! ও সব হবে নি বাপু।

    গনক : আরে বাবা, ব্যাপারটাকে একটু পাকাপোক্ত করতে হলে এমনটাই করতে হবে। নইলে কবে আবার সাঙ্গপাঙ্গ জুটিয়ে এনে উড়ে এসে জুড়ে বসবে। সেটা কি ভালো হবে? যদি বল তাতেই হবে তবে আমি ওকে আজই বাড়ি ছাড়া করে দিচ্ছি। পরে ফিরে এলে, ঝামেলা পাকালে আমাকে দোষ দিতে পারবে না কিন্তু।

    মহাদেব : তাই তো! খুব দু’টানাই ফেললে গনক ভাই।

    গনক : কিচ্ছু দু’টানা নেই। ভেবে দেখ, প্রথমে ভালবেসে কাছে টানে আনতে হবে.. একদম কাছে… আরও কাছে। তারপর ভালোবাসার সুতোটাকে ঘ্যাচাং করে কেটে দিলে, বৌমা কাটা ঘুড়ির মতো গোঁত্তা খেতে খেতে কোথায় হাওয়া হয়ে যাবে। আর ফিরে আসবে না। ভালোবাসার সুতটা আমি নিজে কেটে দেব।

    মহাদেব : বলছো?

    গনক : বলছি তো।

    উমা : তা তোমার ওই ভালোবাসা-বাসির খেলাটা কত দিন খেলতে হবে শুনি। আমি বাবা বেশি দিন ভালবাসতে পারবো না।

    গনক : না না বেশি দিন খেলতে হবে না। ঠিকঠাক করে ভালোবাসার খেলা খেলতে পারলে এক মাসেই হয়ে যাবে। তবে আমি কিন্তু দু’মাস সময় নেব। কোন রিস্ক আমি নেব না। যেদিন দু’মাস পূর্ণ হবে, সেদিন সুত কেটে দিয়ে আমি ধুমধাম করে মায়ের পুজো দেব।

    উমা : দু’মাস!

    গনক : হ্যাঁ গো বউঠান, বেশি দিন নয়। মাত্র দুটো মাস, মানে ষাটটা দিন। ওষুধটাকে ভালভাবে কাজ করার সময়টা দিতে হবে তো।

    উমা : সময়টা একটু কম করা যায় না?

    গনক : ওই যে বললাম, শত্রুকে কাছে টানতে হবে। আর তোমারা যা শত্রুতা করে রেখেছো, তাতে তো একদিন কাছে টানতে পারবে না। সময় লাগবে। দেখ, বাকিটা তোমাদের হাতে। যত তাড়াতাড়ি তোমরা ওকে কাছে টানতে পারবে, ততই মঙ্গল। সম্পর্কটা মাখোমাখো না হলে, দ্বিতীয় দফার ওষুধ কাজ করবে না।

    মহাদেব : আচ্ছা তাই হবে। সে না হয় কষ্টে সৃষ্টে দু’মাস কাটিয়ে নেব। তারপর আপদ বিদেয় হবে তো?

    গনক : আলবাত হবে। একশো পারসেন্ট গ্যারান্টি। ওষুধে কাজ না হলে ডবল পয়সা ফেরত।

    উমা : বেশ দুটো মাস একটু কষ্টেই না হয় কাটিয়ে নেব। তারপর তো সুখই সুখ। দাও দাও তেল-পড়া জল-পড়া কি দেব দাও তো। আজ থেকেই ভালবাসতে নেমে পরবো। এমন ভালবাসবো না, ও সারা জীবন ভুলতে পারবে না।

    গনক : দক্ষিণা…. (হাত পাতে)

    মহাদেব : [ ট্যাঁক থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে গনকের হাতে দেয় ] পাঁচশো টাকার নোট। এটা রাখো। বাকি পাঁচশো কাজ মিটে গেলে পাবে।

    গনক : এখানেও ধার বাকি! আচ্ছা, তাই দিও। [ টাকা নিয়ে মায়ের ছবির সামনে রাখে। তারপর মায়ের ছবির পিছন থেকে একটা তেলের শিশি বের করে উমার হাতে দেয় ] এই নাও। এটাকে বউমার মাথায় মাখাতে হবে। কমপক্ষে তিনদিন। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হবে, তবে দুদিন পরে ও নিজেই মাখতে চাইবে। তারপর দেখ না কি হয়!

    উমা : [ খুব ভক্তি ভরে ওষুধের শিশি আঁচল পেতে নেয়। কপালে হাত রেখে প্রনাম করে ] জয় মা, জয় মা। এই অভাগীর দিকে একটু মুখ তুলে চাও মা। ওই অলক্ষ্মীকে বিদেয় করে দাও মা। মা গো।

    গনক : যাও যাও। তোমাদের সাথে মায়ের আশীর্বাদ আছে। তোমরা বাড়ি গিয়ে কাজ শুরু করগে। আজ মাসের তিন তারিখ। আজ থেকে দু’মাস পরে ঠিক এই তিন তারিখেই আমি নিজে তোমাদের বাড়িতে যাবো। দ্বিতীয় দফার ওষুধ দিয়ে তোমাদের বাঁধন আমি চিরদিনের জন্য কেটে দিয়ে আসবো। এখন যাও।

    মহাদেব : চলো গো চলো। কাজে নেমে পরো। দুটো মাস দেখতে দেখতে কেটে যাবে। নাকি বলো?

    উমা : হ্যাঁ গো হ্যাঁ। জয় মা। মাগো মঙ্গল করো মা।
    [ উভয়ের প্রস্থান ]

    [ মহাদেব ও উমা চলে গেলে গনক আবার পুজোয় বসে। গান ধরে সকলি তোমার ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি…. । গানের মাঝে তরলা আসে এবং মাকে প্রনাম করে গনকের পাশে বসে পরে। ]

    গনক : [ পুজো শেষে তরলাকে দেখে ] তুমি কে গো মা? তুমি কাদের বাড়ির বৌ? তোমাকে আগে তো দেখি নি?

    তরলা : আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি ও পাড়ার মল্লিক বাড়ির বৌ। আমার নাম তরলা।

    গনক : ও! তুমি তাহলে ওই মহাদেব মল্লিকের বৌমা? আমাদের সাধনের স্ত্রী।

    তরলা : হ্যাঁ গনককাকা আপনি ঠিক ধরেছেন। আমি ওদের বাড়ির বৌ।

    গনক : তা একা একা এখানে কেন এসেছো মা?

    তরলা : আমার যে বড় বিপদ গো গনককাকা। আমাকে আপনি বাঁচান।

    গনক : আহা হা। সে তো আমি তোমার মুখ দেখেই বুঝেছি। তুমি খুব অশান্তির মধ্যে আছো।

    তরলা : হ্যাঁ গনককাকা।

    গনক : শ্বশুর শাশুড়ির সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। উঠতে বসতে ঝগড়া বিবাদ। স্বামীও তোর সহায় হতে পারছে না। সে না পারছে বাবা মাকে ফেলতে, না পারছে তোকে কিছু বলতে।

    তরলা : আপনি আমার মুখ দেখে এতো কথা বলে ফেললেন! আপনি মানুষ নন গো কাকা, আপনি দেবতা, অন্তর্যামী।

    গনক : হে হে হে। এই তো আমাদের কাজ রে মা। আমরা লোকের মুখ দেখেই সব বলে দিতে পারি। এই তুই যেমন চাইছিস তোর স্বামীকে বশে এনে শ্বশুর শাশুড়িকে বাড়ি ছাড়া করতে। কি ঠিক বলেছি তো?

    তরলা : হ্যাঁ গো কাকা। একদম ঠিক। আপনি মনের কথা সব পড়ে ফেলেছেন। তাই তো আমি আপনার শরণে এসেছি।

    গনক : হয়ে যাবে রে মা হয়ে যাবে। কোন চিন্তা করিস না। তোর এই গনককাকার কাছে যখন একবার এসে পড়েছিস, তোর আর কোন চিন্তা নেই। তোর সব ইচ্ছে পূর্ণ হয়ে যাবে।

    তরলা : আপনি আমাকে বাঁচালেন কাকা। আপনার দয়ার শরীর।

    গনক : আমি তোকে সিঁদুর-পড়া দেব বুঝলি। তিনদিন তোর শ্বশুর শাশুড়ির কপালে পড়াতে পারলেই কেল্লা ফতে। তবে একটা কথা…

    তরলা : কি কথা? আপনি বলুন।

    গনক : আজকাল তো খালি হাতে কিছু হয় না। তোকে কিছু দিতে হবে।

    তরলা : দিতে হবে? কি দিতে হবে?

    গনক : না না বেশি কিছু না শুধু …..

    তরলা : শুধু কি?

    গনক : কিছু খরচা দিতে হবে।

    তরলা : ওহ এই কথা। আমি ভাবছিলাম কি না কি। তা কত কি দিতে হবে বলুন? যা লাগবে আমি দেব।

    গনক : খরচা তো লাগে হাজার টাকা।

    তরলা : এক হাজার!!

    গনক : হ্যাঁ সে রকমই তো লাগে। তা তুই তো বৌ মানুষ। অতো টাকা কোথায় পাবি?

    তরলা : তাই তো গো কাকা? লক্ষ্মীর ভাণ্ডারেও তো এখনও নাম ওঠে নি। তাহলে না হয় একটা ব্যবস্থা হয়ে যেত।

    গনক : আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি তোর তা হাফ টাকায় করে দেব। মানে পাঁচশো টাকায়। এখন তিনশো, কাজ হয়ে গেলে বাকি দু’শো। কি পারবি তো?

    তরলা : হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব পারবো। তবে এখন তিনশো, পরে দুশো মানে?

    গনক : মানে, মায়ের সিঁদুর পড়া দু’দফায় কাজ করে। প্রথম দফায় যাদেরকে তাড়াতে হবে, মানে তোর শ্বশুর শাশুড়িকে খুব করে ভালোবেসে একেবারে কাছে টেনে আনতে হবে। একদম নিবিড় করে ভালবাসতে হবে।

    তরলা : ভালবাসতে হবে? ওই বুড়ো বুড়িকে? পারবো না।

    গনক : পারবো না বললে তো আর চলবে না। জীবন থেকে ওই রাহু কেতুকে চির দিনের জন্য বিদেয় করতে হলে, এটা তোকে পারতেই হবে। তারপর একদিন ভালোবাসার সুতো কেটে দিয়ে এক ধাক্কায় বাড়ির বাইরে। আর কোন দিন ফিরবে না। পাকাপাকি ব্যবস্থা।

    তরলা : তা কত দিন ভালবাসতে হবে?

    গনক : বেশি দিন না। এই ধর মাসদুয়েক। তারপর সংসার তোর। তুই তখন সংসারে মহারানী। কি পারবি না?

    তরলা : পারতেই হবে। দু’মাস তো? কেটে যাবে।

    গনক : তাহলে তিনশো টাকা দে। সিঁদুর-পড়া নিয়ে যা। আগামী মঙ্গলবার থেকে পরপর তিন দিন পড়াতে হবে, বুঝলি।

    তরলা : তাতো বুঝলাম। কিন্তু সিঁদুর পড়াবো কি করে? তারা তো কাছেই ভিড়বে না।

    গনক : ভিড়বে ভিড়বে। ওদের বাপ কাছে ভিড়বে। তুই আজ থেকে সকাল সন্ধ্যা মন দিয়ে ঠাকুর পুজো করবি। তারপর ঠাকুরের নাম করে এই সিঁদুর টুক করে কপালে পড়িয়ে দিবি। ভালোবাসে পড়ালে লোকে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়বে, এতো সামান্য সিঁদুর।

    তরলা : আচ্ছা, বুঝেছি গনককাকা।

    গনক : তাহলে এই নে। ( সিন্দুরের কৌটো দেয়। তরলা খুব ভক্তি ভরে আঁচল পেতে নেয়। শাড়ির খুঁট থেকে তিনশো টাকা বের করে গনকের হাতে দেয়। ) দুমাস পরে তিন তারিখে আমি নিজে গিয়ে ওদেরকে বাড়ি ছাড়া করে দিয়ে আসবো। যা বাড়ি যা। আর যা যা বললাম, মন দিয়ে সেগুলো করগে যা।
    [ তরলা প্রণাম করে চলে যায় ]

    গনক : মা মাগো, সকলের মঙ্গল করো মা। [ মাকে প্রনাম করে। হঠাৎ ফুরুত করে বাঁশি বাজিয়ে সাধন প্রবেশ করে। ]

    সাধন : [ গনকের সামনে ঝপাৎ করে বসে পড়ে ] মঙ্গল কি হবে গো কাকা? এতো বড় ক্যাচাল কেস করে ফেললে।

    গণক : ক্যাচাল কেস মানে? তোরও ওষুধ লাগবে নাকি? তা তুই কোন পক্ষের? বৌয়ের না বাপ মায়ের?

    সাধন : আমার কোন পক্ষ নেই। আমি নিরপেক্ষ। দু পক্ষের প্লেয়াররা ফাউল করলে আমি বাঁশি বাজাই। আমি নিরপেক্ষ রেফারি।

    গনক : তা হলে বাঁশি বাজাগে যা।

    সাধন : কি করে আর বাঁশি বাজাব বলো? তুমি তো ইস্টবেঙ্গলকেও কোচিং করাচ্ছো, আবার মোহন বাগানকেও টেকনিক্যাল এডভাইস দিচ্ছো। তা শেষ পর্যন্ত এই ডার্বির লড়াই থামাতে পারবে তো?

    গনক : তুই শুধু দেখে যা সাধন। খেলা কেমন জমে। এ খেলায় রেফারি লাগবে না। কেউ ফাউল করবে না। তবে তোর একটা বড় ভুমিকা আছে।

    সাধন : কি ভুমিকা?

    গনক : রিপোর্টারের। যা যা ঘটবে, আর যা যা দেখবি, সব আমার কাছে রিপোর্ট করবি। কিছু লুকোবি না।

    সাধন : নজরদারি করতে হবে? বেশ হয়ে যাবে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট রিপোর্ট পেয়ে যাবে। ফুড়ুৎ… [ প্রস্থান ]

    [ গনক : আবার পুজোয় বসে। পর্দা নামে। ]
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন