একবার হলো কি, এক সমুদ্রের ধারে একটা ছোট্ট গ্রামে এক জেলে থাকতো। তার অন্যান্য জেলে বন্ধুদের মতোই সে অগভীর সমুদ্রে মাছ ধরে জীবন চালাতো। তো, একদিন, সে তার ছোট্ট ডিঙি নিয়ে মাছ ধরছে। জালে বেশ কিছু মাছ ধরা পরেছে। সে ততটুকুতেই খুশি। এবার সে প্রতি দিনের মতোই একটু আরাম করবে। ট্রানজিস্টর-এ তার পছন্দের গান চালিয়ে অল্প কিছু খেতে খেতে সে এই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনটা উপভোগ করতে লাগলো।
এমন সময়, এক বিত্তবান লোকের দেখা মিলল যে তার কেতাদুরস্ত বোট চেপে হন্তদন্ত হয়ে কোথাও যাচ্ছিল। লোকটি জেলে কে অমন ডিঙি তে বসে বসে আরাম করতে দেখে বলল, "ওহে, মিছি মিছি বসে বসে সময় নষ্ট করছো কেন?"
- "তো কি করবো?"
- "আরও মাছ ধরো"
- "তারপর?"
- "মাছ বিক্রি করে আরও বড় ডিঙি কিনবে"
- "তারপর?"
- "আরও বেশি মাছ ধরতে পারবে তাহলে। সেগুলো বেচে আরও বড় ডিঙি কিনতে পারবে তখন"
- "আচ্ছা, বেশ, তারপর?"
- " তারপর আর কি। তখন আরামে সময় কাটাবে।"
জেলে বেশ আশ্চর্য হয়ে বলল, "তাহলে এখন কি করছি !"
এই গল্পটা হয়তো অনেকেই শুনেছ। জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্যের গল্প। পেটের দায়ে সকলকেই কিছু না কিছু কাজ করতে হবেই। পছন্দ হোক বা না হোক। কিন্তু, জীবনটা কে উপভোগ করাটাও একটা বড় কাজ।
ভারসাম্য জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তু গুলির মধ্যে একটা। ভেবে দেখেছি, যেকোন অবস্থাতেই ভারসাম্য রাখাটাই সবচেয়ে কঠিন আর এটাই সবচেয়ে দরকারী।
আর একটা মজার ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, যার যেটা শক্তি, সেটাই জীবনের কোনো প্রান্তে এসে সেটাই তার দুর্বলতা। যেমন, কেউ খুব জেদী। এই জেদ তাকে জীবনের অনেক যুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করার ক্ষমতা যোগায়। কিন্তু, কখনও এই জেদ যখন গোঁয়ার্তুমিতে পরিণত হয় তখন তার সেই শক্তি তার দুর্বলতা হয়ে তারই ক্ষতি করে দেয়। এখানেই আসে ভারসাম্য। কারুর জন্য রাগ আর নিজের জন্য অহংকার পুষে রাখার মত বোকামি না করে, অনেকক্ষেত্রে ক্ষমা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া কাজ দেয় বেশী।
বড় অদ্ভুত এ জীবন। হরদম পরীক্ষা। কখনও পাশ তো কখনও ফেল। প্রতিযোগিতার নাগপাশে জড়িয়ে নিজেকে বলি সর্বদাই জিততে। আমি না বললে সমাজ তো আছেই বলার জন্য।
আসলে, নিজেকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই আমাদের। সব সময় ভাবি, " হারবো কেন?", "ছিঃ, ওর কাছে হেরে গেলাম!"
এই হারা-জেতার খেলা খেলাতে খেলতে কখন যে জীবনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি তা নিজেরাই বুঝিনা। নিজের চোখে নিকট আত্মীয়, প্রিয় বন্ধুরাই হয়ে ওঠে তখন চরম প্রতিদ্বন্দ্বী।
কিন্তু, মনকে এটা বুঝিয়ে উঠতে পারিনা যে, সব যুদ্ধে জেতা যায়না। প্রত্যেক মানুষের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। দৌড়তে দৌড়তে কখনও থামতে হয়। না হলে জীবনটা উপভোগ্য হয়না যে। মাঝে মাঝে হেরে যাওয়াতেও আনন্দ আছে। আর আছে শিক্ষা। ধরো, তুমি একটা 100 মিটার পাহাড় চড়তে শুরু করলে। হতে পারে তুমি 20 মিটারে থেমে গেলে। হতে পারে তুমি 50 মিটারে হাঁফিয়ে গেলে, আর পারছো না। আবার হতে পারে তুমি 90 মিটার উঠে তারপর পড়ে গেলে। আর পেরোনো হলনা পাহাড়। তিনটে উদাহরণই তোমার জয়ের ঝুলি শূন্য। কিন্তু তোমার অভিজ্ঞতার ঝুলি?
প্রায় শেষ পর্যন্ত যাওয়ার অভিজ্ঞতাও কিন্তু কম নয়। রেখে দাও যত্ন করে কাজে লাগবে পরবর্তি কালে।
আমাদের জীবনটা এরকম ভাবেই রচিত। হেরে যাবো, ভুল করবো; আবার সেই ভুল করা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে চলবো।
লেখাটা শুরু করেছিলাম একটা গল্প দিয়ে। শেষে একটা মনস্তাত্ত্বিক রূপকের কথা বলি।
একটা ব্যাঙকে যদি একটি জল ভর্তি পাত্রে রাখো এবং পাত্রটিকে উত্তপ্ত করতে থাকো তবে ব্যাঙটি জলের তাপমাত্রার সাথে সাথে নিজের শরীরের তাপমাত্রা পরিবর্তন করতে থাকে। সে জলের উত্তাপ সহ্য করতে থাকে, লাফ দিয়ে পালানোর পরিবর্তে। কিন্তু একসময় জলের প্রচণ্ড তাপমাত্রা ব্যাঙের শরীর আর মানিয়ে নিতে পারে না। যখন সে জলের তাপমাত্রা আর তার শরীরের তাপমাত্রা আর সমতায় নিয়ে আসতে পারে না, তখন ব্যাঙটি ফুটন্ত জলের পাত্র থেকে লাফ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এ পর্যন্ত শুনে, কিছু মিল পাচ্ছ আমাদের জীবনের.....?
যাইহোক, শেষে দেখা যায়, সে আর লাফ দিতে পারে না, কারণ সে তার সমস্ত শক্তি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করে ফেলেছে। অত:পর সে জলে সেদ্ধ হতে থাকে।
তার মৃত্যুর কারণটা আসলে গরম জল নয়, বিপজ্জনক পরিস্থিতির শুরুতে সেই পরিস্থিতি অস্বীকার করে লাফ না দেওয়াটা তার মৃত্যুর কারণ। সব কিছু সহ্য করে নেবার মত বড় ভুল তার মৃত্যুর কারণ। এখানেও আসে সেই ভারসাম্যের কথা। সম্ভবত আমরাও ঐ ব্যাঙের মত মানিয়ে নিচ্ছি আমাদের চারপাশের অন্যায়গুলোর সাথে। সহ্য করছি সব, আর ভাবছি টিকে আছি, টিকে থাকবো। হয়তো, আমরা অনেকেই সেই বয়লিং ফ্রগ সিনড্রোমে আক্রান্ত।
তবু আমি আশা রাখি, নিশ্চয় আমরা জীবনের নানা ভারসাম্য নিয়ে ভাবনা চিন্তা করবো, আলোচনা করবো। যাতে, সেই সবচেয়ে কঠিন কিন্তু দরকারি বিষয়ে, আমরা কিছুটা হলেও হালে পানি পাই।
চরৈবেতি।
প্রসূন
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।