বাঙালি একটি অদ্ভুত প্রজাতি। পৃথিবীর অন্য কোনো জাতি এত গভীরভাবে নিজের বৌদ্ধিকতা নিয়ে গর্বিত, অথচ একই সাথে এত নিপুণভাবে নিজের মেরুদণ্ড বিসর্জন দিতে পারে। এই দুটো গুণ একসাথে থাকা সম্ভব কিনা, সেটা নিয়ে দার্শনিকরা হয়তো দ্বিধায় পড়বেন। কিন্তু বাঙালি দ্বিধায় পড়ে না। সে একহাতে রবীন্দ্রনাথ ধরে, অন্যহাতে ঝাণ্ডা। এবং দুটোই সমান দক্ষতায়।
সম্প্রতি একটি দৃশ্য দেখলাম। একটি পার্টি অফিসের বাইরে, রাস্তার উপর, একজন মানুষের হাতে ঝাণ্ডা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যটি এতটাই স্বাভাবিক যে আমরা কেউ দ্বিতীয়বার তাকাইনি। কারণ বাঙালির কাছে এটি অতিপরিচিত। এখানে ঝাণ্ডা একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। ঠিক যেমন বিয়েতে সিঁদুর, শ্রাদ্ধে তিল। কেউ জিজ্ঞেস করে না কেন। সবাই জানে এটা হয়। এটা হওয়াই নিয়ম।
কিন্তু যে মানুষটির হাতে ঝাণ্ডা দেওয়া হলো, তাঁকে একটু ভালো করে দেখুন। কাঁধ ঝুলে আছে। চোখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কেউ একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস খুলে নিয়ে গেছে এবং যাওয়ার সময় রিসিটটুকুও দেয়নি। কেন্নো পোকা যেমন গুটিয়ে যায় বিপদে, এই মানুষটিও ঠিক তেমনি। শুধু পার্থক্য হলো কেন্নো নিজের প্রতিরক্ষায় গুটায়, আর এই প্রতিক উর রহমান গুটিয়েছেন অন্যের সুবিধায়।
বাঙালির ইতিহাসে এই গুটিয়ে যাওয়ার একটি দীর্ঘ ও গৌরবময় ঐতিহ্য আছে। আমরা বিপ্লবের কবিতা লিখি এবং পাড়ার মোড়ে ক্ষমতাবানের সামনে মাথা নোয়াই। এই দুটো কাজের মাঝে আমরা কোনো বিরোধ দেখি না। বরং একটা সুনিপুণ ভারসাম্য খুঁজে পাই। মাথা নোয়ালে মেরুদণ্ড বাঁকে, এটা আমরা জানি। কিন্তু বাঁকানো মেরুদণ্ডকে আমরা নমনীয়তা বলে ডাকি। এবং নমনীয়তাকে বুদ্ধিমত্তা।
এখন প্রশ্ন হলো, এই দৃশ্যটি কি নতুন? মোটেই না। রেজ্জাক মোল্লা, ঋতব্রত, কানাইয়াকুমার — এই নামগুলো একটি তালিকার অংশ। একটি চলমান তালিকা। যে তালিকায় নাম যোগ হয়, কিন্তু কোনো নাম মোছা হয় না। কারণ মুছলে তালিকার মাহাত্ম্য কমে। আর বাঙালি মাহাত্ম্য কমাতে রাজি নয়। সে নতুন নাম যোগ করে এবং পুরনো নামের পাশে একটি ছোট্ট নোট লেখে: "দ্রষ্টব্য — এও হয়েছিল।"
এই তালিকায় যাঁরা নাম লেখান, তাঁদের একটি বিশেষ পরিচয় আছে। তাঁরা শোপিস। শোপিস মানে সুন্দর, শোপিস মানে দরকারী, শোপিস মানে ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে রাখলে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ে। শোপিসের নিজস্ব মতামত থাকার প্রয়োজন নেই। শোপিস কথা বলে না। শোপিস শুধু থাকে। এবং থেকে থেকে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দেয়: "দেখো, আমিও আছি।" এইটুকুই যথেষ্ট।
বাঙালি শোপিস বানাতে পারদর্শী। শুধু রাজনীতিতে নয়, সর্বত্র। পাড়ার পুজোয় একজন বুদ্ধিজীবী লাগে, যিনি উদ্বোধনে কিছু গুরুগম্ভীর কথা বলবেন এবং তারপর চুপ করে থাকবেন। অফিসে একজন সিনিয়র লাগে, যিনি মিটিংয়ে মাথা নাড়বেন এবং রিপোর্টে সই করবেন। রাজনীতিতে একজন মুখ লাগে, যিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন এবং ঝাণ্ডা ধরবেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শোপিসের ভূমিকা এক। সৌন্দর্য বর্ধন এবং নীরবতা পালন।
এখন যে প্রশ্নটি করা দরকার, সেটি হলো সেটিং কার? অর্থাৎ এই পুরো ব্যবস্থাটি কে সাজিয়েছে? কার লাভ, কার ক্ষতি, কার খেলা? এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য বিশেষ বুদ্ধি লাগে না। শুধু রোজ একটু খবর দেখলেই হয়। কিন্তু এখানেই বিপদ। বাঙালি খবর দেখে। প্রচুর খবর দেখে। এত খবর দেখে যে খবর আর খবর থাকে না, বিনোদন হয়ে যায়। এবং বিনোদন থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পথটি বাঙালির কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।
আমরা informed হওয়ার ভান করি। সকালে চায়ের কাপ হাতে সংবাদ পড়ি। বিকেলে টেলিভিশনের সামনে বসে বিশ্লেষণ শুনি। রাতে ফোনে স্ক্রল করি। এবং এর পরেও যখন কেউ জিজ্ঞেস করে "কী মনে হচ্ছে?", আমরা উত্তর দিই: "দেখা যাক।" এই "দেখা যাক" বাঙালির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান। এতে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো দায়িত্ব নেই, এবং সবচেয়ে বড় কথা, কোনো ঝুঁকি নেই।
টাকা আসে, টাকা যায়। এই সত্যটি বাঙালি গভীরভাবে জানে। আসলে এই সত্যটি বাঙালি এত গভীরভাবে জানে যে টাকা যাওয়ার দুঃখটুকুও আর থাকে না। টাকা গেলে বলি, "থাকবে না।" টাকা এলে বলি, "আসবেই।" এই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সুবিধাজনক। কারণ এতে কোনো কিছু নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হয় না। টাকার মতো রাজ্যও যদি যায়, তাহলেও হয়তো আমরা বলব, "থাকবে না।" এবং তারপর অন্য কোথাও চলে যাব। কারণ বাঙালি আসলে যাযাবর। তবে সেটা স্বীকার করে না।
"বাংলাদেশ হয়ে যেতে দেবেন না" — এই কথাটি যখন বলা হয়, তখন একটা আশ্চর্য নীরবতা নামে। কারণ বাঙালি ইতিহাস জানে। সে জানে কোন পথে কোন ভুল হয়েছিল, কোন সিদ্ধান্তে কী মূল্য চোকাতে হয়েছিল। কিন্তু জানা আর বোঝা এক জিনিস নয়। এবং বোঝা আর দায়িত্ব নেওয়া আরও আলাদা জিনিস। বাঙালি ইতিহাস জানে, বিশ্লেষণ করে, এবং তারপর পরের প্রজন্মের জন্য রেখে যায়। কারণ "পরে দেখা যাবে" আমাদের জাতীয় নীতিবাক্য।
কিন্তু রাজ্য পরে ফেরত আসে না। মেরুদণ্ড একবার গেলে নতুন করে গজায় না। শোপিস একবার সাজানো হলে সে নিজে থেকে নামে না। এই সত্যগুলো অপ্রিয়। এবং বাঙালি অপ্রিয় সত্যের সামনে একটি কাজ করে — সে সত্যটিকে এত সুন্দর ভাষায় প্রকাশ করে যে সত্যটার কষ্টটা আর থাকে না। থাকে শুধু ভাষার সৌন্দর্য।
এই লেখাটিও সম্ভবত সেই পথেই যাবে। কেউ পড়বে, মাথা নাড়বে, বলবে "একদম ঠিক বলেছে।" তারপর ফোন রেখে দেবে। এবং কাল সকালে উঠে আবার সেই একই খবর দেখবে, সেই একই মন্তব্য করবে, সেই একই "দেখা যাক" বলবে। কারণ বাঙালির সমস্যা জ্ঞানের অভাব নয়। বাঙালির সমস্যা হলো জ্ঞান এবং কাজের মাঝে একটি বিশাল, আরামদায়ক, সুসজ্জিত শূন্যতা। সেই শূন্যতায় আমরা বাস করি। এবং সেই বাসস্থানটি আমাদের অত্যন্ত প্রিয়।
তাই ঝাণ্ডা উড়তে থাকে। শোপিস সাজানো থাকে। এবং আমরা দেখতে থাকি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।