এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ঋত্বিক আয়োজিত দেশবিদেশের নাট্যমেলায় ১৩ই ডিসেম্বর বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে মঞ্চস্থ হল  থিয়েটার প্ল্যাটফর্মের প্রযোজনায় ‘কল্পনার অতীত”

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ | ১৬৭ বার পঠিত
  • ঋত্বিক আয়োজিত দেশবিদেশের নাট্যমেলায় ১৩ই ডিসেম্বর বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে মঞ্চস্থ হল থিয়েটার প্ল্যাটফর্মের প্রযোজনায় ‘কল্পনার অতীত”। মঞ্চ, আলো, নাটক ও নির্দেশনার দায়িত্বে দেবাশিস। দেবাশিসের পরিচালনা ও নাট্যপ্রয়োগের খ্যাতি ইতিমধ্যেই সুপরিজ্ঞাত। সদ্য দুই দিন আগে এই নাট্যমেলাতেই দেবাশিসের নির্মাণে মঞ্চস্থ হয়েছে অনীকের আক্ষরিক নাটকটি এবং সব বয়সের দর্শকের কাছে তুমুল প্রশংসিত হয়েছে। অধিকন্তু এই নাটকে যুক্ত হয়েছে বাংলার মঞ্চজগতের অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক দেবশংকর হালদারের উপস্থিতি। ফলে প্রত্যাশার পারদ চড়েছে।

    এই নাটকটি অবশ্য সম্পূর্ণ অন্য ঘরানার। অ্যাবসার্ড ড্রামার ঘরানাতেই একে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। কারণ গোটা নাটকেই দেখা যায় বেশ কিছু জিনিস উলটো পথে হাঁটছে। তারমধ্যে প্রথমেই আছে দেবশংকর হালদার অভিনীত বাবাই চরিত্রটির বয়স যা উলটো দিকে হাঁটছে। তাকে তার মা চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসেন কারণ এই বিষয়টায় তার আপত্তি আছে – সে ছোটো হতে চায় না। আসলে শুধু ছোটো হওয়া তো নয় তাকে করে তুলতে চাওয়া হয় বোধবুদ্ধিহীন, পরনির্ভরশীল এক অস্তিত্বে্র আধার। চারিপাশে সবাই যেন এভাবেই ক্রমশ তাদের বুদ্ধিবৃত্তিগত ক্ষমতা ক্রমাগত হারিয়ে, ক্রমাগত ভুলতে ভুলতে, ক্রমাগত পড়াশোনা না করতে করতে সেটাকেই চলা বলে ধরে নেয়। এটাই তাদের কাছে স্বাভাবিক।

    বাকিদের সঙ্গে বাবাইয়ের তফাত যে সে অনেক কিছু ভুলতে পারে না—তার কাছে কোনোকিছুর নিয়ন্ত্রণে থাকার চেয়ে স্বাধীনতার মূল্য অনেক বেশি কিন্তু এই চাহিদা ‘রিভার্স গ্রোথ প্রোজেক্ট’এর বুলডোজারের তলায় চাপা পড়ে যায়। সে হাঁটাচলার ক্ষমতা হারায়, তার প্রকাশভঙ্গী অস্পষ্ট হয়,তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। যেন এক আদিম প্রাকৃতিকতার দিকে যাত্রা করে মানবসভ্যতা যেখানে শ্বাপদসংকুল অরণ্যে তার অস্তিত্ব বিপন্ন। এই অবদমনে পরিবার, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতির ভুমিকা স্পষ্ট হয়ে আসে যখন মায়ের হাতের ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ ধারালো অস্ত্রের মত নেমে আসে বাবাইয়ের শরীরে যা তাকে চুপ করিয়ে দেয়। শেষে অবশ্য প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়।

    কারণ বাবাই অন্তর্ঘাত চালিয়েছিল এই ছোটো করে তোলার প্রক্রিয়ায়। আসলে সে ছোটো হয় নি --- তার বুদ্ধিবৃত্তি, কন্ঠস্বর কিছুই হারায় নি। সে ভান করেছিল নিজেকে টিঁকিয়ে রাখতে। এভাবেই মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়ার, ভুলিয়ে রাখার, তাকে শিশুসুলভ আয়োজনে ঘিরে রাখার প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ঘাত চলে।

    এই নাটক বাস্তবধর্মী নয়। বাস্তবতার মাত্রাকে বিপরীত খাতে বইয়ে দিয়ে সামাজিক সত্যের অনুসন্ধানই নাটককারের উপজীব্য। কিন্তু সেই অতিবাস্তবের আবার নিজস্ব লজিক থাকে, থাকে সুসমঞ্জসতা। সেখানে কিছু ঘাটতি থাকায় সমস্যা হয়েছে।

    একমাত্র বাবাইয়ের সঙ্গিনী বালিকাটির ক্লাসে উপর্যুপরি সাফল্যের সঙ্গে ফেল করা ছাড়া অন্য চরিত্রগুলির মধ্যে — যেমন বাবাইয়ের মা বা চিকিৎসক — এই রিভার্স গ্রোথ প্রসেসের কোন প্রভাব দেখা যায় নি। অর্থাৎ ফ্যানটাসি যেখানে সার্বিক প্রয়োগে আপাত বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে সেখানে ন্যারেটিভের লজিকে কোথাও যেন টান পড়েছে। শেষে বাবাই সত্তর দশকের আন্দোলনের নামে কেন জয়ধ্বনি দেয় সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। সত্তর দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন বলতে যদি নকশাল আন্দোলনের কথাই ধরা হয় তাহলে সেখানে প্রতিবাদ ছিল সত্য কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিগত জায়গাটা কি খুব শক্তিশালী ছিল ? সেখানে অযুক্তি আর আবেগ কি মননকে ছাপিয়ে অনেক বালখিল্য কাণ্ড ঘটায় নি ?

    আসলে দেবাশিস বৌদ্ধিক বামনত্বকে প্রশ্ন করতে চেয়েছেন। কিন্তু তার নাটকের ন্যারেটিভে বিষয়টির প্রতি সুসংহত থাকতে পারেন নি সবসময়। দেবাশিসের নাটকে গান বা প্রপসের যে চমকপ্রদ ব্যাপার দেখা যায় এখানে ন্যারেটিভের প্রয়োজনেই সেসব সীমায়িত থেকেছে। এই সংযমবোধকেও তারিফ জানাতে হয়। আর নাটককে টেনে নিয়ে যাবার জন্য দেবশংকরের অসাধারণ অভিনয় ছাড়াও মায়ের চরিত্রে সুপর্ণা দাস, চিকিৎসকের চরিত্রে ভাস্কর মুখার্জি আর বালিকার চরিত্রে ডানা রায় চমৎকার অভিনয় নজর কাড়ে। বিশেষত দেবাশিসের সুকন্যা ডানার মধ্যে আগামী দিনে বাংলা রঙ্গমঞ্চের একজন প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ করলাম। ‘কল্পনার অতীত’ শেষাবধি আমাদের বৌদ্ধিক নির্লিপ্তির কারাগার থেকে মুক্ত করে কল্পনার সাম্রাজ্যে পুনর্বাসনের স্বপ্ন দেখায়। আমাদের পরিণতিবোধ না হারানোর কথা বলে।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন