নাগরিকত্বের গোলকধাঁধা ও ২০২৬-এর পাটিগণিত: বাংলার উদ্বাস্তু রাজনীতির এক নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ
বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে ‘উদ্বাস্তু’ পরিচয়টি কেবল দেশভাগের ক্ষত নয়, বরং এটি এক চিরস্থায়ী অস্তিত্বের লড়াই। দশকের পর দশক ধরে যারা এদেশের মাটিতে নিজেদের শিকড় গেড়েছেন, আজ তারা এক অভূতপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। বিজেপি যখন ‘নিঃশর্ত নাগরিকত্ব’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে মতুয়া ও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মন জয় করেছিল, তখন সেই আশ্বাসের পেছনে ছিল এক ধরণের আধ্যাত্মিক স্বস্তি। কিন্তু সিএএ কার্যকর হওয়ার পর সেই স্বস্তি আজ আতঙ্কে রূপান্তরিত হয়েছে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে, একজন মানুষকে তার বর্তমান নাগরিক পরিচয়কে ‘অবৈধ’ বলে স্বীকার করতে বাধ্য করে ভবিষ্যতের নাগরিকত্বের টোপ দেওয়া আসলে এক ধরণের দার্শনিক প্রবঞ্চনা।
বাংলার রাজনীতিতে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ নিয়ে এক অভাবনীয় মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। বিজেপি যখন প্রবল উৎসাহে ‘রোহিঙ্গা’ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ (ঘুসপেটিয়া) ধরার ডাক দিয়ে জনমত গড়তে চাইল, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে অ-নাগরিকদের ছেঁটে ফেলা। বিজেপি দাবি করল, এই রাজ্যে কোনো অনুপ্রবেশকারীকে ভোটার তালিকায় রাখা হবে না। বিপরীতে, তৃণমূল কংগ্রেস শুরুতেই এই প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে ঘোষণা করল যে—বাংলার মাটিতে কোনো SIR হতে দেওয়া হবে না। তবে এই বিরোধিতার গভীরে লুকিয়ে ছিল এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।
তৃণমূল নেত্রী খুব ভালো করেই জানতেন যে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ বা কেন্দ্রীয় সরকারের আইন সরাসরি অমান্য করলে তা রাষ্ট্রবিরোধী কাজ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের আইন অমান্য করার অভিযোগে কেন্দ্র সরকার রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার মতো চরম পদক্ষেপ নিতে পারত। তাই তিনি এক দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করলেন। একদিকে তিনি জনসভায় SIR-এর কঠোর রাজনৈতিক বিরোধিতা চালিয়ে গেলেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক ও দলীয় স্তরে নির্দেশ দিলেন প্রতিটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। তৃণমূল কর্মীরা বুথ স্তরে সাধারণ মানুষের ফ্রম ফিলাপ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং হিয়ারিং-এ সশরীরে উপস্থিত থেকে সহযোগিতা করতে শুরু করলেন।
এই কৌশলী পদক্ষেপ তৃণমূলের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড হয়ে উঠল। গত পনের বছরের দীর্ঘ শাসনের ফলে মানুষের মধ্যে যেটুকু প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছিল, বিপদের দিনে এই সক্রিয় সহযোগিতা তা অনেকটাই ফিকে করে দিল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মানুষের সঙ্গে এক নতুন ও নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হলো তৃণমূল। তৃণমূলের এই সুচিন্তিত সক্রিয়তা সাধারণ উদ্বাস্তু মানুষের অবচেতনে এক অমোঘ বার্তা পৌঁছে দিল—বিপদের এই কালবেলায় রাষ্ট্র বা আইন যখন তাদের অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, তখন এই রাজ্য প্রশাসনই তাদের একমাত্র বিশ্বস্ত ঢাল হয়ে পাশে আছে।
এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের সবচেয়ে করুণ ছবি দেখা গিয়েছিল সেই দিনগুলোতে, যখন ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখতে উত্তর ২৪ পরগনা থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ বিডিও অফিসের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই হাড়কাঁপানো শীতে আশি বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে কোলের শিশুকে নিয়ে আসা মায়েদের যে চরম লাঞ্ছনা ও কষ্ট সইতে হয়েছে, তা মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, বিজেপি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়াটি বাংলার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, এটি কেবল ভোটার তালিকা সংশোধন নয়, বরং ২০২৬-এর নির্বাচনে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে ভোটদান থেকে বিরত রাখার এবং রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের একটি সুক্ষ্ম কৌশল।
পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু মানুষ যারা দীর্ঘ দিন ধরে এই রাজ্যে বসবাস করছেন, তাদের কাছে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড ও প্যান কার্ডসহ সেই সমস্ত নথিই আছে যা একজন প্রকৃত ভারতীয়র থাকে। তাসত্ত্বেও তারা আজ বিজেপির রাজনীতির ফাঁদে পড়ে বেকায়দায়। উদ্বাস্তু মানুষের মনে নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের যে দুর্বলতা ছিল, তাকে কাজে লাগিয়ে ইতিপূর্বে কোনো রাজনৈতিক দল এভাবে ভোটের রাজনীতি করেনি।বিজেপি প্রথমে হিন্দুত্বের দোহাই দিয়ে এবং মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আশা জাগিয়ে ভোটব্যাঙ্ক নিজেদের পালে টানল; তাদের ওপর ভর করেই এমপি-এমএলএ নির্বাচনে জিতল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। পরে চাপের মুখে তারা ‘সিএএ’ (CAA) নামক এমন এক ‘খুঁড়োর কল’ তৈরি করল, যা নিঃশর্ত নাগরিকত্ব তো দিলই না, বরং নাগরিক থেকে ‘বেনাগরিক’ হওয়ার পথ খুলে দিল। মতুয়ারা যখন বুঝতে পারল সিএএ উপকারের বদলে তাদের বিপদ বাড়াতে পারে, তখন তারা এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।মতুয়াদের এই অনীহা দেখেই বিজেপি এবার ‘এসআইআর’ (SIR) নামক নতুন চাল দিল। মুখে রোহিঙ্গা তাড়ানোর কথা বলে ‘বাংলা বাঁচাও’ স্লোগান দিলেও, এতে মুসলিমদের পাশাপাশি বাংলার বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু হিন্দুও চরম বিপদে পড়ে গেলেন। তাদের এখন একমাত্র ভরসা হিসেবে আবার সেই সিএএ-কেই দেখানো হচ্ছে। এখন মনে প্রশ্ন জাগে, মতুয়া সম্প্রদায় সিএএ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল বলেই কি তাদের কৌশলে একটু ‘শিক্ষা’ দিয়ে পুনরায় নিজেদের পালে টানার এই পরিকল্পনা?
এই পরিস্থিতির গভীরে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক পাটিগণিত ২০২৬-এর নির্বাচনে বিজেপির জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি যে আসনগুলোতে জয়ী হয়েছিল—বিশেষ করে উদ্বাস্তু এলাকায় যেমন কল্যানী, বনগাঁ দক্ষিণ , গাইঘাটা, রানাঘাট দক্ষিণ,চাকদহ ,আলিপুরদুয়ার,কোচবিহার উত্তর ,পাড়া ইত্যাদি ইত্যাদি—সেখানে তাদের জয়ের মার্জিন ছিল মাত্র ২,০০০ থেকে ১৫,০০০ ভোটের মতো। অথচ SIR প্রক্রিয়ায় এই অঞ্চলগুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে, যা বিজেপির গতবারের জয়ের মার্জিনকে অনেকটাই ছাপিয়ে গেছে।
উল্টো দিকে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় তৃণমূলের জেতার মার্জিন যেখানে ২০০০০ থেকে ৫০০০০ যেমন লালগোলা, জলঙ্গী, ফারাক্কা,মালতিপুর,মেটিয়াবুরুজ, ক্যানিং পূর্ব, আলমডাঙ্গা,হাড়োয়া ইত্যাদি ইত্যাদি --- জায়গা গুলোতে বিপুল সংখ্যক (যেমন মুর্শিদাবাদে ৪.৫৫ লক্ষ) নাম বাদ পড়লেও তৃণমূলের জয়ের মার্জিন এতটাই বড় যে, তারা গাণিতিকভাবে এখনও অনেকটাই সুরক্ষিত অবস্থানে আছে। কলকাতার কেন্দ্র গুলোতে তাকালেও দেখা যায় এই একই দৃশ্য। তাহলে একথা বলা যেতেই পারে ,বিজেপি যে ‘অনুপ্রবেশকারী হঠাও’ বা ‘SIR’ কার্ড খেলেছিল, তা বুমেরাং হয়ে তাদের নিজেদের ভোটব্যাঙ্কেই ফাটল ধরিয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূল এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ক্ষোভ কমিয়ে মানুষের সাথে এক নতুন নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে। ২০২৬-এর লড়াইয়ে এই ‘পার্থক্য’ (মার্জিন বনাম বাদ পড়া ভোটার) সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এক ঐতিহাসিক রদবদল ঘটাতে চলেছে।
রাজনৈতিক এই লড়াই যখন সুপ্রিম কোর্টের দোরগোড়ায় পৌঁছাল, তখন বিজেপি উদ্বাস্তু মানুষকে সিএএ-তে আবেদন করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু আদালত সাফ জানিয়ে দেয় যে, আগে পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখাতে হবে, তার পরেই ভোটার তালিকায় নাম তোলা সম্ভব। এই নির্দেশে দিশেহারা এক কোটি কুড়ি লক্ষ মানুষের হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন জানালেন বাংলার গণতন্ত্র রক্ষা করার। আদালতের হস্তক্ষেপে ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এর আওতায় থাকা ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলেন। বাকিদের জন্য জুডিশিয়াল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও আদায় হলো।
অবশ্য বিজেপির পক্ষ থেকে এই প্রক্রিয়াকে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ‘স্বচ্ছ ভোটার তালিকা’ তৈরির একটি পদক্ষেপ হিসেবেই প্রচার করা হচ্ছে। তাদের দাবি, অনুপ্রবেশকারীদের রুখতে এই কঠোরতা জরুরি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাটিগণিত এবং মানুষের সেদিনের সেই লাইনে দাঁড়ানোর চোখের জল ২০২৬-এ এক নতুন সমীকরণ লিখে দিতে চলেছে। উদ্বাস্তু বাঙালির কাছে নাগরিকত্ব কোনো রাজনৈতিক অনুকম্পা নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের অধিকার—যেখানে রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই এখন অনেক বেশি স্পষ্ট।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।