এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • গল্প অফলাইনে বসন্তের খসড়া অয়ন মুখোপাধ্যায়

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ২১১ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • অফলাইনে বসন্তের খসড়া
     
    অয়ন মুখোপাধ্যায়
     
    ১. সিগন্যাল লস্ট
     
    আকাশের রঙটা আজ ঠিক আইফোনের রিটিনা ডিসপ্লের মতো ঝকঝকে নীল। অনিমেষ ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে জানলার বাইরে তাকাল। সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের এই কাঁচঘেরা অফিসটাতে সময় যেন থমকে থাকে। ঘড়িতে বিকেল সাড়ে চারটে। কফিশপে যাওয়ার সময় হয়েছে।আজকাল কার প্রেম গুলো ঠিক ক্লাউড স্টোরেজের মতো। অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। অনিমেষ আর তিতিরের সম্পর্কটাও তেমনই। তিন বছরের সম্পর্ক, যার অর্ধেকের বেশি কেটেছে হোয়াটসঅ্যাপের ভিডিও কলে আর ইনস্টাগ্রামের রিল শেয়ার করে। তিতির এখন ব্যাঙ্গালোরে একটা মাল্টিন্যাশনাল সংস্থায় কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট। আর অনিমেষ কলকাতায় সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট।
    ফোনের নোটিফিকেশন বেজে উঠল। তিতিরের মেসেজ— "অনি, আজকের দিনটার কথা মনে আছে?"
    অনিমেষ কিবোর্ডে আঙুল ছোঁয়ালো। মনে নেই বললে তিতির আস্ত রাখবে না। কিন্তু সত্যিই কি কোনো বিশেষ দিন আজ? সে দ্রুত ক্যালেন্ডার চেক করল। না, জন্মদিন বা অ্যানিভার্সারি নয়। সে লিখল, "একটু হিন্ট দাও না।"
    উত্তর এল তিতিরের চেনা মেজাজে, "ভুলে গেছ তো? আজ আমাদের প্রথম ক্যাফে কফি ডে-তে দেখা হওয়ার চার বছর পূর্ণ হলো। তুমি তখন সেই অদ্ভুত হলুদ টি-শার্টটা পরেছিলে।"
    অনিমেষ হাসল। এই জেনারেশনের প্রেমের ডিকশনারিতে 'অ্যানিভার্সারি' মানে শুধু বিয়ে বা প্রপোজাল নয়; প্রথম দেখা, প্রথম ঝগড়া, এমনকি প্রথম ব্লক করার দিনটাও উদযাপনের তালিকায় পড়ে। অথচ এই ডিজিটাল স্মৃতির ভিড়ে আসল মানুষটাকে কতদিন ছোঁয়া হয় না, সেই হিসেব রাখা হয় না।
     
    ২. নীল খাম ও এনালগ প্রেম
     
    কলকাতার মেট্রোর ভিড়ে দাঁড়িয়ে অনিমেষ ভাবছিল, দূরত্ব আসলে কিলোমিটার দিয়ে মাপা যায় না। দূরত্ব মাপা যায় 'লাস্ট সিন' আর 'রিপ্লাই'-এর মাঝখানের সময় দিয়ে। তিতির যখন অনলাইনে থাকে অথচ উত্তর দেয় না, তখন এই কয়েকশো কিলোমিটারের ব্যবধানটা যেন আলোকবর্ষ ছাড়িয়ে যায়।
    অনিমেষের ফ্ল্যাটে ফেরার পথে একটা ছোট স্টেশনারি দোকান পড়ে। দোকানটা বড্ড পুরনো। সেখানে ধুলো জমা কাঁচের তাকে কয়েকটা নীল রঙের খাম দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎই অনিমেষের মাথায় একটা খেয়াল চাপল। আজকের দিনে সবাই তো ই-মেল বা ডিএম করে। যদি একটা হাতে লেখা চিঠি পাঠানো যায়?
    সে দোকানে ঢুকে এক প্যাকেট খাম আর নীল কালির কলম কিনল। বাড়িতে ফিরে ডাইনিং টেবিলে বসে সে লিখতে শুরু করল। প্রথম কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে ফেলল সে। কিবোর্ডে টাইপ করা সহজ, ব্যাকস্পেস টিপলেই সব পরিষ্কার। কিন্তু কাগজে কলম চালাতে গেলে বুক কাঁপে। কাটাকুটি হলে যেন মনের ক্ষতগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
    সে লিখল:
    "প্রিয় তিতির,
    আমাদের চ্যাটবক্সে গত তিন বছরে প্রায় তিরিশ হাজার মেসেজ জমেছে। কিন্তু তার একটাতেও কি আমি বলতে পেরেছি, সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফেরার সময় যখন ট্যাক্সিতে মাথা রাখি, তখন পাশের সিটে তোমার হাতটা বড্ড মিস করি? ইমোজিতে ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়, কিন্তু হাতের আঙুলের ছোঁয়া বোঝানো যায় না। এই চিঠির নীল খামটা যখন তোমার হাতে পৌঁছাবে, তখন মনে কোরো আমার একটা অংশ তোমার কাছে গেল..."
     
    ৩. ব্ল্যাকআউট
     
    গল্পের মোড় ঘুরল তিনদিন পর। তিতিরের কোনো মেসেজ নেই। অনিমেষ বারবার চেক করছে। কল যাচ্ছে না। ফোন সুইচড অফ। অফিসের কাজে ব্যাঙ্গালোরে বড়সড় কোনো সার্ভার ডাউন হয়েছে বলে খবর আসছে। অনিমেষের অস্থিরতা বাড়তে লাগল। এটাই কি আজকের প্রজন্মের অভিশাপ? কানেক্টিভিটি চলে গেলে আমরা কি এতটাই অসহায়?
    সেদিন রাতে কলকাতায় কালবৈশাখী নামল। জানলার কাঁচ ভেদ করে বৃষ্টির ঝাপটা আসছে। অনিমেষ ভাবছিল, যদি এই মুহূর্তে তিতিরের কোনো বিপদ হয়, সে জানবে কী করে? ডিজিটাল ম্যাপে লোকেশন দেখা যাচ্ছে না, হোয়াটসঅ্যাপে সিঙ্গেল টিক। হঠাৎ মনে হলো, টেকনোলজি আমাদের কাছাকাছি আনেনি, বরং একটা অদৃশ্য সুতোয় ঝুলিয়ে রেখেছে। সুতোটা ছিঁড়লেই আমরা একা।
     
    ৪. ফিরে আসার শব্দ
     
    চতুর্থ দিন সকালে অনিমেষের দরজায় বেল বাজল। কুরিয়ার বয় একটা প্যাকেট দিয়ে গেল। অনিমেষ দেখল, সেটা ব্যাঙ্গালোর থেকে এসেছে। দ্রুত হাতে প্যাকেটটা খুলতেই ওর চোখ আটকে গেল। ভেতরে একটা হাতে লেখা ডায়েরি আর একটা ছোট কাঠের বাক্স।
    ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা— "অনি, আমার ফোনটা ভেঙে গেছে। আর আমি ঠিক করলাম, এই কয়েকদিন আমি কোনো নতুন ফোন কিনব না। তোমার চিঠিটা আজ সকালে পেলাম। তুমি বিশ্বাস করবে না, ওই নীল খামটা যখন হাতে নিলাম, মনে হলো এই প্রথম তোমাকে সত্যিই স্পর্শ করলাম। তোমার আঙুলের ছাপ যেন লেগে ছিল ওই কাগজে।"
    তিতির আরও লিখেছে, সে চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসছে। না, কোনো সিনেমার মতো নাটকীয় কারণে নয়। বরং সে বুঝতে পেরেছে, ল্যাপটপের স্ক্রিনে লাইক আর কমেন্টের চেয়েও জরুরি হলো মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের সান্নিধ্য। সে একটা স্টার্টআপ শুরু করতে চায় যেটা বাংলার হারিয়ে যাওয়া হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করবে।
     
    ৫. ডেটা লস্ট বনাম জীবন
     
    পার্ক স্ট্রিটের সেই পুরনো ক্যাফেতে আজ অনিমেষ অপেক্ষা করছে। তিতির আসবে। বাইরে হালকা বৃষ্টি। শহরটা যেন একটু বেশিই ব্যস্ত। তিতির এল। পরনে সাধারণ নীল কুুর্তা, চোখে সেই চেনা চশমা। তারা মুখোমুখি বসল।
    আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুজনের কেউই ফোনটা টেবিলের ওপর রাখল না। আজকের প্রজন্মের কাছে ফোনটা যেন শরীরের একটা অঙ্গ, কিন্তু আজ তারা সেই অঙ্গটাকেই দূরে সরিয়ে রেখেছে।
    তিতির বলল, "জানো অনি, ব্যাঙ্গালোর থেকে আসার সময় প্লেনে আমার সব ডিজিটাল ব্যাকআপ ডিলিট হয়ে গেছে। কয়েক হাজার ছবি, ভিডিও— সব শেষ।"
    অনিমেষ ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শান্ত স্বরে বলল, "ডেটা লস্ট হতে পারে তিতির, কিন্তু স্মৃতিগুলো যদি হার্ডড্রাইভে না থেকে রক্তে মিশে থাকে, তবে তাকে কেউ মুছতে পারবে না। আমরা বরং নতুন করে স্মৃতি তৈরি করি, যেগুলোর কোনো ব্যাকআপ লাগবে না।"
     
    বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। ক্যাফেটেরিয়ার কোণায় বসে দুই তরুণ-তরুণী প্রমাণ করছে যে, প্রেমের ভাষা আজও বদলায়নি। মাধ্যম বদলেছে, গতি বেড়েছে, কিন্তু হৃদয়ের ধুকপুকানি সেই নীল খামের যুগের মতোই অকৃত্রিম রয়ে গেছে।
    অনিমেষের পকেটে থাকা ফোনটা একবার কেঁপে উঠল কোনো এক কাজের ইমেলে। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সে তিতিরের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো ফিল্টার নেই, কোনো এডিটিং নেই— শুধু একরাশ ভালোবাসা।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন