এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বিচ্ছেদ

    Manali Moulik লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩৪ বার পঠিত
  • শনিবার দুপুরবেলা যে ছোটমামাকে এভাবে দেখতে হবে, সেটা আমার কেউই ভাবিনি। দরজাটা খুলে প্রথমে চমকে গেল মা।

    – “একী রে! কী অবস্থা করেছিস নিজের?”

    আমরাও সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম পুরোনো জামাকাপড় আর দীর্ঘদিন চুল-দাড়ি না কাটার ফলে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে ছোটমামাকে। এমনিতে দিদার বাড়ি গেলে আমার আর বোনের সর্বক্ষণের ফ্রেন্ড,ফিলোসফার অ‍্যান্ড গাইড হিসাবে ছোটমামাকেই আমরা এতোদিন পেয়ে এসেছি। এম.টেক করার পর কোডিং শেখানোর tuition centre আর ছবি আঁকা নিয়ে দিব‍্যি ছিলো। দিদা কয়েকমাস অসুস্থ থাকায় খুব একটা যোগাযোগ ছিলো না। এরমধ‍্যে আমাদের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। তাই মায়ের নজরদারিতে আমরা তখন ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’। অর্থাৎ বাইরের জগতের সঙ্গে সবরকম সংযোগ বন্ধ। এতদিন পর ছোটমামার আগমন আর তাও এমনভাবে যা বাড়ির পরিবেশ ভারী করে তুললো। মায়ের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সামনের সোফাটায় সে বসলো। কপাল ঢেকে যাওয়া চুলগুলোকে সরিয়ে দিয়ে বললো,
    – “দিদি, সম্ভব হলো না রে সম্পর্কটা আর টিকিয়ে রাখা।”
    – “কার সঙ্গে?”
    – “দ‍্যাখ্, একটা সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকে উভয়ের সমঝোতার উপর। একপক্ষ কেবল যন্ত্রণা সহ‍্য করে যাবে, আরেক পক্ষ ব‍্যথা দিয়ে যাবে — এটা হয় না। এটা অবিচার।”
    মুখ অন্ধকার করে ছোটমামা জলের গ্লাসটা তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর জলটা খেয়ে নিয়ে বললো,  – “এই যে স্বচ্ছ জল, যার গভীরতা থাকলেও পঙ্কিলতা নেই, তাকেই মানুষের বেঁচে থাকার জন‍্য প্রয়োজন হয়। বুঝলি, জগতে যেকোনো সম্পর্কের এই স্বচ্ছতাটা খুব দরকার।”
    মা কম্পিত হাতটা ভাইয়ের কাঁধে রেখে বসে পড়লো।  একটু থেমে বললো,

    – “ভাই, মেয়েটা কে রে? পাড়ার কেউ না তোর চেনা? আমি চিনতাম?”

    –  “না। সেভাবে তাকে বাইরে দেখিয়ে বেড়ানোটা আমার পছন্দ ছিলো না। অনেক গোপন রক্তক্ষরণ সহ‍্য করেও তাই আড়ালেই রাখতাম। তবে….” মা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,  “আজকাল কেউই ভালো নয় রে। এ কি আর আমাদের যুগ? তা বলে তুই নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছিস কেন? দাঁড়া, আমি চা করে আনি।”

    – “ না রে দিদি। বোস তুই, ওসব করতে হবে না।”
    ছোটমামার গাম্ভীর্য এতটাই বেড়ে গেছে যে মা পর্যন্ত ভয় পেয়েছে! একবার ভাবলাম, এরকম সিরিয়াসনেস আমি দেখালে কী সিরিয়াস কান্ডটাই এতক্ষণে ঘটে যেতো! কিন্তু এখন মায়ের রাগ দূরে থাক, মামার বৈরাগ‍্য দেখে চোখ ছলছল করছে আমাদের। মা বললো,  – “ভাই শোন্, জীবন আমাদের অনেক শিক্ষা দেয়। সেগুলো ঠেকে শিখলে সবচেয়ে ভালো। কিন্তু শিক্ষাটা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, এরকম ভেঙে পড়লে চলবে না। তুই দাঁড়া, পুরো ব‍্যাপারটা আমায় মায়ের থেকে ফোনে জানতে হবে। কী এমন মেয়ে, যার তোকে ভালো লাগে না?”

    – “আর জেনে কী হবে?” ছোটমামার গলায় হেমন্তের হাহাকার।
    – “সবকিছু চুকিয়ে দিয়েছি যখন, আর কীসের মায়া? তবে দ‍্যাখ, আমার দিক থেকে কোনো ফাঁকি ছিলো না। সাধ‍্যমতো চেষ্টা করেছি মানিয়ে নেওয়ার,মেনে নেওয়ার। ও যন্ত্রণা দিলেও,শতকষ্ট হলেও সহ‍্য করেছি রে দিদি, পারলাম না রে শেষপর্যন্ত….! ও থাকার নয়।”

    – “কেন এতো ভাবছিস বলতো তুই তাহলে?” মায়ের উদ্বিগ্ন প্রশ্ন।
    সোফা থেকে উঠে ছোটমামা পায়চারি শুরু করে। 
    — “আমার হৃদয়াকাশে এখন দুর্যোগের ঘনঘটা। ক‍‍্যারিয়ারের সৌভাগ‍্যসূর্য অস্তাচলগামী। জানিস দিদি, কাল দুপুর পর্যন্ত আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। অসহ‍্য হয়ে উঠেছিলো, শেষ সিদ্ধান্ত  নেব, কিন্তু কোথায় একটা ব‍্যথার ভয়, একটা সূক্ষ্ম বাঁধন কাটতে পারছিলাম না রে। যাকগে, বিকেলে মনকে শক্ত করলাম। কবিগুরুর ভাষায় বোঝালাম - দুঃখ যদি না পাবে তো / দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে?/ বিষকে বিষের দাহ দিয়ে / দহন করে মারতে হবে।” 
    ঘরে এখন পিনপতনের নীরবতা। মা শুধু বললো,  – “তারপর?”
    সিগ্রেটের ধোঁয়ার দুটো রিং পরপর ছেড়ে ছোটমামা বেশ নিশ্চিন্তভাবে বললো,
    – “তারপর আর কী! ডেনটিস্ট চৌধুরীর কাছে গিয়ে বিচ্ছেদ সম্পন্ন হলো আমাদের।”

    – “অ‍্যাঁ !! বলিস কী? ডেনটিস্ট চৌধুরী? তিনি আবার এরমধ‍্যে কী করবেন?” মা হতচকিত। ছোটমামা সোজা তাকিয়ে বললো,

    – “তিনিই তো তুলে দিলেন কষের দাঁতটা। যাকে নিয়ে এতো টানাপোড়েন, তার সঙ্গে বিচ্ছেদের কারিগর তো ওনাকেই বলা যায়। সেই যন্ত্রণার কথাই তো বলছিলাম এতোক্ষণ।  তুই কী ভাবলি রে? 
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2607:fb91:4c1f:10de:3989:5bab:4904:***:*** | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:৫১738728
  • ঠিক এই বিষয়েই আরো একটা লেখা আমি গুরুতেই পড়েছি মনে হচ্ছে। মানালি, আপনিই কি লিখেছিলেন আগে এই নিয়ে? সম্ভবত একটা চিঠির আকারে?
  • Manali Moulik | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:০০738729
  • না কেকে। এটা নিয়ে আমার প্রথম লেখা এটাই। অন‍্যকিছু আমি এরকম আগে লিখিনি
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন