অন্য ছত্রপতি
শর্মিষ্ঠা রায়
মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি শিবাজি ভোঁসলের নাম আমরা সবাই জানি। তিনি তো এখন হিন্দুরাষ্ট্রের আইকন। কিন্তু, আরও এক ছত্রপতির কথা আমরা আজ এখানে বলব। বেশি পুরানো দিনের লোক তিনি নন, কিন্তু তাঁর নাম অনেকেই শোনেন নি। কেন তাঁর নাম ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে, এই নিবন্ধটি থেকেই তা কিছুটা বোঝা যাবে।
নাম তাঁর রাজর্ষি সাহু। মহারাষ্ট্রের ভোঁসলে পরিবারেরই আর এক সন্তান ছিলেন তিনি। বংশপরম্পরায় রাজত্ব লাভও করেছিলেন। ছত্রপতি রাজর্ষি সাহু মহারাজ। রানি ভিক্টোরিয়ার দেওয়া নাইট গ্র্যান্ড কম্যান্ডার পদকপ্রাপ্ত। জন্ম ১৮৭৪ সালের ২৬ জুন। মৃত্যু ১৯২২ সালের ৬ মে। ২৮ বছরকাল (১৮৯৪ - ১৯২২) দেশীয় করদ রাজ্য কোলহাপুরের রাজা ছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই নিজের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সমাজসংস্কারক ভাবমূর্তির এক বলিষ্ঠ ছাপ তৈরি করে ফেলেছিলেন। তাঁর শাসনকালে বেশ কিছু প্রগতিশীল ও সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে যখন তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়, তখন থেকে যতদিন বেঁচে ছিলেন, রাজ্যের নীচু জাত ও দলিত প্রজাদের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রাধিকার ছিল সমস্ত জাতের বাচ্চাদের অন্ততপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষার অধিকারকে সুনিশ্চিত করা। গরিব ও নীচু জাতের জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে তিনি পঞ্চাশ শতাংশ সংরক্ষণ চালু করেছিলেন। তাঁকে Father of Indian Reservation বলা হয়। ভারতের গরিব পিছিয়ে পড়া, দলিত, পিছড়ে বর্গ, অতি পিছড়ে বর্গের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন God of Indian Reservation.
আশাকরি, পাঠক এতক্ষণে বুঝে গেছেন, কেন এই ক্ষণজন্মা ছত্রপতির নাম ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে।
বাবা জয়সিংরাও, মা রাধাবাই। রাধাবাই মুধলের রাজপরিবারের মেয়ে। আর বাবা জয়সিংরাও একটি গ্রামের প্রধান। বাবা কিন্তু ছেলের লেখাপড়ার প্রতি যত্নবান ছিলেন। বয়স যখন ১০ বছর, কোলহাপুরের ছত্রপতি ষষ্ঠ শিবাজি মহারাজার বিধবা স্ত্রী রানি আনন্দীবাই তাঁকে দত্তক নিলেন। এই দত্তক নেবার প্রধান শর্ত ছিল, শিশুটিকে ভোঁসলে পরিবারের সন্তান হতে হবে। আর সেই কারণেই তাঁর কপালে শিকে ছিঁড়েছিল। রাজকোটের কলেজের পড়াশোনা শেষ করে স্যার স্টুয়ার্ট ফ্র্যাসারের কাছে প্রশাসনের শিক্ষা গ্রহণ করলেন, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের ছাত্র হিসেবে। পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি উচ্চতার সুগঠিত চেহারার এই রাজার প্রিয় খেলা ছিল কুস্তি। তাঁর রাজত্বকালে এই খেলার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন তিনি।
তিনি ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্মেছিলেন বলে রাজপরিবারের ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা তাঁকে কোনো আচার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দিত না। এর ফলে ব্রাহ্মণদের ওপর তাঁর একটা বিরাগ জন্মায়। তিনি ক্রমশ আর্যসমাজ ও স্বয়ংশোধক সমাজের প্রতি আকৃষ্ট হন। ক্রমশ তিনি মারাঠাদের অধিকারের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। এরপর এই জাতপাত কলঙ্কিত দেশে তিনি বেশ কিছু দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিলেন। রাজপরিবারের ব্রাহ্মণ গুরুর জায়গায় তিনি একজন অল্পবয়সী অব্রাহ্মণ মারাঠাকে নিযুক্ত করলেন। তার পদ হল ক্ষাত্র জগদগুরু। এর ফলে অনিবার্য সংঘাত নেমে এল ব্রাহ্মণসমাজের কাছ থেকে, কিন্তু এক পা পিছোবার বান্দা ছিলেন না তিনি। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি অব্রাহ্মণদের সংগঠিত করে আন্দোলন গড়ে তুললেন ও নিজের পতাকাতলে মারাঠাদের ঐক্যবদ্ধ করে তুললেন।
২৮ বছরের রাজত্বকালে নীচু জাতের উন্নতিকল্পে আপ্রাণ পরিশ্রম করেছেন। পঞ্চাশ শতাংশ সংরক্ষণ চালু করে তাদের তুলে আনলেন এক ভদ্রস্থ জায়গায়। চাকরিতেও এই সংরক্ষণ রেখে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সাহায্য করলেন। ইতিহাসে তাঁর এই অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকার কথা ছিল। কিন্তু, ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের আপ্রাণ চেষ্টায় তাঁর নাম বেশির ভাগ লোকই জানে না। শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন এমনভাবে, যাতে সমাজের উৎপাদকের ভূমিকা যারা নেয়, তারা যেন অনুৎপাদক পরজীবি শ্রেণির চেয়ে এক চুলও কম সুযোগ না পায়। এই ব্যবস্থা চালু হয় ১৯০২ সাল থেকে। তারপর ১৯০৬ সালে তিনি সাহু ছত্রপতি উইভিং অ্যান্ড স্পিনিং মিল স্থাপন করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলেন। এরপর রাজারাম কলেজ স্থাপন করলেন, যা পরে তাঁর নামাঙ্কিত কলেজ হয়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে তাঁর পাখির চোখ ছিল জনশিক্ষা। তাঁর রাজ্যের প্রতিটি জাতি, উপজাতি, ধর্মের মানুষকে শিক্ষার আওতায় আনার জন্য অসংখ্য এডুকেশনাল প্রোগ্রাম এনেছেন। অস্পৃশ্যদের জন্য হোস্টেল করে দিয়েছেন, যাতে তারা পড়তে পারে। পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মেধাবী ছাত্রদের জন্য প্রচুর স্কলারশিপ চালু করেছেন। সমগ্র রাজ্যে বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেছিলেন। সংস্কৃত শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভালো প্রশাসক তৈরির স্কুলও নির্মাণ করেছিলেন।
রাজর্ষি সাহু সামাজিক সাম্যে বিশ্বাস করতেন। সমাজে ব্রাহ্মণদের বিশেষ স্থান দেবার ঘোর বিরোধী ছিলেন। রাজপরিবারের ধর্মীয় উপদেষ্টার পদ থেকে ব্রাহ্মণদের পদচ্যুত করে অব্রাহ্মণদের এগিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সাহায্যে অব্রাহ্মণরা বেদপাঠ শুরু করে। যা থেকে বেদোক্ত বিতর্ক শুরু হয় মহারাষ্ট্রে। সমাজের অভিজাত শ্রেণি ও তাঁর বিরোধীরা এক হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। যদিও তিনি বিশেষ পরোয়া করেন নি। ১৯১৬ সালে নিপানিতে তিনি ডেকান রায়ত অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করেন। এই সংগঠন অব্রাহ্মণদের সমান রাজনৈতিক অধিকার ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকারের দাবি তোলে।
রাজর্ষি ছিলেন মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলের মতাদর্শে বিশ্বাসী, ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত সত্যশোধক সমাজের সঙ্গে যুক্ত।
১৯০৩ সালে তিনি সপ্তম এডওয়ার্ড ও রানি আলেকজান্দ্রার অভিষেকের অনুষ্ঠানে যান, এবং ঐ বছরই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক এলএলডি ডিগ্রি পান।
সমাজ থেকে অস্পৃশ্যতা মুছে দিতে পাগলের মতো কাজ করে গেছেন। সম্ভবত ভারতে তিনিই প্রথম সরকারি চাকরিতে অস্পৃশ্য শ্রেণির মানুষকে নিয়োগ করেছেন। ডিক্রি জারি করে কুঁয়ো ও পুকুরের জল যাতে উঁচু জাতের লোকের মত অস্পৃশ্যরাও ব্যবহার করতে পারে, তার জন্য শক্ত হাতে আইনের ব্যবহার করেছেন। একই ভূমিকা নিয়েছেন স্কুল ও হাসপাতালের ক্ষেত্রেও। অন্য জাতে বিয়ে আইনসিদ্ধ করে দলিতদের সামাজিক অবস্থান বদলে দিয়েছেন। জন্মসূত্রে পাওয়া পদবির বাধ্যতামূলক ব্যবহার রদ করেছেন, ও কর আদায়ের চাকরি যারা করে, তাদের মেয়াদ বদলে দিয়েছেন।
মহিলাদের অবস্থার উন্নতিসাধনেও তিনি ছিলেন যত্নবান। মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল খুলেছেন ও স্ত্রী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সর্বত্র প্রচার করতেন। ১৯১৭ সালে তিনি আইন করে বিধবা বিবাহ চালু করেন। বাল্যবিবাহ বন্ধ ও দেবদাসী প্রথা বন্ধেও সক্রিয় ভূমিকা নেন।
নতুন শিক্ষিত সমাজ যাতে কাজ পায় তার জন্য তিনি অসংখ্য কারখানা স্থাপন করেন। যে যেমন কাজ করতে ভালোবাসে, সে যেন তা করার সুযোগ পায়। কৃষি, বিপনন, সেচ, সমবায়, স্বাধীন ব্যাবসা ইত্যাদিতে তাঁর শিক্ষিত, উন্নত ভাবনা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের বহু ছাপ দেখা যায়। আধুনিক কৃষির শিক্ষার জন্য তিনি কিং এডওয়ার্ড এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন, যাতে কৃষকেরা আধুনিক কৃষির খবর পায়।রাধানগরী ড্যাম স্থাপন করে কোলহাপুরে জলের সমস্যার সমাধান করে ফেলেন।
শিল্প, সংস্কৃতি বিশেষ করে ফাইন আর্টসে ছিল তাঁর প্রবল উৎসাহ। যে কোনো গবেষকদের সব রকমে সাহায্য করতেন। কুস্তিতে তো উৎসাহ ছিলই, অল্পবয়সীদের খেলাধূলায় উৎসাহ দিতেন। ড. বাবাসাহেব আম্বেদকরকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে তাঁকে সাহায্য করেছেন নানাভাবে। ড. আম্বেদকর একটি কাগজ বের করতেন, তাতে অর্থসাহায্যও করেছেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, তাঁদের সম্পর্ক অটুট ছিল।
১৯২২ সালের ৬ মে মারা যান সাহু। রেখে যান ছেলে তৃতীয় রাজারামকে। সে লাভ করে সিংহাসন। কিন্তু জীবনভর যে সংস্কার তিনি করেছিলেন, যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে তা ক্রমে নষ্ট হয়ে যায়।
যেন রূপকথা, তাই না? ভাবলেও শিহরণ হয়। বিশ্বাস হতে চায় না। যারা এই মানুষটির কথা প্রথম শুনলেন, তাদের অনুরোধ করব, চলুন, আমরা খুঁজে বের করি এদের। এঁদের উত্তরাধিকার আমরা বহন করছি। এই গৌরবময় ইতিহাস খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাদেরই।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।