এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নাম নেই তবু কাম আছে 

    RINA CHAKRABORTY লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ২৪২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • প্রথম পর্ব
    নাম নেই তবু কাম আছে
    — ধারা ১

    আজকাল কোনও কিছুর নাম না থাকলে আমার বেশ ভালো লাগে। নাম থাকলেই তার একটা পরিচয় হয়, পরিচয় হলেই তার হিসেব হয়, আর হিসেব হলেই মানুষ জানতে চায়—কতটা লাভ, কতটা লোকসান, কার কৃতিত্ব, কার ব্যর্থতা।

    আমাদের ছোটবেলায় এসব ছিল না। পুজোরও একটা নাম ছিল না। কাকা হেসে বলতেন, “পুজোর আবার নাম কী?” কথাটা তখন বুঝিনি। এখন বুঝি, নাম না থাকলেও কিছু কিছু জিনিস খুব গভীরভাবে থেকে যায়। যেমন গন্ধ। যেমন ভোরবেলার ঠান্ডা জল। যেমন মায়ের শাড়ি দুভাঁজ করে পরা। যেমন বাড়ির উঠোনের স্থলপদ্ম। যেমন দাদাদের হাত ধরে প্যান্ডেলে যাওয়া। আর যেমন একটা উপনগরী—যার নাম বাটানগর।

    আমি সেই উপনগরীর মেয়ে। আমার জন্ম ১৯৬০ সালে। তখন বাটানগরকে আজকের মতো কেউ ইতিহাসের বইয়ে রাখেনি। তৎকালীন ২৪ পরগনা জেলার এই উপনগরী আমাদের কাছে ছিল ঘরবাড়ি, রাস্তা, স্কুল, বাটা কারখানা, গঙ্গার হাওয়া আর পুজোর প্যান্ডেল। আমরা জানতাম না, একটা উপনগরীরও একদিন ইতিহাস হয়ে যায়। জানতাম না, যে রাস্তায় প্রতিদিন হাঁটি, তারও একটা জন্মকথা আছে। জানতাম না, আমাদের বাবাদের উদ্বাস্তু হয়ে এসে নতুন করে সংসার পাতার মধ্যে একটা দেশের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। আমরা শুধু জানতাম—পুজো আসছে।
    আমি ছিলাম চার ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় নাকি বেশ মাথা ছিল। বৃত্তি পেয়েছি, একবার ডাবল প্রমোশনও হয়েছে। বাড়ির বড়রা এসব নিয়ে খুশি হতেন। আমিও হতাম। কিন্তু তার চেয়েও বেশি খুশি হতাম যখন পুজো আসত। এখন ভাবি, মেয়েটা বোধহয় তখনই বুঝে গিয়েছিল—জীবনে সব আনন্দ পরীক্ষার খাতায় পাওয়া যায় না। কিছু আনন্দের কোনও নম্বর থাকে না, কোনও সার্টিফিকেট থাকে না, কোনও নামও থাকে না। তবু তাদের কাজ আছে। তারা মানুষকে অনেক বছর পরে বসিয়ে দেয় পুরোনো দিনের সামনে।
    আজ যেমন আমাকে বসিয়েছে।

    তাই এই ডায়েরি। একটা নামহীন পুজোর কাছে ফিরে যাওয়ার ডায়েরি। আর সেই পুজোর অছিলায় নিজের সময়টাকে একটু জিজ্ঞেস করা—তুই কোথায় গেলি রে?

    উত্তরটা তখনও জানতাম না। জানতাম শুধু, সেই মেয়েটা একদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠবে। উঠোনের স্থলপদ্ম গাছটার দিকে তাকাবে। মায়ের শাড়ি দুভাঁজ করে পরবে। আর দাদা-দিদিদের সঙ্গে পুজোর প্যান্ডেলের দিকে হাঁটবে। সেই হাঁটার পথেই তার সামনে খুলে যাবে একটা উপনগরী, একটা কারখানা, একটা উদ্বাস্তু পরিবারের গল্প, একটা স্কুল, কিছু মানুষ, আর এমন এক পুজো, যার কোনও নাম ছিল না—কিন্তু যার কাজ ছিল আমাদের সবাইকে একসঙ্গে করে দেওয়া।
    সেই গল্পটা পরের দিন থেকে শুরু করা যাক। কারণ স্মৃতিরও তো একটু শ্বাস নেওয়া দরকার।

    —শ্রীমতী রীনা
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    প্রথম পর্ব
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | ১৭ আগস্ট ২০২৬ ১৯:২৪742293
  • শুরু টুকু বেশ ভালো লাগলো। পরের পর্বগুলোর অপেক্ষায় থাকলাম। কিন্তু কিছু করে এই লেখাটা তীর্থ দাশগুপ্ত'র ট্রাম নিয়ে সিরিজের সাথে ট্যাগড হয়ে গেছে! একটু দেখবেন ঠিক করা যায় কিনা?
  • Ranjan | ১৮ আগস্ট ২০২৬ ০৬:১২742297
  • সঙ্গে আছি l
  • RINA CHAKRABORTY | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০১:৪৫742311
  • নাম নেই তবু কাম আছে

    ধারা ২ : যে কথাগুলো আমাদের সামনে বলা হতো না

    পুজোর সময় বাবা খুব একটা আমাদের সঙ্গে থাকতে পারতেন না। তখনও বুঝিনি, পুজো সবার জন্য ছুটি নিয়ে আসে না। কারও জন্য পুজো মানে নতুন জামা, প্যান্ডেল, ভোগ আর রাত জেগে নাটকের মহড়া; আর কারও জন্য সেই চার দিনও কাজের দিন। বাবা তেমনই একজন। সংসার চালানোর জন্য কাজটা ধরে রাখতে হতো। চাকরিটা স্থায়ী ছিল না—একটা ছাপাখানায় অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করতেন।

    ছাপাখানাটা আমি কোনওদিন দেখিনি। অথচ বাবার মুখে শুনতে শুনতে জায়গাটা আমার কাছে বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মনে হতো, একটা ঘরের মধ্যে সারাক্ষণ মেশিন চলছে। খটখট, ঘর্ঘর—তার সঙ্গে কাগজের শব্দ। বাতাসে ছাপার কালির গন্ধ। কোথাও কাগজের স্তূপ, কোথাও ছোট ছোট ধাতব অক্ষর সাজানো। তখন তো অক্ষরকে কম্পিউটারে বসিয়ে ছাপা হতো না। অক্ষর ছিল হাতে ধরার জিনিস। একটার পর একটা হরফ সাজিয়ে শব্দ তৈরি হতো, শব্দ থেকে লাইন, লাইন থেকে পাতা। তারপর সেই পাতায় কালি লাগিয়ে কাগজে তার ছাপ।

    বাবা এসব খুব সহজ করে বলতেন। আমি শুনতাম আর নিজের মতো করে ছাপাখানাটা বানিয়ে নিতাম। সেখানে বাবার একটা জায়গা ছিল। হয়তো খুব বড় জায়গা নয়। কিন্তু আমার কল্পনায় সেটুকুই ছিল তাঁর কর্মজগৎ। তিনি সকালে সেখানে যেতেন, সারাদিন কাজ করতেন, আর সন্ধেবেলা ফিরে আসতেন আমাদের কাছে।

    পুজোর দিনেও।

    আমরা তখন প্যান্ডেলে। দাদা-দিদিরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কবিতা আবৃত্তি হবে, নাটক হবে। হেনাদি ব্যস্ত। প্যান্ডেলে ভোগের গন্ধ। চারপাশে আলো। আর বাবা তখন কোথাও একটা ছাপাখানার মধ্যে অন্যের লেখা কাগজে তুলে দিচ্ছেন।

    কী আশ্চর্য—একজন মানুষ সারাদিন অন্যের কথা ছাপছেন, অথচ নিজের কথাগুলো কোথাও লেখা নেই।

    তিনি ওপার বাংলা থেকে আসা মানুষ। নতুন জায়গায় এসে, নতুন করে সংসার করেছেন। কাজটা অস্থায়ী। আয় অনিশ্চিত। তবু কাজ করতে হয়েছে। কারণ সংসার তো ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে না।

    তখন এসব বুঝতাম না। শুধু জানতাম, পুজোর সময় বাবাকে সবসময় কাছে পাওয়া যায় না।

    আজ এত বছর পরে মনে হয়, কত মানুষের জীবনই তো এমন ছিল। তারা অন্যের নাম ছাপত, অন্যের খবর ছাপত, অন্যের কথা ছাপত। নিজের জীবনের কোনও শিরোনাম তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল না।

    বাবারও না।

    তাঁর নাম কেইবা ছাপবে?
  • Mou Chakraborty | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০২:৩০742312
  • পুরনো সেই দিনের কথা
     
  • . | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০৩:৩৩742313
  • লিখুন। পড়ছি মন দিয়ে।
  • শ্রীমতী রীনা | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ১৮:৪৬742316
  • আমি শ্রীমতী রীনা, আপনার মন্তব্য বুঝতে পারিনি। আমার কি করণীয় যদি বলেন।
  • . | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ২০:৩৪742319
  • sorry. আমি ভাবলাম হয়তো এই লেখাটা আরও চলবে।
  • kk | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫০742320
  • ডট,
    আমার মনে হয় শ্রীমতি রীনা এই পোস্টটা আমার কমেন্টের উত্তরে করেছেন। হয়তো উনি এখানে আগে পোস্ট করেননি তাই বুঝতে একটু অসুবিধে হচ্ছে যে এখানে ঠিক কীভাবে কী হয়। আমি যেহেতু কিছু টেকনিকাল দিক নিয়ে বলেছি আর সম্ভবত অ্যাডমিন সেটা ঠিক করে দিয়েছেন সেইজন্য ওঁর কনফিউশন হতে পারে। সেক্ষেত্রে গুরুর কোনো সহৃদয় রোবট যদি একটু ওঁকে লিখে দেন কেমন ভাবে খেরোর খাতায় পোস্ট করলে পর পর পর্ব দেওয়া যাবে তাহলে ভালো হয়।
  • . | ১৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:১০742321
  • হ‍্যাঁ কেকেদা, এরকমই সম্ভব মনে হচ্ছে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন