এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ছোটগল্প: বিড়ালের কান্না

    asim nondon লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৬ বার পঠিত
  • আমাদের বাড়ির পোষা বিড়ালটা ৩ দিন যাবত কেঁদে চলেছে। পোষা বলাটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, বলতে পারবো না। কেননা ওকে আমরা কেউ পোষ্য নেইনি কোনোদিন। আমার মা কুকুর-বিড়াল দু-চোখে দেখতে পারেন না। আমার বাবার ব্যাপারটা বোঝা মুশকিল। কারণ বাবা দুবেলা নিয়ম করে উচ্ছিষ্ট কিছুটা ভাত আর মাছের কাটা বিড়ালের জন্য নিজের থালার একপাশে জমিয়ে রেখে দেন ঠিকই, কিন্তু বিড়ালকে কখনোই ঘরের ভিতর প্রত্যাশা করেন না। বিড়ালটা ঘরে ঢুকলেই মা-বাবা দুজন মিলে হুসহুস করে তাড়িয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠেন। পোষা বলাটা হয়তো বাড়াবাড়িই হবে। অবশ্য বিড়ালটা কিন্তু নিজ উদ্যোগে হয়তো বেঁচে থাকার খায়েশে নিয়ম করে দুপুর এবং রাতে, ঠিক আমরা যখন খেতে বসি তখন দরজার সামনে এসে বসে থাকে। এবং বিড়ালটা ঠিক কবে থেকে আমাদের বাড়িতে আসে তা আমরা জানি না। আমরা কেবল খাওয়ার পর কিছুটা উচ্ছিষ্ট ভাত আর কাঁটাকুটা কলপাড়ের এক কোণে শুকনো কাঁঠালপাতার উপর রেখে দেই। আর বিড়ালটা নিজের সুযোগ বুঝে কেবল কাঁটাগুলো সাবাড় করে ভাতগুলো ফেলে চলে যায়। 
     
    কিন্তু ৩ দিন যাবৎ আমদের বাড়ির বিড়ালটা কেঁদেই চলেছে। মিয়াঁও মিয়াঁও করতে করতে ওর গলা ভেঙে গেছে। কণ্ঠস্বরের সুরেলা ধাঁচটা এখন অবলুপ্ত হয়েছে। ইদানীং খাবারের ব্যাপারেও তার উৎসাহ নেই। এক রকমের বৈরাগ্যে তার অন্তঃকরণ যেন দীর্ঘশ্বাসের মতন বিষন্ন হয়ে গেছে। পোষ্য বলাটা হয়তো যুক্তিসঙ্গত হলো না, কেননা ভরণপোষণের দায়িত্ব কিংবা চিকিৎসার দায়িত্ব কিংবা ওর বসবাস উপযোগী কোনো স্থানের দায়িত্বের মতন কোনো সাতে-পাঁচেই আমরা নেই।
     
    এবার কী হয়েছে, বিড়ালটা মাসখানেক আগে প্রকৃতির নিজস্ব বাস্তবতায় বাচ্চা প্রসব করেছে। এর আগেও একবার আমাদের বাড়িতেই সে ৩টা বাচ্চা প্রসব করেছিল। সেই ৩টার মধ্যে কেবল ১টাকেই সে প্রকৃতির কঠিন শৃঙ্খলায় টিকিয়ে তুলতে পেরেছিল। সেই বাচ্চাটা অবশ্য বড় হবার পর, মা'কে একা ফেলে সে নিজের চারণভূমি নিজেই পছন্দ করে সেখানে চলে গেছে। তাকে আর ইদানিং দেখা যায় না।
     
    আমাদের বাড়ির বিড়ালটা ৩দিন যাবত কেঁদেই চলেছে। মাসখানেক আগে সে মা হয়েছিল। কতগুলো বাচ্চার মা সে হয়েছিল তা আমরা জানি না। তবে এবার তার সাথে কেবল ১টা ছানাই আমাদের বাড়িতে আস্তানা গেড়েছিল। বিড়ালছানাটা ফুটফুটে সুন্দর ছিল। সারাদিন সে মনের আনন্দে তিড়িংবিড়িং করে বেড়াতো। মায়ের পিছে পিছে তিড়িংতিড়িং করতো। মাঝেমধ্যে আমাদের ঘরের ভিতরও ঢুকে যেত। ঘরের ভিতর ঢুকেই সে খাটের নিচে আশ্রয় নিত। আর তখনই আমার মা-বাবা দুজনই সম্মিলিত স্বরে হুসহুস করে সেই আাচ্চাটাকে তাড়িয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠতেন।
     
    মা বলতেন, 'বিলাই ঢুকছে ঘরে। হাইগা-মুইতা ঘর নষ্ট কইরা ফালাবো। তাত্তাড়ি খেদা বিলাইডা।'
     
    মায়ের আশঙ্কা অমূলকও ছিল না। কেননা ওরা তো আমাদের পোষ্য নয়। ওদের তো কোনোরকম ট্রেনিং নেই। যেমন মায়ের আশঙ্কা অনুযায়ী, ওরা একদিন আমাদের একটা ঘরের ১টা বিছানা ভিজিয়ে রেখে পালিয়ে ছিল। মা সেদিন খুব চিল্লাপাল্লা করেছিলেন। বিড়ালের যন্ত্রণায় তাঁকে বিছানা ধুতে হয়েছিল এবং তোশক রোদে দিতে হয়েছিল। এরকমের বাড়তি কাজ তাঁর একদমই ভালো লাগে না। আদতে কারোরই তো বাড়তি কাজ ভালো লাগে না। 
     
    আমাদের বাড়ির বিড়ালটা ৩দিন যাবৎ কেঁদে কেঁদে গলা ভেঙে ফেলেছে। ওর ছোট্ট ছানাটাকে গত ৩দিন দেখতে পাই না। বিড়ালটা বারবার আসে। কাঁদে। এ ঘর থেকে সে ঘরে ঘুরে ঘুরে মিয়াঁও মিয়াঁও করে। সারাদিন তন্নতন্ন করে খোঁজে। সে তার উত্তরাধিকারীকে খুঁজে ফেরে। পায় না। যেখানে যেখানে বিড়ালছানাটা তিড়িংবিড়িং করে বেড়াতো, আমাদের বিভিন্ন ঘরের কোণে, খাটের নিচে, রান্নাঘরে সকল জায়গায় সে তার ছানাটাকে মিয়াঁও মিয়াঁও করে ডাকে। সে হয়তো স্বপ্ন দেখে, তার মিয়াঁও শুনে ছানাটা দৌড়ে চলে আসবে। আবার আগের মতন তিড়িংতিড়িং করে খেলে বেড়াবে। বিড়ালটা হয়তো ভাবে ছানাটা তার সাথে লুকোচুরি খেলছে। 
     
    ৩ দিন আগে, যে রাত থেকে বিড়ালটা কাঁদতে শুরু করেছিল, সেদিন বিকেলেও আমি ওদের বাৎসল্য দেখে ছিলাম। ওরা দুজনই খেলতে খেলতে আমার ঘরের খাটের নিচে ঢুকে পড়েছিল। তারপর আমি বিশেষ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ওদেরকে আমার ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ছিলাম। সন্ধ্যায় যখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলাম, ছানাটা আমার পায়ের কাছে এসে বেশ কিছুক্ষণ ভয়ে ভয়ে তিড়িংবিড়িং করেছিল। ওর তিড়িংতিড়িং দেখে আমার মন গলে গিয়েছিল। আমি ওকে হাত দিয়ে আদর করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে আদরের তোয়াক্কা না করে তিড়িংবিড়িং করে পালিয়েছিল। হয়তো ভয়ই পেয়েছিল।
     
    সেই সন্ধ্যার পর থেকে আমি আর ছানাটাকে দেখিনি। সেদিন সারারাত বিড়ালটা কেঁদেছে। কখনো ছাদের উপর, কখনো দরজার পাশে, কখনো জানালার ধারে। আমি বিড়ালটাকে বহুবার বলেছি, ধীরে ধীরে বলেছি, সান্ত্বনা দিয়েছি।
     
    'তর ছানাটা চইলা আসবো। একটু ঘুরতে গেছে। কান্দিস না।'
     
    বিড়ালটা আমার কথা শোনেনি। হয়তো আমার ভাষা সে বোঝেনি। যেমন আমি তার ভাষা বুঝি না। সেও আমার ভাষা বুঝেনি। আমরা কেবল একে অন্যের ইশারা-ইঙ্গিত কিছু কিছু বুঝি। যদি ওদের ভাষাটা আমি জানতাম, যদি সেই ভাষা রপ্ত করার কোনো পদ্ধতি থাকতো, আমি অবশ্যই রপ্ত করে ওর মনের সব কথা শুনতাম। বোঝার চেষ্টা করতাম। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য, আমরা কেউ কারো ভাষা বুঝি না। 
     
    যেদিন রাতে বিড়ালছানাটা মিসিং হলো, তার পরদিন সকালে মায়ের চিৎকারে আমার ঘুম ভাঙে। সাতসকালে তিনি চেচামেচি লাগালেন। এবং কিছুটা দুঃখও করলেন। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সব শুনলাম। সাড়া দিলাম না। রান্নাঘরে মা ছানাটাকে আবিষ্কার করলেন। মৃত। ঠান্ডা। মৃত্যুর কথা শুনে আমি আর বিছানা থেকে উঠিনি। মনটাও বেজায় বিষন্ন হয়ে গেল। আমি নিজের মাঝে সেই মৃত ছানাটাকে দেখার সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি। দিনের অন্য কোনো সময়ে হলে হয়তো সাহস হতো, কিন্তু সাতসকালে ১টা মৃত বিড়ালছানার বায়বীয় দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না। পরে শুনেছিলাম মা নাকি মৃত ছানাটাকে নদীর জলে ফেলে দিয়ে এসেছে। জানতে চেয়েছিলাম, কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কিনা। মা জানিয়ে ছিলেন, বাড়ির সামনের রাস্তায় হয়তো কোনো মোটরসাইকেল ঘটনাটা ঘটিয়ে থাকবে। যদিও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবে নিশ্চিত মানুষেরই কর্ম ঐটি। হয়তো রাতেই মৃত ছানাটিকে বিড়ালটা খুঁজে পেয়েছিল। এবং মুখে ধরে এনে আমাদের রান্নাঘরে লুকিয়ে রেখেছিল। হয়তো আশা করেছিল, রান্নাঘরে রাখলে মাছের গন্ধে নিশ্চয়ই তার সন্তান আবার জেগে উঠবে।
     
    এসব কথা জেনে এবং বিড়ালের কান্না শুনে বাবা বলেছিলেন, '৬৫ বছরের জীবনে এরম তো কুনোদিন দেখি নাই। বিড়াল তো দেহি মানুষের থিকাও বেশি কান্দে। মানুষের বাচ্চা মরলেও তো কুনোদিন কুনো মায়েরে এরম কানতে দেহি নাই।'
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন