- :|: | ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৩:৫১
- ... কতটা পয়সা ...
পয়সা... হুম... এইটা আসলে আমার ঠিক মাথায় ঢোকে না। এত এত টাকা কীভাবে দেওয়া নেওয়া হয়। কী করেই বা ঢুকবে, আমাকে তো আর কেউ দিচ্ছে না। যাই হোক, মানে কী হয়, এমন তো আর না যে সাহাবাবু একটা ছোটহাতি বোঝাই নোট নিয়ে এসে বললেন, সরকারবাবু, এলুম গ। আর পেটিএম কি গুগুল পে তো আর করবে না, তাহলে দাগ থেকে যাবে। তো ঐ ঋণমকুব টাইপের ব্যাপার। বা হয়তো এরোপ্লেনমন্ত্রীকে বলে দিল, ওহে, গোঁসাইবাগানের ভুতো খুব ভালো সেবা করেছে, ব্যাবাক এয়ারপোর্টে রাতদিন ওর চ্যাঁচামেচি দেখানোর বন্দোবস্ত করে দাও। বা হয়তো কেউ অনেক স্টক টক কিনে নিল। কী জানি কী হয়।
যাগ্গে, সে কোন কথা না। একটা তো কর্পোরেট পলিসি থাকেই। সেখানে নানান খেলা। কিন্তু আবার আভ্যন্তরীন গোষ্ঠীও থাকে। এইটা আসলে গেরুয়া গুণ্ডামি নিয়ে পুলিশ রিপোর্টের বয়ান দেখে মনে হল। সুনির্দিষ্টভাবে সম্পাদকীয় দপ্তরের দু'জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আমি নিশ্চিত গুরুর কেউ কেউ ওই দু'জনকে চেনেন, এবং এটাও নিশ্চিত যে তাঁদের কারো কারো ইন্টিগ্রিটি নিয়ে চেনাশুনোরা নিঃসংশয় হবেন। তো, তার মানে কী, ভেতরে কিছু কিছু সুস্থ ও মুক্ত চিন্তার মানুষ বরাবরই আছেন, তাঁরা তাঁদের সাধ্যমত করেন। এবার ঐ ভেতর থেকে লড়াইটাও বিরাট ব্যাপার। মানে খুবই বড় ব্যাপার- অনেক কিছু স্টেক থাকে। এবং এঁরা না থাকলে যেটুকু স্যানিটি অবশিষ্ট তা আর থাকতো না। তো গেরুয়া গুন্ডামি লিখেছে মানে টাকা পায়নি- এই কথা বলা মানে ভেতরের ঐ অংশটাকে অস্বীকার, হয়তো অসম্মানও করা, যাঁরা ঝুঁকি নিয়ে বন্ধুর পথে চলেছেন। পুরো যন্ত্রটা গোলেমেলে কিন্তু তার মধ্যে আলোকবর্তিকা কারো কারো হাতে, সরকারি সিস্টেম নিয়েও আমার ঐ মনে হয়। এইসব ভাবতে ভাবতে শিন্ডলার্স লিস্ট ইত্যাদিও মনে পড়ে গেল।
এবার সেইসব লড়াই জায়গা পাবে কিনা, ছাপা হবে কিনা, একের পাতায় বড় করে না সাতের পাতায় ছোট করে- সে আরেক। বর্তমান মূলধারার মিডিয়া দায়িত্বপালন করছে না এটা আমি মনে করি, কিন্তু ভেতরে আড়ে ছোট বহরে বিরাট লড়াইপত্র থাকে। সেইসব লড়াই, সাহস, মানুষ - ভরসা।
মুশকিল হল যত দিন যাচ্ছে, ঐ অর্থনীতি মার্ক্ষ সাহেব ইত্যাদি ইত্যাদির নিয়মেই বোধহয়, রূপহীন কায়াহীন আকারহীন পলিসি প্রসেস ইত্যাদি ব্যক্তির উদ্যোগকে আবছা করে দিচ্ছে, ক্ষমতার বিপক্ষে গেলে।
এবার এও হতেই পারে যে সাহাবাবু ছোট হাতি নিয়ে যাননি বলে ই খবরটা ছাপতে দিয়েছে, না হলে চেপে দিত। কে জানে। সে যাই হোক, যাঁরা এই দুঃসময়ে যক্ষপুরীর ভেতরেও আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন তাঁদের অভিবাদন আরকি। প্রতিষ্ঠান নিয়ে যতই সন্দেহ থাকুক।
তবে পাঁচের পাতায় হলেও লিখেছে চমৎকার। আর শেষ অনুচ্ছেদে, আমার পড়ে মনে হল তৃণও মনে করি না- এখানে তৃণকে কতিপয় অপরিশীলিত প্রাকৃত শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করলেও বেশ একটা জোশ হয়ঃ)
অধ্যাপক পাত্র মশাইয়ের দেওয়াল থেকে কপি করে দিই বরং রিপোর্টটা।
***
চতুর্থ স্তম্ভ অমলিন-ই
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দু'দল ছাত্রের মধ্যে গোলমালের রাতে বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় হুঙ্কার দিয়েছিলেন, 'তাণ্ডব হবে'। পরের দিন সেই 'তাণ্ডবে'র অভিঘাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক ভেঙে পড়েছিল। আর সেই ঘটনার সংবাদের সঙ্গে থাকা শিরোনামের জেরে এ বার আক্ষরিক অর্থেই 'রং-বাজি' হল আনন্দবাজার পত্রিকার দুয়ারে! পত্রিকার মূল ভবনের সামনে বিক্ষোভকরে থামের গায়ে দেওয়া হল গেরুয়া রঙের পোঁচ। ঘটনাস্থলে কেবল দাঁড়িয়ে থেকেই 'রাজধর্ম' পালন করল পুলিশ!
আনন্দবাজার প্রতিষ্ঠান ও তার দফতরের গায়ে রং লাগানোর চেষ্টার অভিঘাত অবশ্য ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত ও দূরে দূরে। গেরুয়ার পোঁচ মুছে পুরনো সাদা রং দ্রুতই ফিরিয়ে আনা হয়েছে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের তরফে। তবে তার চেয়েও দ্রুত এই পেশি আস্ফালনের প্রয়াসের খবর ছড়িয়ে গিয়ে প্রতিবাদ এসেছে নানা মহল থেকে। একযোগে সরব হয়েছে সব বিরোধী দল, নিন্দায় মুখর হয়েছে সাংবাদিকদের সংগঠনও। শাসক বিজেপি যদিও এই ঘটনার 'দায়' অস্বীকার করেছে। শাসক পক্ষের বেশির ভাগ নেতা-মন্ত্রীই মন্তব্য এড়িয়ে গেলেও পর্যটন ও পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ অবশ্য বলেছেন, "কাজটা ঠিক হয়নি।"
যাদবপুরে হামলার ঘটনার পরে সংবাদের শিরোনাম নিয়ে প্রবল আপত্তি প্রকাশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বলেছিলেন, ক্ষমা না-চাইলে গেরুয়া বসন পরে প্রতিবাদ হবে। সেই ধারা মেনেই আনন্দবাজার পত্রিকা দফতরের সামনে মঙ্গলবার বিক্ষোভ দেখিয়েছেন এক দল গেরুয়া বসনধারী।
'বয়কট আনন্দবাজার' প্ল্যাকার্ড নিয়ে কয়েক জন বিক্ষোভকারী এসে এ দিন দুপুরে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে আনন্দবাজারের মূল ভবনের সামনে জড়ো হয়েছিলেন। পুলিশের ঘেরাটোপের মধ্যেই ভবনের মূল ফটকের উপরে গেরুয়া একটি উত্তরীয় ঝুলিয়ে দিয়ে তাঁরা বিক্ষোভ-অবস্থানে বসেন। তাঁরা দাবি করেন, "আনন্দবাজার পত্রিকা সরকারের সমালোচনা করতেই পারে। মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনাও করতে পারে। কিন্তু গেরুয়া রংকে অসম্মান করার অধিকার কারও নেই। পুলিশের কথা মেনে আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শুধরে না-নিলে পরে বড় প্রতিবাদ হবে!" হিন্দিভাষী বিক্ষোভকারীরা বাংলায় আনন্দবাজারের খবর ও শিরোনাম নিয়ে নানা ধরনের পর্যবেক্ষণ পেশ করেন, সংবাদ কর্তৃপক্ষকে 'দিমাগি নকশাল' আখ্যাও দেওয়া হয়। কিছু ক্ষণ অবস্থানের পরে মূল ফটকের পাশের দুই থামে গেরুয়া রঙের পোঁচ লাগিয়ে 'আনন্দবাজার হায় হায়' স্লোগান দিতে দিতে বিক্ষোভকারীরা চলে যান। বহিরাগত লোকজন এসে পত্রিকা দফতরের দেওয়ালে রং লাগাচ্ছে দেখেও পুলিশ অবশ্য বাধা দেয়নি। অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতে বাম এবং তৃণমূল কংগ্রেস জমানায় আনন্দবাজারের সামনে একাধিক বার বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হলেও বাড়ির গায়ে হাত পড়েনি।
বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব অবশ্য দাবি করেছেন, দলের তরফে এমন কোনও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়নি। রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের বক্তব্য, "কারা করেছে, কী করেছে, জানি না। পুরো বিষয়টা না-জেনে মন্তব্য করতে পারব না।" তবে মন্ত্রী শঙ্করের মতে, "আমরা দেওয়ালে নয়, মনে গেরুয়া রং করতে এসেছি। তাই যারা এই কাজ করেছে, সমর্থন করছি না। এই কাজটা ঠিক হয়নি। যে কাজ ভালবেসে করতে হয়, সেই কাজ জোর করে করা যায় না!"
যে শিরোনামের জেরে বিক্ষোভ, তার জন্য ইতিমধ্যেই আদালতে মামলা ও থানায় অভিযোগ হয়েছে। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মহিলা সাংবাদিকদের সংগঠন আইডব্লিউপিসি-র তরফে বলা হয়েছে, 'কোনও মহারাজ বা দক্ষিণপন্থী সংগঠনের সঙ্গে রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসকের বক্তব্য মিলে যাচ্ছে, এটা খুব উদ্বেগের কথা। স্বাধীন ও অবাধ সাংবাদিকতার জন্য এটা অনুকূল পরিবেশ নয়, গণতন্ত্রের জন্য ভাল লক্ষণও নয়।" একাধিক প্রেস ক্লাব সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বিরোধীরাও এক সুরে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কালীঘাটপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের মন্তব্য, "বিজেপির গুন্ডারা আনন্দবাজার ভবনের গায়ে গেরুয়া রং দিচ্ছে আর পুলিশ তাদের পাহারা দিচ্ছে! গেরুয়া গুন্ডামি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বলতে হবে!" তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে সাংসদ সৌগত রায়, দোলা সেনেরা পরে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে ঘুরে গিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
একই ভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, পলিটবুরোর সদস্য নীলোৎপল বসু, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, কলকাতার নেতা কল্লোল মজুমদার, কৌস্তভ চট্টোপাধ্যায়েরা। সেলিম বলেছেন, "যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের পরে আনন্দবাজার পত্রিকায় যে শিরোনাম করেছিল, তার জন্য এই হিন্দুত্ব বাহিনী পুলিশের সামনে গেরুয়া রং করেছে। গুন্ডামির সাক্ষ্যই রেখেছে ফের! 'রং-বাজি' করেছে। ছবিতে দেখলাম, ঘটনাস্থলে পুলিশ নীল-সাদা ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে। ছাতার রং এখনও বদলায়নি, কিন্তু ছাতির রং বদলে ফেলেছে।" প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন ও নিউ ডেমোক্রেসি, এসইউসি, ফরওয়ার্ড ব্লক-সহ বিভিন্ন দলের নেতৃত্ব।
পত্রিকা দফতরে 'হামলা'য় দোষীদের শাস্তি দাবি করে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের মন্তব্য, "গেরুয়া রঙের অবমাননা এরা নিজেরাই করছে। গেরুয়া হল ত্যাগ এবং তিতিক্ষার প্রতীক। গেরুয়ার তাৎপর্য বুঝতে গেলে আগে অন্তরে ত্যাগ ও তিতিক্ষার অনুভূতি আনতে হয়।"
দিনভর অসংখ্য পাঠক ফোনে, বার্তা পাঠিয়ে ও সমাজমাধ্যম মারফত পত্রিকার দফতরে 'অসভ্যতা'র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই যুগে যুগে আনন্দবাজার প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাবানের রোষের পরোয়া না-করে সংবাদ পরিবেশন করে এসেছে। সংস্কৃত শ্লোকে যাকে বলে 'তৃণায় মন্যে' (আক্ষরিক অর্থ, তৃণ মনে করি, আর ব্যঞ্জনার অর্থে তৃণও মনে করি না), তা-ই থেকেছে এই ধরনের আস্ফালনের প্রতি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মনোভাব। এই পাঠকই পত্রিকার শক্তি। দেওয়ালে গা-জোয়ারি রঙের পোঁচ যাকে ছুঁতে পারে না!