এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পুরুষশাসিত খাঁচায় অধিকার শূন্য নারী (গল্প)

    SANKAR HALDER লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ আগস্ট ২০২৬ | ৩৪ বার পঠিত
  • পুরুষশাসিত খাঁচায় অধিকার শূন্য নারী
    লেখক : শংকর হালদার শৈলবালা
    রচনাকাল : ২ আগস্ট, ২০২৬
     
    এক মফস্বল শহরের প্রাণকেন্দ্রে, ব্যস্ত রাজপথের ঠিক পাশেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে অখিল বাবুর বিশাল তিনতলা অট্টালিকা। স্থানীয় বাজারে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর বেশ নামডাক ও প্রভাব-প্রতিপত্তি। মোটা অঙ্কের ব্যাংক ব্যালেন্স, নিজস্ব গাড়ি, কাজের লোকলস্কর কিংবা সামাজিক মর্যাদার কোনো অভাব নেই সেখানে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, ওই প্রাসাদোপম বাড়ির ছাদের নিচে যেন প্রাচুর্য আর সুখের কোনো কমতি নেই। কিন্তু সেই প্রাচুর্যের ঝকমকে আলোর আড়ালে, নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে আর একটি নিভৃত জীবনধারা—যার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয় হচ্ছেন তাঁর সহধর্মিণী মীরা দেবী।
     
    পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই মীরা দেবীর সকাল শুরু হয় পুব আকাশে সূর্য ওঠার অনেক আগেই। যখন শান্ত মফস্বল শহরটি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, ঠিক তখনই অট্টালিকার নিচতলার হিমশীতল মেঝেতে পা রাখতে হয় মীরা দেবীকে। গৃহস্থালির বাসি কাজ শেষ করে, স্নান সেরে, পূজোর থালায় ফুল-চন্দন সাজিয়েই শুরু হয় সংসারের পর্বতপ্রমাণ দায়িত্ব এক হাতে সামলানোর নির্মম যুদ্ধ।
     
    স্বামী অখিল বাবুর খুঁটিনাটি প্রতিটা অভ্যাস থেকে শুরু করে, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত একমাত্র ছেলে সায়নের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনের হরেক ফরমাশ একা হাতে মেটানোটাই তাঁর জীবনের প্রধান কাজ। রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আক্রান্ত স্বামীর চিনি ছাড়া বিশেষ লিকার চা, আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে ছেলের পছন্দের হরেক পদের জল খাবার—সবকিছু ঘড়ির কাঁটা মেপে প্রস্তুত রাখতে হয়। সামান্য একটু এদিক-ওদিক হলেই অখিল বাবুর কড়া গলার হুঙ্কার ভেসে আসে—"বাড়িতে কি কেউ কাজ করার নেই? এত দেরি হচ্ছে কেন?" মীরা দেবী কোনো উত্তর দেন না; নীরবে মাথার আঁচলটা সামলে নিয়ে হাসিমুখে প্রতিটা ফরমাশ পূরণ করাটাই নিজের বাধ্যবাধকতা বলে মেনে নিয়েছেন।
     
    এর সাথে নিত্যদিনের বাড়তি পাওনা অখিল বাবুর রাজনৈতিক, সাহিত্যপ্রেমী ও ব্যবসায়ী বন্ধুদের নিয়মিত সান্ধ্য আড্ডা। রাত আটটার দিকে শুরু হয়ে সেই আসর কখনো গড়ায় রাত এগারোটা বা বারোটা পর্যন্ত। বৈঠকখানার সুসজ্জিত সোফায় বসে যখন আড্ডার চায়ের কাপে তুফান ওঠে; চা, গরম গরম চপ-কাটলেট আর অট্টহাসির তোড়জোড় চলে, তখন চার দেয়ালের সংকীর্ণ রান্নাঘরের ভ্যাপসা ধোঁয়া আর উনুনের তীব্র আঁচে মীরা দেবীর নিঃশ্বাস আটকে আসে। তাঁর হাতের তৈরি সুস্বাদু চপ আর চা শহরের ঘরে ঘরে প্রশংসা কুড়ায় বটে, কিন্তু সেই প্রশংসার কোনো ছিটেফোঁটাও রান্নাঘরের বন্ধ দরজা টপকে মীরা দেবীর ক্লান্ত কানে এসে পৌঁছায় না।
     
    পুরুষশাসিত সমাজের চিরাচরিত সেই বহু প্রাচীন ও কঠিন নিয়মে একজন গৃহবধূর এই অক্লান্ত, বৈচিত্র্যহীন পরিশ্রমে কোনো ক্লান্তি থাকতে নেই, থাকতে নেই কোনো অসন্তোষ কিংবা নিজস্ব মতামতও—সবাই যেন এটাই স্বাভাবিক সামাজিক বিধান বলে ধরে নিয়েছে। মফস্বল শহরের এই সোনার খাঁচায় বন্দী হয়ে, রক্তমাংসের একজন মানুষ কীভাবে অধিকারহীন এক দাসীতে পরিণত হন, মীরা দেবীর এই নিঃশব্দ জীবন যেন তারই এক করুণ দলিল।
     
    সপ্তাহের ছয় দিন মফস্বল শহরের গঞ্জে ব্যবসার ব্যস্ততা শেষে রবিবার হলো অখিল বাবুর ছুটির দিন। ব্যবসার হাজারো হিসাব-নিকাশ আর মানসিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে সেদিন তিনি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। সকালে দেরিতে বিছানা ছাড়া, স্নান সেরে তেল মেখে বারান্দায় রোদ পোহানো, স্থানীয় বাজারে বন্ধুদের সঙ্গে মোড়ের দোকানে জমিয়ে গল্প-গুজব করা আর দুপুরে খাসির মাংস, পনির ও পোলাওয়ের মতো নানাবিধ পছন্দের পদ দিয়ে ভূরিভোজ সারা—সব মিলিয়ে অখিল বাবুর রবিবারের দিনটি কাটে পরম আমোদ-প্রমোদে। কিন্তু গৃহস্থালির চরম বিড়ম্বনা হলো, পরিবারের কর্তা ও ছেলের এই আনন্দের ছুটির দিনে মীরা দেবীর খাটুনি ও মানসিক চাপ একটুও কমে না, বরং তা অন্য দিনের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
     
    পুরুষশাসিত সমাজের অনবধানতায় ছুটির দিন মানেই যে গৃহবধূর জন্য দ্বিগুণ পরিশ্রমের দিন—এ সত্য যেন এ বাড়ির প্রতিটা দেওয়ালে খোদাই করা রয়েছে।
    সেদিন ছিল এমনই এক তপ্ত রবিবারের সকাল। চারদিকের স্তব্ধতার মাঝে অখিল বাবু বারান্দায় আরাম চেয়ারে বসে একমনে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিল। মীরা দেবী রান্নাঘরের বাষ্পীয় আঁচ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর জন্য ধোঁয়া ওঠা গরম চা আর বিস্কুটের থালাটি টেবিলে রাখলেন। প্রাতরাশ পরিবেশন করার পর, কাপে চুমুক দেওয়ার ঠিক মুহূর্তটিতে মীরা দেবী কিছুটা দ্বিধা ও ধীরকণ্ঠে বললেন, "হ্যাঁ গো, আমার রক্তচাপের ওষুধটা তো পরশুদিনই শেষ হয়ে গেছে। আজ দু'দিন হলো ওষুধটা খাওয়া হয়নি। বাজারে গিয়ে আজ কিন্তু ওষুধটা আনা ভীষণ প্রয়োজন। ওষুধ না খেলে সকাল থেকেই মাথাটা ঝিমঝিম করছে, শরীরটাও বেশ মেজমেজে লাগছে... নিয়মিত না খেলে সত্যিই হয়তো ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ব।"
     
    অখিল বাবু চোখের খবরের কাগজটা এক চুলও না সরিয়ে, বিরক্তির সুর ঢেকে অতি সংক্ষেপে ও উদাসীনভাবে উত্তর দিলেন, "ঠিক আছে, সময় হলে এনে দেবোখন। এখন চা-টা খেতে দাও দেখি।"
     
    মীরা দেবী এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন। স্বামীর এই নির্লিপ্ত উত্তরে তাঁর অসুস্থতা যেন আরও এক ধাপ বেড়ে গেল। যে মানুষটি নিজের সামান্য হাঁচি-কাশি হলে তোলপাড় বাঁধিয়ে দেন, সেই মানুষটির কাছে নিজের স্ত্রীর দীর্ঘদিনের শারীরিক কষ্টের মূল্য যে কতটা নগণ্য, তা মীরা দেবীর বুঝতে আর বাকি রইল না। নীরবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আবার ফিরে গেলেন রান্নাঘরের সেই চেনা অন্ধকূপে, যেখানে মাংস কষানোর মশলার গন্ধে তাঁর মাথার যন্ত্রণাটা আরও তীব্র রূপ নিতে লাগল।
     
    কিন্তু সংসারের অভিজ্ঞতা থেকে মীরা দেবী ভালো করেই জানতেন—স্বামীর মুখের ওই "এনে দেবোখন" আশ্বাসটা আসলে কত সহজে বাতাসে মিলিয়ে যায়। আর বাস্তবেও তা-ই ঘটল। দেখতে দেখতে সকালের রোদ গড়িয়ে দুপুর হলো, তারপর দুপুরের তপ্ত বাতাস জুড়িয়ে মফস্বল শহরের ওপর সন্ধ্যার মায়াবী অন্ধকার নেমে এল। কিন্তু অখিল বাবুর সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়িত হলো না।
     
    সন্ধ্যা নামতেই অখিল বাবুর বিলাসবহুল বৈঠকখানায় শুরু হলো বন্ধুদের নিয়ে সাপ্তাহিক বিশেষ সান্ধ্য আসর। আলমারির গোপন তাক থেকে বের হলো নামী দামী ব্যান্ডের হুইস্কি ও মদের বোতল। আর মীরা দেবীকে তাঁর সেই মাথা ঘোরা শরীর নিয়েই উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের জন্য ভাজতে হলো চিকেন পকৌড়া ও পনির টিক্কা। ঘরের বন্ধ দরজার ওপার থেকে ভেসে আসতে লাগল দামি দামী চশমার ঠুং-ঠাং শব্দ, সোডাফোমের গর্জন আর আভিজাত্যের অট্টহাসি।
     
    স্ত্রীকে সুস্থ রাখার জন্য সামান্য দু-শো টাকার রক্তচাপের ওষুধ যেখানে সময় আর সদিচ্ছার অভাবে আনা হলো না, সেখানে কেবল সেই এক সন্ধ্যার নেশার পেছনে আর বন্ধুদের আপ্যায়নে অখিল বাবুর পকেট থেকে নিমেষেই উবে গেল প্রায় আড়াই হাজার টাকার মদ! স্ত্রীর অসুস্থতার চেয়েও যে বন্ধুদের সাথে মদের পাত্রে চুমুক দেওয়াটা অখিল বাবুর কাছে বহুগুণ বেশি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ—এই সত্যটি রান্নাঘরের গুমোট আঁচে বসে মীরা দেবীর বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধতে লাগল।
     
    ঘড়ির কাঁটায় রাত তখন প্রায় এগারো'টা। নেশায় চুর হয়ে বন্ধুরা একে একে বিদায় নিলে মীরা দেবী তাঁর ক্লান্ত, অবসন্ন আর অসুস্থ শরীরটা টেনে স্বামীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। বিষণ্ণ ও ক্ষুব্ধ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "আমার ওষুধটা কি এনেছ?"
     
    অখিল বাবু মদের ঘোরে সিগারেট ধরাতে ধরাতে কপালে বিরক্তির চরম ভাঁজ ফেলে চোখ মুখ কুঁচকে বললেন, "ধুর! সারাটা দিন এত ঝুটঝামেলা, বন্ধুদের সামলানো—তার মাঝে দোকান যাওয়ার সময় কোথায় পেলাম বলো তো? একটা ওষুধের জন্য এত তাড়া কিসের?"
     
    মীরা দেবীর বুকের ভেতর বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অপমানের অবহেলা আর অভিমান একমুহূর্তে আগ্নেয়গিরির মতো উছলে উঠল। জীবনের এই অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে অবহেলিত হতে হতে আজ তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না। মৃদু কিন্তু তীব্র প্রতিবাদে বলে উঠলেন, "সারাদিন তো বন্ধুদের সঙ্গে মদের গ্লাস নিয়ে আড্ডা দিয়ে আর টাকা উড়িয়েই কাটালে। সেখানে সময় আর টাকার কোনোটাই কম পড়ল না, কেবল আমার এই জরুরি ওষুধটুকু আনার সময় আর সদিচ্ছাটাই তোমার হলো না? আমি যদি রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে স্ট্রোক করে মারা যাই, তাহলেও কি তোমার এই এক অজুহাতই থাকবে?"
     
    অখিল বাবু অত্যন্ত হালকা ছলে নিজের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা আর অবহেলাকে এড়িয়ে গিয়ে উদাসীন জবাব দিলেন, "কেন, সায়নকে বা কাউকে দিয়ে দোকান থেকে আনিয়ে নিতে তো পারতে! এর জন্য আমার পেছনে এত ঘ্যানঘ্যান করার আর কথা বলার কী আছে? নিজের কাজটা নিজে করে নিতে পারো না?"
     
    স্ত্রীর জীবনের ও শারীরিক সুরক্ষার চেয়ে যে নেশা আর বিলাসিতাই স্বামীর কাছে বেশি দামি—অখিল বাবুর এই নির্মম উত্তরের পর মীরা দেবী আর কোনো কথা বলতে পারলেন না, কেবল একরাশি ঘৃণায় বাক্‌রুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
     
    স্বামীর এই মর্মান্তিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন উত্তরের পর মীরা দেবী আর কোনো কথা না বলে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ক্ষোভ আর বেদনার এক গভীর নীরব আর্তনাদ কেবল তাঁর নিজের বুকের ভেতরের অন্ধকূপেই প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল। মনে মনে ভাবলেন—'কাউকে দিয়ে আনাব? কিন্তু কীভাবে? এই সংসারের অর্থনৈতিক চাবিকাঠি আর ক্ষমতার দাপট তো সবই তোমার হাতে নির্মমভাবে বন্দী!
     
    আমাদের নিজের বলতে কোনো স্বাধীন অস্তিত্বই বা কোথায় রাখা হয়েছে? প্রতিটা ওষুধ, প্রতিটা জামাকাপড়, এমনকি নিজের হাতখরচের মতো অত্যন্ত ছোটখাটো নিজস্ব প্রয়োজনের জন্যও তো প্রতিনিয়ত অপরাধীর মতো হাত পাততে হয় তোমারই কাছে!'
     
    রাতের আবছা আলোয় চোখের কোণে একবিন্দু তপ্ত জল চিকচিক করে উঠল মীরা দেবীর। তিরিশ বছরের এই দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের ইতিহাস যেন এক লহমায় তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল। এই পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় একজন গৃহবধূর আত্মত্যাগ, নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দেওয়া আর নিঃশব্দে হাড়ভাঙা খাটুনিকে কত সহজ, সাধারণ ও স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়! অথচ বিনিময়ে তাঁর পাওনার খাতায় জমার অঙ্কটা চিরকাল শূন্যই থেকে যায়; সেখানে পড়ে থাকে কেবল চরম অবহেলা, অমর্যাদা আর কটু কথা।
     
    মীরা দেবী গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আক্ষেপের সুর তুলে ভাবলেন—'আজ এই রবিবার ছুটির দিনেও তো নিজের শারীরিক অসুস্থতাকে চেপে রেখে খাটুনির কোনো ত্রুটি রাখিনি। অখিল আর সায়নের পছন্দমতো হরেক পদের সুস্বাদু খাবার তৈরি করে খাওয়ালাম, অখিলের বন্ধুদের জন্য চপ-কাটলেট বানিয়ে উনুনের তাপে নিজের শরীর জ্বালালাম; কিন্তু দিনশেষে বিনিময়ে আমি কী পেলাম? নিজের রক্তচাপের একটা সামান্য দু-শো টাকার ওষুধের দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজনটুকুও কেউ অনুভব করল না! এই সংসারে আমি অসুস্থ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরলেও হয়তো কারও খবর নেওয়ার অবকাশ থাকবে না, অথচ এদের সামান্য হাঁচি-কাশি কিংবা একটু জ্বর হলেই আমি দুশ্চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে দিনরাত এক করে ফেলি। কী নির্মম এই সংসারের সমীকরণ!'
     
    মীরা দেবীর মনের গহীনে জমে থাকা বছরের পর বছর ধরে জমানো গ্লানি আর বঞ্চনার পাহাড়ে আজ যেন ধস নেমেছে। যৌবনের দিনগুলোয় নিজের কত যে অপূর্ণ ইচ্ছা ছিল, একটু পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন ছিল, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বাসনা ছিল—সবকিছুই অখিলের এই বিশাল অট্টালিকার দাসত্বে বলি দিতে হয়েছে। আজ জীবনের শেষ বিকেলে এসে মনে হচ্ছে, তিনি কোনোদিন এই পরিবারের সদস্য ছিলেনই না; তিনি ছিলেন কেবল বিনা বেতনের এক চিরস্থায়ী পরিচারিকা, যাঁর নিজের বলতে কোনো অসুস্থ হওয়ার অধিকারটুকু পর্যন্ত নেই।
     
    রাতের গভীর নিস্তব্ধতায় নিজের শয়নঘরের জানালার গরাদে কপাল ঠেকিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন মীরা দেবী। বাইরে মফস্বল শহরের রূপালী সোডিয়াম আলোয় পথঘাট ঝলমল করছে। তিনি পরম অনুভবে ও গভীর মনোকষ্টে উপলব্ধি করলেন—বাইরের এই রূপালী আলো বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন হতে পারে, কিন্তু চারদেয়ালের সংকীর্ণ খাঁচায় বন্দিনী একজন গৃহবধূর আত্মসম্মান, নারীত্ব আর বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারের জগৎটি আজও সেই অবহেলার অতল অন্ধকারেই ঢাকা পড়ে আছে। পুরুষশাসিত সমাজের এই রূপালী খাঁচা ভেঙে নারীর আত্মপরিচয়ের সূর্য হয়তো মীরা দেবী দেখে যেতে পারলেন না, কিন্তু তাঁর চোখের জলের বিন্দুগুলো সেই চারদেয়ালেই এক নীরব প্রতিবাদের ইতিহাস হয়ে জমা হয়ে রইল।
    ~~~~~~~~~~~~

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন