এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ডেভিড হর্সব্রো, ও তাঁর নীলবাগের রূপকথা

    Chiraharit A science magazine লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ডেভিড হর্সব্রো ও তাঁর নীলবাগের রূপকথা
     
    শর্মিষ্ঠা রায় 

    ১৯৪৩ সাল। এক ব্রিটিশ তরুণ এয়ারফোর্স অফিসার এলেন ভারতে। তখন পৃথিবী জুড়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাপট। মাত্র কুড়ি বছর বয়স তার। নাম ডেভিড হর্সব্রো। বিমানে করে তাকে বোমা ফেলতে পাঠানো হয়েছিল বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। সুজলা সুফলা বাংলাদেশের প্রকৃতিকে আগে কখনো চোখে দেখেনি ডেভিড। বোমারু বিমানের জানলা দিয়ে যতদূর দেখা যায় সবুজ ধান খেত। জায়গায় জায়গায় সবুজের বুক চিরে বয়ে যাচ্ছে নদী। ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রাম। এইখানে বোমা ফেলে তছনছ করে দিতে হবে তাকে? বিদ্রোহ করে উঠল তরুণ মন। না, এ অসম্ভব! বিমানের মুখ ঘুরিয়ে এসে নামলেন বিমানবন্দরে। সেখান থেকে সোজা অফিসে ফিরে গিয়ে ইস্তফাপত্র দিলেন চাকরিতে। 

    দেশে ফিরে Oriental Institute of London এ ভর্তি হয়ে গেলেন প্রাচ্যবিদ্যা শিখতে।  সেখানে শিখলেন সংস্কৃত, পালি ও আরও কয়েকটি ভারতীয় ভাষা। তারপর ১৯৫৯ সালে যোগ দিলেন ব্রিটিশ কাউন্সিলে। আবার ফিরলেন ভারতে। দেশটাকে বড়ো ভালো লেগে গেছে তাঁর। এই দেশটাকে তার নিজের জাতের লোকেরা ২০০ বছর ধরে চুষে ছিবড়ে করেছে। তার প্রায়শ্চিত্ত তাঁকে করতেই হবে। চাকরিতে জয়েন করলেন ঋষি ভ্যালি স্কুলে। কয়েক বছর পড়ালেন। কিন্তু, এ স্কুলে কোনো গরিবের ছেলেমেয়ে পড়তে পারবে না। বড্ড খরচ। শেষে তাঁর স্বপ্ন রূপ পেল ১৯৭২ সালে। অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তুর জেলায় ১৭ একর জমির ওপর তৈরি হল তাঁর স্কুল, নীল বাগ।

    স্কুলের দেয়াল, জানলা দরজা নিজে হাতে করা তাঁর। হেন কাজ ছিল না যা জানতেন না। অত্যন্ত ভালো ছুতোর মিস্ত্রি ছিলেন তিনি। দারুণ মাটির কাজ জানতেন। অসম্ভব ভালো গান গাইতেন। থিয়েটার নাটকে অপরিসীম দক্ষতা ছিল। আর স্টকে ছিল ৭০০ র ওপরে গান। অনেকগুলো ভাষা জানতেন। বিরাট ইনোভেটর ছিলেন। ভয়ঙ্কর সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা। 

    স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা চেয়ে বিজ্ঞাপন দিতেন যখন, তাতে লিখে দিতেন, প্রার্থীর যেন বি এড বা এম এড ট্রেনিং নেওয়া না থাকে। এই ট্রেনিং এর ওপর বিন্দুমাত্র ভরসা ছিল না তাঁর। ছেলে নিকোলাস ও নিজে মিলে একশোর ওপর বই লিখেছেন। ছেপে বেরিয়েছে হয় Oxford University Press বা Orient Longman থেকে। সেই আমলে ৩০ লক্ষ টাকা রয়্যালটি পেয়েছেন। সেই টাকায় চলেছে স্কুল। বিরাট লাইব্রেরি ছিল। প্রায় ৭০০০ বই। 

    এক আজব স্কুল বানিয়েছিলেন ডেভিড। একটি পয়সাও খরচ ছিল না ছাত্রছাত্রীদের। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে হয় জোর করে, না যাবার জন্য কান্নাকাটি করে তারা। ডেভিডের স্কুল খুলত সাড়ে আটটায়। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ঢুকে পড়ত সাতটারও আগে। তাদের কাছেই থাকত চাবি, নিজেরা খুলে নিজেদের ক্লাস পরিষ্কার করত তারা। ছিল না কোনো বকাঝকা, ছিল না কোনো পরীক্ষা। লাইব্রেরি থেকে ইচ্ছেমত বই নিয়ে প্রত্যেকে পড়তে বসে যেত। যেখানে আটকাত, উঁচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব ছিল দেখিয়ে দেওয়া। এক বছরের মধ্যে তিনটে ভাষা শিখে যেত সদ্য গ্রাম থেকে আসা বাচ্চা। শিক্ষকরা শুধু পড়াতেন না, মাটির কাজ, কাঠের কাজ, গান, নাটক, সেলাই ফোঁড়াই সব শেখাতেন। শেখার মান ছিল অত্যন্ত উন্নত। শিক্ষকেরাও প্রতিদিন শিখতেন। তাঁরা মধুর স্মৃতিচারণ করেছেন সেই সময়ের। ডেভিড প্রতিদিন পড়ানোর পদ্ধতিকে আরও চমকপ্রদ ও কার্যকরী করে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। 

    ডেভিডের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দর্শন। শিক্ষকদের ভালোবাসতে শিখিয়েছেন নিঃস্বার্থভাবে। ছিল না কোনো প্রতিযোগিতা বা পুরষ্কার। কেউ যেন নিজেকে অন্যের থেকে ছোটো বা বড়ো মনে না করে।

    স্কুলে থাকত এক ঘণ্টা প্রশ্নের আসর। যার যা খুশি প্রশ্ন করার অধিকার ছিল। এখানে শিক্ষক বলবে ছাত্র শুনবে এই রীতি ছিল না। কথা বলত ছাত্ররাই বেশি। 

    ডেভিডের মৃত্যুর পর আর চালানো যায়নি এই স্কুল। ভারত সরকার ব্রিটিশের দেখানো পথে মেকলের শিক্ষা দেশে চালু করেছে। কিন্তু আর এক ব্রিটিশ ডেভিডের এই অসাধারণ সৃষ্টিকে চালু করে নি। তবু তার এই অভিনব পথ আজও তার পূর্ণ গুরুত্ব নিয়েই বেঁচে আছে।
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 2402:e280:2141:1e8:2dcc:def2:4c6c:***:*** | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:৩৩738725
  • এই লেখাটা খুব ভালো লাগলো। ডেভিড হর্সব্রোর নাম আগে শুনিনি, এখন জানতে পারলাম। ওনার ইতিহাস জানতে পেরে ভালো লাগলো। তবে একটা কথা, নীল বাগ স্কুল এখনও আছে। আমার এক বন্ধুর ছেলে ঋষি ভ্যালি বোর্ডিং স্কুলে পড়তো, ওটা আইসিএসই বোর্ড। সেই বন্ধুর কাছেই মাঝে মাঝে ঋষি ভ্যালি আর নীল বাগ ইস্কুলের কথা শুনেছি, দুটোই বোধায় একই ম্যানেজমেন্ট চালায়। 
  • dc | 2402:e280:2141:1e8:2dcc:def2:4c6c:***:*** | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:৩৭738726
  • আমাদের দেশেও হয়তো একদিন বিনে পয়সায় পড়াশোনা করার ব্যবস্থা হবে, অন্তত উচ্চ মাধ্যমিল অবধি সবাই নিখরচায় স্কুলে পড়তে পারবে। আশা করতে দোষ কি!  
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই প্রতিক্রিয়া দিন