এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ভূতের শহরে ভূতের কেত্তন 

    Kriti Alam লেখকের গ্রাহক হোন
    ১২ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৩ বার পঠিত
  • এই দেশে এক জিনিস যেটা দেখলাম সেটা হল হ্যালোইন। এখানে এই জিনিসটা আরও বেশি আনন্দদায়ক এবং ছোট থেকে বড় সবার সহযোগিতা বা উৎসাহ দেখে বেশ লাগে। আমি যেই শহরে থাকি সেটি হল টেক্সাসের “হ্যালোইন ক্যাপিটাল”। গত দুই বছরেই দেখেছি, এই গোটা অক্টোবর মাস জুড়ে নানা ধরনের আমোদযুক্ত খেলা বা উৎসবরূপী সাজগোজে শহর গমগম করতে থাকে। প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু লেগেই থাকে। অনেক কিছুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নিছক আনন্দ। সব বয়সি লোকজন বা সব ধরনের পেশাগত মানুষ এই উৎসবে নিজের উপস্থিতি রাখেন এবং দিব্যি ভালভাবেই রাখেন। এই ধরুন যেমন কিছু দোকানে মাকড়সার জাল লাগানো থাকে যা ভুতুড়ে বাড়ির আদল দেওয়ার জন্য। লোকজনকে দেখা যায় নিজেদের সাজে কিছু পরিবর্তন আনতে। এই যেমন বিশেষ ধরনের কানের দুল বা মুখে তৈরি করা কিছু ভয় দেখানো সাজগোজ। শহরের মাঝে বসানো হয় একটি বড় কুমড়ো। নানা সরঞ্জাম থাকে কিন্তু এই কুমড়ো জিনিসটি খুবই দরকারি একটি দ্রব্য। হলুদ দেখে মিষ্টি একটা কুমড়ো যা দেখে বাঙালির মনে হবে দিব্যি ভেজে খাই বা ছোলা দিয়ে ছেঁচকি বানাই ইত্যাদি। কিন্তু এখানে এই হ্যালোইন উৎসবে কুমড়ো জিনিসটি সবচাইতে দরকারি এক রসদ। এখানকার বাজারে তখন ধাউস সাইজের কুমড়ো বিক্রি হয়। লোকের ঘরের সামনে দরজার আশেপাশে দেখবেন এই কুমড়োর ছড়াছড়ি। একটা উল্লেখ দেওয়া দরকার যে যেহেতু মাসটি ফল সিজনের মাস, এই সময় পাম্পকিন-স্পাইস লাটে পানীয় খুবই প্রচলিত, যদিও আমার সেটি খাওয়ার এখনো সুযোগ হয়নি।
    ভুতের প্রসঙ্গে আসা যাক। নানা ধরনের সাজে সেজে লোকজন গোটা সপ্তাহ জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও শহর জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আগেই এই সাজের ব্যাপারে কিছুটা বলেছি। আরেকটু যদি বলি, দেখবেন এখানে একটা জিনিস যে — যে যত ভুতুড়ে বা যত অদ্ভুত সাজবে, তার ততই বেশি প্রশংসা। আমার শহর ডেন্টনে এই সময় যেটি বিশেষ দ্রষ্টব্য তা হল প্যারেড। এখানে প্যারেড দুই রকম আছে, একটি হয় বড় ট্রাকের প্যারেড যেখানে অনেক ধরনের সাজে দেখানো হয় ট্রাক। বিশাল বড় তিন মানুষ উঁচু ট্রাকগুলি মাথা উঁচিয়ে দেখতে হয় এবং প্রশংসা করতে হয় নান ধরনের সুন্দর টুনি আলো দিয়ে সাজিয়ে মানুষের সামনে ধীর গতিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু ট্রাকের বেশ জোরে হর্নের আওয়াজ বা ইঞ্জিনের গর্জনের দ্বারা মানুষকে চমকে দিয়ে বেশ মজা করে। আরেকটি যেই প্যারেড যা “মৃতদের দিবস” কেন্দ্র করে উদযাপন করা হয়। এখানে দেখা যায় অনেক পরিবার অংশগ্রহণ করে যেখানে তাদের দেখা যায় কফিন নানাভাবে সাজিয়ে প্যারেড করা হয়। বিকেলে একদিন শহরের মাঝখানে (বা স্কয়ারে) হাঁটতে গিয়ে দেখি মানুষের ভিড় আর কিছু গাড়ি এগিয়ে আসছে। একটু দাঁড়িয়ে দেখি নানা ধরনের সাজে মানুষ দিব্যি নাচ করছেন। বেশ ঝকমকে কাপড় পরে বা ভুতের পোশাক পরে তারা সুন্দর নেচে নেচে লোকজনকে আনন্দ দিচ্ছেন। এরপর এক একটি ট্রাক আসছে যাতে রয়েছে সাজানো কফিন। সাজের নানা থিম আছে, যেটি বিশেষ দ্রষ্টব্য। কখন দেখবেন কঙ্কালে ভরতি। সে আবার সব ধরনের কঙ্কাল — লম্বা, বেঁটে, ছোট। বাপস! বেশ ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। আবার একটু ভয় কমানোর জন্য এলো স্পাইডারম্যান কফিন ট্রাক। আবার কিছু ট্রাকের সেরকম সাজ নেই কিন্তু মানুষগুলো বেশ সুন্দর সেজে বা ভয়ংকর মুখোশ পরে মানুষের সামনে যাচ্ছেন। অনেক ট্রাক থেকে ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে খেলনা বা চকোলেট।
    শহরের কিছু দ্রষ্টব্যে দেখলাম যেমন একটি ফাঁকা ছোট মাঠের মধ্যে একটি ইউ-এফ-ও এবং কিছু এলিয়েনের পুতুল বসিয়ে রাখা হয়েছে। আবার নীল-বেগুনি আলো দিয়ে একটা অন্য গ্রহের পরিবেশের সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই জায়গাটির নাম দেওয়া হয়েছে “এরিয়া ৫১”। দিব্যি লাগে এগুলি দেখতে এবং সেলাম জানাতে হয় এরকম চিন্তাভাবনার। কেউ কি ভাবতে পারবেন হঠাৎ করে একদিন এসপ্ল্যানেডের মোড়ে একটি বড় মাকড়সা ও মাকড়সার জাল, বেশ মজা হলেও মানুষের সারাদিনের কাজের চাপে তাতে সত্যিকারের অবহেলার ছাপ পড়ে যাবে। এবার যেইদিন আসল উৎসবের দিন তখন আরও মজা। সাজ-সজ্জা সেইদিন দেখে কে! এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায় দেখ। যে যা পেরেছে, বিদেশের সিনেমায় যত ভুতের উল্লেখ আছে তা তো রাস্তায় দেখতে পাবেনই, তা ছাড়া কত রকমের ভূত, পেত্নি ইত্যাদি। এখানকার শপিং মল “স্যাম’স ক্লাব” বা “ওয়ালমার্ট” এও দেখবেন উঁচু সব ভূত পেত্নিতে ভর্তি। লোকের বাড়ির সামনে কুমড়ো বাদেও দেখবেন নানা ধরনের ছোট বড় ভূত। আমার আগের বাড়ির কাছে এক উল্লেখযোগ্য সাজের কথা বললে দেখতে হয় তাদের বাড়ির সামনে বিশালাকৃতি কঙ্কাল আর তার পাশে ছোট ছোট নানা কাজে ব্যস্ত কঙ্কাল। ভাবুন, রাত্রিবেলা কাজ শেষে ফেরার পথে আধা অন্ধকারে কঙ্কালের জ্বলন্ত চোখ… অতীব ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতি। তাছাড়া আরেকটি অদ্ভুত ভূত হল চাদর ভূত। ভারিক্কি কোনো সাজের ব্যাপার নেই, স্রেফ একটি চাদর মাথা থেকে পা অবধি চাপিয়ে ও চোখ নাক মুখের দিকটি কেটে বেশ একটি ভুতুড়ে ব্যাপার সৃষ্টি হয়েছে। এরকম অনেকে দল করে নানা সাজে ঘুরে বেড়ায় শহরময় এবং আমোদপ্রমোদের মধ্যে উদযাপন হয় এই ভুতেদের কেত্তন। আনন্দের মধ্যস্থলে রয়েছেন কচিকাচাদের দল। তাদের উদ্যম ছাপিয়ে যাওয়া না গেলেও বড়রাও দিব্যি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে।
    সবকিছুর মধ্যে একটা জিনিস দেখতে হবে সেটি হল মানুষের উৎসাহ। সবাই কিছু না কিছু সাজবে, অন্যকে আনন্দের ভয় দেবেন। সে যত বড় মানুষ হোক না কেন বা যেকোনো বয়সের হোক না কেন। কেউ কাউকে কটাক্ষ করবে না, বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের আনন্দ ও উচ্ছ্বাস বেড়ে উঠবে। একসাথে হয়ে আনন্দ করা, পুরো শহরকে গমগম করে রাখা সারা মাস জুড়ে ভুতেদের কেত্তন দেখিয়ে আনন্দের ভয় পাইয়ে একে অপরের পাশে থাকার নামই তো উৎসব।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন