এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আগুনের জাতক 

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ৫৭ বার পঠিত
  • আমি আগুন। আগুনের মেয়ে। কিন্তু। আগুন আমাকে দেয়নি মায়ের দুধ। বাপের নাম।  দিয়েছে শুধু দহনের অধিকার। আমার হাতের তালু পোড়া।  যেখানে ধরা ছিল সেই পাত্র, যেখান থেকে আমি উঠে এসেছিলাম – রক্ত গরম, চিৎকার শূন্য। চোখে প্রথম আলো সেই যজ্ঞের শিখা,  যা আমাকে তৈরি করেছিল একটি অস্ত্র হিসেবে। একটি উত্তর হিসেবে। একটি প্রশ্নের বিরুদ্ধে অন্য প্রশ্ন। আমি কাঁদিনি। আমি শুধু হেঁটেছিলাম, মন্ত্রমুগ্ধ পায়ে, রাজসভার দিকে, যেখানে বৃদ্ধরা চোখ নামায়, যুবকেরা দৃষ্টি স্থির করে, আর নারীরা ফিসফিসায় – “এসেছে। সে এসেছে। আগুনের মেয়ে।”
    তবে তারা জানে না আমি আসলে বনের মেয়ে। যে বনে মানুষ হাঁটে না- শুধু পায়ের ছাপ ফেলে যায় গাছের ছালে, নদীর কিনারে, পোড়া মাটির চুলার পাশে। আমার ভাষা পাখিদের ডাক, বানরের হুঙ্কার, বাঘিনীর গর্জন, যে গর্জনে লুকিয়ে আছে সন্তানের জন্য ভালোবাসা। যে ভালোবাসা ইতিহাসের মানুষ জানে না, কারণ তারা ব্যস্ত সিংহাসন বাঁচাতে। পাশা খেলতে।বেশ্যা ডাকতে । আমি ডাক শুনেছি। সেদিন, যখন কেশ খুলে গিয়েছিল, যখন বস্ত্র খসে পড়েছিল, যখন হাত বাড়িয়ে কাউকে পাইনি – তখন আমার চোখ খুঁজেছিল এক জোড়া চোখ, যে চোখে আছে বোঝা।   যন্ত্রণা। আছে সেই একই পোড়া মাটির গন্ধ -আমার শ্বাসে।
    আমি  দেখেছি।  দাঁড়িয়ে ছিল প্রান্তে, অস্ত্রের ঝলকানির আড়ালে, তার কান দুটি সূর্যের টুকরো। তার বুকের বর্ম স্বর্ণময়, কিন্তু তার চোখ – তার চোখ ছিল ক্লান্ত। ক্ষুধার্- এমন ক্ষুধা যা রাজসভার ভোজ মেটাতে পারে না। রুপোর থালায় পরিবেশন করা যায় না। চায় শুধু একটি স্পর্শ - একটি স্বীকৃত ফিসফিস – “তোমাকে দেখছি। তুমি একা নও।”
    তাকে ফিসফিস করেছিলাম সেই সভায়। না, ঠোঁট নড়েনি, কিন্তু আমার হৃদয় নড়েছিল, একটি পাতার মতো, যে বাতাসে কাঁপে -  ভাঙে না। সে শুনেছিল? সে কি শুনেছিল  - আমার বুকের ভিতর চিতার কাঠের ফাটার শব্দ? দেখেছিল আমার চোখের জলে ডুবে যাওয়া সভ্যতার ছলনা? সে কি জানত  তাকে চিনি – তাকে, যে নদীর ধারে জল দিয়েছিল এক সকালে, যখন আমি ক্লান্ত, যখন কলসি ভাঙা - যখন আমার মুখে কাদা আর কপালে ঘাম। সে আমার কপালে হাত রেখেছিল?  বলেছিল?  “  তাপ আমার পরিচিত। তুমি  আমার মতো পুড়ছ?”
      কথা বলিনি। আমি শুধু জল তুলেছিলাম, ভাঙা কলসির ফাঁক দিয়ে জল চুইয়ে পড়ছিল, আমার পা ভিজছিল, মাটি নরম হচ্ছিল, এবং সেই মাটির গন্ধ মিশে গিয়েছিল তার শরীরের ঘামের গন্ধে – এক অদ্ভুত সুবাস, যেন জঙ্গলের মাটি ও চিতার ছাই একসঙ্গে মাখা।
    চলে গিয়েছিল। আমি জানতাম সে ফিরবে না।  সে যোদ্ধা,  আমি রাজ্ঞী। পাঁচজনের পত্নী।  জনপদ কল্যাণী।  নাম মুখে নিলে পুণ্য হয়, কিন্তু যার শরীর স্পর্শ করলে পাপ হয় – এমন এক নিয়ম যাতে নারীরা বন্দী থাকে সোনার খাঁচায়।  আর তারা খেলে পাশা। পান করে সোমরস। স্বপ্ন দেখে অন্য নারীর।
    আমি স্বপ্ন দেখি।  স্বপ্ন দেখি সেই নদীর ধার।   সে দাঁড়িয়েছিল।  তার হাতে আমার কলসির টুকরো -  সে আঠা লাগানোর চেষ্টা করছে।  পারে না।   ভাঙা কলসি কখনো আগের মতো হয় না – শুধু শিল্পী বানাতে পারে নতুন।  শিল্পী নয় সে।  যোদ্ধা। ভাঙতে জানে।  জোড়াতে  না। আমি তাকে বলতে চাই, “দরকার নেই কলসি জোড়ানোর। ভাঙাই সৌন্দর্য। ভাঙাই আমার পরিচয়।”
    সে চলে গেছে। আর আমি ফিরেছি সেই প্রাসাদে যেখানে পাঁচজন স্বামী।  প্রত্যেকে আলাদা, প্রত্যেকে একই – তারা চায় শাসন।   রাজ্য।   ধর্ম।   কেউ চায় না আমাকে, আমার আগুন।  আমার বনের ডাক।  আমার উপজাতীয় নৃত্য।  যেখানে আমি খালি পায়ে কাঁটার ওপর নাচি  রক্ত ঝরে।  আমি হাসি।   ব্যথা আমার বন্ধু, ব্যথা আমার গান।
    আমার গান। শুধু রাতে গাই যখন সবাই ঘুমায়।   চাঁদ ঢাকে মেঘে।  যখন দরজায় পাহারা দেয়ালের ছায়া। আমি গাই সেই সুর, যা আমার মা শিখিয়েছিলেন – যে মা আমাকে জন্ম দেননি।  কিন্তু  বাঁচতে শিখিয়েছিলেন।  সেই বুড়ি।  যে আমার পাশে বসত কাজের  পর, যখন আমার শরীর কাঁপত।  যখন আমার মন চিৎকার করত।  সে আমার মাথায় হাত রাখত, ফিসফিস করত, “তোমার ভিতরে যে আগুন, . নিভিও না। তা দাও তাকে।  যে আগুন চিনতে পারে।”
    আমি খুঁজেছি তাকে। প্রতিটি সভায়। প্রতিটি যুদ্ধে।  প্রতিটি পাশা খেলায় – আমি তার মুখ খুঁজেছি। সে এসেছে কখনো দূরে, কখনো কাছে।  কিন্তু কখনো আমার হাত ছোঁয়নি।  হাত ছোঁয়াতে পারে না যেখানে পাঁচজন স্বামীর কর্তৃত্ব দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। আমি চেয়েছি দৌড়ে যেতে বনের পথ ধরে।  যেখানে সে থাকে – না, সে থাকে না।   ঘুরে বেড়ায়, এক রথে, এক সারথির সাথে, যে সব জানে।  যে সব দেখে।   চক্র ঘুরায় -  আর আমি গুটি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি এই চৌরাস্তায়।  অপেক্ষায়।  প্রতীক্ষায়। 
     এই শুরু। এই অগ্নিস্নাত প্রার্থনা।  গল্প বলব আমি -  আগুনের কন্যা।, বনের নর্তকী। পাঁচজনের বন্দিন… একজনের স্বপ্ন। থাকবে শুধু কণ্ঠস্বর, কর্কশ, ভাঙা, কখনো গানের মত, কখনো ক্রন্দনের মত, কখনো নিঃশব্দ চিৎকারের মত। নাম দেয় দেয় সভ্যতা, দেয় ইতিহাস। আমি বনের মেয়ে, আমার নাম নেই, আমি কেবল আছি।জ্বলছি। পুড়ছ… ভালোবাসছি,  এই ভালোবাসাই আমার একমাত্র বাস্তবতা, যা সভ্যতা স্বীকার করে না,  আমি গল্প বলি, লুকিয়ে রাতে। চিতার ধোঁয়ায়। ভাঙা কলসির ফাঁকে। পোড়া মাটির গন্ধে।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন