অ্যা লবার্ট সিরাজ ব্যানার্জি
প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় সে প্রাসাদের সর্বোচ্চ বারান্দায় দাঁড়ায়। লালচে আকাশের নিচে হস্তিনাপুরের অপরূপ রূপ যেন আগুনে ঝলসে উঠে। কিন্তু তার চোখে পড়ে না সৌন্দর্য। চোখে পড়ে শুধু সেই একই দৃশ্য—সবুজ মাঠের ওপারে দূরের কুটির, যেখানে পাঁচ ভাই ও তাদের এক স্ত্রী বাস করে। আরও ক্লিয়ারভাবে দেখে সে—সেই সুন্দরী স্ত্রী, যার হাসিতে একদিন পুরো সভা ভেসে গিয়েছিল। আজ সেই হাসি নেই, আছে শুধু লজ্জা, ক্ষোভ এবং অপেক্ষা।
হাতের রেলিংটা শক্ত করে ধরে। নখ গেঁথে যায় কাঠের ভেতর। মনে পড়ে যায় সেই সভার দিন। তার হাত ধরে টেনে আনা হয়েছিল সেই নারীকে। চুলের মুঠি ধরে টানা হয়েছিল। শুনতে হয়েছিল সেই ভয়ানক শব্দ—বস্ত্রখণ্ডের টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার শব্দ। সেদিন সে বিজয়ের মদে ডুবে ছিল। কিন্তু আজ? আজ শুধু গলায় একটা অসহ্য চাপ অনুভব করে।
পিছনে পায়ের শব্দ শোনে। ঘুরে দাঁড়ায় না। জানে কে আসছে। সেই মানুষটা আসে নিঃশব্দে, দাঁড়ায় পাশে। দুজনেরই দৃষ্টি থাকে দূরের কুটিরে।
"আবার গেলে?" প্রথম পুরুষ প্রশ্ন করে, মুখ না ফিরিয়েই।
"হ্যাঁ।" উত্তর আসে সংক্ষিপ্ত। "তারা এখনও মানছে না। শুধু দ্বিতীয় ভাইটা কিছুটা নড়চড় করছে। বাকিরা অটল।"
"সে কী দেখে আসছে?" প্রথম পুরুষের গলায় একটু কাঁপন ধরে। "সে কি... তার কথা জিজ্ঞেস করে?"
দ্বিতীয় পুরুষ কিছুক্ষণ চুপ থাকে। "জিজ্ঞেস করে। প্রতি বারই জিজ্ঞেস করে। তার স্বাস্থ্য, তার মন... সব জানতে চায়।"
প্রথম পুরুষের হাতের মুঠি শক্ত হয়। "আর সে জবাব দেয় কী?"
"জবাব দেয় তৃতীয় ভাই। বলে, সে ভালো আছে। বলে, অপেক্ষা করছে।" দ্বিতীয় পুরুষ একটা গভীর শ্বাস নেয়। "তোমার জন্য অপেক্ষা করছে না। অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করছে।"
প্রথম পুরুষ ঝাঁকি দিয়ে বারান্দা ছেড়ে চলে আসে ভেতরের দিকে। রাজপ্রাসাদের করিডরগুলো আজ তার কাছে কারাগারের করিডোর মনে হয়। দেয়ালের ফ্রেস্কোগুলোতে যুদ্ধের দৃশ্য আঁকা। মহাভারতের গল্প। কিন্তু আজ সেগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছে। সে দেখতে পায় নিজেকে—রাজসভার মাঝে দাঁড়িয়ে, এক নারীর বস্ত্র হরণ করছে। তারপরই দৃশ্য বদলে যায়। দেখে, সেই নারী দাঁড়িয়ে আছে এক তেজস্বী যোদ্ধার পাশে। যোদ্ধার কানে দুলছে স্বর্ণের কুণ্ডল, বক্ষে ঝলমল করছে স্বর্ণের কবচ। আর তাদের চোখে শুধু ঘৃণা নয়, আছে আরও গভীর কিছু—একটা বোঝাপড়া, একটা না বলা সম্পর্ক।
দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে আসছে মদ্যপানের আওয়াজ, হাসির শব্দ। তার ভাইরা এখনও সেই সভার দিনের বিজয় উদযাপন করছে। সে দরজা খোলে না। ফিরে যায় নিজের কক্ষে।
রাত নামে। প্রদীপের আলোয় অন্ধকারটা দোদুল্যমান হয়। সে খোলা রাখে জানালা। বাতাসে আসে দূরের বন থেকে ফুলের গন্ধ। সেই গন্ধেই আবার মনে পড়ে যায়—এক যুবতীর ঘোমটা থেকে উড়ে আসা চম্পক ফুলের সুবাস। রাজসভায় দাঁড়িয়ে সে ঘোমটা খুলে ফেলেছিল। শুধু বস্ত্র হরণ করেনি, হরণ করেছিল লজ্জা, সম্মান, সবকিছু।
কিন্তু একটা জিনিস হরণ করতে পারেনি। হরণ করতে পারেনি সেই দৃষ্টি—সেই নারীর দৃষ্টি যখন সে তাকিয়েছিল সভার এক প্রান্তে দাঁড়ানো এক যোদ্ধার দিকে। সেই দৃষ্টিতে ভয় ছিল না, ক্ষোভ ছিল না। ছিল শুধু এক গভীর বেদনা, আর অপেক্ষা। অপেক্ষা সেই যোদ্ধার সাহায্যের, যার দিকে তাকিয়ে ছিল যেন শেষ আশ্রয়।
সেই যোদ্ধা আজও যায়। গোপনে। ছদ্মবেশে। প্রতি পূর্ণিমায় সে বের হয়। কালো চাদর জড়িয়ে, মুখ ঢেকে। হেঁটে যায় বনের পথ ধরে। পৌঁছায় সেই কুটিরে। দরজা খোলে তৃতীয় ভাই। কথা বলে নিঃশব্দে। জানতে চায় সেই নারীর কথা। শুনে চলে আসে।
প্রথম পুরুষ জানত না শুরুতে। ধরা পড়েছিল একদিন। অনুসরণ করেছিল। দেখেছিল সেই যাওয়া-আসা। দেখেছিল কুটিরের দরজা খুলতে সেই নারীকে। দুই চোখের দেখা। নিঃশব্দে কাঁদা। তারপর দরজা বন্ধ।
সেদিন রাতে প্রথমবার বুঝতে পারে আসল শত্রু কে। শত্রু শুধু পাঁচ ভাই নয়। শত্রু সেই মানুষটা, যে রাজসভায় চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। যে আজ গোপনে যায়-আসে। যে হয়তো অপেক্ষা করছে উপযুক্ত সময়ের।
প্রাসাদের উদ্যানে পা চালায় অন্ধকারে। মনে পড়ে ছেলেবেলা। একসাথে খেলা করত। কুস্তি করত। সেই মানুষটা সবসময় থাকত একটু দূরে। কারণ সে ছিল সূতপুত্র। কিন্তু যুদ্ধের কৌশলে সবার সেরা। দানের ক্ষেত্রে অদ্বিতীয়।
হঠাৎ একটা শব্দ শোনে। ঘুরে দাঁড়ায়। দেখে, বাগানের গহীনে একটা ছায়া নড়ছে। ছায়া এগিয়ে আসে আলোর দিকে। সেই মুখ। সেই চোখ।
"তুমি এখানে?" প্রথম পুরুষ বলতে চায়, কিন্তু গলায় আটকে যায় কথা।
"তোমার সাথে কথা বলতে চাই।" দ্বিতীয় পুরুষ বলে। "একা কথা বলতে চাই।"
দুজনে হেঁটে যায় রাজপ্রাসাদের পিছনের বাগানে। সেখানে একটা পুরনো পুষ্করিণী। জলে পড়েছে চাঁদের আলো। দুজনেই জানে, এই পুকুরের পাড়ে বসে তারা কত স্বপ্ন দেখত। কত পরিকল্পনা করত।
"তুমি ভুল করেছ।" দ্বিতীয় পুরুষ সরাসরি বলে। "সেদিন রাজসভায় যে কাজ করেছ, সেটা শুধু অন্যায় নয়, মূর্খতাও।"
"তুমি বলতে পারতে! সেদিন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন?" প্রথম পুরুষ গর্জে ওঠে। "তোমার তো বীরত্বের শেষ নেই! তখন কেন বাধা দিলে না?"
দ্বিতীয় পুরুষের চোখে একটা অদ্ভুত দীপ্তি আসে। "সে সময় আমি কীভাবে বাধা দেব? আমার অবস্থান কী ছিল সভায়? আমি কে? সূতপুত্র। একজন সারথির ছেলে। আর তুমি? রাজপুত্র।"
"তোমার বন্ধু! তোমার সাথী!" প্রথম পুরুষ চিৎকার করে। "তুমি যদি চাইতে..."
"চেয়েছিলাম!" দ্বিতীয় পুরুষ হঠাৎ উচ্চৈঃস্বরে বলে। "সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলাম বাধা দিতে। কিন্তু আমার হাত ছিল বাঁধা। শুধু রাজপরিবারের নিয়মে নয়, আমার নিজের প্রতিশ্রুতিতে।"
প্রথম পুরুষ চেয়ে থাকে। বুঝতে পারে না।
দ্বিতীয় পুরুষ নিঃশ্বাস ছাড়ে। "তুমি জান না। কেউ জানে না। শুধু একজনের জানার কথা ছিল। আজ হয়তো সে-ও জানে না।"
"কী কথা?" প্রথম পুরুষের গলা শুকিয়ে আসে।
"সেই নারী..." দ্বিতীয় পুরুষ বলতে গিয়ে থামে। "সেই স্বয়ংবর সভায় আমি ছিলাম। দেখেছিলাম তাকে। প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম, সে শুধু একজন নারী নয়। সে একজন দেবী। কিন্তু আমি কী করতে পারি? একজন সূতপুত্র? তাই দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছি। দেখেছি কীভাবে অর্জুন লক্ষ্য ভেদ করে। দেখেছি কীভাবে সে বরণমাল্য পরায় তার গলায়।"
পুকুরের জলে একটা মাছ লাফ দেয়। ঢেউ হয়। চাঁদের প্রতিবিম্ব ভেঙে যায়।
"তারপরও আশা ছিল। ভাবতাম, হয়তো... কিন্তু সব শেষ হয়ে যায় রাজসভার দিন। যখন তুমি টেনে আনলে তাকে। যখন হরণ করতে চাইলে তার সবকিছু। সেদিন আমার হাত কাঁপছিল। তলোয়ার ধরতে চাইছিল। কিন্তু পারিনি। কারণ আমি বন্ধুত্বের শপথ ভঙ্গ করতে পারিনি। তোমার দাদার সাথে বন্ধুত্ব। আমার জীবনের প্রথম ও শেষ বন্ধুত্ব।"
প্রথম পুরুষ নিঃশব্দে কাঁদে। কাঁদে লজ্জায়, অনুশোচনায়।
"আজ আমি যা করছি, সেটা বন্ধুত্বের জন্য নয়। সেটা ন্যায়ের জন্য। সেটা... তার জন্য।" দ্বিতীয় পুরুষ উঠে দাঁড়ায়। "তাই শোনো। যদি তুমি নিজে শাস্তি নাও, যদি তুমি নিজে ক্ষমা না চাও, তাহলে আমাকে করতে হবে যা করতে হয়।"
"তুমি আমাকে মারবে?" প্রথম পুরুষ বলে অবিশ্বাস্যে।
"না। তুমি মারবে না ভীমকে। সে মারবে তোমাকে। এটা নিশ্চিত। কিন্তু যদি সে না মারতে পারে, যদি কোনো কারণে সে ব্যর্থ হয়, তাহলে... তাহলে আমাকে মারতে হবে। কারণ যুদ্ধ ক্ষত্রিয়দের ধর্ম নয়। যুদ্ধ ধর্ম। আমি ন্যায়ের পক্ষে।"
দ্বিতীয় পুরুষ চলে যায়। ফেলে যায় প্রথম পুরুষকে অন্ধকারে।
পরের কয়েকদিন প্রথম পুরুষ প্রাসাদের ভেতরেই থাকে। বাইরে বের হয় না। ভাইদের মদ্যপের আসর এড়িয়ে চলে। রাতগুলো কাটে জেগে জেগে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য—সে মরছে। কে মারে? বড় ভাই? না। দ্বিতীয় ভাই? না। মারে ভীম। আর যদি ভীম না মারে? তাহলে মারে সেই মানুষ। যে আজ তার শত্রু। যে একদিন তার বন্ধু ছিল।
একদিন রাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। বুঝতে পারে, সে একা নয়। কক্ষের এক কোণে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে। ছায়া বলে, "সময় আসছে। প্রস্তুত হও।"
"কোন সময়?" প্রথম পুরুষ জিজ্ঞেস করে।
"যুদ্ধের সময়। শেষ যুদ্ধের সময়। এটা শুধু রাজ্যের জন্য যুদ্ধ হবে না। এটা হবে ন্যায়-অন্যায়ের যুদ্ধ। সত্য-মিথ্যার যুদ্ধ। আর তোমাকে থাকতে হবে ভুলের দিকে। কারণ তুমিই ভুল করেছ।"
"আমি পাল্টাতে পারি না?" প্রথম পুরুষ কাঁদতে কাঁদতে বলে।
"পারো। কিন্তু সেটা বিশ্বাস করবে না কেউ। বিশেষ করে সে না। যে অপেক্ষা করছে প্রতিশোধের।"
ছায়া মিলিয়ে যায়। প্রথম পুরুষ বেরিয়ে আসে বারান্দায়। দেখে, আকাশে মেঘ জমেছে। বাতাসে আসছে বৃষ্টির গন্ধ। দূরের কুটিরে আজ আলো জ্বলে না। অন্ধকারে ডুবে আছে সবকিছু।
সেই দিন থেকে সে দেখতে থাকে। দেখে, পাঁচ ভাই গোপনে লোক জড়ো করে। দেখে, তারা অস্ত্র সংগ্রহ করে। দেখে, দূরদূরান্ত থেকে আসেন যোদ্ধারা। সবাই একজোট হয় এক লক্ষ্য নিয়ে—প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।
আর দেখে সেই মানুষটাকে। যে এখন আর ছদ্মবেশে যায় না। যে এখন খোলাখুলি
একদিন সকালে সে রাজসভায় যায়। দাঁড়ায় মহারাজের সামনে। বলে, "আমি ভুল করেছি। আমি ক্ষমা চাই।"
সভায় নিশ্চুপতা নেমে আসে। তার ভাইরা হাসে। মহারাজ রাগে। কিন্তু একজনের মুখে হাসি থাকে না। যে দাঁড়িয়ে আছে সভার এক প্রান্তে। যে শুধু মাথা নিচু করে।
সেদিন রাতে আবার দেখা হয় পুকুরের পাড়ে।
"তুমি ক্ষমা চেয়েছ। ভালো করেছ।" দ্বিতীয় পুরুষ বলে। "কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়।"
"আর কী করতে হবে?" প্রথম পুরুষ জিজ্ঞেস করে।
"যুদ্ধ আসছে। সেই যুদ্ধে তোমার মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু মৃত্যুর আগে তোমাকে করতে হবে একটা কাজ। তুমি যেখানে পাপ করেছ, সেখানে ফিরে যেতে হবে। সেই সভাঘরে। সেখানে মাথা নত করতে হবে। বলা হবে, 'আমি ক্ষমা চাই। আমার জীবন নাও। কিন্তু আর কাউকে দোষ দিও না।'"
"আমি করতে পারব।"
"শুধু বললে হবে না। প্রমাণ করতে হবে। রক্ত দিতে হবে।" দ্বিতীয় পুরুষ পা বাড়ায়। "আমি যাই। মনে রাখবে, যদি ভীম না মারে, আমি মারব। কারণ দাবি এটাই।"
বৃষ্টি নামে। টিপটিপ বৃষ্টি। প্রথম পুরুষ দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টিতে। ভিজতে থাকে। মনে হয়, এই বৃষ্টিতে ধুয়ে যাবে সব পাপ। কিন্তু জানে, পাপ ধোয়া যায় না। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।
যুদ্ধের দিন আসে। কুরুক্ষেত্রের মাঠে সৈন্য সমাবেশ হয়। দুই পক্ষ। একপক্ষে পাণ্ডব, অন্য পক্ষে কৌরব। প্রথম পুরুষ দাঁড়ায় কৌরব বাহিনীর সামনে। দেখে, পাণ্ডব বাহিনীর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষ। আজ তার কবচ কুণ্ডল ঝলমল করছে। আজ সে সারথি নয়, আজ সে যোদ্ধা।
যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিনেই রক্তে লাল হয় মাটি। প্রথম পুরুষ লড়াই করে। ভালোই লড়াই করে। কিন্তু মনে শান্তি নেই। চোখ সবসময় খোঁজে সেই মানুষটাকে।
একদিন দেখা হয় যুদ্ধের মাঝখানে। দুজনেই রথ থেকে নেমে পড়ে। মুখোমুখি হয়।
"আজ শেষ কথা বলব।" দ্বিতীয় পুরুষ বলে। "তোমার মৃত্যু আসছে। খুব তাড়াতাড়ি। প্রস্তুত হও।"
"আমি প্রস্তুত।" প্রথম পুরুষ বলে। "কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করব। সেদিন স্বয়ংবর সভায়... যদি আমি না থাকতাম, যদি অর্জুন না থাকত, তুমি কি..."
"হ্যাঁ।" উত্তর আসে সরাসরি। "হ্যাঁ, আমি লক্ষ্য ভেদ করতাম। আমি জিততাম। কিন্তু ইতিহাস 'হ্যাঁ' শুনতে চায় না। ইতিহাস শুধু সত্য শোনে। আর সত্য হলো, আমি সূতপুত্র। আমি পারিনি।"
যুদ্ধ চলতে থাকে। দিনের পর দিন। প্রথম পুরুষের ভাইরা একে একে মারা যায়। শেষ পর্যন্ত আসে সেই ভয়ঙ্কর দিন। যেদিন ভীম হুমকি দিয়েছিল।
যুদ্ধের সপ্তদশ দিন। আকাশ মেঘে ঢাকা। বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ। প্রথম পুরুষ রথ চালাচ্ছে। হঠাৎ দেখে, ভীম এগিয়ে আসছে। বিশাল গদা হাতে। চোখ লাল। মুখে ফেনা।
"অপেক্ষা কর!" প্রথম পুরুষ চিৎকার করে। "আমি কিছু বলব!"
কিন্তু ভীম শোনে না। গর্জে ওঠে। "সেদিন রাজসভায় যা করেছিস, আজ তার শাস্তি পাবি!"
গদা উঁচু হয়। প্রথম পুরুষ চোখ বন্ধ করে। অপেক্ষা করে শেষ মুহূর্তের। কিন্তু আঘাত আসে না।
চোখ খোলে। দেখে, একটা রথ দাঁড়িয়ে আছে দুইজনের মাঝে। রথ থেকে নেমে আসছে সেই মানুষ। কবচ-কুণ্ডল নিয়ে।
"এটা ঠিক না।" দ্বিতীয় পুরুষ বলে ভীমকে। "এভাবে নয়। সেদিন সে যা করেছিল, সেটা রাজসভায় করেছিল। আজ যদি শাস্তি দিতেই হয়, দাও রাজসভায়। সবাই দেখবে। ইতিহাস দেখবে।"
ভীম রাগে থরথর করে কাঁপে। কিন্তু কিছু বলে না। কারণ এই যোদ্ধার কথায় ওজন আছে।
দ্বিতীয় পুরুষ ফিরে তাকায় প্রথম পুরুষের দিকে। "এটাই শেষ সুযোগ। রাজপ্রাসাদের সেই সভাঘরে যাও। সেখানে দাঁড়াও। অপেক্ষা করো। যদি ক্ষমা চাও, বলো। যদি না চাও, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।"
প্রথম পুরুষ রথ ফিরিয়ে নেয়। যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যায়। পেছনে ফেলে আসে চিৎকার, হাহাকার, যুদ্ধের শব্দ।
রাজপ্রাসাদ আজ ফাঁকা। সবাই যুদ্ধে গেছে। সে হেঁটে যায় সেই সভাঘরের দিকে। দরজা খোলে। ভেতরে ঢোকে।
সবকিছু যেমন ছিল। সিংহাসন। আসন। কিন্তু মানুষ নেই। আজ কেউ নেই বিচারক হিসেবে। আজ বিচারক শুধু তার নিজের বিবেক।
সভাঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। মাথা নিচু করে। বলে, "আমি দোষী। আমি পাপ করেছি। আমি একজন নারীর সম্মান হরণ করেছি। আজ আমি আমার জীবন উৎসর্গ করছি। কে নেবে?"
দরজা খোলে। আলো আসে। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে সেই মানুষ। আজ তার চোখে রাগ নেই, ঘৃণা নেই। আছে শুধু এক গভীর দুঃখ।
"আমি নেব না।" দ্বিতীয় পুরুষ বলে। "কিন্তু সে আসছে। যে নেবে।"
পেছন থেকে আসে ভীষণ পদক্ষেপের শব্দ। প্রথম পুরুষ ঘুরে তাকায় না। জানে কে আসছে।
"ক্ষমা চাও!" ভীম গর্জন করে।
"ক্ষমা চাইছি।" প্রথম পুরুষ বলে। "তোমার কাছেও। তার কাছেও। যার সাথে আমি অন্যায় করেছি।"
গদা উঁচু হয়। প্রথম পুরুষ চোখ বন্ধ করে। মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার দিনগুলো। মনে পড়ে যায় সেই মানুষটার সাথে বন্ধুত্ব। মনে পড়ে যায় সেই নারীর হাসি। সবকিছু যেন একটা ছবির মতো ভেসে ওঠে।
তারপর আঘাত আসে।
শেষ শব্দটা সে শোনে। নিজের হাড় ভাঙার শব্দ। শেষ দৃশ্য দেখে—দরজায় দাঁড়িয়ে সেই মানুষ, যে চোখ বন্ধ করে ফেলছে। শেষ চিন্তা ভেসে আসে—হয়তো এটাই ন্যায়। হয়তো এটাই প্রায়শ্চিত্ত।
বাইরে বৃষ্টি নামে। মুষলধারে। বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় রাজপ্রাসাদের সিঁড়ির রক্ত। ধুয়ে যায় সব পাপ, সব অপরাধ। কিন্তু ধুয়ে যায় না ইতিহাস। ইতিহাস থেকে যায়। থেকে যায় গল্প। থেকে যায় শিক্ষা।
দরজায় দাঁড়ানো মানুষটা বৃষ্টিতে হাঁটে। যায় না যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। যায় বনের দিকে। সেখানে এক কুটিরে এক নারী অপেক্ষা করছে। না, প্রতিশোধের জন্য না। শান্তির জন্য। ন্যায়ের জন্য।
সেই মানুষ কুটিরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। দরজা খোলে। ভেতরে দাঁড়িয়ে সেই নারী। তার চোখে আজ অশ্রু নেই। আছে শুধু প্রশ্ন।
"শেষ হয়ে গেছে?" নারী জিজ্ঞেস করে।
"হ্যাঁ। এক পাপের শেষ হয়েছে। কিন্তু আরও অনেক পাপ বাকি।" মানুষ বলে।
"তোমার পাপ?"
"হ্যাঁ। আমার পাপ। যে পাপ আমি আজও বহন করি। যে আমি প্রকাশ করতে পারিনি। যে সম্মান আমি দিতে পারিনি।"
নারী কিছু বলে না। শুধু দরজা বন্ধ করে। কিন্তু দরজা বন্ধ করার আগে, এক ফোঁটা অশ্রু পড়ে মাটিতে।
মানুষটা ফিরে যায়। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে। জানে, যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। জানে, এখনও বাকি আছে শেষ পর্ব। তার নিজের পর্ব। যে পর্বে তাকেও মরতে হবে। যে মৃত্যু হবে তার প্রায়শ্চিত্ত।