ভাষা আমাদের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। আমাদের আবেগ আর বিবৃতিগুলো ভাষার মাধ্যমেই আমরা সাধারণত প্রকাশ করে থাকি (ছবি, ডায়াগ্রাম, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বাদ দিয়ে)।
ভাষা প্রকৃত প্রস্তাবে অর্থবহ শব্দসমষ্টি। সেই হিসেবে খিস্তিও ভাষা কারণ এগুলোও অর্থবহ শব্দসমষ্টি। অথচ, কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, খিস্তি অপাংক্তেয়। মনের আবেগ প্রকাশে যারা খিস্তি ব্যবহার করে, সুশীল সমাজ তাদের এড়িয়ে চলে। তাদের দেখলে নাক কুঁচকায়।
তীব্র রাগ বিরক্তি ঘেন্না প্রভৃতি আবেগগুলোর সঠিক প্রকাশ খিস্তির সাহায্য ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই এইসব পরিস্থিতি অনুযায়ী, একমাত্র যথাযথ খিস্তি প্রয়োগ করলেই এই আবেগগুলো প্রশমিত হয়ে মন শান্ত, পরিতৃপ্ত হয়। কিন্তু এর ফলে সমাজের দেওয়া, আমাদের বুকে সাঁটা, ‘শিক্ষিত’ ‘সংস্কৃতিবান’ ইত্যাদি তকমাগুলোতে কলঙ্কচিহ্ন পড়ে। তাই আমরা, ভদ্দরলোকেরা, রক্তচাপ বাড়াতে রাজি আছি, কিন্তু প্রাণ খুলে খিস্তি করে মন হালকা করতে রাজি নই কারণ ঐ তকমাগুলোকে অকলঙ্ক রাখতে হবে। এটাকে এক ধরণের প্রেজুডিস বলা যেতে পারে।
অথচ, সুশীল সমাজের সদস্যরা যে খিস্তি জানে না, তা নয়। এমনকি, কারও কারও বাড়ির বইয়ের তাকে ‘বাংলা স্ল্যাং অভিধান’-ও শোভা পেতে দেখা যায়। কিন্তু তারা খিস্তিকে ভাষার মূলস্রোতের অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি নয়। উচ্চারণেও পরাঙ্মুখ। তবে, কারও ওপর প্রচণ্ড রাগ বা ঘৃণা প্রকাশ করতে তারা যে মনে মনে ঐ সব ‘অকথ্য’ শব্দ উচ্চারণ করে না, একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু মনে মনে খিস্তি করলে সঠিক তৃপ্তি পাওয়া যায় কি না, সে-বিষয়ে সন্দেহ আছে। অপরপক্ষে, চিৎকার করে, প্রয়োজনীয় ধ্বনিগুলোকে যথাযথ emphasize করে খিস্তি করলে ক্ষুব্ধ মন যে সবচেয়ে পরিতৃপ্ত হয়, একথা নিশ্চিত। তার ওপর, ‘অকথ্য’ শব্দ মনে মনে বলা কিন্তু মুখে উচ্চারণ না করাটা সাংস্কৃতিক ভণ্ডামির পর্যায়ে পড়ে। এটা ভাষার সঙ্গেও এক ধরণের বিশ্বাসঘাতকতা।
প্রতীচী কিন্তু এই বিষয়ে অনেক স্পষ্টবাদী। তারা সাধারণত রাগ ক্ষোভ ঘেন্না ইত্যাদি খিস্তি করেই প্রকাশ করে। সংস্কৃতি-জগতের মানুষরাও এর ব্যতিক্রম নয়, বরং বিশেষত, সঙ্গীত জগতে এর প্রকাশ সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্র বা প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতে তারা তাদের গানে কাঁচা খিস্তি ব্যবহারে পিছপা হয় না। এই প্রসঙ্গে, গত শতকের সাতের দশকের শেষভাগে গড়ে ওঠা একটা ব্রিটিশ punk rock band উল্লেখযোগ্য। ব্যান্ডের নাম ‘Anti-Nowhere League’। শোনা যায়, এদের albumগুলো মুক্তি পাবার এক সপ্তাহের মধ্যে ব্রিটিশ পুলিস সেগুলোকে ban করে দিতে বাধ্য হতো, অশ্লীল ভাষার কারণে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইংল্যান্ডে তাদের বিপুল জনপ্রিয়তা তো ছিলই , এমনকি, U.S.A-তে তাদের জনপ্রিয়তা ছিল আরও বেশি। এদের ‘So What’ গানটা তো punk rock ঘরানার ‘Anthem song’ হিসাবে বিবেচিত ও সমাদৃত হয়। অথচ এই গান মুক্তি পাবার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে ban হয়ে গেছিল। এই প্রসঙ্গে U.S. band ‘Green Day, ‘Metallica’, ‘Pantera’, ও আরও অনেক ব্যান্ডের কথা বলা যায় যারা নিজেদের মনোভাব ব্যক্ত করতে, খিস্তি করতে সঙ্কোচ বোধ করে নি। সমগ্র প্রতীচী তো বটেই , সারা বিশ্বের সঙ্গীতপ্রেমীরা এই সব গানের দলগুলোকে যথেষ্ট শ্রদ্ধার সঙ্গে সমাদর করে।
এ-দেশের সুশীল সমাজ সায়েবদের নানা আদবকায়দা অনুকরণ করতে যার পর নাই সচেষ্ট থাকে, কিন্তু সায়েবদের এই স্পষ্টবাদী মনোভাবকে অনুসরণ করার কথা ভাবলেই এদের নাকের চামড়া কুঁচকে যায়। সুশীল সমাজের কেউ কেউ সাধু শব্দের ব্যবহার করে খিস্তি দিয়ে থাকে। যেমন, ‘বরাহ নন্দন’। কিন্তু যাকে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলতে ইচ্ছে করছে তাকে ‘বরাহ নন্দন’ বললে সেই তৃপ্তি লাভ করা যায় কি ? এ যেন অনেকটা, ‘ভাষা দিয়া চরিত্র আগলাইয়া রাখা’-র মতো ব্যাপার। সায়েবরা কিন্তু ‘mother fucker’ কে ‘mother fucker’-ই বলে। ‘copulator of progenitrix’ জাতীয় শব্দ প্রয়োগের কথা ভাবে না।
It is always good to call a spade a spade.
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।