
রাতে বেডরুমের আলো নিভিয়ে দেবার পর রাস্তার স্ট্রিট লাইট ঘরটাকে যতটা আলোকিত করে, সেদিন সন্ধ্যের সময় রাস্তায় বেরিয়ে ঠিক ততটাই আলো চোখে পড়ছিল। লোডশেডিং এর চাঁদটা দেখে অন্ধকার ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা এক চিলতে রোদ মনে হবার কোনও কারন না থাকলেও, বিদ্যুৎহীন পৃথিবীর বিশালতাকে তা উপলব্ধ করতে সাহায্য করে কিঞ্চিৎ। তখন যাবতীয় মুখোশ গুলো শুধুমাত্র যে লোকলজ্জার কারণে মুখে চাপানো - তা ঠাওর করতে বিশেষ অসুবিধা হয়না।
মুখ ঢেকে বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে হেটে ডানদিকে ঘোরার আগে আমি পিছনে তাকাই - এটা বরাবরের অভ্যাস। বাবা ছাদে দাড়িয়ে আছে জানি, কিন্তু অন্ধকারে মুখটা দেখা গেল না। সরু গলিতে চাঁদের আলো রাস্তা হারিয়ে ফেলে, ঠিক যেরকম ভাবে ছোটবেলায় সাইকেল চালিয়ে রাস্তা হারিয়ে আমরা নিজেদের চেনা জগতকে অচেনা বানানোর আনন্দে মেতে উঠি, সেভাবেই। বয়স বাড়ার সাথে সাইকেলে জং ধরে, বিয়ারের বোতল ব্যারিকেডের মতন ঘরের চৌকাঠ পেরোতে মানা করে।
জং ধরা সাইকেল ছেড়ে এখন পায়ে হাঁটতেই বেশি ভাল্লাগে। মামাবাড়ির তিনমাথার মোড়ে কোনও এক অজানা কারণে বারংবার বাঁদিকের গলিটায় চোখ চলে যায়। প্রত্যহের অভ্যাস কাটিয়ে এখন শিবমন্দিরে আলো জ্বলছে না - দেবতা মানুষের মুখের উপর আশ্রয়ের দরজা বন্ধ রেখেছেন। একটু আগে আসলে বেশ দূর থেকেও মাসখানেকের অবজ্ঞার ধুলো দেখতে অসুবিধা হয় না। এখন আকাশের যাবতীয় আবর্জনা মাটিতে আসছে, থিতিয়ে যাচ্ছে। এই জং সরানোর কাজ যে সহজ হবেনা, তা নতুন করে কাওকে বলে দিতে হয়না।
ছোটবেলায় নীল পুজোয় বেশ আনন্দ হত। শিব মন্দিরের গলিটায় ঢুকলে মনে হত ঈশ্বরের সাথে প্রকৃতির বিবাহের আনন্দে সারা পাড়া মেতে উঠে চারদিক আলোকিত করেছে। যাদের মনে অন্ধকার তারা প্রসাদে অতিরিক্ত লুচি চাইলে মুখ ব্যাজার করতেন। আমরা ছোটরা রাখাল সাজতাম না - গুন্ডা সেজে হাতে ক্যাপ বন্দুক নিয়ে কোনও এক কাল্পনিক জমিদারবাড়ি লুঠ করতে তেড়ে যেতাম - আর সেই কৌতুক নাটকের একমাত্র দর্শক হয়ে চাঁদমামা হাততালি দিত।
হাঁটতে হাঁটতে সাহেব্বাগান মাঠের কাছে এসে একটু দম বন্ধ লাগলো। মুখোশটা খুলে একটু শ্বাস নিয়ে বুঝতে পারলাম এই হাওয়ায় ছোটবেলার ঘাসের গন্ধ আছে; আসলে আমাদের যাবতীয় মুখোশ তো বড় হবার জন্যই পড়তে হয়। হঠাৎ খেয়াল হল যে এখানে রোগী ধরা পড়েছে - এরকম একটা খবর হাওয়ায় ভেসে বেরাচ্ছে। চটপট মুখ বন্ধ করে এগিয়ে চললাম - যেরম সারা জীবন এগিয়ে যাই, নিঃসাড়ে নিস্তব্ধে।
এখানে এককালে আমি পড়তে আসতাম। হইহই করে যাওয়া আসার মাঝে কোনদিন ভাবতে হয়নি যে এই রাস্তায় একা হাঁটব। অবশ্য সব ট্রেনযাত্রীর যে গন্তব্যস্থল এক - তা ভাবা তো উচিৎ নয়। যে একা যাত্রা করে, তার কোনও গন্তব্যস্থল দরকার হয়না। বড় রাস্তায় রূপোলী চন্দ্রসুধা সার্চলাইটের মত এদিক ওদিক তাকাতে বলে। এভাবেই হেঁটে যেতে যেতে একদিন উল্কাপিণ্ড কখন যে তারামণ্ডলের আকর্ষণ ছেড়ে লাগাম ছাড়া সাদীর মত তার ফেলে আসা যাবতীয় সবকিছুকে ভালবাসতে ভুলে যায় - তা ধরতে পারা যায়না।
আমার ছেলেবেলার শেষ খুঁটি ছিল বড় রাস্তার ধারের সাইবার ক্যাফে। বাবার পকেট থেকে দশটাকা বের করে কাউন্টার স্ট্রাইক আর ফিফাতে উচ্চমাধ্যমিকের বারটা বাজানোয় একটা আফসোস ছিল, কিন্তু কোনদিন অপরাধ বোধ হয়নি। গালাগালমন্দ, চিৎকার চেঁচামেচি, ঝগড়া অশান্তি, আবার বেরিয়ে দু টাকার ফ্লেক - এসবের ঝাঁপ কবে যে এখনকার শাটারটার মতন বন্ধ হয়ে গেল তা বুঝে ওঠার সময় জীবন দেয়নি। শুধু এটুকু ভাল করে বুঝিয়েছে যে অপরাধবোধটা সমসাময়িক আমদানি।
তবুও চাঁদের আলোয় রাস্তা খুঁজে বাড়ি ফিরতে হয়। ভালবাসার ঝাঁপ গুলো বন্ধ হলেও আবার, বারবার মন চায় ঘরের দেওয়ালের মত হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকি - বাড়িতে ঘর তৈরি করি। আবার তাতে ছোট ছোট আনন্দগুলো আনাগোনা শুরু করুক, বিয়ারের বোতল গুলোর ব্যারিকেড ভাঙুক প্রেমের অপরিসীম বিদ্রোহে।
লোডশেডিং কাটেনি। পায়ের তলায় অবশিষ্ট চন্দ্রকনাকে পারিয়ে ঘরে ঢুকলাম। এই লকডাউন একদিন কাটবেই - তারপর আবার শিবমন্দিরে সন্ধ্যার আলো জ্বলবে।