এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পতঞ্জলির যোগসূত্রের ‘বৈজ্ঞানিকীকরণ’ -- বিবেকানন্দের পুনর্লিখন

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ৩৬৮ বার পঠিত
  • [ এই লেখাটি মৌলিক নয় আদৌ। এটি মীরা নন্দার ‘Science in Saffron: Skeptical Essays on History of Science’ বইয়ের ৫৬ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ তথা অধ্যায়ের সারাৎসার।]

    “The physics and chemistry of living cells is the same as the physics and chemistry of rocks. No spiritual energy is needed to explain life”
    --- Victor Stenger

    ১৮৯৩ সালে বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতার মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞানের কথা এসেছিল এরকম ভাবে – ‘হিন্দুরা যে কথা তার বুকের মধ্যে যুগ যুগ ধরে ধারণ করে এসেছে সেই কথাই আরও জোরালো ভাষায়, বিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম সিদ্ধান্তের আলোয় শেখানো হবে এবার।’

    শিকাগোর পর বিবেকানন্দ আমেরিকায় পতঞ্জলির যোগসূত্রর ওপর নিউইয়র্ক এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই বক্তৃতাগুলি বিবেকানন্দর অনুবাদ সহ ১৮৯৬ সালে ‘ রাজযোগ’ নামে প্রকাশিত হয়। প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয় বইটি। এই বইতে শারীরিক আসন টাসনের কথা বলা নেই কিছু যেগুলো বিবেকানন্দর অপছন্দর জিনিস ছিল। আছে যৌগিক ধ্যান ও সমাধির কথা। এর মাধ্যমেই ‘অবিনশ্বর আত্মাকে দেখা’ সম্ভব। বিবেকানন্দর কাছে হিন্দুধর্ম তাই এক যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ধর্ম, যোগ হল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া এবং সত্যকে উপলব্ধি(যাচাই) করার উপায়। ফলে যোগ মানে দাঁড়াল মহাজাগতিক ‘প্রাণ’ বা ‘জীবনশক্তি’কে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করা। এই শক্তি একই সঙ্গে দিব্য আত্মার প্রকাশ আবার একই সঙ্গে প্রাকৃতিক বস্তু যা প্রকৃতিবিজ্ঞানের নিয়মের অধীন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞান অবশ্য এরকম কোনো দিব্য, আত্মসচেতন শক্তি খুঁজে পায় নি।

    ভারতের সনাতন ধর্মীয় চিন্তায় সাদৃশ্য চিন্তার (Resemblance Thinking) খুব গুরুত্ব রয়েছে। অর্থাৎ মহাজাগতিক স্তরে বা অন্যন্য স্তরে যা যা ঘটছে বা ঘটছে বলে কল্পনা করা হচ্ছে জীবজগতে তার সাদৃশ্য খোঁজা। ধরা যাক বৃহদারণ্যক উপনিষদে যজ্ঞের বলিপ্রদত্ত অশ্বের বর্ণ্না--- ‘অশ্বের মাথা হচ্ছে ঊষা, চক্ষু হল সূর্য, এর নিঃশ্বাস হল বায়ু, এর ব্যাদিত মুখগহ্বর হল অগ্নি, সমগ্র শরীর হল বৎসর, এর পিঠ হল আকাশ, এর পেট হল পৃথিবী। এর হাই থেকে বিদ্যুৎ, কম্পন থেকে ভূমিকম্প এবং মূত্রত্যাগ থেকে বৃষ্টি উৎপন্ন হয়’। আবার মানব শরীরের যেমন অবিনশ্বর আত্মা আছে বলে ধরে নেওয়া হয় সেরকম একই সাদৃশ্য চিন্তায় জগতেরও আত্মা আছে ধরে নেওয়া হয় যা ব্রহ্ম। বেদে যজ্ঞের সময় বহির্জগতকে শরীরের মধ্যে কল্পনা করে নেওয়া হয়। ফলে সুষুম্না দণ্ড হয় সুমেরু (জগতের আলম্ব), চার হাত পা চারটি মহাদেশ, মাথা দেবপ্রদেশ, দুটি চক্ষু সূর্য ও চন্দ্র। আবার সৎকার মন্ত্রে মৃত ব্যক্তির চক্ষুদ্বয়কে সূর্যের কাছে আর নিঃশ্বাসকে বায়ুর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ব্রহ্ম তাই জগতের প্রতিটি কণায় ধারণা বা সম্ভাবনা হিসেবে বিরাজমান যাকে নিজের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে বৈদিক ক্রিয়াকর্ম বা যজ্ঞের প্রয়োজন। এই ক্রিয়াকর্মগুলিও ক্রমেই আত্মীকৃত হতে থাকে যা আত্মন ও ব্রহ্মের মধ্যে সম্পর্কস্থাপনে প্রযুক্ত হয়। এই সাদৃশ্যস্থাপন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গবেষণাগারে কর্মরত বিজ্ঞানীকে বিবেকানন্দ ধ্যানরত যোগীকে দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে পারেন।

    ১৮৮০ সালে ১৯ বছর বয়সে নরেন্দ্রনাথ দত্ত কেশবচন্দ্র সেনের ব্রাহ্মসমাজের ঘনিষ্ঠ হন। তিনি চিরকালই অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাবাদে বিশ্বাসী।তাই কেশবের মৃত্যুর পর ১৮৮৪ সালে তিনি যখন রামকৃষ্ণর দর্শনার্থী হন তখন তাঁর প্রথম প্রশ্নই ছিল যে তিনি ঈশ্বরকে দেখেছেন কিনা। লক, বার্কলে হিউম পড়া অভিজ্ঞতাবাদী নরেনের কাছে এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মূল্য ছিল সবচেয়ে বেশি।

    ১৮৮৬ সালে রামকৃষ্ণর মৃত্যুর সাত বছর পর আমেরিকায় পৌঁছে তিন বছর সেখানে থাকেন বিবেকানন্দ। সেখানে অসংখ্য বক্তৃতা তিনি যাদের সামনে রাখেন তাঁরা তখন ধর্মচর্চায় নতুন পথ খুঁজছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের নানা অনুসিদ্ধান্ত হোলি ট্রিনিটির মত খ্রীস্টধর্মের পুরোনো ধারণাকে আর আঁকড়ে থাকতে দিচ্ছিল না। বিবেকানন্দ তাদের উপযোগী হিসেবে অদ্বৈত বেদান্তকে বেছে নিলেন প্রচারের জন্য। বিবেকানন্দ বললেন যে তাঁর এবং গুরু রামকৃষ্ণের সাধনপ্রক্রিয়া আদি শংকরাচার্যর অনুসারী। তখন পাশ্চাত্যে যে কতরকম আধ্যাত্মিক স্রোত বইছিল তার একটা উদাহরণ হল থিয়োজফিক সোসাইটি। মাদাম ব্লাভাটস্কি, হেনরি ওলকটরা ভারতে যে হেডকোয়ার্টার স্থাপন করেছিলেন তার উদ্দেশ্য ছিল রহস্যবাদ, ম্যাজিক, আধুনিক বিজ্ঞান এবং ভারতীয় দর্শনকে মেলানো। বিবেকানন্দ এসবের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। বিশেষত দয়ানন্দ সরস্বতীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। সেই সময় খ্রীস্টধর্ম আধুনিক বিজ্ঞানের চাপে এতটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল যে আমেরিকায় দাঁড়িয়ে খ্রীস্টধর্মকে অযৌক্তিক এবং কুসংস্কারগ্রস্ত বলতেও তিনি ছাড়েন নি। পাশ্চাত্যের অতীন্দ্রীয়বাদী, রহস্যবাদী, গুপ্তসাধক পন্থী – সকলের জন্যই বিবেকানন্দর সমাধান দাঁড়াল যোগ। কিন্তু বিবেকানন্দ পাশ্চাত্যের জমিতে দাঁড়িয়ে এর জন্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, শরীরবিদ্যা এবং জীববিদ্যা থেকে সাদৃশ্য সন্ধান করলেন।

    পতঞ্জলির যোগসূত্রে ১৯৫ টি সূত্র আছে। এর মধ্যে কিন্তু রামদেবীয় আসন নেই। সেগুলি আছে অনেক পরের হঠযোগে। পতঞ্জলির উদ্দিষ্ট হল সমাধি বা বিকল্প চেতনা যাতে আত্মা উপলব্ধি করতে পারে যে সে শরীর থেকে আলাদা। এর জন্য অষ্টাঙ্গ পথ হল যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি। বিবেকানন্দ রাজযোগের ভূমিকায় ‘মেঘের আড়ালে থাকা ঈশ্বর’ এবং বিভিন্ন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি আবার আধুনিক বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা বলেন কারণ তা নাকি মিরাকল ইত্যাদির ব্যাখ্যা দিতে পারে না !তাঁর মতে পতঞ্জলি এই ‘ব্যর্থতার’ সমাধান দিয়েছেন। বিবেকানন্দর মতে ‘অতিপ্রাকৃতিক বলে কিছু নেই, কিন্তু প্রকৃতিতে আছে স্থূল প্রকাশ আর সূক্ষ্ম প্রকাশ। স্থূল প্রকাশ ইন্দ্রিয় দ্বারাই গ্রাহ্য। কিন্তু সূক্ষ্ম প্রকাশ রাজযোগের অনুশীলন দ্বারা অধিগম্য। যৌগিক ধ্যান হচ্ছে এই সূক্ষ্মতার বিজ্ঞান। যোগের মাধ্যমে সকলেই সেই অনুভূতি অর্জনের অধিকারী। তাদের শুধু ‘যোগের বৈজ্ঞানিকভাবে উদ্ভুত পদ্ধতি’ অনুশীলন করতে হবে। বিবেকানন্দর এই প্রকল্প আধুনিকতার এই চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যেখানে বিশ্বাস বা গ্রন্থবাণী নয় --- অভিজ্ঞতা, সাক্ষ্য ও যুক্তির গুরুত্ব বেশি। কিন্তু খ্রিস্টিয় ঐতিহ্যে যখন এই ঐশ্বরিক প্রমাণ প্রকৃতিতে খোঁজা হচ্ছিল, বিবেকানন্দ সেটা নিজের মধ্যে খোঁজার কথা বলছিলেন। বিবেকানন্দের মতে বহির্জগৎ অন্তর্জগৎ বা সূক্ষ্ম জগতের প্রকাশ মাত্র। প্রথমটি কার্য, দ্বিতীয়টি কারণ। এখান থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান যে নিজের ভেতরের আধ্যাত্মিক শক্তিকে যদি কেউ জানতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাহলে সে বহির্জগৎকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সে নাকি এমনকি প্রাকৃতিক নিয়মের আর অধীন থাকবে না। সে প্রকৃতিকেও শাসন করতে পারবে। তিনি লিখছেন--

    ‘‘ ধরা যাক একজন ‘প্রাণ’ কী সেটা ভালোভাবে বুঝেছে এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পৃথিবীর কোন ক্ষমতা তার অনায়ত্ত থাকবে ? সে সূর্য এবং নক্ষত্রদের কক্ষচ্যুত করতে পারবে, পরমাণু থেকে বৃহত্তম সূর্য পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কারণ সে ‘প্রাণ’কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
    ‘যদি সে ঈশ্বর অথবা মৃত্যুর পরের আত্মাকে নির্দেশ দেয় তারা তার কথা শুনবে। সমস্ত প্রাকৃতিক শক্তি সেই নিখুঁত যোগীকে দাসের মত মানবে। সে প্রায় সর্বশক্তিমান হয়ে উঠবে। ’’

    থিওসোফিস্টরা বলতেন’ম্যাজিকও একটা বিজ্ঞান। এটা সূক্ষ্ম শক্তির বিজ্ঞান যেটা জড়বাদী পশ্চিম ধরতে পারছে না। বিবেকানন্দ সেই সূত্রই গ্রহণ করেছেন এখানে। কিন্তু ২০০০ বছরের পুরোনো যোগসূত্রকে বৈজ্ঞানিক বানাতে গিয়ে তাকে এর মধ্যে পরিবর্তন (খারাপ ভাষায় বিকৃতিসাধন) করতে হয়েছে।

    পতঞ্জলির যোগসূত্রে দৈব শক্তি অর্জন নিয়ে অনেকখানি (গোটা বইয়ের এক-ষষ্ঠাংশ) ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পূর্ব জন্মের জ্ঞান, অদৃশ্য হওয়া, নিজের মৃত্যুর সময় জানতে পারা, হাতির মত শক্তিশালী হওয়া, দূরবর্তী জিনিস দেখতে পাওয়া, সূর্য, চন্দ্র ও তারাদের সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা, মৃত লোকের আত্মাকে দেখতে পাওয়া, মৃত ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে তাকে ওঠানো এবং চালানো, তুলোর মত হালকা হয়ে আকাশে উড়ে যাওয়া, কণার মত ক্ষুদ্র হওয়া এবং পর্বতের মত বিশাল হওয়া ইত্যাদি। বিবেকানন্দ এই সবগুলিকেই সমর্থন করে বলেছেন যে মনকে একটি বস্তুর উপর স্থির করে এবং দীর্ঘ সময় রেখে দিয়ে এসব সম্ভব। ভাবলে অবাক লাগে যে বিবেকানন্দর গুরু এসব সিদ্ধাই, বিভূতিকে কোনো গুরুত্বই দেন নি। কিন্তু বিবেকানন্দ লিখছেন, ‘প্রকৃতির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, তারচেয়ে একচুলও কম নয়, আমাদের আবশ্যিক লক্ষ্য হওয়া উচিত।’ তাঁর মতে জাতি হিসেবে ভারতীয়রা সৌভাগ্যবান কারণ বহিঃস্থ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্তঃস্থ জ্ঞানের বিশেষ উপহার তাদের জন্য আছে।

    বিবেকানন্দ এইসব লেখার পরও গুরুত্ব পেয়েছেন কারণ তিনি বিজ্ঞানের পরিভাষা দিয়ে এসব সাজিয়েছেন। এটা করতে গিয়ে তিনি সাংখ্য দর্শনকেও পালটে দিয়ে ব্যবহার করেছেন। সাংখ্য দর্শনের বস্তুগত আধার বা প্রকৃতির জায়গায় তিনি বসিয়েছেন ‘আকাশ’ আর আত্নিক আধার বা পুরুষের জায়গায় বসিয়েছেন ‘প্রাণ’। তারপর তিনি আকাশের সঙ্গে ইথার আর প্রাণের সঙ্গে ‘শক্তি’ বা এনার্জির সাদৃশ্য টেনেছেন। উনবিংশ শতাব্দীতে নিউটনীয় বিজ্ঞানের প্রাধান্যের যুগে ইথার আর এনার্জি, দুইয়েরই সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ছিল। এই সাদৃশ্য প্রতিষ্ঠার পর গোটাটাকেই বেশ বিজ্ঞানের আওতায় এনে ফেলা গেল। তারপর সাদৃশ্য আর রূপকের সাহায্যে বলা হল- প্রাণায়ামের মাধ্যমে প্রাণের নিয়ন্ত্রণ হল মহাজাগতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ। তাহলে প্রাণায়ামের সাহায্যে যে অতীন্দ্রিয় শক্তির অর্জন সেটা দাঁড়াল ‘বৈজ্ঞানিকভাবে’ শক্তির নিয়ন্ত্রণ।

    ভারতীয় দর্শনে পঞ্চভূতের অন্যতম আকাশ। কিন্তু সাংখ্য দর্শনে তা প্রকৃতিরই এক গৌণ বিবর্তন। বিবেকানন্দ যে লিখেছেন আকাশ থেকেই সমস্ত কিছুর উৎপত্তি তা সাংখ্য দর্শনে আদৌ নেই। সেখানে এই উদ্ভব বস্তুগত আধার প্রকৃতি থেকে এবং তা আবশ্যিকভাবে কোনো সূক্ষ্ম আধার নয়। যখন তা প্রকাশিত তখন তা সসীম এবং স্থান কাল দ্বারা সীমায়িত। একমাত্র অপ্রকাশিত রূপেই তা সূক্ষ্ম এবং অদৃশ্য। আবার ‘প্রাণ’কে জগতের শক্তির প্রকাশক বলে যে ভূমিকা বিবেকানন্দ দিয়েছেন তা সাংখ্য দর্শনে আছে পুরুষের যা শুদ্ধ, অজড় চেতনা। পতঞ্জলির লেখায় প্রাণ শব্দটি একটি শ্লোকেই আছে যেখানে এর মানে নিঃশ্বাসপ্রক্রিয়া।পতঞ্জলি মনের নিয়ন্ত্রণের জন্য নিঃশ্বাসের গুরুত্বের কথা বলেছেন, এইটুকুই। সাংখ্য দর্শনে তো প্রাণের কথাই নেই, প্রকৃতির উদ্ভব হিসেবেও নয়। একমাত্র হঠযোগে মুক্তির উপায় হিসেবে নিঃশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ মুল জায়গায় আছে। বিবেকানন্দর কাছে আবার হঠযোগের কোনো গুরুত্ব ছিল না। বিবেকানন্দর মতে প্রাণ মানে নিঃশ্বাস নয়। প্রাণ মানে জগতের শক্তির রূপ। জগতের যা কিছু প্রকাশিত সেই শক্তির সমাহার হচ্ছে প্রাণ। মানে প্রাণ মানে ঠিক নিঃশ্বাস নয়। কিন্তু নিঃশ্বাসের মাধ্যমে প্রাণকে যোগী অনুভব করেন। তিনি লিখছেন---
    ‘‘ আকাশ যেমন জগতের অসীম, সর্বব্যাপ্ত কারণ, প্রাণ তেমনি জগতের অসীম, সর্বব্যাপ্ত প্রকাশ’’
    ‘‘প্রাণই মহাকর্ষ, চৌম্বক বল হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে।প্রাণই স্নায়ুর প্রবাহ, চিন্তাশক্তি হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে।’’

    এই বহিস্থ শক্তিই নাকি যোগীর শরীরে ‘ওজসে’ পরিণত হয়। তখন যোগীর মন সূক্ষ্ম মহাজাগতিক শক্তির সঙ্গে একই কম্পাঙ্কে কম্পিত হয়। তখন তার সমাধি হয়। বিবেকানন্দ এই জায়গায় হঠযোগ থেকে কুণ্ডলিনীচক্র ইত্যাদি ধারণা যোগ করেছেন। বলার এটাই যে স্নায়ুবিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত এসব কাল্পনিক চক্র টক্রের কাছাকাছিও কিছু পাওয়া যায় নি। বিবেকানন্দ পতঞ্জলির যোগসূত্রে প্রাণ এবং আকাশের যে ধারণা ঢুকিয়েছেন সেগুলোও পতঞ্জলির সূত্রে ছিল না।

    আকাশ মানে ইথার আর প্রাণ মানে এনার্জি – এই ধারণা অবশ্য থিয়োজফিস্টরা ইতিমধ্যেই নিয়ে এসেছিল। মাদাম ব্লাভাতস্কি তাঁর ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত বইতে লিখেছিলেন গোটা মহাজগৎ ডুবে আছে ইথারে যেটা আসলে মেসমার বর্ণিত চৌম্বক তরলের (পরে ভুল প্রমাণিত) অনুরূপ সূক্ষ্ম ইথার। ১৮৯৩ সালে মাদ্রাজের থিয়জফিকাল সোসাইটি থেকে প্রকাশিত শ্রীনিবাস আয়েঙ্গারের হঠযোগ প্রদীপিকায় প্রাণের এই সংজ্ঞা গ্রহণ করে বলা হয়েছে প্রাণ আর নিঃশ্বাস আলাদা। মনে রাখতে হবে পতঞ্জলির যোগসূত্রের ইংরেজী অনুবাদও প্রথম এই থিওজফিকাল সোসাইটি থেকেই প্রকাশিত হয়। বিবেকানন্দ প্রকাশ্যে থিওজফিস্টদের অস্বীকার করলেও এখানে তাঁদের ধারণাই প্রয়োগ করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের জগতেও ইথার নিয়ে খুব মাতামাতি হয়েছিল। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিয়োরি অব রিলেটিভিটি প্রকাশের পরই ইথারের গল্পের নটেগাছটি মুড়িয়ে যায়। কিন্তু ধর্মকে বিজ্ঞানের মোড়ক পড়াতে এটা একসময় অতীন্দ্রিয়বাদীদের খুব কাজে লেগেছিল।

    প্রাণ মানে এনার্জি – এই ধারণাটাও রহস্যবাদীদের বেশ কাজে লাগে। ‘হিউমান এনার্জি ফিল্ড’ ইত্যাদি কথা ব্যবহার করে এঁরা ব্যাপারটাকে বেশ ‘বৈজ্ঞানিক’ করে তোলার চেষ্টা করেন। অথচ পদার্থবিজ্ঞানে এনার্জির একটা সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে (কাজ করবার ক্ষমতা)। ফলে এটা বস্তুরই ধর্ম। এমন নয় যে শূণ্য থেকে অশরীরী তরঙ্গ ধরে এনে চেতনা, জ্ঞান বা সংজ্ঞায় প্রবিষ্ট করে দেওয়া যায়। চেতনার কম্পাঙ্ক, এনার্জি ফিল্ড — এসব কিছুই হয় না। এটি বস্তু থেকেই উদ্ভুত।

    এসব ধর্মীয় ছদ্মবিজ্ঞানে সরাসরি ঈশ্বর, দেবতা প্রভৃতির অবতারণা করা হয় না। বিবেকানন্দ তাঁর সময়ে প্রচলিত বিজ্ঞানের ধারণাগুলিকে ২০০০ বছরের পুরোনো অতিলৌকিক ধারণার ব্যাখ্যায় কাজে লাগিয়েছিলেন। আজকে ইথার আর এনার্জির বদলে কোয়ান্টাম ফিজিক্স আর মহাকাশবিদ্যার ধারণাগুলি কাজে লাগিয়ে একই কাজ করা হয়। ফিজিক্সের ডার্ক ম্যাটার আর এনার্জির ধারণা দিয়ে অসংজ্ঞেয় আর অসংজ্ঞাত অপ্রাকৃতকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টাও চলছে। বিবেকানন্দ এই ব্যাপারে আমাদের দেশে পথিকৃৎসুলভ ভূমিকা পালন করেছেন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কৌতূহলী | 115.187.***.*** | ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:১৩737871
  • ছদ্মবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা আর আধ্যাত্মিকতাকে ইন্টেলেকচুয়াল রূপ দেওয়া বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক অবদান বটে,এটা আমার বিজ্ঞানমনস্ক মনন নির্মাণে প্রধান বাধা বলেই মনে হয়। মতে না মিললেও বিবেকানন্দের দুটো গুণ তারিফযোগ্য , সাংগঠনিক দক্ষতা আর ঝরঝরে গদ্য। 
     
    প্রসঙ্গত , অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। 
    '' রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ'' আমরা একই ব্র্যাকেটে উচ্চারন করি বটে ,কিন্তু রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দের ধর্মপ্রচারের মডেল সম্পূর্ণ আলাদা। 
  • Sandipan Majumder | ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:০১737874
  • @কৌতূহলী,ঠিকই বলেছেন।  আসলে বিবেকানন্দর টার্গেট অডিয়েন্স নানা রকম ছিল।সেটাও একটা কারণ বোধহয়।   যেমন শিল্লোন্নত সমাজে তিনি বৈদান্তিক দর্শনকেই সামনে এনেছেন।
  • syandi | 138.199.***.*** | ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০০:৩৮737907
  • বিবেকানন্দর আর এক বিখ্যাত সায়েন্টিফিক দাবী হল একটি অন্ধকার ঘরে ইস্পাতের পাতের উপর শক্তি প্রয়োগ করলে পাতটা নাকি চৈতন্য বা মনে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। এটা প্রবীর ঘোষের বই (প্রবীর ঘোষ, অলৌকিক নয়, লৌকিক, দে’জ পাবলিশিং, একাদশ মূদ্রণ, ১৯৯৮, পৃঃ ২১৭)-তে আছে।

    রামকৃষ্ণ মিশনের এক সাধুমহারাজের দাবী রিলেটিভিটি থিয়োরির জনক আসলে বিবেকানন্দ। উনি আমেরিকা ভ্রমণের সময়ে নাকি ওনার রিলেটিভিটি সংক্রান্ত আইডিয়ার কথা টেসলাকে বলেছিলেন; টেসলা তারপরে ঐ আইডিয়া আইনস্টাইনের প্রথমা স্ত্রী মিলেভা মারিচের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং শেষে আইনস্টাইন  স্ত্রীর কাছ থেকে আইডিয়া পেয়ে বেমালুম ঝেঁপে দেন। একজনকে হিরো বানাতে গিয়ে এরা যে কি করে! 
  • Sandipan Majumder | ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৪৬737916
  • @sayandi,  রিলেটিভিটির গল্পটা জব্বর।বক্তব্যটা শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে। 
  • Sandipan Majumder | ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:০৭737920
  • @ar আপনাকে ধন্যবাদ।  পড়ে দেখব।
     
  • syandi | 185.252.***.*** | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০২:৩৬737925
  • @Sandipan Majumder,
     
    একটু ভুল বলেছিলাম। মহারাজ আইনস্টাইনকে বঞ্চিত করে যে ক্রেডিডটা বিবেকানন্দকে দিচ্ছেন  সেটা রিলাটিভিটি থিওরি রিলেটেড নয়, মাস-এনার্জি ইকুইভ্যালেন্স থিওরি সম্পর্কিত। তবে মাস-এনার্জি ইকুইভ্যালেন্স থিওরি, যেটাকে E = mcদিয়ে রিপ্রেজেন্ট করা হয় সেটা তো special theory of relativity-র সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। আমি এটা দেখেছিলাম একটা ফেসবুক ভিডিওতে। এক চাড্ডি বন্ধু পাঠিয়েছিল।
     
  • Sandipan Majumder | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৫737927
  • @Sayandi, অনেক ধন্যবাদ। 
  • দ্রি | 2406:b400:b4:f2ab:411b:55fd:d83:***:*** | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:১১737934
  • আমার মনে হয় বিবেকানন্দ এখানে জাস্ট কনভেয়ার অফ দা মেসেজ। কিন্তু পতঞ্জলির শাস্ত্রে কোথাও যদি এটুকু বলা থাকে যে মাস আর এনার্জি একই জিনিসের দুই রূপ তাহলে এই কনসেপ্টের থিওরিটিক্যাল বেসিসের জন্য পতঞ্জলিকে কিছু ব্রাউনি পয়েন্ট দেওয়া উচিত। কারণ আমি এখনো এটা ভালো করে কনসিভ করতে পারি না। 
     
    কিন্তু এর কোয়ান্টিটেটিভ বেসিসের জন্য আইনস্টাইন এবং তাকে যেসব গাণিতিকরা সাহায্য করেছেন তাদের অবদান স্বীকার করতেই হবে। 
  • দ্রি | 2406:b400:b4:f2ab:411b:55fd:d83:***:*** | ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:১৬737936
  • আইনস্টাইনের সেই পেপার। 
     
     
    (অরিজিনাল পেপার নিশ্চয় জার্মানে ছিল এটা ইংরিজিতে তর্জমা )
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন