আজ আনন্দবাজারে মৈত্রীশ ঘটকের গ্রাম বনাম শহরের উন্নয়নের ধারণা নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। মৈত্রীশবাবু প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ। আমার এই বিষয়ে কোনো প্রথাগত শিক্ষা নেই। তাই, কেনো আমি লিখছি শুরুতেই সে কৈফিয়ত দেওয়া জরুরি।
পেশাগত কারণে আমি যে বিষয়ের সাথে জড়িত, তা "উন্নয়ন" এর চেকলিস্টে প্রায় সব বাক্সেই টিক দেয়। আলোকিত ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, পুনে কেন্দ্রিক - আমেরিকা বা ইউরোপীয় সহকর্মীদের সাথে কাজ - কলকাতা শহরের শিক্ষিত তরুণরা এরকমই চাকরি খোঁজেন। তাই একজন "ইনসাইডার" হিসেবে কিছু কথা বলি।
কোলকাতায় তো অনেক "আইটি" কোম্পানি হয়েছে, তাহলে কোলকাতায় নেই নেই রব কেনো? ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাইতে কী আছে যা কোলকাতায় নেই? কোলকাতায় এই মুহূর্তে রয়েছে ভারতের প্রায় সব আইটি সার্ভিস কোম্পানি - সাম্প্রতিক AI সংক্রান্ত ছাঁটাই এর ব্যাপার বাদ দিলে হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণের চাকরির সুযোগ এখানেই। অন্যদিকে এই ধরণের কোম্পানি কিন্তু ব্যাঙ্গালোর চেন্নাইতে আছে বটে, কিন্তু শতাংশের বিচারে কলকাতার চে ঢের কম। সেখানে রয়েছে আরও বেশি "নিশ" (niche) কাজের সুযোগ। ব্যাপারটা একটু উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছি। ধরুন একটি বহুজাতিক ব্যাংক "ক" সে একটি কাজ করতে দিলো কলকাতার আইটি সার্ভিস কোম্পানি "খ" কে নিদির্ষ্ট অর্থের বিনিময়ে। আবার এই "ক" এর একটি কেপেবিলিটি সেন্টার "গ" আছে ব্যাঙ্গালোরে। সেখানে তুলনামূলক একটু জটিল কাজ হয় - যাকে পারিভাষিক শব্দে বলে হায়ার ভ্যালু স্ট্রিম। একই কর্মী কিন্তু "খ" ও "গ" তে কাজ করতে সক্ষম। "গ" তিনি মাইনে পাবেন "খ" এর অন্তত দ্বিগুণ (কিছু ক্ষেত্রে আমি এটি চারগুণ পর্যন্ত হতে দেখেছি)। এবার "একটি কাজ" এর ব্যবচ্ছেদ করা যাক। ব্যাংক "ক" এর মূল ব্যবসা কিন্তু আইটির কাজ নয়। আইটি কে আমরা ধরতে পারি পরিকাঠামো বা কিছুক্ষেত্রে এনেবলার হিসেবে। তার মূল প্রোডাক্ট বিভিন্ন ধরণের ধার (লোন) - কে ডিজাইন করবে সেই প্রোডাক্ট? কে করবে তার রিস্ক আনলিসিস? "খ" এই কাজ পারবে না, তাকে "ক" করতেও দেবে না বিভিন্ন আইনি কারণে। কিন্তু "গ" তে ওই আইটির কাজ করা লোক ছাড়াও এই ধরণের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কারা করেন এই কাজ? "শিক্ষিত" এখানে যথেষ্ট না, এই কর্মীরা বেশিরভাগ ন্যূনতম মাস্টার্সডিগ্রি ধারী। এখানে কলেজের ক্যাম্পাস থেকে কাউকে চাকরিতে নেওয়া হয় না। কতজন এই ধরণের চাকরি পান? সীমিত, খুব সীমিত। এই ধরণের চাকরির সুযোগ আছে গাড়ি, প্লেন - প্রায় সবকিছুতে। হায়দ্রাবাদ এই মুহূর্তে চুক্তির ভিত্তিতে ওষুধ তৈরির (CDMO) যে বাস্তুতন্ত্র তার একদম কেন্দ্রে। এছাড়াও আছে CRO - বস্তুতঃ যেখানে বিশাল কর্পোরেট গুলো নিজেদের "রিসার্চ" বা জটিল ভাবনাচিন্তার কাজ "আউটসোর্স" করে দেয়। আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। কোলকাতায় এর কিচ্ছু নেই। কেনো নেই? সে কিন্তু আলাদা প্রসঙ্গ, প্রায় পুরোটাই রাজনৈতিক - তার জন্য বর্তমান সরকারের দায় কমই।
বাংলায় কী আছে? শিক্ষিত তরুণদের জন্য তেমন আকর্ষণীয় না হলেও লজিস্টিকস হাব হাজার হাজার কর্মসংস্থান করতে পারে। হ্যাঁ লো-স্কিল এখানে বাধা নয়। MSME তে বহুদিন হলো বাংলা দেশের মধ্যেই প্রথম তিনে আছে। আর হ্যাঁ সাম্প্রতিক খবরে প্রকাশ কলকাতার জিডিপি ব্যাঙ্গালোরের চেয়ে বেশি। যদিও ঠিক কীভাবে এই দাবি করা হচ্ছে সেটা আমার কাছে স্পষ্ট না। ভূগর্ভস্থ জল, তুলনায় সস্তা রিয়েল এস্টেট, রাস্তা সব মিলিয়ে স্রেফ পরিকাঠামোগত দিক থেকে কোলকাতা মোটেই পিছিয়ে নেই। আমরা শুধু প্রথম বাস টা মিস করে গেছি।
আর একটি কথা বলার আছে। "ভারী শিল্প" নিয়ে আমাদের রোমান্সের শেষ নেই, প্রচুর শ্রমিক কাজ পাবেন ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তব এরকম না। ভারী শিল্পে "ম্যানুফ্যাকচারিং" প্রায় শেষ ধাপ। এখানে আর নতুনভাবে ঢোকা প্রায় অসম্ভব। বরং আপস্ট্রিম কাজের যে উদাহরণ দিলাম, ওগুলোই ভবিষ্যত। এই হায়দ্রাবাদ, ব্যাঙ্গালোরের চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতির শরিক হতেই যান বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক। বাংলার পাশে থাকা বিহার, ঝাড়খণ্ড এর বিপুল জনসংখ্যা কোনোদিনই বাংলার শ্রম বাজারকে সেভাবে "দামী" হতে দেবে না।
"শিল্প", "উন্নয়ন" এই ধরণের বিশাল ছাতার তলায় হারিয়ে যায় বাস্তব। উপনিবেশের শিক্ষা আমাদের চিরকাল "টপ-ডাউন" ভাবতে শেখায়। "বটম - আপ" কোথাও একটা গিয়ে আমাদের বড়ো হওয়ার সংস্কৃতিতে ঠিক যেন খাপ খায় না।