এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অক্ষরের শ্রম ও সৃজনঃ বাংলা ভাষার এক বিস্মৃতপ্রায়  শিল্পীর জীবনের মঞ্চায়ন

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ | ৩২৫ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • পুঁথি থেকে পুস্তক – শুনতে আজকে যতটা সহজ লাগছে তার বিপ্রতীপে ততটাই কঠিন ছিল বাংলা ভাষার বিস্তার এবং সর্বজনীনতার ইতিহাস। কারণ এর জন্য প্রাথমিকভাবে দরকার ছিল মুদ্রণযোগ্য সুসমঞ্জস সচল হরফছাঁদ (পাঞ্চ) নির্মাণ। প্রশাসনিক কাজে, ধর্মবিস্তারের প্রচেষ্টায় এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে  ব্রিটিশ  শাসকরা এই উদ্যোগ নিয়েছিল । ওয়ারেন হেস্টিংসের সহস্রমুদ্রা সাহায্যপ্রাপ্তির উৎসাহে ১৭৭৮ সালে হ্যালহেডের প্রথম বাংলা হরফের ব্যাকরণ বইটি  হুগলিতে ছাপতে শুরু করেন চার্লস  উইলকিন্স। প্রকাশের পর সরকার কর্তৃক প্রশংসিতও  হয় ‘ A Grammar of the Bengal Language’ নামে বইটি। কিন্তু এই ইতিহাসের কোথাও স্থান পায় না উইলকিন্সের প্রকল্পের প্রধান রূপকার, বাংলার প্রথম হরফ  খোদাইকার পঞ্চানন কর্মকারের নাম। যদিও ১৭৮৬ সালে উইলকিন্স দেশে ফিরে যাবার পর সৃষ্টিশীল পঞ্চানন কর্মকারকে জহুরীর মত চিনে নিয়ে  শ্রীরামপুরে নিয়ে আসেন উইলিয়াম কেরী—বাংলায় বাইবেল ছাপানোর অদম্য আকাঙ্খায়। পঞ্চানন কর্মকার আরও শৈল্পিক ও সুন্দর করে তুললেন বাংলা হরফের ছাঁদ যা পরবর্তী কালে বিদ্যাসাগরের হাতে সংস্কারের ফলে ‘বর্ণপরিচয়’  রূপে বাংলাভাষার ধাত্রী হয়ে  উঠল। কিন্তু আড়ালে চলে গেল পঞ্চানন কর্মকারের নাম। রজত চক্রবর্তীর ‘পঞ্চাননের হরফ’ নামে  ডকু-উপন্যাসে সেই বিস্মৃতপ্রায় প্রণম্য জীবনকেই তুলে ধরার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। আর তাকে বাংলা থিয়েটারের মঞ্চে আনার  দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছেন অনীকের ‘আক্ষরিক’ প্রযোজনার মাধ্যমে নাট্যরূপ, আলো্,‌মঞ্চ,আবহ পরিকল্পনা আর নির্দেশনার দায়িত্বে থাকা দেবাশিস। অনীকের গোটা টিম তাকে যথাযোগ্য সহায়তা করেছে।

    এই নাটকের চ্যলেঞ্জ তার বিষয়বস্তু। ইতিহাসের যে ডকুমেন্টেশন এ নাটকের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তাকে থিয়েটারের ভাষায় রূপান্তরিত করা—এও যেন পঞ্চাননের মতই শ্রমের সঙ্গে কল্পনা, অধ্যবসায়ের সঙ্গে সৃষ্টিশীলতাকে মেলানোর এক স্বপ্ননিবিড় প্রকল্প। পঞ্চানন কর্মকার শুধু কারিগর( artisan) হয়ে থেমে থাকেন নি। কারিগরী পুনরাবৃত্তি আর  পুনরুৎপাদনে সীমায়িত রাখে্ন  নি নিজেকে। নিজের সৃষ্টিশীলতাকে মূলধন করে হয়ে উঠেছেন এক সাধক শিল্পী (artist)।এই  নাটকও তাই  গবেষকের তথ্যসন্ধান আর শিল্পী কল্পনাকে মিলাতে চেয়েছে তার উপস্থাপনে। ফলে এই নাটকের ফর্মকে হতে হয়েছে নমনীয় এবং নিরীক্ষাশীল। দেবাশিসের যে কোনো নাটকে প্রপসের ব্যবহার হয়ে ওঠে অমোঘ। এখানেও দুটি ছাপার কাপড়, টুল , বাঁশের পোল  দিয়ে কত যে অনুষঙ্গ তৈরি হয় আলোকসম্পাতে আর প্রয়োগনৈপুণ্যে ! ছাপাখানার আবহ তৈরিতে সাধারণ চেয়ারের ব্যবহার মুগ্ধ করে। কামারের হাতুড়ির   ঠকঠক আওয়াজ, সম্মিলিত প্রয়াসে ছন্দোবদ্ধ শব্দধ্বনিতে  শ্রমের ইতিহাসকে থিয়েটারের ভাষায়  শ্রদ্ধার্ঘ্য জানায়। আর সেই শ্রমকে শিল্পীর উচ্চতায় উন্নীত করতে , বাংলার আকাশ ,বাতাস, ভালোবাসায় ঘেরা সংস্কৃতির জমিতে প্রোথিত করতে  বাংলার গান হয়ে ওঠে এই নাটকের অন্যতম উপাদান।
     
    একটা দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসকে ধরে রাখতে মঞ্চে একই সময়ে  পঞ্চাননের জীবনের বিভিন্ন সময়ের অভিনেতাকে নিয়ে আসেন দেবাশিস।তারা একই সঙ্গে হয়ে ওঠে ইতিহাস ও  জীবনের ভাষ্যকার ও অভিনেতা। এই নিয়ে দর্শককে বেশি আতান্তরে ফেলেন না তিনি। ফলে আঙ্গিক নিয়ে বিষয়বস্তুর বাইরে কোনো দুর্বোধ্যতা তৈরি হয় না। সংযোগস্থাপনে কোনো ছেদ না  তৈরি করেই প্রবন্ধধর্মিতা  আর ফিকশনের ভারসাম্য রক্ষায় সফল হয়ে ওঠে এই নাটক।
     
    তবে এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে এই কারণেও যে   অনীকের গোটা টিম এই নাট্যভাবনার  সঙ্গে অভিনয়, সঙ্গীত,মঞ্চ এবং আলোর ভাবনার প্রয়োগে অধ্যবসায়ী এবং সনিষ্ঠ থেকেছে। অভিনয়ে আলাদা করে কারো নাম উল্লেখ করা ঠিক হবে না। তবে  ধ্রুব মুখার্জীর কণ্ঠে গানগুলি এই নাটকের পরম প্রাপ্তি। ইতিহাসের প্রতি যে  উদাসীন অন্ধকার  আমাদের উপনিবেশিত চরিত্রের অংশ,এই নাটক সেখান থেকে উজ্জ্বল উদ্ধারের পথে হাঁটতে আমাদের প্রাণিত করল, ঋণী করল দর্শক হিসেবে আমাদের।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Subhajit Sekhar Naskar | 117.98.***.*** | ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৫৪540090
  • অপনার লেখাটির জন্য অনেক ধন্যবাদ.
  • Sandipan Majumder | ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ২২:২৮540109
  • আপনাকেও ধন্যবাদ জানাই।
  • কৌতূহলী | 115.187.***.*** | ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:২৪540116
  • বাঃ , দারুণ বিষয় তো। কোথায় হচ্ছে নাটকটা? মা অসুস্থ না হয়ে পরলে দেখতে যেতাম।
    পঞ্চানন কর্মকার সম্পর্কে আগ্রহ আছে , আমাদের শহরের সাথে ঐতিহাসিক সূত্রে জড়িত থাকায়। অথচ আমাদের শহর পঞ্চানন কর্মকারের স্মৃতিবিজরিত বাড়িটাই ঐতিহাসিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারল না। 
    পঞ্চানন কর্মকারকে নিয়ে সিদ্ধার্থ ঘোষ এর একটা কাজ ছিল , সেটাও পাওয়া যায় কিনা জানি না। 
  • Prativa Sarker | ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:৪৯540119
  • এই নাটকটি দেখবার খুব ইচ্ছে আছে। আপনার লেখাটি পড়ে সেই ইচ্ছে আরও বেড়ে গেল।
  • Sandipan Majumder | ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৯:৪৭540163
  • @কৌতূহলী  আপনি কি  চন্দননগরে থাকেন?  চন্দনগরের বাসিন্দা রজত চক্রবর্তী ' পঞ্চাননের হরফ' নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। সেখান থেকেই এই নাটক।বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহরে ও কলকাতায় মঞ্চস্থ হচ্ছে।
    @প্রতিভা সরকার, আপনাকে ধন্যবাদ। নাটকটি সুযোগ পেলে দেখবেন।
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৯:৫৭540166
  • খুব ভালো লাগল জেনে যে পঞ্চানন কর্মকারকে নিয়ে এইভাবে কাজ হচ্ছে। আমার পক্ষে নাটক দেখার সম্ভাবনা নেই। বইটি সংগ্রহ করার ইচ্ছা রাখি।
     
    আপনার সুলিখিত প্রতিবেদনটির জন্য অনেক ধন্যবাদ।
  • Sandipan Majumder | ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৭:৩৫540180
  • @  অমিতাভ চক্রবর্তী আপনাকেও ধন্যবাদ লেখাটি পাঠ করার জন্য।
  • স্বপন সেনগুপ্ত | 103.218.***.*** | ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৪৬540182
  • চমৎকার আলোচনা !
  • Sandipan Majumder | ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ২২:১৬540190
  • @স্বপন সেনগুপ্ত, আপনাকে ধন্যবাদ। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন