( ২ )
রামশঙ্করের মনটা আজ একদম ভাল নেই। বাদামী রঙের ভোলাভালা ভুলোটাকে কে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে। সকালবেলায় দেখল সজনেগাছের তলায় মরে পড়ে আছে। যন্ত্রণাকাতর মুখটা অসহায়ভাবে হাঁ করা। গ্যাঁজলা শুকিয়ে আছে চোয়ালের দুপাশে। পা চারটে টানটান হয়ে আছে। প্রাণটা বেরোবার আগে পর্যন্ত কত কষ্ট পেয়েছে ভেবে তার চোখে জল এসে গেল। সে রাস্তার ধারে উবু হয়ে বসে ভুলোর দিকে তাকিয়ে রইল ।
..... খুব ন্যাওটা ছিল ..... কামারুল মোল্লার নামে কসম খেয়ে বলল — ভুলো তোকে কথা দিলাম এর বদলা আমি নেব। মা কসম ... গুরু কসম .....
লুঙ্গি পরে খালি গায়ে নিমকাঠি দিয়ে দাঁতন করতে করতে ঘাড় ঝুঁকিয়ে দেখতে লাগল নিশীথ বট । ‘ ..... ইশশ্ কাদের কাজ এসব ..... এত ভাল ছিল ও .... কার গায়ের জ্বালা ধরল বল তো ..... পাষন্ড ... পাষন্ড।’
রামশঙ্কর আবার বিড়বিড় করল , ‘ ছাড়ব না কিছুতেই মা কসম ...’
নিশীথের কানে গেল বোধহয় । সে বলল, ‘ .... হ্যাঁ আলবাত .... ছাড়বি না ..... একদম ছাড়বি না শালা শুয়োরের বাচ্চা... '
—- ‘ ওটা দেখছি কি করা যায়। এখন ভুলোকে একটা ভাল জায়গায় কবর দিতে হবে । ও যেন ওপরে গিয়ে শান্তি পায় ‘
— ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ .... দাঁড়া আমি গাড়িটা নিয়ে আসছি । নীলুকে ডাকছি দাঁড়া । তোলবার জন্যে তো দুটো লোক চাই ’
গাড়ি মানে নিশীথের ভ্যানরিক্শা। স্টেশন থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত গাড়ি টানে নিশীথ সকাল নটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত। সে আমবাগানের পিছনে তার বাড়ির দিকে গেল জোরে পা চালিয়ে । তার সতের বছরের ছেলে গাট্টাগোট্টা চেহারার নীলুকে ভ্যানে বসিয়ে মিনিট পাঁচেকের ভিতর এসে গেল নিশীথ। রামশঙ্কর তখনও উবু হয়ে বসে আছে ভুলোর দিকে চেয়ে। তার চোখে জল আসছে বারবার। নিশীথ বট একটা শাবল আর একটা কোদালও নিয়ে এল সঙ্গে করে।
পশ্চিমের বিলের ধারে ওরা তিনজনে মিলে মাটি খুঁড়ে বেশ চওড়া গর্ত করে ভুলোকে যত্ন করে শুইয়ে মাটি চাপা দিল।
ভুলোর বয়েস হয়েছিল প্রায় দশ। সেই কচি বয়স থেকেই রামশঙ্করের ন্যাওটা। রামশঙ্করকে দেখলেই ল্যাজ নেড়ে নেড়ে অস্থির। বিছানায় ওকে পাশে নিয়ে ঘুমোত। আরও দুটো ভাই হয়েছিল ভুলোর। সেগুলো বাঁচেনি। ভুলোর মা ভুলোকে নিয়ে রইল। ভুলোর বয়েস যখন বছর খানেক ওর মা মরে গেল। বুড়ি হয়ে গিয়েছিল। মহিমদের পুকুরধারে গিয়ে মরে পড়ে ছিল।
রামশঙ্কর তখন আর ভুলোকে পাশে নিয়ে শোয় না রাতের বেলায়। ঘরের দরজার বাইরে শুয়ে থাকে। মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে অন্ধকার সজনেতলায় গিয়ে দাঁড়ায়। এপাশে ওপাশে কি সব শোঁকাশুঁকি করে, তারপর আবার রামশঙ্করের দোরগোড়ায় এসে গুটলি পাকিয়ে শুয়ে পড়ে।
সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়াত এখানে ওখানে। দুপুরবেলায় রামশঙ্কর বাড়ি থাকত না। শনিবারটা বাদ দিয়ে রোজই কলকাতায় গিয়ে নিজের ধান্দাপানিতে চক্কর কাটতে হয়। তার দুই বৌদি তার দাদাদের কান ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে তার হাড়ি আলাদা করে ছেড়েছে বটে, তবে তারা ভুলোর ওপর কিন্তু যথেষ্ট সদয় এবং স্নেহপরবশ। ভুলোর মা দেহত্যাগ করার পর থেকে কুকুরটার ওপর তাদের টান আরও বেড়েছে। দুপুরবেলায় দুই জায়ে মিলে খেতে দেয়। এজন্য রামশঙ্কর যথেষ্ট কৃতজ্ঞ ওদের ওপর। রাতে রামশঙ্করের ফেরার অপেক্ষায় রান্নাঘরের পিছন দিকে তার ঘরের বাইরে ঠায় বসে থাকত ভুলো । রামশঙ্কর বাড়ি ফিরলে ছেলেপুলেদের মতো সামনের দুপা বুকে তুলে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। রামশঙ্কর মাটিতে বসে পড়ে ভুলোর আপাদমস্তক আদরে আদরে ভরিয়ে দিত। মাঠঘাট ঘর বাড়ি তখন হয়ত ভরে যাচ্ছে আকাশ থেকে ঝরে পড়া জ্যোৎস্নার আলোয়।
ভুলুকে সমাধিস্থ করার পর রামশঙ্কর ওপরের মাটিতে একটা কৃষ্ণচূড়ার চারা পুঁতে দিল। গাছটা বেড়ে ওঠার পর যাতে রাঙা ফুল ঝরিয়ে ভরে রাখতে পারে সমাধির ওপরটা। কিন্তু রামশঙ্করের মনে আচমকা জেগে উঠল একটা ভাবনা। যদি কখনও দমকা হাওয়া ওঠে বোশেখ জষ্ঠি মাসে এ চারা বাঁচিয়ে রাখতে পারবে তো নিজেকে সে ঝটকা সামলে। তারপর ভাবল নিশ্চয় পারবে। কালবোশেখির ঝাপটা পড়ে লম্বা বাড়ন্ত গাছগুলোর ওপর। তলায় থাকা ছোটগুলো ধাক্কা খায় না তেমন।
কামারুল মোল্লা বলল, ‘ তুই দু:খ করিসনি। রাস্তা একটা বের করব ঠি ক। যারা করেছে তারা আলবাত মুজরিম। জবাব নিশ্চই দেওয়া উচিত। দিনকয়েক অপেক্ষা কর ‘
শিয়ালদায় বি আর সিং হাসপাতালের কাছে ফুটপাথে প্লাস্টিকের ছাউনি দেওয়া ভাতের হোটেলে বসে চারাপোনার ঝোল দিয়ে ভাত খাচ্ছিল রামশঙ্কর। এক কুচি লেবু আর লঙ্কা ফ্রি । জলের মতো পাতলা ডালটাও ওই ওর মধ্যেই। আলাদা পয়সা লাগবে না। এক্সট্রা ভাত প্রতি ক্ষেপে পাঁচ টাকা। হাপুস হাপুস করে খাচ্ছে সবাই পরম আনন্দে। ছেঁড়া ফাটা বর্ণহীন লোকজন। লেবুটা যতটা সম্ভব নিংড়ে ক’ ফোঁটা রস বার করে ঝোলভাতে মেখে নিল রামশঙ্কর। একটা কাঁচা লঙ্কা তুলে নিয়ে কামড় দিল। মাগনায় দিচ্ছে, ছাড়বে কেন । মুখে পুরতেই ভুলোর কথা মনে পড়ে গেল। মনের তলায় একটা ব্যথা পাক দিয়ে উঠল। ভুলোরও এটাই খাবার টাইম। যেখানেই টইটই করে ঘুরুক না কেন, ওর পেটঘড়ি ঠিক টাইম জানান দেয়।
ঠিক এই টাইমে উঠোনের একপাশে এসে বসে থাকত ঘরের দিকে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে । রামশঙ্করের বৌদিরা রামশঙ্করের ওপর বিরূপ হলেও ভুলোর ওপর অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ। চারটে ভাতমাখা কাঁটাকুটো তারাই দিয়ে আসছে নিয়মিত। রামশঙ্কর তার বৌদিদের ওপর ভীষণ কৃতজ্ঞ সেজন্য। রাতের দায়িত্ব অবশ্য রামশঙ্করের । দশ টাকার মাংসের ছাঁট কিনে আনত বাড়ি ফেরার সময়, ওই স্টেশনের পাশে মাংসের দোকান থেকে। ছটা হাতে গড়া রুটিও কিনে নিত । চারটে নিজের , দুটো ভুলোর। ওসবের আর দরকার হবে না। রাতে ভুলো শোবেও না তার ঘরে আর কোনদিন।তার ফেরার পথ চেয়ে বসেও থাকবে না আর । মনটা হু হু করতে লাগল। খাওয়া থেমে গেল তার।
পাশে একটা লোক একমনে খেয়ে যাচ্ছে। আরও এক বাটি ভাত নিল। আবার একবার ডাল নিল। তারপর আবার মাছের ঝোল চাইল। দিতে একটু দেরি হওয়ায় গলা উঁচিয়ে চেরা আওয়াজে বলে উঠল, ‘ কি হল কি ..... বসে বসে আঙুল চুষব নাকি ? কথা কানে যাচ্ছে না ! আর কতক্ষণ লাগবে .... মিনি মাগনায় খাচ্ছি নাকি ? ‘
কালো মতো একজন মাঝবয়েসি লোক নির্বিকার ভঙ্গীতে এসে কাস্টমারের মাছের ঝোলের প্লেটে খানিকটা ঝোল ঢেলে দিয়ে দ্রুতগতিতে অন্যদিকে চলে গেল।
কাস্টমারের মুখ দিয়ে অস্ফুটে তাচ্ছিল্যের আওয়াজ বেরোল— ‘হুঁ : ..... ‘ । তারপর আবার খাওয়ায় মন দিল। দুপুরবেলায় ফুটপাথের বেঞ্চিতে বসে এই সাপটে মাছের ঝোল ভাত সাঁটানোর যে কি সুখ তা আর কে বুঝবে। মাথা নীচু করে মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে কারো দিকে না তাকিয়ে লোকটা বলল, ‘ দাদা কোন লাইনের ? ‘
কাকে বলছে কিছু বোঝা গেল না। এবার রামশঙ্করের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘ হ্যাঁ দাদা ..... ‘
রামশঙ্কর বুঝতে পারল প্রশ্নটা তার উদ্দেশ্যেই করা। তাকে সদা সতর্ক থাকতে হয়। অযাচিত এবং অবাঞ্ছিত দহরম মহরম তার লাইনে চলে না। কে যে কোন ঘাটের মাল ধরা মুশ্কিল। একটু চেপে ঢেকে কথাবার্তা চালাতে হয়। সে লাইনটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল, ‘ ওই বজবজ .... মানে সোনারপুর লাইনের।’
— ‘ অ : ‘ , বলে লোকটা আবার খাওয়ায় মন দিল।
মুখের ভাতটা শেষ করে ভাতের থালার দিকে তাকিয়েই আবার বলে, ‘ না ... মানে বলছিলাম যে কোন চাকরি করেন , না কি কোন হাতের কাজ টাজ .....’
রামশঙ্করের বুকটা ধক করে ওঠে। ভর দুপুরে এ ভাল জ্বালা হল।একটু শান্তিতে খেতেও দেবে না। এখান থেকে তাড়াতাড়ি সটকে পড়তে পারলে হয়। মুখে বলে— ‘ হ্যাঁ .... চাকরি ... চাকরি .... ওই খিদিরপুরের দিকে ..... রঙের কারখানায় ’
লোকটা ঝোলমাখা ভাত মুখে পুরে আবার নির্বিকারভাবে বলল, ‘ অ : .... তা ভাল ... ‘।তারপর বলল, ‘ আমি বউবাজারে থাকি।আমার নাম সুশান্ত দাস ।আমাকে প্রতিদিন দুপুরবেলা এখানেই পাবেন । যদি কোন দরকার থাকে বলবেন ..... যদি কোন কাজে আসতে পারি । সবরকম কাজে সাহায্য দিয়ে থাকি। মজুরি অতি সামান্য .... বুঝলেন কিনা ..... এই নেন রাখেন.... যদি কোন দরকার লাগে .... ‘ বলে বাঁ হাত দিয়ে বুকপকেট হাতড়ে নাম আর ফোন নম্বর লেখা একটা কার্ড বের করে রামশঙ্করের দিকে বাড়িয়ে ধরল। রামশঙ্কর নেব কি নেব না ভাবতে ভাবতে কার্ডটা টুক করে নিয়ে নিল। নিয়ে উঠে পড়ল তাড়াতাড়ি।। বাইরে গিয়ে মগে করে ড্রাম থেকে জল তুলে আঁচিয়ে নিল। তারপর আর কোন বাক্যালাপের মধ্যে না গিয়ে মিলের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে ঝটপট সরে গেল ওখান থেকে। লোকটার দিকে আর তাকালোই না একদম।
মৌলালির মোড় থেকে বাস ধরে মল্লিকবাজারে গিয়ে নামল। তারপর ডানদিকে ঘুরে পার্ক স্ট্রীট ধরে হাঁটতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতে স্পেন্সারের মোড়ের কাছে এসে দেখল একটা ছোটখাট জটলা। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে মাথাটা গলিয়ে দেখল একটা বাইশ তেইশ বছরের মেয়েকে ঘিরে লোকজন চাক বেঁধেছে।
ভিড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে চেক কাটা নীল লুঙ্গি আর কালো রঙের জামা পরা একজন ফর্সামতো খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা লোক জর্দাপান চিবোচ্ছিল নিরুত্তাপ ভঙ্গীতে। রামশঙ্কর তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ কি কেস দাদা ?’
লোকটার মুখ ভর্তি পানের পিক। ফুটপাথের ধারে গিয়ে ফেলে এল।তারপর হাত নেড়ে অবাঙালি উচ্চারণে বলল, ‘ ও.. হি বদমাশি .... কেপমারওয়ালি.... আনেক দেখা যাচ্ছে আখুন..... মেট্রোসে পাকড় গ্যয়ী। বহৎ চালাক ..... মালটা বার করা যাচ্ছে না .... ‘ , বলে আবার গেল আর এক দফা পিক ফেলতে।
রামশঙ্কর বুঝতে পারল মেয়েটা লাইনের লোক এবং ওকে বাঁচাবার কর্তব্য বোধ করল সে। ও মেয়ে না হয়ে ছেলে হলে এতক্ষণে মার খেয়ে আধমরা হয়ে যেত। রামশঙ্কর কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে নিল, তারপর ভিড় ঠেলে ঢুকে পড়ল।
সালোয়ার কুর্তা পরে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে । রঙ কালোই বলা যায়। গোল ধরণের ভরাট মুখ, নাকটা সামান্য বোঁচা, ঠোঁট পুরুষ্টু কমলালেবুর কোয়ার মতো।চোখে বেশ একটা মায়ামেশানো ঝিলিক আছে। ভুরু দুটো অসাধারণ। যেন তুলি দিয়ে আঁকা। সত্যি আঁকা কিনা কে জানে।রামশঙ্কর লক্ষ্য করল বিপদের মধ্যে দাঁড়িয়েও রীতিমতো মাথা ঠান্ডা রেখেছে। নিজের জায়গাটা টান টান ধরে রেখেছে। অতগুলো লোকের সঙ্গে একা লড়ে যাচ্ছে। ভেতরে ধুকপুকুনি আছে নিশ্চয়ই, বাইরে কিন্তু কোন ঘাবড়ানির চিহ্ন নেই। বারবার বলছে, ‘ আপনারা কিন্তু মিছিমিছি হ্যারাস করছেন আমাকে। একজন ভদ্রমহিলাকে এইভাবে হ্যারাস করতে পারেন না আপনারা। আমার কাছে কিছু আছে ? কিছু দেখতে পাচ্ছেন আমার কাছে ?’ মেয়েটা জোরাল গলায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে গলা মুখ ঘেমে যাচ্ছে।হাতের রুমালটা দিয়ে বারবার গলা মুখ মুছছে।
একজন চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছরের মোটাসোটা ভদ্রলোক বললেন, ‘ হ্যারাস করা মারাচ্ছ ! আসল দাওয়াই তো পড়েনি তাই এত তড়পানি ...... আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম পার্সটা আর একজনকে পাস করল । আর বলছে কিনা ...... শালা ... পাঁচহাজার টাকা ছিল ওতে.... ও : ! .... শিগ্গীর বার কর বলছি .... নইলে .... থানায় গিয়ে ডান্ডা খেয়ে হাড়গোড় ভাঙলে ভাল হবে ? ‘
রামশঙ্কর বুঝতে পারল মেট্রো স্টেশনের মধ্যে এই ভদ্রলোকেরই কেপমারি হয়েছে। মেয়েটা ভাল কারিগরই মনে হচ্ছে। দক্ষতার সঙ্গে মাল পাস করেছে। তারপর রিসিভার সেকেন্ডের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেছে। খুব ভাল বোঝাপড়া এবং অনেকদিনের প্র্যাকটিসের ফল এটা।
মধুর চারপাশে পিঁপড়ের মতো ভিড় আরও চাক বাঁধছে। মেয়েটা বারবার মুখ আর গলার ঘাম মুছছে ।
রামশঙ্কর ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল। এসে মুরুব্বির স্টাইলে নেতৃত্বের দায়িত্ব তুলে নিল নিজের হাতে।
— ‘ দেখি দেখি .... এভাবে হবে না । এটাকে পার্ক স্ট্রীট থানায় নিয়ে চলুন। লোকের কষ্টের টাকা ঝেড়ে আবার বড় বড় কথা .... দেখি দেখি সরুন তো .... এ..ই চল তো দেখি। পুলিশের হাতে পড়লে সব সুড় সুড় করে বেরিয়ে আসবে ’
রামশঙ্কর সবাইকে হতভম্ব করে দিয়ে হঠাৎ মেয়েটার হাত ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে লাগল মল্লিকবাজারের দিকে । ভিড়ের লোকগুলো কি করবে না করবে ভেবে না পেয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল পনের বিশ সেকেন্ড। রামশঙ্কর মেয়েটাকে টেনে নিয়ে ক্ষিপ্র হরিণের গতিতে ডানদিকের রাস্তায় ঢুকে এক নিমেষে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
মেয়েটার অতি দ্রুত সহযোগিতাজনিত প্রতিক্রিয়ায় রামশঙ্কর বুঝতে পারল সেও এ লাইনের এই তাৎক্ষণিক প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে রীতিমতো অভ্যস্ত। সকলেরই তো কোন না কোন প্রতিরোধের ঢাল থাকা চাই। নইলে সে বাঁচবে কি করে। যার যেটা বল সেটাই তার অস্ত্র।
একটা ব্রিটিশ আমলের পুরনো ভগ্নদশাপ্রাপ্ত পরিত্যক্ত বাড়ির চাতালে ঢুকে পড়ল। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে হাঁফাতে লাগল স্বস্তিমিশ্রিত উত্তেজনায়।
মেয়েটা রুমাল দিয়ে আবার গলার এবং মুখের ঘাম মুছল। তারপর সটান রামশঙ্করের চোখের দিকে সটান তাকিয়ে বলল, ‘ অনেক ধন্যবাদ। আপনি না থাকলে মুশ্কিল হয়ে যেত। দাদা কোন রুটে আছেন ? ‘
— ‘ এ..ই শিয়ালদা থেকে আলিপুর জু’
— ‘ লাইনে বোধহয় অনেকদিন ...’
— ‘ হ্যাঁ তা হল বেশ কয়েক বছর .... আরে ! সাবধান .... সরে আসুন ‘
মেয়েটা চমকে উঠে একদিকে সরে গেল। দেখা গেল বহু পুরনো বট অশ্বথ্থের শিকড় বাকড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে প্রাচীন মগ্ন ভাঙাচোরা অট্টালিকার ভিতরবাগে এঁকেবেঁকে হিলহিল করে ঢুকে যাচ্ছে একটা প্রায় সাড়ে চার ফুট লম্বা একটা সাপ। এটা নিশ্চয়ই এককালে কোন ব্রিটিশ সাহেবের বাংলো ছিল।
মেয়েটা বলল, ‘ বাপরে পার্ক স্ট্রিটেও সাপের বাসা ! ‘
— ‘ হ্যাঁ তা আর বলতে .... সাপখোপ সর্বত্রই আছে । কিছু দেখা যায় , কিছু আড়ালে থাকে । চলেন এবার সরে পড়া যাক। সেন্ট জেভিয়ার্সের পেছন দিয়ে বেরব .... তারপর বড় রাস্তায় পড়লে আর চিন্তা নেই । ওখানে কামারুল মিয়াঁর অনেক লোক থাকে। ভাল কথা আমার নাম রামশঙ্কর। আপনার নামটা জানা হল না..... ‘
— ‘ও: হ্যাঁ...... কৌশানি ।
আচ্ছা... কামারুল কে ? ওই নারকেলডাঙার কামারুল ? ‘
— ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ ..... চেনেন নাকি ?’
— ‘ হ্যাঁ মানে , নাম শুনেছি । লাইনে আছি তো বেশ কিছুদিন । দারুন ওস্তাদ শুনেছি ..... ‘
— ‘ হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন ‘
এইসব বলে রামশঙ্কর ভাবল, এতটা অকপট হওয়া বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। তাদের লাইনে এসব চলে না। যাই হোক সে ঠিক করল মোবাইল নম্বর টম্বর কিছুতেই দেবে না। সেধে বাঁশ নেওয়ার দরকার কি ?’
কৌশানি কিন্তু রামশঙ্করের মোবাইল নম্বর চাইলই না। বরং বলল, ‘ এই নিন , আমার মোবাইল নম্বরটা রেখে দিন । কোন দরকার হলে ফোন করবেন।’ বেশ কর্ত্তৃর ভঙ্গীতে কথাগুলো বলে একটা চিরকুট এগিয়ে ধরল রামশঙ্করের দিকে।
বাড়ি ফেরার পথে রামশঙ্কর স্টেশনের আশেপাশে দেখল বেশ কিছু রঙ আর আবীরের দোকান বসেছে ডালা সাজিয়ে। নানা রঙের ফাগে যেন রঙীন হয়ে আছে মসলন্দপুর স্টেশনের এ পাশটা। বিক্রিবাটাও খারাপ হচ্ছে না। রামশঙ্করের মনে পড়ল— কাল হোলি। কৌশানির মুখটা মনে পড়ে গিয়ে তার মনটা কেমন করে উঠল। এই পকেটমারি কেপমারির জগৎ তার আর ভাল লাগে না।কৌশানিরও নিশ্চয়ই ভাল লাগে না। তারপর ভাবল— না না ...তা কি করে হবে ! কৌশানির মনের খবর সে জানবে কি করে । মোটে তো কয়েক মিনিটের পরিচয়। ফোন নাম্বারটা দিয়েছে অবশ্য।আসলি কি নকলি জানা হয়নি এখনও। দেখতে হবে পরখ করে।এ লাইনে বিশ্বাস কাউকে নেই।
রামশঙ্কর এতক্ষণ অন্যমনে ছিল। বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভুলোকে হারাবার ব্যথাটা ফের চাগাড় দিয়ে উঠল। ভাবল, একবার পশ্চিমের বিল দিয়ে ঘুরে যাই। তারপর ভাবল, এই অন্ধকারে ওখানে কি-ই বা দেখা যাবে। বরং কাল সকালে যাব।
সকালবেলায় পশ্চিমের বিলের ধারে ভুলোর সমাধির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কৃষ্ণচূড়ার চারাটা সতেজ দাঁড়িয়ে আছে। একরাতেই সামান্য বেড়েছে বলে মনে হল। ভুলোকে যে অধীর বিশ্বাসের বাড়ির মেজ ছেলে এবং তার বৌ মিলে মেরেছে এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। ভুলোর অপরাধ , খুব সম্ভবত: ভুল করে ওদের উঠোনে ঢুকে দু একবার মলত্যাগ করে ফেলেছে। ও ছেলেমানুষ , অত কি বোঝে। ওর মনে অত ঘোরপ্যাঁচ থাকলে ও তো কুকুর না হয়ে কোন ধুরন্ধর মানুষই হত।
হোলির দিন ছুটির দিন। রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা ফাঁকা। আজ রামশঙ্করের লাইনে কাজকর্ম হবার সুযোগ কম। রামশঙ্কর তবু কিসের টানে কে জানে নটা বাইশের ডাউন ট্রেন ধরে কলকাতায় চলে এল।
মল্লিকবাজার থেকে পার্ক স্ট্রীট ধরে সোজা হাঁটতে লাগল চৌরঙ্গী রোডের দিকে। রাস্তার এদিক ওদিক দেখতে দেখতে যাচ্ছে রামশঙ্কর। কাউকে যেন খুঁজতে খুঁজতে যাচ্ছে। তার চোখ কাকে খুঁজছে কে জানে। হাঁটতে হাঁটতে স্পেনসারের মোড়ে এসে পৌঁছল। কিন্তু ওখানে দাঁড়ানো নিরাপদ বোধ করল না । রাস্তায় নেমে ঝটপট কালকের সেই জায়গাটা পেরিয়ে যাবার সময় চোখে পড়ল কালকের সেই কালো জামা, চেক লুঙ্গি পরা ফর্সা মতো লোকটা ফুটপাথের কিনারায় এসে পানের পিক ফেলছে পু..চুত্ করে ।
পার্ক স্ট্রীট মেট্রো স্টেশনের পাশে ফুটপাথে যে খাবারের দোকানটা আছে রামশঙ্কর সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। তার মনের ভিতর এ চিন্তাটা ঘনঘন নাড়া খাচ্ছে যে এ অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করাটা ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কি জানি মনটাকে ঘুরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারছে না।কস্তুরি মৃগের নাভি সুগন্ধের মতো কিছু যেন ভেসে বেড়াচ্ছে আশেপাশে।
কিন্তু রোজগারও তো কিছু দরকার। অন্তত একসপ্তাহ ধরে বিশেষ আমদানি নেই রামশঙ্করের। যা পেয়েছে তা ছোটখাটো জিনিস। নগদ টাকাও যা পেয়েছে তা অতি সামান্য। কামারুলের ভাষায় ‘পুঁটিমাছ’ ।
আজ তো শহর ফাঁকা ফাঁকা। চান্স আরও কম।
দোকানটায় বসে দু পিস স্যাঁকা পাউরুটি আর হাফ প্লেট ঘুঘনি নিল। বেঞ্চে একজন বছর চল্লিশের ভদ্রলোক বসে ডবল ডিমের ওমলেট খাচ্ছে। বেশ মোটাসোটা চেহারা। রামশঙ্কর তার কাছ ঘেঁসে বসল। প্যান্টের বাঁ দিকের পকেটটা ভরাট হয়ে আছে। রামশঙ্কর পার্স এবং টাকার গন্ধ পেল হাতের কাছে। লোকটা পরম আনন্দে পেয়াঁজ লঙ্কায় ভরা গরম ওমলেট চিবোচ্ছে। তৃপ্তিতে চোখ প্রায় বুজে আসছে। রামশঙ্করের মনে হল, ব্যাটা বোধহয় কোন রোড কনট্র্যাকটার। মুখটা যেন চেনা চেনা লাগছে। রাজাবাজারের দিকে কোথাও ওকে দেখেছিল মনে হচ্ছে। সে যাই হোক, রামশঙ্করের ডানহাতের পাঁচ আঙুল নিশপিশ করতে লাগল। অনবদ্য কায়দায় তার হাতের তালু পালকের মতো হাল্কা হয়ে লেগে রইল বাঁ পকেটের ভেজানো দরজার বাইরে। সে ভদ্রলোকের ডানদিকে আঙুল দেখিয়ে হঠাৎ বলে উঠল , ‘ ও..ই যে , কি পড়ে গেছে আপনার পকেট থেকে দরকারি কাগজ বোধহয় ... ‘ । লোকটা চমকে উঠে ডানদিকে তাকাল । তারপর ওমলেটের প্লেট হাতে ধরে ঝট করে বুকপকেটে হাত দিল ডানহাত দিয়ে ।
—- ‘ কই না: .... কিছু নেই তো .... ‘ , পকেটের ভেতর উঁকি মেরে বলল, ‘ ও: .... না: , সব
ঠিক আছে ‘ , বলে ওমলেটের অবশিষ্টাংশের দিকে মন দিল সে।
রামশঙ্কর আফশোষের সুরে বলল, ‘ ও : সরি সরি..... আমিই ভুল দেখেছি। কিছু মনে করবেন না ’
রামশঙ্করের ঘুঘনি পাঁউরুটির দাম আগেই মেটানো হয়ে গেছিল। ওমলেট খাওয়া ভদ্রলোকের মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অন্যমনস্কতায় রামশঙ্কর তার হাতের কাজ সেরে ফেলেছে । সামনে মুখোমুখি বসে থাকা দোকানটারও কিচ্ছু টের পেল না কাজে ব্যস্ত থাকায়। রামশঙ্কর এবার উঠে পড়ল বেঞ্চ থেকে। আস্তে আস্তে ওখান থেকে বেরিয়ে জোরে পা চালাতে লাগল ক্যামাক স্ট্রীট-এর দিকে। লোকটার খাওয়া শেষ হবার আগেই পগার পার হয়ে যেতে হবে । একটা চলন্ত বাস দেখে গোঁত্তা খেয়ে ঢুকে পড়ল । এসে নামল এক্সাইডের মোড়ে। কাঁধের ঝোলা ব্যাগের ভেতর ফেলে রাখা নাদুস নুদুস টাকার পার্সটা একবার হাতে ছুঁয়ে দেখে নিল। তারপর রবীন্দ্রসদনের দিকে হাঁটতে সাগল। নন্দনের কাছে পৌঁছে দেখল নানা রঙের গুলাল ফাগ পিচকিরি রঙের মহা হুল্লোড় চলছে।
( বাকিটুকু এখানে আঁটল না। কাজেই পরের পর্বে )
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।