এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • রোবট চুরি থেকে ঘণ্টা বাজিয়ে ভাইরাস নিধন: ভারতীয় মেধাকে কৌতুক বানানোর দায় কার?

    অখিল রঞ্জন দে লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৩ বার পঠিত
  • রোবট চুরি থেকে ঘণ্টা বাজিয়ে ভাইরাস নিধন: ভারতীয় মেধাকে কৌতুক বানানোর দায় কার?
     
    বর্তমানে ভারতবর্ষ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের গরিমা আর থালা বাজিয়ে ভাইরাস তাড়ানোর প্রলাপ একই সমান্তরালে অবস্থান করছে। গালগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক রোবট জালিয়াতি (২০২৬ সালের ইন্ডিয়া এআই সামিটে চীনের 'Unitree' কোম্পানির তৈরি রোবট কুকুরকে নিজেদের আবিষ্কার বলে চালিয়ে দেওয়া) কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আসলে একটি গভীর ও বিস্তৃত বৌদ্ধিক মহামারীর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। যখন আইআইটি-র মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মেঘভাঙা বৃষ্টির কারণ হিসেবে "মাংস ভক্ষণ"(!) (আইআইটি মান্ডির ডিরেক্টর লক্ষ্মীধর বেহেরা দাবি করেছিলেন যে পশুহত্যার কারণেই হিমাচলে ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটছে) কে দায়ী করেন, কিংবা ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে স্টেম সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে কৌরবদের জন্মের তত্ত্ব প্রচার করা হয় (২০১৯ সালের সায়েন্স কংগ্রেসে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জি. নাগেশ্বর রাও দাবি করেন যে মহাভারতের সময় ভারতেই স্টেম সেল ও টেস্ট টিউব বেবি প্রযুক্তি ছিল), তখন বুঝতে হবে কুসংস্কার এখন আর অশিক্ষিতের আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই—তা এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গবেষণাগারেও ঢুকে পড়েছে।
    এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মূলে রয়েছে রাষ্ট্রনায়কদের প্রতীকী আচরণকে অন্ধভাবে "বিজ্ঞান" হিসেবে প্রমাণ করার এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা।যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা কোনো প্রতীকী আহ্বানকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার নির্লজ্জ চেষ্টা চলে, তখন তা সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে পঙ্গু করে দেয় এবং বৈশ্বিক দরবারে এতো বছর ধরে ভারতের সমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যকে কালিমালিপ্ত করে। যখন রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য আয়ুর্বেদিক ওষুধকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভুয়ো স্বীকৃতির মোড়কে বাজারজাত করা হয় (পতঞ্জলির "করোনিল" নিয়ে বিতর্ক, যেখানে যথাযথ ক্লিনিকাল ট্রায়াল ছাড়াই একে করোনার নিরাময় দাবি করা হয়েছিল এবং ডব্লিউএইচও-র নাম জড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল), বা প্রাচীন উড়োজাহাজ তত্ত্বকে আধুনিক অ্যারোনটিক্সের সমতুল্য দাবি করা হয় (২০১৫ সালের সায়েন্স কংগ্রেসে দাবি করা হয়েছিল যে ৭০০০ বছর আগে ভারতে আন্তঃগ্রহগামী বিশাল বিমান ছিল), তখন সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধি কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। গালগোটিয়ার রোবোট-ডগ চুরি বা ঘণ্টা বাজিয়ে করোনা জয়ের থিসিস (২০২০ সালে গালগোটিয়ার গবেষক ধর্মেন্দ্র কুমার দাবি করেছিলেন ঘণ্টার শব্দতরঙ্গ ভাইরাসের প্রোটিন শেল ভেঙে দেয়) আসলে এই মিথ্যার ইকোসিস্টেমেরই ফসল। এটি কেবল বিজ্ঞানের অপমান নয়, বরং সি. ভি. রমন বা জগদীশ চন্দ্র বসুর উত্তরসূরিদের জন্য এক চরম লজ্জার দলিল।
    প্রকৃত বিজ্ঞান প্রশ্ন করতে শেখায়, কিন্তু এই নতুন সংস্কৃতি শেখায় অন্ধ আনুগত্য। যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার নামে স্রেফ চাটুকারিতা করে বা অন্যের উদ্ভাবন নিজের নামে চালিয়ে দেয়, তখন আন্তর্জাতিক মহলে ভারতীয় মেধা স্রেফ একটি কৌতুক হয়ে দাঁড়ায়। এই নৈতিক স্খলন আমাদের প্রজন্মকে এক অন্ধকার গহ্ববরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে সত্যের চেয়ে দৃশ্যমানতা আর যুক্তির চেয়ে জালিয়াতি বেশি সমাদৃত। এই প্রাতিষ্ঠানিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আজ যদি রুখে না দাঁড়ানো যায়, তবে আগামী দিনে ভারত কেবল কারিগরের দেশ হয়ে থাকবে, কোনো মুক্তমনা বিজ্ঞানীর জন্ম সেখানে হবে না।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন