এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • উত্তর খোঁজার আগে প্রশ্ন খোঁজা জরুরী 

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৩ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • আমাদের মত গুরুবাদী এবং প্রথানুগামী দেশে প্রশ্ন করাকে খুব ভালো চোখে দেখা হত না কোনোকালেই। গুরুজনদের প্রশ্ন করাকে তো রীতিমতো গর্হিত অপরাধ ও  ধৃষ্টতা হিসেবেই গণ্য করা হত। কার বক্তব্য সঠিক তার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল কার বয়স বেশি। কোনো প্রথা বা অনুষ্ঠানের  যৌক্তিকতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত  ঐতিহ্যের প্রশ্নটি। পরিবারে, শিক্ষাঙ্গনে, সমাজে সর্বত্রই এই সংস্কৃতি পরিব্যাপ্ত ছিল এবং নতুন নতুন চেহারায় তা আজও ভালোমতই টিকে আছে।  তার বাহ্যিক রূপের বদল হয়েছে মাত্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে , যেমন শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত, এমনকি চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে নোটমুখস্থ পড়া, অগভীর এম সি কিউ নির্ভর জ্ঞান, সাজেশন ও টিউশন নির্ভরতা ইত্যাদি উপসর্গ  নিজে পড়ে কোনো বিষয়কে জানা, আত্মস্থ করা এবং পড়তে পড়তে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করে চলেছে। উচ্চতর  গবেষণার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। নতুন গবেষক কোনো বিষয়ের নতুন প্রশ্ন এবং সম্ভাবনাকে উদ্দীপিত করার বদলে তাঁর গাইডের প্রদর্শিত পথে  থোড় বড়ি খাড়া গবেষণাপত্র উৎপাদন করে চলেছেন। ফলে গোটা বিশ্বে বিজ্ঞান , সাহিত্য ও সমাজবিদ্যার গবেষণায় আমাদের দেশ প্রচুর পিছিয়ে। পিছিয়ে পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির তালিকাতেও।
     
    শিক্ষাক্ষেত্রে যা শুরু সামাজিক আর রাজনৈতিক জীবনে তা যে আরও বড় সত্য হয়ে উঠবে তাতে আর আশ্চর্য কী? গোটা পৃথিবীতে সব চেয়ে বেশি  নবীন প্রজন্মের মানুষ বাস করেন ভারতবর্ষে । কিন্তু ভোট বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে এদের অধিকাংশই কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতা ও স্থিতাবস্থার পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন। বাকি পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই উলটো  প্রবণতা আছে।  কিন্তু ভারতে এরাই সবচেয়ে বেশি দেখনদারি  সংস্কৃতির ভক্ত যেখানে প্রদর্শনমূলক জাতীয়তাবাদ আর দেশপ্রেমকে এক করে দেওয়া হয়, যেখানে দাক্ষিণ্য আর অধিকারের মাঝে সীমারেখাটিকে অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়। অথচ  প্রশ্ন করার অভ্যেস থাকলে এই নবীন প্রজন্মই পারত  প্রাত্যহিক বাস্তবতার আড়ালে যে নিষ্ঠুরতার আরাধনা সহনীয় করে তোলে লোভ ও হিংসার মুখব্যাদান—তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিতে। মুনাফার বিষ যেভাবে পাহাড়, জঙ্গল, জলাভূমি বিষিয়ে  ধ্বংস ত্বরান্বিত করছে তাকে চ্যালেঞ্জ করা যেত। কিন্তু হায় বিধি বাম। শাসকের ন্যারেটিভ খাস্তা চিপসের মতই কুড়মুড়ে। কোন তেলে ভাজা সে প্রশ্ন করে কী লাভ ? পঞ্চেন্দ্রিয়ের  পরিতৃপ্তিসাধনই চরম মোক্ষ আপাতত।

    বললাম বটে বিধির কথা, কিন্তু এই সমর্পণ কী  সবটাই দৈবদুর্বিপাকের  ফল? ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করে যে রাজনীতির জন্ম হওয়ার কথা তা কতটুকু প্রশ্নকে  প্রশ্রয় দিয়েছে? দেয়নি যে, হলফ করে বলতে পারবেন অনেক রাজনৈতিক কর্মী যাঁরা ব্যবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্নকে দুচোখে নিয়ে বহু পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের পর হতাশ হয়েছেন।এর কারণ যাঁদের নীচুতলা থেকে আরও প্রশ্ন খোঁজার কথা, তাঁরা সেটাকে নিরুৎসাহিত করেছেন শৃঙ্খলা নামক শব্দের শৃঙ্খল পরিয়ে। পরিবর্তে তাঁরা আগে থেকেই নির্ধারিত কিছু উত্তরের সেট নিয়ে হাজির হয়েছেন সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রশ্নটির মোকাবিলা করতে। কিন্তু যেহেতু তাঁরা প্রশ্ন করার , প্রশ্ন শোনার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নন, তাই সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন এলে , সিলেবাস পালটে গেলে চেনা উত্তরপত্রের সেট দিয়ে আর সেই প্রশ্নগুলির সমাধান খুঁজে পান নি। আবার সেই ব্যর্থতার উত্তর খুঁজতে চেয়ে যে নতুন করে প্রশ্ন করা দরকার –চেনা অভ্যস্ততার কারণে সেই পথে না হেঁটে তাঁরা পুরোনো প্রশ্নোত্তরের মডেলের মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছেন। এরজন্য আগে থেকে উত্তর ঠিক না করে দরকার ছিল প্রশ্ন করতে শেখা ।
     
    প্রশ্ন করতে শেখা ? প্রশ্ন করতে আবার শিখতে হয় নাকি ? এর উত্তরে ঘুরিয়ে বলা যায় প্রকৃত শিক্ষার্থীই প্রশ্ন করতে পারে কারণ প্রশ্ন আসে বিষয় ভাবনা থেকে, বাস্তবতা সম্পর্কে অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। যেমন শ্রেণী রাজনীতিতে শ্রেণীর সংজ্ঞাকে পুরোনো শ্রেণীভাবনার মধ্যে আটকে না রেখে প্রান্তিকতার নানা প্রশ্নকে তার অন্তর্গত করা –  জাতপাত, নারী, আদিবাসী প্রভৃতি প্রশ্নের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে অল্প হলেও তো ঘটেছে । এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নয়ন, জীবনের মান এসব বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন করার প্রবণতা যেখানে কলোনিয়াল উন্নয়ন ধারণা—এমনকি বিজ্ঞান ও প্রগতির বহু ছকে বাঁধা উত্তর নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ  শহুরে প্রগতিমনস্ক নিরীশ্বরবাদের তুলনায় নিম্নবর্গের ভক্তিবাদী আন্দোলন সাম্প্রদায়িকতা রোধে বেশি কার্যকরী কিনা সেই প্রশ্নও এসে যাচ্ছে।

    এই  শতাব্দীতে প্রাত্যহিক বাস্তবতায়  যুক্ত হয়েছে আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বের প্রযুক্তির গতি। ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মানুষের বহু অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করছে।  কৃত্রিম মেধা , প্ল্যাটফর্ম ক্যাপিটালিজম ( উবের ,ওলা, জোমাটো, সুইগি) জীবিকার পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষকে করে দিচ্ছে একক ও নিঃসঙ্গ। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঙ্গে গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে  নিম্নবিত্ত প্রান্তিক মানুষের যে  যোগসূত্র সমাজবদলের স্বপ্নের মাধ্যমে  স্থাপিত হয়েছিল  তা প্রায় ছিঁড়ে গেছে। এমন অবস্থায় নতুন করে প্রশ্ন করতে শেখা জরুরী যে  কীভাবে আবার মানুষ বাঁধবে সেতু? নাকি নিশ্চেষ্টভাবে শুধু অপেক্ষায় থাকতে হবে কবে বিপন্নতার মহামারী   আমাদের একই ডাঙায় এনে দাঁড় করায়  যেখানে না মেলা অংকের হিসেব ছাড়া আমাদের হাতে আর কিছু থাকবে না ? না,  পুরোনো  ছকে বাঁধা উত্তরগুলি থেকে এর সমাধান পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বিষয়ে প্রশ্ন উথ্বাপন করাটা বেশি জরুরী। অনেকে মিলে এই সন্ধানে ব্যাপৃত হলে সম্ভাব্য  সমাধানের হদিশ মিলতে পারে। কে না জানে জঙ্গলে পথ হারিয়ে  ফেললে তা রাত্রিবেলা খোঁজা যায় না, দিনের বেলা গাছপালার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যালোকেই সেই পথ খুঁজতে হয়। মানবসভ্যতা তো বরাবর প্রশ্নের আলোতেই পথ চিনেছে তার সংকট্মুহূর্তে।

     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন