২০২৫ শেষ হতে আর এক ঘন্টা বাকি আমার এখানে, তাপমাত্রা নেমেছে প্রায় ১০° সেলসিয়াসে, মরশুমের শীতলতম দিন আজ আপাতত। ফিরে দেখছিলাম ২০২৫ কে, স্মৃতির ভাঁড়ারে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই জমা পড়েনি এ বছরের জন্য বা এ যাবৎ, আমার জীবনটা এরকমই- নিস্তরঙ্গ শীতের মৃদুমন্দ নদী বয়ে যাচ্ছে কুয়াশা আর মৃদু রোদ্দুরের মধ্যে দিয়ে, হালভাঙা পালছেঁড়া তরণী কোন নিরুদ্দেশের পানে চলেছে তার ঠিক ঠিকানা নাই।
এর একটা বড়ো কারণ জীবনটা তো আমি এখনো ঠিক করে বাঁচলামই না, শুরুটাই তো হয়েছে অবাঞ্ছিত খাতে প্রবাহের। মাঝে মাঝে ভাবি, যেমনভাবে জীবনটা বাঁচতে চেয়েছিলাম, তেমনটি হলে ঠিক কেমনটি হতে পারত। আর সব variable fixed রেখে, মানে এই একই জায়গায়,একই সময়কালে, একই পরিবারে জন্ম নিলে, শুধু মেয়ে হিসেবে- কেমনভাবে সাজাতাম জীবনটা। বেশ মা,বাবা, দাদা সব মিলিয়ে মফস্বলি সাজানো সুখী সংসারের একমাত্র মেয়ে, বাবা-মা দুজনের দিক থেকেই তুতো ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোটবোন, বিশেষত মামা-মাসিদের দিকে মেয়ে বলতে আমাদের প্রজন্মে শুধু সবার বড়োজন, দি'ভাই, বাকি সবাই ভাই আমরা, আমি হতে পারতাম আরেকটা বোন, সবার ছোটজন ও ছোটবোন। তারপর হয়তো স্কুলে পড়তাম (হয়তো আকনা, রমেশ নয় কারণ রমেশ নিয়ে একটু নাক-সেঁটকানি ভাব আছে আমাদের এদিকে, হয়তো দেবিশ্বরী(যদিও মান পড়ে গেছে), হয়তো ইংরাজি মিডিয়াম হলে সেন্ট জোসেফ, গসপেল), তারপর ইংরাজি বা তুলনামূলক ইউরোপীয় সাহিত্য নিয়ে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি বা বিশ্বভারতী, বা সেন্ট স্টিফেন্স, মিরান্ডা, তারপর হয়তো জেএনইউ,টিস্ থেকে মাস্টার্স এম ফিল, তারপর হয়তো অক্সফোর্ড/কেমব্রিজ। এরই মধ্যে মিশে থাকত গান শেখা, অন্তরঙ্গ বান্ধবীদের দলে গল্পগুজব খেলাধুলো, গানের স্কুলে গান শেখা, ছবি আঁকা বা নাচ শেখা, অনুষ্ঠানে গান গাওয়া, নৃত্যনাট্যে গীতিনাট্যে সখীদের দল থেকে শ্যামার শ্যামা, মায়ার খেলার প্রমোদা হওয়া, প্রথম কৈশোরের আলোয় চোখ তুলে তাকানো টিউশন পড়তে আসা কোনো ফর্সা লম্বা চশমা পরা তরুণের চোখে আর চোখ ফিরিয়ে নেওয়া পরক্ষণেই, মায়ের কাছে পাঠ নিভৃত নারীত্বের। হাহ্, যেখানে হল না খেলা সে খেলাঘরে, আজি নিশিদিন মন কেমন কেমন করে। জীবনে প্রাপ্তির ঘর হয়তো শূন্য নয়- তথাকথিত ভালো স্কুলে প্রথম সারির ছাত্র হিসাবে পড়েছি, জনপ্রিয় এবং সত্যিকারেই ভালো কলেজে কলকাতার কেন্দ্রস্থলে গিয়ে পড়েছি, ভালো ফল করার চেষ্টা করেছি( অঙ্ক বা অঙ্ক সম্বন্ধীয় কোন বিষয়ই আমার সত্যি খুব একটা পছন্দের নয়, অন্ততঃ সাহিত্য পড়ার চাইতে তো নয়ই আর এই অঙ্ক-বিতৃষ্ণার পিছনে বাবার ভূমিকা অপরিসীম, কিন্তু তাও টিকটিক করে ইঁদুর দৌড়ে টিকে গেছি, নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়ার চর্চার ইচ্ছেটাকে হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়ে), আবার এসেও পড়েছি এক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু এই ২২ বছরের জীবনটা বেঁচেছি স্রোতের ওপর ভাসমান শ্যাওলাদাম হয়ে, আমিও তো শেকড় গাড়তে পারতাম জলের তলায় পদ্মলতা হিসেবে, ফোটাতে পারতাম ফুল, পাতায় ধরা পড়ত কতো জলবিন্দু নীহারকণা, আসতে পারত মধুলোভী ভ্রমর গুনগুনিয় গান শোনাতে, সরস্বতীর চরণকমল শোভা পেত আমারই উতল প্রাণে আকাশপানে চাওমা মৃণাল বাহুডোরে - তার জায়গায় শ্যাওলার দল হয়ে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছি খালি,এ পৃথিবীর কোথাও আমার স্থান নেই, কোথাও আমার কেউ নেই, আমার নিজের জীবনটাও আমার নয়, আত্মহত্যার প্রচলিত পদ্ধতিগুলো বড়ো বীভৎস লাগে নাহলে কবেই শেষ করে দিতাম এই ভবের খেলা( দাও ভেঙে দাও এ ভবের সুখ, কাজ নেই এ খেলায় হে), যদিও কখনো কখনো সেল্ফ অ্যাসিস্টেড ইউথ্যানাশিয়া রোমান্টিসাইজ করি, অনেকটা 'জয়পরাজয়' গল্পের শেখরের মৃত্যুদৃশ্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে, কিন্তু সুন্দরী অগ্নিশিখাকে দেওয়ার জন্য শেখরের তবু নিজের রচিত কাব্যপুঁথি ছিল কাব্যমেধ করার জন্য, আমার তো এই নধর অনাকাঙ্ক্ষিত(কুৎসিত বলব না কারণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমার বাহ্যিক রূপ হয়তো গড়পরতা তরুণদের মতোই, খুব কুরূপ বা খুব সুদর্শন কোনটাই নয়, যদিও সুদর্শন হয়ে ওঠার কিছু বৈশিষ্ট্য আমার চেহারায় আছে, কিন্তু আমি তো সুন্দরী হতে চেয়েছিলাম, সুদর্শন সুপুরুষ নয়।)বপুখানি ছাড়া কিছুই নেই, আর কোনো রাজকন্যা অপরাজিতার মতো রাজপুত্র অপরাজিত (এটা লিখতেই ঝিন্দের বন্দীর সৌমিত্রের মুখটা ভেসে উঠল চোখে) নেই বিজয়মালা পরিয়ে দেবার আমার গলায়।
যাকগে, মরুকগে। আরেকটু অন্যরকম দুঃখের কথা লিখি বরং। ওপরের কথাগুলো ভেবে দুঃখ হয়, কিন্তু মানিয়ে নিয়েছি আর সত্যি কথা বলতে,এখনকার ডাক্তারিবিদ্যার অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে হয়তো একটা নারীদেহ আমি পেতে পারি, কিন্তু তার জন্য যে পরিমাণ লড়াই ঘরে, বাইরের সমাজে, সরকারি নিয়মের বেড়াজালে, অর্থনৈতিক ভাবে, নিজের মনের দ্বিধাদ্বন্দ্বের সাথে করতে হবে, তাও আবার সে সুযোগ আসতে আসতে হয়তো জীবনের অর্ধেকটাই কাবার হয়ে যাবে, আমার মধ্যে অতো প্রাণশক্তি নেই। হকিং এর কথা অনুসারে আমাদের সবার কাছে এই একটাই জীবন আছে এই মহাবিশ্বের বিপুল বর্ণাঢ্য রূপের রস উপভোগ করার,আর আমার সেই জীবনটার তো এককাল গিয়ে পড়ে রয়েছে আর তিনকাল, তাও যদি না আমি ৪০ এর আগে চাকাটা থামিয়ে দিই জোর করে, বিবেকানন্দ বলেছিলেন- "I'll never be on the right side of forty" আর কথা রেখেছিলেনও, নিবেদিতাও গুরুর পদাঙ্কই অনুসরণ করেছিলেন কিন্তু নৌকাডুবির আগে দেখতে চেয়েছিলেন সূর্যোদয়, আমিও তাই করব অনন্ত রাত্রির বুকে পাড়ি জমাব পারের খেয়ায় শেষ সূর্যোদয়টি দেখে।
ছোটবেলায থেকেই art আমাকে আকৃষ্ট করে, সে সাহিত্য হোক বা ছবি, বা গান বা আবৃত্তি নাটক। সবচেয়ে আগে পরিচয় সাহিত্যের সাথেই, গল্পের বইয়ের হাত ধরে। তারপর আঁকা, আবৃত্তি শেখানোর চেষ্টা হয়েছে জোর করে যাতে "পরীক্ষার খাতায় হাতের লেখা, ভূগোলে, জীবনবিজ্ঞান আঁকা ভালো হয়", "গলার আওয়াজ খোলে/পুরুষালি হয়" ইত্যাদি কারণে যে জন্য একদমই ভালো লাগেনি কিন্তু এখন ভালো লাগে এই বয়সে এসে স্কেচপেন দিয়ে আঁকিবুঁকি করতে, রবীন্দ্রনাথের ও অন্যন্য কবিতা জোরে জোরে পড়তে। আর গান? একটু খুলে বলা দরকার।
গান আমার ছোটবেলা থেকেই ভালো লাগে। এর একটা প্রমাণ হলো আমি ছোট থেকেই ছড়া কবিতা পড়তাম সুর করে, একঘেয়ে পাঁচালির সুরে হলেও, তাল দিয়ে দিয়ে। আমি এখন যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠরত, সেখানে আমার একজন বন্ধু হয়েছে হোস্টেলে, যেটা বোধহয় এবছর (এই মুহূর্তে গতবছর, কারণ এই লাইন লেখার সময় ঘড়িতে বাজছে রাত ১২:৩০, অতএব ২০২৬ এ ঢুকে পড়েছি আমরা) ২০২৫ এ আমার সেরা প্রাপ্তি, এই প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি। ধরা যাক, ওর নাম প্রবাল (আমরা দুজন সই পাতিয়েছি, কিন্তু ওই চিরাচরিত গঙ্গাজল-গোলাপ না, শঙ্খ আর প্রবাল, কারণ শাঁখা আর পলা যেমন সবসময় জোড়ায় থাকে আর এভাবে আমাদের নামের আদ্যাক্ষরগুলোও পরস্পরের মধ্যে অদল বদল হয়ে যায় হাহা)। প্রবাল ও আমার মতোই- কিন্তু ও প্রায় ১৫ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কণ্ঠ সঙ্গীত সাধনা করছে আর পাশাপাশি সরোদও শিখছে। ওর মায়ের কাছ থেকেই ও অকুণ্ঠ উৎসাহ ও সমর্থন পেয়েছে যেহেতু কাকিমাও শিল্পরসিক ও রসগ্রাহী। কিন্তু আমার এ সৌভাগ্য হয়নি। আমার মায়ের বাড়ির দিকে গানবাজনা বা সংস্কৃতি চর্চার চল আছে যথেষ্ট, মা একসময় সেতার বাজিয়েছে কিছুদিন, আমার সদ্যপ্রয়াতা মাসি লখনৌ থেকে সঙ্গীত বিশারদ উপাধি পেয়েছে, মেজোমামা ছোটমামা দুজনেই ভালো গান গায়, ছোটমামা নিজের হাতে তৈরি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল চালানোর পাশাপাশি গান লিখে সুর ও দেয় তাতে অবসর সময়ে, ভীষণ ভালো কুরুশ, কার্পেট বোনা ও হাতের কাজ জানে আমার মায়ের মতোই। কিন্তু বাবাদের দিকে একসময়ের প্রবল দারিদ্র্য ও তজ্জনিত বামপন্থী আদর্শের প্রতি আসক্তির কারণে, সংস্কৃতিচর্চার মধ্যেও বলিষ্ঠতার আদর্শই বেশি পছন্দসই আর মায়েদের দিকে দাদামশাই সরকারি চাকুরে ও বাড়িতে কংগ্রেসি আদর্শের পরিবেশ থাকায় মায়েদের পরিবার(উভয় পরিবার পরস্পরের প্রতিবেশী ছিল দীর্ঘদিন) ও তাদের সংস্কৃতিচর্চার প্রতি তাচ্ছিল্য ও উপহাসের মনোভাব ছিল। এমনি স্বশিক্ষিত আবৃত্তির চর্চা (রবীন্দ্রনাথ, সুকান্ত প্রমুখের কবিতা) করলেও একটা বিরুদ্ধ মানসিকতা কোথাও সবসময়ই সক্রিয় ছিল। তাই মা সকালে উঠে রান্নাঘরে যখন ভোরবেলা রান্না বা ঘরের কাজ করতে করতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতো "১০৬.২ আমার fm" এ, বাবার মন্তব্য হতো-" এটা কি ঘর না চায়ের দোকান যে সবসময় গান বাজছে?" এই করতে করতে আমার মায়ের গান শোনার স্পৃহাটাই মরে গেছে। তাই আমিও ছোটবেলায় গান শোনার বা চর্চার খুব একটা পরিসর পাইনি বা স্পৃহাও হয়নি, কারণ একটা মানসিকতা আমার মধ্যে চারিয়ে গেছিল পরোক্ষ প্রভাবে - " পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই মুখ্য, যারা পড়াশোনা পারে না, তারাই গানবাজনা নাটক ছবি আঁকা এসব করে সময় নষ্ট করে।"
(এই লেখাটা সেই কবে থেকে ফেলে রেখেছি আধাখ্যাঁচড়া লিখে, জীবনের পটে লেখা কি আর শেষ হয়, কালির আঁচড় পড়ছে তো পড়ছেই। এই আদ্ধেক লেখাটাই পোস্টালাম এখন, পরে আরো জিনিস জুড়ব হয়তো।এর পরের অংশটা ওই গান শোনার গাওয়ার যাত্রাপথের আনন্দগান নিয়েই লেখার ছিলো, সেটা আধেক রইল বাকি।)