এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • স্বামী বিবেকানন্দকে আমি কেন এখন ও প্রাসঙ্গিক মনে করি: এক মার্কসবাদী পাঠ

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ জানুয়ারি ২০২৬ | ৪৫৯ বার পঠিত
  • স্বামী বিবেকানন্দকে আমি কেন এখনও প্রাসঙ্গিক মনে করি: এক মার্কসবাদী পাঠ

    অয়ন মুখোপাধ্যায়

    আমি নিজেকে মার্কসবাদী বলেই স্বামী বিবেকানন্দকে প্রথমে কিছুটা দূর থেকেই দেখেছিলাম। আধ্যাত্মিক ভাষা, ধর্মের উল্লেখ, বেদান্তের পরিভাষা—এই সবই আমার অভ্যস্ত প্রশ্নবোধকে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক করে তুলত। ভাববাদ বনাম বস্তুগত দর্শনের সেই চিরচেনা দ্বন্দ্ব, যেন সাপে-নেউলের সম্পর্ক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি—কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কেবল তাঁর ব্যবহৃত শব্দের খোলসে বন্দি করলে তাঁর প্রকৃত ভূমিকা ধরা পড়ে না। আজ আমি স্বামী বিবেকানন্দকে পড়ি একজন সামাজিক চিন্তক হিসেবে—যিনি ঔপনিবেশিক ভারতের ভাঙা সমাজ, আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ ও গভীর অবক্ষয়ের সংকট তীক্ষ্ণভাবে অনুভব করেছিলেন।

    আমার কাছে ক্রমে স্পষ্ট হয়েছে, স্বামীজীর চিন্তা কখনও স্থির ছিল না। তিনি অতীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু সেখানে থেমে থাকেননি। একজন মার্কসবাদী হিসেবে আমি জানি—ইতিহাস কখনও মসৃণ পথে এগোয় না; এগোয় দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েন ও সংঘাতের ভিতর দিয়ে। স্বামীজী এই দ্বন্দ্বকে অস্বীকার করেননি। তিনি স্পষ্টভাবে দেখেছিলেন, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, সামাজিক অবমাননা কোনও ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়—এগুলি সমাজের গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত বাস্তবতা। তাঁর বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য—ক্ষুধার্ত মানুষকে আগে আহার দিতে হবে—আমার কাছে কোনও নৈতিক আবেগের বাণী নয়, বরং বস্তুগত বাস্তবতার স্বীকৃতি।

    মার্কস ধর্মকে দেখেছিলেন মানুষের দীর্ঘ সহনশীলতা ও বঞ্চনার ভাষা হিসেবে। স্বামীজী ধর্মকে দেখতে চেয়েছিলেন মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মাধ্যম হিসেবে। এখানে মতভেদ রয়েছে, কিন্তু এই মতভেদ অচল বা নিষ্ফল নয়। আমি লক্ষ করি, স্বামীজীর ধর্ম কোনও ক্ষমতাকাঠামোর মুখপাত্র নয়। তিনি পুরোহিততন্ত্রের বিরোধিতা করেছেন, জাতি ভেদের সংকীর্ণতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, নিষ্ক্রিয় সাধনার বদলে কর্মকে গুরুত্ব দিয়েছেন। শ্রম তাঁর কাছে তুচ্ছ ছিল না—বরং মানুষের মর্যাদার এক অপরিহার্য শর্ত। এই জায়গাতেই আমি তাঁকে গুরুত্ব দিয়ে পড়ি।

    পাশ্চাত্যে গিয়ে যে সমাজ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল। শিল্প, সংগঠন, শৃঙ্খলা—এই ধারণাগুলি তাঁর চিন্তায় নতুন গুরুত্ব পায়। তিনি বুঝেছিলেন, কেবল আবেগ দিয়ে সমাজ বদলায় না; দরকার সংহত মানুষ, সংগঠিত উদ্যোগ ও স্পষ্ট লক্ষ্য। এখানে তাঁর ভাবনার সঙ্গে প্রাথমিক মার্কসবাদী সংগঠনচিন্তার এক অন্তরঙ্গ সংলাপ তৈরি হয়—যদিও দার্শনিক পথ আলাদা।

    নারী প্রসঙ্গে স্বামীজীর অবস্থান আমাকে বিশেষভাবে টানে। তিনি নারীকে করুণার বস্তু হিসেবে দেখেননি; দেখেছিলেন সামাজিক পরিবর্তনের এক সক্রিয় শক্তি হিসেবে। মার্কসবাদ যেমন উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের প্রশ্নে নারীর ভূমিকাকে কেন্দ্রীয় বলে মনে করে, স্বামীজীও সমাজের অগ্রগতিকে নারীর অবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিছক উদার মানবতাবাদ নয়—এ এক সচেতন সামাজিক পাঠ।

    স্বামীজীর ‘মানুষ গঠন’-এর ধারণাকে আমি আজ মার্কসবাদী ভাষায় নতুন করে পড়ি। তিনি ব্যক্তি-পূজা বা জাতিগত অহংকারে বিশ্বাস করেননি। তিনি চেয়েছিলেন আত্মবিশ্বাসী, চিন্তাশীল, শ্রমের মর্যাদা বোঝে—এমন মানুষ। আমি জানি, কেবল চরিত্র গঠনেই সমাজের সমস্ত অসাম্য দূর হয় না। কিন্তু এটাও জানি—ভীত, আত্মবিশ্বাসহীন ও অবমানিত মানুষ দিয়েও কোনও মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় না। এইখানেই স্বামীজী ও মার্কস আমার কাছে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নন; তাঁরা এক বৃহত্তর ঐতিহাসিক সংলাপের দুই প্রান্ত।
    আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখি—ধর্ম প্রায়ই ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে, ঘৃণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, আর ডিজিটাল পরিসর সেই উত্তেজনাকে বহুগুণে প্রতিধ্বনিত করে। 

    এই প্রেক্ষিতে আমি স্বামীজীকে স্মরণ করি পূজার জন্য নয়, চিন্তার জন্য। তিনি জানতেন—দুর্বলতার ভিতর থেকেই হিংসার জন্ম হয়। মার্কসবাদও বলে—দীর্ঘ বঞ্চনা মানুষকে বিকৃত করে। ভিন্ন পথ থেকে এসে এই দুই বোধ একই মানবিক সত্যকে স্পর্শ করে।

    আমি তাই স্বামী বিবেকানন্দকে কোনও চূড়ান্ত উত্তর হিসেবে দেখি না। সমস্ত সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক অতিক্রম করে তাঁকে দেখি এক ঐতিহাসিক চিন্তক হিসেবে—যিনি ভগ্ন সমাজে মানুষের ভিতরের শক্তির ভাষা খুঁজেছিলেন। একজন মার্কসবাদী হিসেবে আমি তাঁর সীমা বুঝি, আবার তাঁর প্রয়োজনও অস্বীকার করি না। কারণ আজও লড়াইটা মূলত সেখানেই—মানুষকে ছোট করে রাখা বনাম মানুষকে সম্পূর্ণ করে তোলা।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:১১737841
  • লড়ে যান অয়ন।
    বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রামকৃষ্ঞ, অরবিন্দ ও রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আপনার নতুন বিশ্লেষণ লিখুন-- এক এক করে, আরাম সে।
     
    একমত হই বা না হই শুনতে আগ্রহী।
  • Ayan Mukhopadhyay | ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৪৩737849
  • ধন্যবাদ রঞ্জন বাবু
  • JAYANTA GUHABISWAS | ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৪৫737851
  • সঠিক। নতুন ভাবে এই দেখার এবং দেখানোর চেষ্টাকে স্বাগত।
  • Ayan Mukhopadhyay | ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৫৭737852
  • ধন্যবাদ জয়ন্ত বাবু
  • পরাদ্যুতি পোদ্দার। | 2401:4900:1c85:af0e:f3fa:b8db:fb67:***:*** | ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:১৯737890
  • দুই  বিপরীতধর্মী  সমাজচিন্তকের ভাবনার সঠিক মূল্যায়ন করা  একপক্ষে দুরূহ ব্যাপার। তাও আপনার সাহসী প্রচেষ্টার জন্য সাধুবাদ জানাই। আপনার মূল্যায়ন  আমার দারুণ লেগেছে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন